দেশের শিক্ষা ব্যবস্থাকে আধুনিক ও প্রযুক্তিনির্ভর করতে ‘ওয়ান টিচার, ওয়ান ট্যাব’ প্রকল্প চালুর ঘোষণা দিয়েছে নতুন সরকার।
পরিকল্পনা অনুযায়ী, এ ট্যাবে থাকবে পাঠ পরিকল্পনার টেমপ্লেট, প্রশ্নব্যাংক এবং লার্নিং এভিডেন্স আপলোডের সুবিধা। তবে শিক্ষাবিদ ও সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, এ উদ্যোগের সফল বাস্তবায়নে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হতে পারে শিক্ষকদের প্রয়োজনীয় দক্ষতার অভাব।
সম্প্রতি জাতীয় প্রাথমিক শিক্ষা একাডেমি (নেপ) প্রকাশিত এক গবেষণা প্রতিবেদনে উঠে এসেছে, ডিজিটাল শিক্ষা ও একুশ শতকের দক্ষতা প্রয়োগে অনেক পিছিয়ে রয়েছেন দেশের শিক্ষকরা। প্রায় ৬০ শতাংশ নিজেদের দক্ষ দাবি করলেও বাস্তবে শ্রেণীকক্ষে তা প্রয়োগ করতে পারছেন কেবল এক-চতুর্থাংশ শিক্ষক। আট বিভাগের ১৬টি উপজেলার ১৩ হাজারের বেশি শিক্ষকের তথ্য বিশ্লেষণ করে ‘সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষকদের ২১ শতকের দক্ষতার উপলব্ধি এবং বাস্তবায়নের চ্যালেঞ্জসমূহ অনুসন্ধান’ বিষয়ক প্রতিবেদনটি তৈরি করা হয়।
প্রাথমিকের মতো দক্ষতার ঘাটতি রয়েছে মাধ্যমিক স্তরের শিক্ষকদেরও। ইউনেস্কো প্রকাশিত বিশ্ব শিক্ষা পরিসংখ্যান অনুযায়ী, প্রয়োজনীয় প্রশিক্ষণ বিবেচনায় দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর মধ্যে ন্যূনতম দক্ষতাসম্পন্ন শিক্ষকের হারে বাংলাদেশের অবস্থান সবার পেছনে। এ প্রতিবেদন অনুযায়ী দেশের মাধ্যমিক স্তরে গড়ে ন্যূনতম দক্ষতাসম্পন্ন শিক্ষকের হার মাত্র ৫৫ শতাংশ।
অন্তর্বর্তী সরকারের সময় প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়ের উদ্যোগে প্রাথমিক ও উপানুষ্ঠানিক শিক্ষার মানোন্নয়ন এবং শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের উদ্যোগে মাধ্যমিক শিক্ষার মানোন্নয়নে দুটি পৃথক পরামর্শক কমিটি গঠন করা হয়। ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ের ইমেরিটাস অধ্যাপক মনজুর আহমদের নেতৃত্বে উভয় কমিটির প্রতিবেদনেই দক্ষ শিক্ষক নিশ্চিতে যথাযথ প্রশিক্ষণে গুরুত্বারোপ করা হয়েছিল।
জানতে চাইলে অধ্যাপক মনজুর আহমদ বণিক বার্তাকে বলেন, ‘অতীতেও আমরা ডিজিটাল ক্লাসরুম, ল্যাপটপ প্রদানসহ নানা উদ্যোগ দেখেছি। তবে শিক্ষার মানোন্নয়নে সে প্রকল্পগুলোর তেমন প্রভাবে দেখা যায়নি। আর এর পেছনে একটি বড় কারণ ছিল যথাযথ পরিকল্পনার অভাব। বিদ্যালয়ে ডিজিটাল শিক্ষা উপকরণ দেয়া হলেও পর্যাপ্ত দক্ষতাসম্পন্ন শিক্ষক কিন্তু তৈরি করা হয়নি। দেখা গেছে অনেক বিদ্যালয়ে ল্যাপটপ দেয়া হলেও সেগুলো পরিচালনার জন্য পর্যাপ্ত প্রশিক্ষণ দেয়া হয়নি। আবার অনেক ক্ষেত্রে ল্যাপটপ, ডেস্কটপ বা শিক্ষাসামগ্রীর মান ভালো ছিল না, প্রয়োজনীয় নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ ও ইন্টারনেট সংযোগ ছিল না। শেষ পর্যন্ত ওইগুলো দিনের পর দিন অব্যবহৃত থেকে নষ্ট হয়েছে।’
আরো একটি বড় সমস্যার কথা উল্লেখ করে এ শিক্ষাবিদ বলেন, ‘অনেক সময় প্রশিক্ষণ দেয়া হলেও শিক্ষকরা সেখান থেকে কাঙ্ক্ষিত দক্ষতা অর্জন করতে পারছেন কিনা এবং শ্রেণীকক্ষে তা প্রয়োগ করতে পারছেন কিনা সেটি নিশ্চিত করা হয় না। মনিটরিং ও ইভ্যালুয়েশনের বড় ঘাটতি আছে আমাদের। এছাড়া আমাদের শিক্ষক সংখ্যাও অপ্রতুল। তাই ডিজিটাল শিক্ষা নিশ্চিত করতে হলে শুধু শিক্ষা উপকরণ দিলেই হবে না, এসব ঘাটতিও দূর করতে হবে।’
এদিকে প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়, শিক্ষা মন্ত্রণালয় এবং তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি মন্ত্রণালয়ের বিভিন্ন প্রকল্পের আওতায় দেশে হাজারো ডিজিটাল ক্লাসরুম ও ল্যাব স্থাপন করা হয়। অথচ এর বড় অংশই বর্তমানে অব্যবহৃত। ‘শেখ রাসেল ডিজিটাল ল্যাব’ প্রকল্পের আওতায় প্রথম ধাপে ৪ হাজার ১৭৬টি প্রতিষ্ঠানে ল্যাব স্থাপন করা হয়। তবে সরকারের বাস্তবায়ন পরিবীক্ষণ ও মূল্যায়ন বিভাগের (আইএমইডি) মূল্যায়নে দেখা গেছে, তদারকির অভাব, প্রশিক্ষিত শিক্ষকের ঘাটতি, নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ ও ইন্টারনেট সংযোগের সংকট এবং উপযুক্ত কারিকুলাম না থাকায় এসব ল্যাব কার্যকরভাবে ব্যবহার করা সম্ভব হয়নি। এছাড়া প্রকল্প বাস্তবায়নে দুর্নীতির অভিযোগও রয়েছে। শেখ রাসেল ডিজিটাল ল্যাব প্রকল্পের দ্বিতীয় ধাপে ৯৩৮ কোটি টাকার বাজেটের মধ্যে ৭০৮ কোটি টাকা ব্যয়েই অনিয়মের প্রমাণ পাওয়া গেছে বলে নিরীক্ষা প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
২০২৪ সালের ৫ আগস্ট আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর ল্যাবের নাম পরিবর্তন করে ‘শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ডিজিটাল ল্যাব স্থাপন প্রকল্প’ নামকরণ হয়। তবে নাম পরিবর্তন হলেও এখনো যথাযথভাবে কার্যক্রম চালুর বিষয়ে কোনো পদক্ষেপ নেয়া হয়নি বলে জানিয়েছেন একাধিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক।
মানিকগঞ্জের সাটুরিয়ার একটি বিদ্যালয়ের আইসিটি শিক্ষক নাম অপ্রকাশিত রাখার শর্তে বণিক বার্তাকে বলেন, ‘২০২১ সালে যখন আমাদের বিদ্যালয়ে ল্যাব স্থাপন করা হয় তখনই ১৭টি ল্যাপটপের পাঁচটি নষ্ট ছিল। এক বছরের মধ্যে আরো ১০টি ল্যাপটপ নষ্ট হয়ে যায়। এখন মাত্র দুটি আংশিকভাবে চলে। এছাড়া মাল্টিমিডিয়া ক্লাসরুমের ওয়েবক্যামও নষ্ট। অন্তর্বর্তী সরকারের সময় শুধু ল্যাবের নাম পরিবর্তন করা হয়েছে। তবে এটি কার্যকরের কোনো উদ্যোগ নেয়া হয়নি।’
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, শুধু প্রযুক্তি সরবরাহ নয়, শিক্ষকদের দক্ষতা উন্নয়ন, কার্যকর প্রশিক্ষণ, নিয়মিত মনিটরিং এবং অবকাঠামোগত উন্নয়ন নিশ্চিত না করলে ‘ওয়ান টিচার, ওয়ান ট্যাব’ উদ্যোগও আগের প্রকল্পগুলোর মতো প্রত্যাশিত সুফল দিতে ব্যর্থ হতে পারে। এমনকি শিক্ষকরাও এমনটি মনে করেন।
এ বিষয়ে বাংলাদেশ প্রাথমিক শিক্ষক সমিতির সাধারণ সম্পাদক মোস্তাফিজুর রহমান শাহীন বণিক বার্তাকে বলেন, ‘এর আগে কিছু বিদ্যালয়ে ডিজিটাল ল্যাব করার উদ্যোগ নেয়া হয়েছিল, কিন্তু সেটি প্রতিষ্ঠানগুলোয় কোনো ইতিবাচক ফল আনতে পারেনি। এর কারণ ছিল প্রশিক্ষিত শিক্ষকের ঘাটতি, মানহীন সরঞ্জাম। ওয়ান টিচার, ওয়ান ট্যাব একটি ভালো উদ্যোগ। তবে এর আগে সব শিক্ষককে প্রশিক্ষণের আওতায় আনার পাশাপাশি বিদ্যালয়ের অবকাঠামো, ইন্টারনেট সংযোগ নিশ্চিত করতে হবে। অন্যথায় এটিও ব্যর্থ হতে পারে।’
নেপের গবেষণায় একুশ শতকের দক্ষতা হিসেবে শিক্ষাদান, বিষয়ভিত্তিক জ্ঞান, ডিজিটাল জ্ঞান, সূক্ষ্ম চিন্তন, সৃজনশীল চিন্তন, সমস্যার সমাধানে দক্ষতা, স্বব্যবস্থাপনা, সিদ্ধান্ত গ্রহণের দক্ষতা, যোগাযোগ দক্ষতা, জীবনভিত্তিক দক্ষতা, সমন্বয়সহ মোট ১৩টি বিষয়কে বিবেচনায় নেয়া হয়েছে। প্রতিবেদনের তথ্য বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, শিক্ষকদের মধ্যে ৭ দশমিক ২ শতাংশ মনে করেন তাদের বিষয়ভিত্তিক জ্ঞান অসাধারণ পর্যায়ে রয়েছে। ১৪ দশমিক ৬ শতাংশ মনে করেন খুব ভালো পর্যায়ে। আর ৪২ দশমিক ৮ শতাংশ জানান তাদের বিষয়ভিত্তিক জ্ঞান ভালো পর্যায়ে রয়েছে। কিন্তু যখন শ্রেণীকক্ষে প্রায়োগিক দক্ষতা বিশ্লেষণ করা হয় তখন দেখা যায়, মাত্র ৩০ দশমিক ১ শতাংশ শিক্ষক শ্রেণীকক্ষে পর্যাপ্ত দক্ষতার প্রয়োগ করতে পেরেছেন। ডিজিটাল শিক্ষা বোঝার দক্ষতার ক্ষেত্রে ২ দশমিক ৭ শতাংশ মনে করেছেন তাদের বোঝাপড়া অসাধারণ, ৯ দশমিক ১ শতাংশের ধারণা খুব ভালো আর ২৩ দশমিক ৯ শতাংশ মনে করছেন ভালো মানের। অথচ প্রয়োগের ক্ষেত্রে দেখা গেছে, মাত্র ১৯ দশমিক ৪ শতাংশ শিক্ষক শ্রেণীকক্ষে পর্যাপ্ত দক্ষতার প্রয়োগ করতে পারছেন। একই ধরনের চিত্র দেখা গেছে অন্যান্য দক্ষতার ক্ষেত্রেও। নিজেদের দক্ষতাসম্পন্ন মনে করছেন এমন শিক্ষকদের প্রায় অর্ধেকই পাঠদানের ক্ষেত্রে তা প্রয়োগ করতে পারছেন না।
প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষকদের ক্ষেত্রে ‘ওয়ান টিচার, ওয়ান ট্যাব’ উদ্যোগটি প্রাথমিক শিক্ষা উন্নয়ন কর্মসূচির (পিইডিপি-৫) আওতায় বাস্তবায়ন করা হবে বলে জানিয়েছেন প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তরের মহাপরিচালক আবু নূর মো. শামসুজ্জামান। বণিক বার্তাকে তিনি বলেন, ‘দেশে বর্তমানে প্রায় ৬৫ হাজার ৫০০টি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের মধ্যে প্রায় ৬২ হাজারে মাল্টিমিডিয়া প্রজেক্টর, ল্যাপটপ ও সাউন্ড সিস্টেম সরবরাহের মাধ্যমে ডিজিটাল ক্লাসরুম স্থাপন করা হয়েছে। তবে এসব উপকরণ ব্যবহারের ক্ষেত্রে শিক্ষকদের যে প্রশিক্ষণ দেয়া হয়েছিল, তা ছিল প্রাথমিক ধারণা পর্যায়ের; পূর্ণাঙ্গ প্রশিক্ষণ নয়।’
এ ঘাটতি কাটাতে অধিদপ্তর তাদের লিডারশিপ ট্রেনিং সেন্টারগুলোয় ১০ দিনের প্রশিক্ষণ কার্যক্রম চালু করেছে বলে জানান প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তরের মহাপরিচালক। একই সঙ্গে ‘ওয়ান টিচার, ওয়ান ট্যাব’ উদ্যোগটি পিইডিপি-৫-এর আওতায় বাস্তবায়নের সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছে, আগামী জুলাই থেকে প্রকল্পের কাজ শুরু হবে বলে তিনি আশা প্রকাশ করেন। মো. শামসুজ্জামান আরো বলেন, ‘ট্যাব বিতরণের আগে শিক্ষকদের জন্য উপযোগী প্রশিক্ষণ মডিউল তৈরি এবং প্রয়োজনীয় প্রশিক্ষণ নিশ্চিতের পরিকল্পনা রয়েছে, যাতে তারা ট্যাবের সর্বোচ্চ ব্যবহার করতে পারেন।’
মাঠপর্যায়ে ডিজিটাল ক্লাসরুম ও সরঞ্জামের যথাযথ ব্যবহার না হওয়া এবং অপব্যবহারের বিষয়টিও স্বীকার করেন প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তরের মহাপরিচালক আবু নূর মো. শামসুজ্জামান। এ বিষয়ে তিনি বলেন, ‘এর আগে মাঠপর্যায়ে ডিজিটাল ক্লাসরুম ও সরঞ্জামের যথাযথ ব্যবহার না হওয়া, এমনকি অপব্যবহারের বেশকিছু ঘটনা ঘটেছে, এটি সঠিক। তবে এর মূল কারণ ছিল মনিটরিংয়ের ঘাটতি। ভবিষ্যতে যথাযথ মনিটরিং নিশ্চিত করা হবে। বিশেষত ওয়ান টিচার, ওয়ান ট্যাবের ক্ষেত্রে মনিটরিং হবে সফটওয়্যারভিত্তিক এবং অতীতের ঘটনা পুনরাবৃত্তির সুযোগ থাকবে না।’
অতীতে বিভিন্ন প্রকল্পে ব্যর্থতার বিষয়টি সরকার অবগত বলে জানান মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা অধিদপ্তরের (মাউশি) মহাপরিচালক (অতিরিক্ত দায়িত্ব) অধ্যাপক খান মইনুদ্দিন আল মাহমুদ সোহেল। ওয়ান টিচার, ওয়ান ট্যাব প্রকল্পের বিষয়ে বণিক বার্তাকে তিনি বলেন, ‘এসব বিষয় বিবেচনায় রেখেই প্রকল্পটি চালু করা হবে। এটি যেন ফলপ্রসূ হয় তার জন্য শিক্ষকদের পর্যাপ্ত প্রশিক্ষণ, যথাযথ মনিটরিংসহ প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ অবশ্যই নেয়া হবে।’ বর্তমানে শিক্ষকদের দক্ষতা নিশ্চিতে লেইস প্রজেক্টের আওতায় প্রশিক্ষণ চলমান রয়েছে বলেও জানান তিনি।