Image description

মো. মঈন উদ্দিন। ৫ই আগস্টের পর নিজেকে শেরেবাংলা নগর যুবদলের প্রতিষ্ঠাতা সাংগঠনিক সম্পাদক দাবি করেন। এরপর শ্যামলী-শেরেবাংলা নগর এলাকার নিয়ন্ত্রণ নিতে গড়ে তোলেন আলাদা বাহিনী। তার দলে ভেড়ান তালিকাভুক্ত শীর্ষ সন্ত্রাসীর আশীর্বাদপুষ্ট ক্যাডারদের। এই ক্যাডারদের দিয়েই এলাকার প্রায় ৬০টি বেসরকারি হাসপাতাল থেকে প্রতি মাসে চাঁদা তোলেন মঈন। এই বাহিনীকে চাঁদা না দিয়ে শুধু হাসপাতাল নয় আবাসিক হোটেল, ব্যবসা প্রতিষ্ঠান পর্যন্ত কেউই চালাতে পারে না। তার হাত থেকে রেহাই পাইনি মসজিদ-মাদ্রাসাও। তার অনুমতি ছাড়া ওই এলাকায় কেউ ভবন ভাঙতেও পারে না, গড়তেও পারে না। পুরো এলাকায় ত্রাসের রাজত্ব কায়েম করেন তিনি। সম্প্রতি আলোচিত কিডনি চিকিৎসক প্রফেসর কামরুল ইসলামের মালিকানাধীন শ্যামলীর সেন্টার ফর কিডনি ডিজিজেস অ্যান্ড ইউরোলজি (সিকেডি) হাসপাতালে চাঁদা চাইতে গিয়ে আলোচনায় আসেন মঈন। মঈন ও তার বাহিনীকে গ্রেপ্তার করে কারাগারে পাঠালেও ওই এলাকায় চাঁদাবাজি থেমে নেই। সরকারি-বেসরকারি হাসপাতালের খাবার থেকে শুরু করে মেডিকেল ইকুইপমেন্ট সাপ্লাই, অবকাঠামো উন্নয়ন, নির্মাণ কাজের টেন্ডার (ঠিকাদারি), এ্যাম্বুলেন্স সিন্ডিকেটসহ পুরো শেরে বাংলা নগর ও শ্যামলী এলাকার নিয়ন্ত্রণ নিতে সক্রিয় আরও বেশ কয়েকটি চক্র। ওই এলাকার ফুটপাত, আবাসিক হোটেল এমনকি এলজিডি ও গণপূর্তের এক্সচেঞ্জ অফিসও তাদের নিয়ন্ত্রণে।

শেরেবাংলা নগর এলাকার একটি বেসরকারি হাসপাতালের মালিক বলেন, মঈন ও তার বাহিনীর অত্যাচারে গত দেড়/দুই বছর ধরে আমরা অতিষ্ঠ। কেউ কিছু বললেই তাকে আওয়ামী লীগ ট্যাগ দিয়ে লোকজন নিয়ে এসে ঝামেলা শুরু করে। প্রতিষ্ঠান দখল করে নেয়ার হুমকি দেয়। কাউকে হাসপাতাল থেকে বের হতে দেয় না। তিনি বলেন, আগে তো প্রতি মাসে ৫০ হাজার টাকা দিতে হতো। নির্বাচনের পর তা এক লাখ হয়েছে। শুধু চাঁদা নয় খাবার থেকে শুরু করে আসবাবপত্র, মেডিকেল ইকুইপমেন্ট কেনার জন্য শেরেবাংলা নগরের সবক’টি সরকারি হাসপাতালের ঠিকাদারির কাজও মঈনকে দেয়ার জন্য বাধ্য করা হয়। মঈন ও তার নিজস্ব লোক ছাড়া ওই এলাকার কোনো হাসপাতালের কাজ কাউকেই করতে দেয়া হয় না। আর এই জন্য কখনো লোক পাঠিয়ে, কখনো আবার নিজে সশরীরে গিয়ে সরকারি-বেসরকারি হাসপাতাল কর্তৃপক্ষকে চাপ প্রয়োগ করে মঈন। আর এসব কাজে নিজেকে ২৮ নম্বর ওয়ার্ডের কমিশনার প্রার্থী দাবি করে বড় বড় নেতাদের সঙ্গে কৌশলে তোলা ছবি ছিল তার অন্যতম হাতিয়ার।

মো. আজগর আলী, মো. শাহজাহান, লিয়াকত হোসেন, সালামসহ শ্যামলীর বেশ কয়েকজন বলেন, মঈনের বাসা শ্যামলীর ৪ নম্বর রোডে। তার গ্রামের বাড়ি নড়াইলে। আগে তাকে কেউ চিনতো না। কোনো খোঁজ-খবর ছিল না। ৫ই আগস্টের পর হঠাৎ মাথাচাড়া দিয়ে ওঠে মঈন। শীর্ষ সন্ত্রাসী ও কিছু রাজনৈতিক নেতার ছত্রছায়ায় সে এলাকায় কিশোর গ্যাং তৈরি করে। তাদের দিয়ে মাদক বিক্রি করায়। আবার কারও সঙ্গে কিছু হলে এই গ্যাংই তার হয়ে কাজ করে। শুধু হাসপাতালে চাঁদাবাজি নয়, এরা সরকারি হাসপাতালের এম্বুলেন্স সিন্ডিকেটও নিয়ন্ত্রণ করে। হাসপাতালের দালালরাও তার চক্রের সদস্য। ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অব নিউরো সায়েন্সেস ও হাসপাতালেও ত্রাসের রাজত্ব কায়েম করেছে মঈন বাহিনী। হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ ও এম্বুলেন্স চালকরা বলেন, হাসপাতালের সামনে এম্বুলেন্স মালিকদের মাসপ্রতি টাকা দিতো মঈনকে। শুধু তাই নয় হাসপাতালের সামনের ফুটপাথের দোকান থেকেও চাঁদা তোলে মঈনের লোকজন। তারা বলেন, মঈনের এই অপরাধ জগতে মাইনুদ্দিন, রুবেল, মোশাররফ, জসীম, মোহন, মামুন ও ফালানসহ বেশ কয়েকজন ঘনিষ্ঠ সহযোগী আছে। তাদের সকলের বিরুদ্ধেই হত্যা, মাদকসহ একাধিক মামলা রয়েছে। তারা বলেন, জান্নাতুল ফেরদৌস মসজিদের পরবর্তী অংশ থেকে শ্যামলীর প্রধান সড়ক পর্যন্ত বেশ কয়েকটি দোকান বসিয়েছেন মঈন। মাদক কারবারের জন্য খালের পাড়ের বিদ্যুতের লাইনের দায়িত্বে থাকা মো. আলতাফকে টাকা দিয়ে গত দেড় বছর ধরে এই সড়কের বাতি বন্ধ রেখেছেন মঈন। এ ছাড়াও সড়ক ও জনপথ স্টাফ কোয়ার্টারের অন্তত ৩০টি ঘর দখল করেছে মঈন। কলোনির পাশের এলাকার গার্মেন্টস থেকেও নিয়মিত চাঁদা নেয় সে।

শ্যামলী এলাকায় ১০ থেকে ১৫টি আবাসিক হোটেল রয়েছে। এসব হোটেলে ইয়াবাসহ বিভিন্ন মাদক সরবরাহ করেন মঈন। এসব আবাসিক হোটেল থেকে মাসিক চাঁদা নেয় মঈন বাহিনী। এ ছাড়া এলাকার ক্যাবল, ইন্টারনেট এমনকি ময়লার ব্যবসাও রয়েছে মঈনের নিয়ন্ত্রণে। 

শুধু চাঁদা নয় তাদের হাত থেকে বাসাবাড়ি এমনকি মসজিদ-মাদ্রাসাও রেহায় পাইনি। সম্প্রতি জান্নাতুল ফেরদৌস মসজিদের পূর্ব পাশে ব্যক্তি মালিকানাধীন ১০ কাঠার একটি জমিতে ভবন নির্মাণ শুরু হলে মঈন তার দলবল নিয়ে কাজ বন্ধ করে দেয়। ওই জমির মালিক ও ডেভেলপার কোম্পানির কর্মকর্তারা বলেন, অনেকদিন ধরে জায়গাটির উপর মঈনের নজর ছিল। সম্প্রতি ভবনের কাজ শুরু করতে গেলে বাধা দেয়া হয়। মঈন আমাদের বলে, এখানে সরকারি জায়গা আছে। ডেভেলপার কোম্পানির কর্মীরা কাজ শুরু করতে গেলে তাদের মারধর করা হয়। পরে মঈন তার ইচ্ছামতো বাউন্ডারি দিয়েছে। এদিকে শ্যামলী ৪ নম্বর রোডের মাদ্রাসাতুল কাউসার আল-ইসলামিয়া মাদ্রাসার এক শিক্ষক বলেন, আমাদের মাদ্রাসায় প্রতিদিন অনেক সবজি প্রয়োজন হয়। সাধারণত আমরা যেখানে কম দাম পাই সেখান থেকে সবজি কিনি। কিন্তু হঠাৎ একদিন মঈন তার কিশোর গ্যাংয়ের লোকজন নিয়ে আমার কাছে বলে, তাদের কাছ থেকেই মাদ্রাসার সবকিছু কিনতে হবে।

তবে আমরা রাজি না হওয়ায় মঈন তখন আমাদের অনেক হুমকি-ধামকি দেয়। গালিগালাজ করে। মাদ্রাসা বন্ধ করে দিতে চায়। পরে লোকজন ধরে আমরা রেহাই পাই। তিনি বলেন, এর কিছুদিন পরে আমরা মাদ্রাসা বড় করার জন্য আমাদের পুরনো ভবন ভেঙে নতুন ভবন নির্মাণের সিদ্ধান্ত নিই। কিন্তু মঈন আবারো ঝামেলা শুরু করে। সে আমাদের বলে- আমরা নাকি আমাদের ভবন ভাঙতে পারবো না। ভাঙতে হলে তার কাছে ভবনটি বিক্রি করতে হবে। নতুন ভবনের জন্য তার লোকের কাছ থেকে রড, বালু, সিমেন্ট সবকিছু কিনতে হবে। এতসব ঝামেলা দেখে আমরা আমাদের নতুন ভবন তৈরির সিদ্ধান্ত থেকে সরে আসি। শ্যামলী এলাকার ওই মাদ্রাসার বিপরীত পাশেই জান্নাতুল ফেরদৌস মসজিদ এবং একটু সামনে সড়ক ও জনপথ স্টাফ কোয়ার্টার জামে মসজিদের অবস্থান। দুই মসজিদ কর্তৃপক্ষ জানায়, ৫ই আগস্টের পর এই দুই মসজিদ কমিটি ভেঙে দেয় মঈন। পরে নতুন কমিটিতে নিজের পছন্দের লোক বসায়। তবে স্থানীয় ও বিএনপি’র অন্য নেতাদের চাপে ওই কমিটি আবার ভেঙে দিয়ে নতুন কমিটি করা হয়। সেখানেও বসানো হয়েছে তার পছন্দের লোক।

শুধু মঈন উদ্দিনই নয় ওই এলাকার নিয়ন্ত্রণ করছেন মোহাম্মদপুর এলাকার এক যুব নেতাও। এম্বুলেন্সের সিন্ডিকেট নিয়ন্ত্রণ নিয়ে কিছুদিন আগে তিনিও খবরের শিরোনাম হন। পুরো এলাকার একটা বড় অংশই তার নিয়ন্ত্রণে। আর তাকে পেছন থেকে শেল্টার দিচ্ছেন ৫ই আগস্টের পর কারাগার থেকে বের হওয়া পুলিশের তালিকাভুক্ত এক শীর্ষ সন্ত্রাসী। এছাড়াও শাহ আলম, বিপ্লব, অপু, মনির হোসেন, রাকিবুল ইসলাম, মো. খায়রুলসহ বেশ কয়েকজন বর্তমানে এলাকাটির নিয়ন্ত্রণ করছেন। ওঠে এসেছে সরকারি চাকরির আড়ালে গত ১৬ বছর কাজী এন্টারপ্রাইজ, কবীর এন্টারপ্রাইজ, সুজন এন্টারপ্রাইজ, প্রভী ইন্টারন্যাশনাল ও ফারহানা এন্টারপ্রাইজের নামে শেরে বাংলা নগরের বিভিন্ন সরকারি হাসপাতালের ঠিকাদারি ও খাদ্য সরবরাহের কাজ হাতিয়ে নেয়া দুই সহোদর কাজী জাহিদ হাসান (তারিফ) ও কাজী কবিরের নাম। তবে মঈন কাণ্ডের পর বর্তমানে সকলেই গা বাঁচিয়ে চলছেন।

এদিকে এত অভিযোগের পরও এতদিন কেন মঈনসহ অনান্যদের বিরুদ্ধে কেনো ব্যবস্থা নেয়া হয়নি- এমন প্রশ্নের জবাবে ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশ-ডিএমপি’র শেরেবাংলা নগর থানার অফিসার ইনচার্জ (ওসি) মনিরুল ইসলাম বলেন, এতদিন মঈন বা এসব অভিযুক্তের বিরুদ্ধে আমাদের কাছে তেমন কেউ কোনো সুনির্দিষ্ট অভিযোগ করেনি। এখন সুস্পষ্ট অপরাধে মঈন ও তার সহযোগীদের বিরুদ্ধে মামলা হয়েছে। সেই মামলাতেই তাকে গ্রেপ্তার করে আদালতে ৭ দিনের রিমান্ড চাওয়া হয়। আদালত ৩ দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করেছেন। এমন আরও যদি কেউ কারোর দ্বারা ক্ষতিগ্রস্ত হয়, সেক্ষেত্রে আমরা ভুক্তভোগীদের বলবো- আমাদের থানায় অভিযোগ দিতে, আমরা যথাযথ আইনি ব্যবস্থা নেবো।
উল্লেখ্য, সম্প্রতি আলোচিত কিডনি চিকিৎসক কামরুল ইসলামের মালিকানাধীন শ্যামলীর সেন্টার ফর কিডনি ডিজিজেস অ্যান্ড ইউরোলজি (সিকেডি) হাসপাতালে ৫ লাখ চাঁদা দাবির অভিযোগ ওঠে এই মঈনের বিরুদ্ধে। এ নিয়ে গণমাধ্যমে সংবাদ প্রকাশ হলে বিষয়টি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে।

বিষয়টি নজরে আসে প্রধানমন্ত্রীর। মধ্য রাতেই সিকেডি হাসপাতালে পাঠান যুবদলের দুই শীর্ষ নেতাকে। চাঁদাবাজদের বিরুদ্ধে দ্রুত ব্যবস্থা নেয়ার নির্দেশ দেন প্রশাসনকে। ওই ঘটনার পরদিনই মঈনের চার সহযোগীকে আটক করে র‌্যাব। এরপর সোমবার সকাল ৬টার দিকে নড়াইলের কালিয়া থেকে মঈনকে আটক করা হয়। একইসঙ্গে লিটন মিয়া, সুমন, শাওন, স্বপন কাজি, মো. ফালান ও রুবেলসহ মঈনের আরও ৬ সহযোগীকে আটক করে থানায় হস্তান্তর করেছে র‌্যাব। তাদের রিমান্ডও মঞ্জুর করেছেন আদালত।