রাজধানীর জ্বালানি সংকট এখন আর শুধু অভাবের গল্প নয়, এটি পরিণত হয়েছে নগরবাসীর যন্ত্রণার এক মহাকাব্যে। তেলের জন্য হাহাকার এখন ঢাকার প্রতিটি সড়কের মোড়ে। পাম্পগুলোতে দীর্ঘ প্রতীক্ষার পরও মিলছে না কাঙ্ক্ষিত জ্বালানি। অবস্থা এমন পর্যায়ে পৌঁছেছে যে, মাত্র কয়েক লিটার তেলের জন্য চালকদের দিনের ২৪ ঘণ্টার অর্ধেকটাই কাটাতে হচ্ছে রাজপথে। সরকারের পক্ষ থেকে পর্যাপ্ত মজুতের আশ্বাস দেওয়া হলেও বাস্তব চিত্র বলছে ভিন্ন কথা। হাহাকার আর অনিশ্চয়তার এই ক্লান্তিকর লড়াইয়ে পিষ্ট হচ্ছে সাধারণ মানুষ।
রাজধানীর বিজয় সরণির ট্রাস্ট ফিলিং স্টেশনসহ বিভিন্ন এলাকায় শনিবার সরেজমিন দেখা যায়, যানবাহণের অন্তহীন সারি। অনেক চালক অভিযোগ করেছেন, তেলের সিরিয়াল পেতে তাদের ১২ ঘণ্টা পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হচ্ছে। দীর্ঘ সময় লাইনে দাঁড়িয়ে থাকায় পেটে দানাপানি জুটছে না অনেকের। শুধু পানি খেয়েই রোদে পুড়ছেন তারা। গাড়ি রেখে খেতে যাওয়ারও উপায় নেই। যন্ত্রাংশ চুরির ভয়ে চালকের আসন ছেড়ে নামতেও পারছেন না অনেকে। প্রতিটি পাম্পেই এখন একই দৃশ্য। তেল পাওয়ার অনিশ্চয়তা আর ঘণ্টার পর ঘণ্টা অপেক্ষার এক অসম লড়াই।
মতিঝিলের মেঘনা পেট্রোলপাম্পের লাইনে ৬ ঘণ্টা ধরে অপেক্ষায় থাকা মোটরসাইকেলচালক জামিল আহমেদ ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, ১০ বছর ধরে মোটরসাইকেল চালাই, তেলের জন্য এমন কষ্ট জীবনেও দেখিনি। রাত জেগে পাম্পে দাঁড়িয়েও তেল পাচ্ছি না। সরকার বলছে সংকট নেই। তাহলে এই দীর্ঘ লাইন কেন? তীব্র গরমে জীবন বের হয়ে যাওয়ার মতো অবস্থা।
আরেক বাইকার কালাম আজাদ বলেন, গত সপ্তাহে সংসদ এলাকার একটি পাম্পে ১৪ ঘণ্টা অপেক্ষা করে তেল পেয়েছি। এখন জরুরি প্রয়োজন ছাড়া আর মোটরসাইকেল বের করছি না। তার ভাষায়, মোটরসাইকেলের তেল শেষ হলে তা সংগ্রহ করা যে কী দুঃসহ যন্ত্রণা, তা বলে বোঝানো যাবে না।
সাধারণ মানুষ ১০-১২ ঘণ্টা লাইনে দাঁড়িয়ে থাকলেও প্রভাবশালী বা প্রশাসনের পরিচয় দিয়ে এক শ্রেণির মানুষ মুহূর্তেই তেল নিয়ে যাচ্ছেন বলে অভিযোগ উঠেছে। সচিব কিংবা প্রশাসনের দোহাই দিয়ে অথবা ফোনে কথা বলিয়ে লাইনের বাইরে তেল নেওয়ার এই সংস্কৃতিতে সাধারণ চালকদের মাঝে তীব্র ক্ষোভের সৃষ্টি হয়েছে। মগবাজারের মঈন মোটর ফিলিং স্টেশনে নাজিম নামের এক বাইকার আক্ষেপ করে বলেন, আমরা ঘণ্টার পর ঘণ্টা দাঁড়িয়েও তেল পাই না। অথচ অনেকে ক্ষমতা দেখিয়ে বা কর্মীদের ১০০-২০০ টাকা বাড়তি দিয়ে সিস্টেম করে তেল নিয়ে যাচ্ছে। এতে আমাদের অপেক্ষা আরও দীর্ঘ হচ্ছে।
ফিলিং স্টেশন মালিকদের দাবি, চাহিদার তুলনায় ডিপো থেকে সরবরাহ মিলছে যৎসামান্য। সময়মতো তেল না আসায় তারা গ্রাহকদের সামাল দিতে পারছেন না। তাদের মতে, বিশ্ব পরিস্থিতি বা যুদ্ধের চেয়েও বড় সমস্যা হয়ে দাঁড়িয়েছে অসাধু চক্রের কারসাজি। আর সাধারণ মানুষের মাঝে আতঙ্কিত হয়ে তেল মজুত করার প্রবণতা। কঠোর তদারকি না বাড়ালে এই সংকট থেকে মুক্তি মেলা কঠিন বলে তারা আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন।
রাজধানীর অধিকাংশ পাম্পে ‘তেল নেই’ সাইনবোর্ড ঝুললেও শত শত মানুষ এই আশায় দাঁড়িয়ে আছেন যে, হয়তো বিকালের দিকে ডিপো থেকে গাড়ি আসবে। জ্বালানি খাতের এই অস্থিরতা কবে নাগাদ স্বাভাবিক হবে সে বিষয়ে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ এখনো কোনো সুনির্দিষ্ট আশার বাণী শোনাতে পারেনি। এতে সাধারণ মানুষের ভোগান্তি শুধু দীর্ঘ থেকে দীর্ঘতর হচ্ছে।