Image description

দেশের ভোজ্য তেলের বাজারে আবারো অস্থিরতা দেখা দিয়েছে। গত দুই মাস ধরে সয়াবিন তেলের সরবরাহ স্বাভাবিক না থাকায় বাজারে সৃষ্টি হয়েছে তীব্র সংকট, যা বর্তমানে আরও প্রকট আকার ধারণ করেছে। সরবরাহকারী  প্রতিষ্ঠানগুলো এখনো পরিস্থিতি স্বাভাবিক করতে কার্যকর পদক্ষেপ নিচ্ছে না বলে অভিযোগ উঠেছে বিভিন্ন মহলে। ফলে সংকটের প্রভাব সরাসরি পড়েছে বাজারদরে। নির্ধারিত মূল্যের চেয়ে বেশি দামে বিক্রি হচ্ছে সয়াবিন তেল।
ক্রেতাদের অভিযোগ, দাম বাড়ানোর জন্য বড় বড় কোম্পানিগুলো ইচ্ছা করে কৃত্রিম সংকট তৈরি করছে, তাই সরকারকে কঠোর পদক্ষেপ নেয়ার আহ্বান জানান তারা।

অন্যদিকে বিক্রেতারা বলছেন, রমজানের পর থেকেই বাজারে সয়াবিন তেলের সরবরাহ কম। চাহিদামতো তেল দিচ্ছে না ডিলাররা। অনেক ক্ষেত্রে তেল চাইলে মানতে হচ্ছে তাদের শর্ত। কখনো কখনো তেলের সঙ্গে কোম্পানির অন্যান্য পণ্য ক্রয়ের শর্তে অল্প পরিমাণ তেল মিলছে। এ ছাড়া, মধ্যপ্রাচ্যে ইরানের ওপর ইসরাইল ও যুক্তরাষ্ট্রের হামলার জেরে দাম বাড়ার আশঙ্কায় অনেকে চাহিদার চেয়ে অতিরিক্ত তেল কেনায় সৃষ্টি হয়েছে সংকট।

সরজমিন রাজধানীর কাওরান বাজার, যাত্রাবাড়ী, শনির আখড়া, শেওড়াপাড়া ও সেগুনবাগিচা বাজার ঘুরে দেখা গেছে, রাজধানীর বড় বাজারের কয়েকটি দোকানে তেল পাওয়া গেলেও মহল্লার দোকানগুলোতে পাওয়া যাচ্ছে না। আবার বেশ কয়েকজন বিক্রেতা সয়াবিন তেলের সঙ্গে অন্যান্য পণ্য কেনার শর্ত জুড়ে দিচ্ছেন। পরিচিত গ্রাহক ছাড়া অপরিচিত গ্রাহকদের স্পষ্ট জানিয়ে দিচ্ছেন তেল নেই। এ সুযোগে অবশ্য বাড়তি দামে বিক্রি হচ্ছে খোলা সয়াবিন তেল। কোথাও কোথাও খোলা সয়াবিন তেল প্রতি লিটার ২২০ টাকা পর্যন্ত বিক্রি হচ্ছে। পছন্দের ব্র্যান্ডের বোতলজাত সয়াবিন খুঁজে পাওয়া এখন সৌভাগ্যের বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে। আগে অপরিচিত ব্র্যান্ডের সয়াবিন তেল দেখা গেলেও বর্তমানে তাও মিলছে না।

বর্তমানে বোতলজাত তেলের উল্লেখিত সর্বোচ্চ খুচরা মূল্য (এমআরপি) ১৯৫ টাকা প্রতি লিটার। অথচ খোলা সয়াবিন তেল প্রতি লিটার ২০০ থেকে ২২০ টাকা ও পাম তেল ১৯০ থেকে ২০০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। সংকট থাকায় যেসব দোকানে সয়াবিন তেল রয়েছে, তারা সর্বোচ্চ মূল্য থেকে বেশি দামে বিক্রি করছেন।
রাজধানীর শনির আখড়া গোবিন্দপুর বাজারের মুদি দোকানি রাশেদ হোসেন বলেন, রমজান থেকেই বাজারে সয়াবিন তেলের সংকট। কোম্পানিগুলো তেলের সরবরাহ কমিয়ে দিয়েছে। এখন তেল নেয়ার জন্য কিছু শর্ত জুুড়ে দিচ্ছেন। তেলের পাশাপাশি তাদের মরিচ, হলুদ, মুরগির মাংসের মসলা- এগুলো নিতে হয়। বাজারে তাদের যেসব পণ্য চলে না, সেগুলো কিনতে বাধ্য করছে। এ ছাড়া, ফোনে অর্ডার নিলেও দোকান পর্যন্ত তেল পৌঁছে দিচ্ছেন না। ডিলার পয়েন্ট থেকে তেল আনতে বাড়তি পরিবহন খরচ হচ্ছে। তাই এখন বোতলজাত সয়াবিন তেল বিক্রি বন্ধ করে দিয়েছি। 

সেগুনবাগিচার হেলাল স্টোরের দোকানি মালেক হোসেন বলেন, খোলা তেলের দাম বেশি হওয়ায় অনেকেই এখন বোতলজাত সয়াবিন তেল নিতে চায়। যুদ্ধের জেরে অনেকে অতিরিক্ত তেল কিনে বাসায় মজুত করছেন। এমনিতেই সরবরাহ কম, এর উপর সবাই আতঙ্কে অতিরিক্ত তেল কেনায় বোতলজাত সয়াবিন তেলের সংকট তৈরি হয়েছে। সীমিত সংখ্যক যে তেল পাই তাতে সবাইকে বোতলজাত সয়াবিন দেয়া সম্ভব হচ্ছে না। যারা পুরনো ক্রেতা তারা এলে আগে তাদেরকে তেল দেই।

কাওরান বাজারের মুদি এস এম ট্রেডার্সের সাকিল বলেন, গত কয়েকদিন ধরে চাহিদামতো বোতলজাত সয়াবিন তেলের সরবাহ করছে না কোম্পানিগুলো। বলে তেল নেই। হয়তো দাম বাড়ানোর জন্য সরবরাহ কমিয়ে দিয়েছে বড় বড় প্রতিষ্ঠানগুলো। বোতল থেকে খোলা সয়াবিন তেলের দাম বাড়তি। এ ছাড়া, যুদ্ধের জেরে অনেকে বেশি পরিমাণে তেল কিনছেন তাই সংকট আরও বেশি দেখা যায়।

শনির আখড়ায় দুই লিটার সয়াবিন তেলের ৪টি বোতল কিনে বাসায় যাচ্ছিলেন বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে কর্মরত মোরশেদ আলম। তিনি বলেন, সামনে তেলের সংকট তীব্র আকার ধারণ করবে। বাজারে তেল পাওয়া যাচ্ছে না, ৫ লিটারের তেল নেই। ইরান যুদ্ধের ভুক্তভোগী বাংলাদেশ। তাই এগুলো কিনেছি। ব্যবসায়ীরা দাম বাড়ানোর জন্য পাঁয়তারা করছেন।

পশ্চিম শেওড়াপাড়ার হাবিব স্টোরের হাবিব হোসেন বলেন, এক মাস ধরে তেলের সরবরাহ নেই। যা পাই সেগুলো বাড়তি দামে কিনতে হচ্ছে। ডিলারদের কাছ থেকেও বাড়তি দামে তেল ক্রয় করতে হচ্ছে। তাই বোতলের গায়ে লেখা দামের চেয়ে কিছুটা বেশি দামে বিক্রি করতে হচ্ছে। আর খোলা সয়াবিন তেল ২২০ টাকা করে বিক্রি করছি। খোলা সয়াবিন তেলের দাম বেড়ে যাওয়ায় সবাই বোতলজাত সয়াবিন তেল ক্রয় করতে আসছেন। কিন্তু সরবরাহ না থাকায় সবাইকে তেল দিতে পারছি না।

এর আগে, মধ্যপ্রাচ্য যুদ্ধের কারণে আন্তর্জাতিক বাজারে অপরিশোধিত ভোজ্য তেলের দাম বাড়ায় গত ২৫শে মার্চ বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ে তেলের দাম সমন্বয়ের দাবি জানিয়ে চিঠি দেয় বাংলাদেশ ভেজিটেবল অয়েল রিফাইনার্স অ্যান্ড বনস্পতি ম্যানুফ্যাকচারার্স এসোসিয়েশন। তবে সরকার থেকে অনুমতি না পাওয়ায় বোতলজাত সয়াবিনের দাম বাড়াতে পারেনি কোম্পানিগুলো।