মধ্যপ্রাচ্যের আকাশ থেকে বারুদের গন্ধ কি তবে মিলিয়ে যেতে শুরু করেছে? ইরান ও লেবাননে বর্তমানে দুটি পৃথক যুদ্ধবিরতি কার্যকর থাকায় অঞ্চলটিতে ঐতিহাসিক কোনো অর্জনের সম্ভাবনা উঁকি দিচ্ছে। যদিও এই যুদ্ধবিরতিগুলোকে অত্যন্ত ‘ভঙ্গুর’ বলে অভিহিত করছেন বিশ্লেষকরা, তবুও যুদ্ধের দামামা স্তিমিত হওয়ার এই মুহূর্তটি একই সাথে সম্ভাবনা এবং চরম ঝুঁকির বার্তাও বহন করছে।
বৃহস্পতিবার (১৬ এপ্রিল) রাতে ইসরায়েল এবং ইরান-সমর্থিত সশস্ত্র গোষ্ঠী হিজবুল্লাহর মধ্যে ১০ দিনের একটি সাময়িক যুদ্ধবিরতি ঘোষিত হয়েছে। আপাতদৃষ্টিতে একে ইরানের বড় বিজয় হিসেবে দেখা হচ্ছে। তেহরান দীর্ঘদিন ধরে দাবি করে আসছিল যে, লেবাননে যুদ্ধ বন্ধ না হলে যুক্তরাষ্ট্রের সাথে কোনো আলোচনা ফলপ্রসূ হবে না। যুদ্ধবিরতি কার্যকর হওয়ার পরপরই ইরান পাল্টা প্রতিক্রিয়ায় ঘোষণা করেছে যে, হরমুজ প্রণালী এখন থেকে ‘সম্পূর্ণ উন্মুক্ত’।
গত সপ্তাহে ইসলামাবাদে অনুষ্ঠিত দীর্ঘ আলোচনার সময়ই বোঝা গিয়েছিল যে, লেবাননে লড়াই চললেও কূটনীতিতে অগ্রগতি সম্ভব। তবে ইরান ও পাকিস্তান উভয়ই লেবানন ইস্যুকে আলোচনার টেবিলে অন্তর্ভুক্ত করার ব্যাপারে অনড় ছিল। অবশেষে তা বাস্তবায়িত হওয়ায় ইসরায়েলের উত্তরাঞ্চলীয় সীমান্ত সংলগ্ন বাসিন্দাদের মধ্যে তীব্র ক্ষোভ দেখা দিয়েছে। তারা মনে করছেন, প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু মার্কিন চাপে নতি স্বীকার করেছেন, যার ফলে হিজবুল্লাহর রকেট হামলার হুমকি পুরোপুরি নির্মূল হয়নি।
ইসরায়েলি জনপ্রিয় ডানপন্থী পত্রিকা ‘ইসরায়েল হাইয়োম’-এর প্রতিবেদক শিরিত আভিতান কোহেন আজ সকালে লিখেছেন, এই যুদ্ধবিরতি মূলত সেই পরিস্থিতিকেই বৈধতা দিল যা ইসরায়েল এড়াতে চেয়েছিল ইরান ও লেবানন ফ্রন্টকে এক সূত্রে গেঁথে ফেলা। হিজবুল্লাহর অভিভাবক (ইরান) যে এখনও পুরো অঞ্চলের নিয়ন্ত্রণ ধরে রেখেছে, এটি তারই প্রমাণ।
তবে এই বহুমুখী সংকটের প্রতিটি পক্ষই এই চুক্তি থেকে কিছু না কিছু সুবিধা পাচ্ছে। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এবং ইরানি নেতৃত্ব—উভয়ই এই যুদ্ধবিরতির কৃতিত্ব নিতে পারছেন। নেতানিয়াহু দাবি করতে পারছেন যে, ইসরায়েলি সেনারা এখনও দক্ষিণ লেবাননের মাটিতে অবস্থান করছে। অন্যদিকে, লেবানন সরকার দীর্ঘ প্রতীক্ষার পর সরাসরি ইসরায়েলের সাথে আলোচনার টেবিলে বসতে পেরেছে।
হিজবুল্লাহ এই যুদ্ধবিরতি মেনে নেওয়ার ঘোষণা দিলেও তাদের ভাষায়, ‘আঙুল এখনও ট্রিগারেই আছে’। গোষ্ঠীটি সাফ জানিয়ে দিয়েছে যে, তারা এখনই নিরস্ত্র হবে না। হিজবুল্লাহর জ্যেষ্ঠ নেতা ওয়াফিক সাফা বিবিসিকে বলেন, যতক্ষণ না স্থায়ী যুদ্ধবিরতি হচ্ছে, ইসরায়েল পুরোপুরি প্রত্যাহার করছে এবং বন্দী ও বাস্তুচ্যুতরা ফিরে আসছে, ততক্ষণ হিজবুল্লাহর অস্ত্র নিয়ে কোনো কথা হবে না।
লন্ডনভিত্তিক থিঙ্কট্যাঙ্ক চ্যাথাম হাউসের গবেষক লিনা খতিব মনে করেন, এই যুদ্ধবিরতি ইসরায়েল ও লেবাননের সরাসরি আলোচনার পথ প্রশস্ত করলেও শান্তি চুক্তির পথ অত্যন্ত কণ্টকাকীর্ণ। সীমান্ত নির্ধারণ, হিজবুল্লাহকে নিরস্ত্র করা এবং ইসরায়েলি বাহিনীর প্রত্যাহার—এই তিনটি বিষয় সমাধান করা চরম জটিল কাজ। ১৯৪৮ সাল থেকে ইসরায়েল ও লেবানন কারিগরিভাবে যুদ্ধাবস্থায় রয়েছে এবং তাদের মধ্যে কোনো কূটনৈতিক সম্পর্ক নেই। তবে লিনা খতিবের মতে, ওয়াশিংটনে দুই দেশের রাষ্ট্রদূতের সরাসরি আলোচনা প্রমাণ করে যে, লেবানন ধীরে ধীরে ইরানের প্রভাব বলয় থেকে বেরিয়ে আসার চেষ্টা করছে।
পুরো বিষয়টি এখন ঝুলে আছে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যকার পরবর্তী কূটনৈতিক পদক্ষেপের ওপর। ইসলামাবাদে দ্বিতীয় দফার আলোচনা শুরু হলে ওয়াশিংটনের প্রধান লক্ষ্য হবে মধ্যপ্রাচ্যে ইরানের ‘অশুভ তৎপরতা’ বন্ধ করা। বিশেষ করে হিজবুল্লাহ, হামাস ও ইয়েমেনের হুথি বিদ্রোহীদের প্রতি ইরানের সমর্থন বন্ধ করা ইসরায়েলের জন্য অস্তিত্ব রক্ষার লড়াই। তবে ইরান তার কয়েক দশকের প্রভাবের হাতিয়ার সহজে ছেড়ে দেবে বলে মনে হয় না।
এর বাইরেও রয়ে গেছে ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি ও হরমুজ প্রণালীর ভবিষ্যৎ। ডোনাল্ড ট্রাম্প দাবি করেছেন যে, ইরানের সাথে চুক্তি ‘খুবই কাছাকাছি’। তিনি সাংবাদিকদের জানিয়েছেন, ইসফাহানে গত বছর বোমা হামলায় বিধ্বস্ত একটি স্থাপনার নিচ থেকে ৪৪০ কেজি সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম (যাকে তিনি ‘নিউক্লিয়ার ডাস্ট’ বলছেন) হস্তান্তরে রাজি হয়েছে তেহরান। যদিও ইরানের বিচার বিভাগ নিয়ন্ত্রিত মিজান নিউজ এজেন্সি একে অস্বীকার করে বলেছে, আমেরিকার কাছে কোনো পারমাণবিক উপাদান হস্তান্তরের বিষয়ে আলোচনা হয়নি।
হরমুজ প্রণালী নিয়েও ইরানের নিজস্ব পরিকল্পনা রয়েছে। তারা ওমানের সাথে যৌথভাবে এই জলপথ নিয়ন্ত্রণের আইনি কাঠামোর দাবি তুলছে। আপাতত আগামী এক সপ্তাহের জন্য প্রণালীটি খোলা রাখার ঘোষণা দিয়েছেন ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচি। তবে শর্ত হিসেবে জাহাজগুলোকে ইরানের নির্ধারিত নির্দিষ্ট রুট ব্যবহার করতে হবে। ট্রাম্প এই বাজার পরিস্থিতিকে ইতিবাচক বললেও ইরানি বন্দরগুলোর ওপর মার্কিন অবরোধ এখনও বহাল রয়েছে।
অতীতের অভিজ্ঞতা বলছে, ২০১৫ সালের পারমাণবিক চুক্তি (জেসিপিওএ) সম্পন্ন করতে ২০ মাস সময় লেগেছিল, যা পরে ট্রাম্প নিজেই বাতিল করেন। ট্রাম্প দ্রুত চুক্তির জন্য পরিচিত হলেও তার উত্তর কোরিয়া সফরের মতো ফলাফল অনেক সময় শূন্যই থাকে। তবে গত ছয় সপ্তাহের ঘটনাবহুল পরিস্থিতির পর চলমান এই কূটনৈতিক প্রচেষ্টা কতটুকু টেকসই হবে, তা সময়ই বলে দেবে। যুদ্ধ কি সত্যিই থামবে, নাকি এটি কেবল বড় কোনো ঝড়ের আগের নিস্তব্ধতা—সেই উত্তর কারো কাছেই নেই।
সূত্র: বিবিসি