লোহিত সাগরে ইরান সমর্থিত হুতি বিদ্রোহীদের অব্যাহত হামলার মুখে নিজেদের শক্তিমত্তার কৌশল পরিবর্তন করতে বাধ্য হয়েছে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র। হুতিদের ড্রোন ও মিসাইল হামলা এড়াতে আমেরিকার অন্যতম শক্তিশালী পরমাণুচালিত বিমানবাহী রণতরি ‘ইউএসএস জর্জ এইচডব্লিউ বুশ’ লোহিত সাগরের সংক্ষিপ্ত পথ ছেড়ে আফ্রিকা মহাদেশ ঘুরে দীর্ঘ পথ পাড়ি দিচ্ছে।
বর্তমানে হরমুজ প্রণালিতে ইরান ও আমেরিকার মধ্যে চরম উত্তেজনা বিরাজ করছে। এমন পরিস্থিতিতে বিশাল এই রণতরিটির গতিপথ পরিবর্তনকে সামরিক বিশ্লেষকরা লোহিত সাগরে মার্কিন নৌবাহিনীর নিরাপত্তার সীমাবদ্ধতার একটি ‘নীরব স্বীকৃতি’ হিসেবে দেখছেন।
গত মার্চ মাসের শেষের দিকে ভার্জিনিয়ার নরফোক নৌঘাঁটি থেকে প্রায় ৫ হাজার নৌসেনা এবং ‘ক্যারিয়ার এয়ার উইং সেভেন’-এর বৈমানিকদের নিয়ে যাত্রা শুরু করে এই নিমিৎজ-ক্লাসের সুপারক্যারিয়ারটি। চলতি সপ্তাহের শুরুতে রণতরিটিকে নামিবিয়ার উপকূলে দেখা গেছে। এটি আফ্রিকার দক্ষিণ প্রান্ত তথা ‘কেপ অব গুড হোপ’ অতিক্রম করে আটলান্টিক থেকে ভারত মহাসাগরে প্রবেশ করবে বলে নিশ্চিত হওয়া গেছে।
সাধারণত যুক্তরাষ্ট্রের পূর্ব উপকূল থেকে মধ্যপ্রাচ্যে যাওয়ার স্বাভাবিক রুট হলো জিব্রাল্টার প্রণালি হয়ে ভূমধ্যসাগর, এরপর সুয়েজ খাল দিয়ে লোহিত সাগর পাড়ি দেওয়া। কিন্তু মার্কিন সংবাদমাধ্যম ‘ইউএসএনআই নিউজ’-এর প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০২৪ ও ২০২৫ সালে লোহিত সাগর এবং বাব আল-মান্দেব প্রণালিতে হুতিদের ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলা ব্যাপক বৃদ্ধি পাওয়ায় এই রুটটি এখন অনিরাপদ।
পেন্টাগন আনুষ্ঠানিকভাবে এই দীর্ঘ পথ বেছে নেওয়ার কারণ ব্যাখ্যা না করলেও এটি স্পষ্ট যে0, হুতিদের হুমকি এড়াতেই এই ‘ডিটর’ বা বাঁক নেওয়া হয়েছে। বর্তমানে মধ্যপ্রাচ্যে মোতায়েন থাকা ‘ইউএসএস আব্রাহাম লিংকন’-এর সঙ্গে যোগ দিতে যাচ্ছে এই রণতরি।
ইয়েমেনের হুতি বিদ্রোহীরা বর্তমানে দেশটির পশ্চিমাঞ্চলীয় উপকূল এবং কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ হোদাইদাহ বন্দর নিয়ন্ত্রণ করছে। পাহাড়ি অঞ্চলে শক্ত অবস্থান নিয়ে তারা বাব আল-মান্দেব প্রণালির ওপর কড়া নজর রাখছে। আরবিতে এই প্রণালির নাম ‘বাবেল মান্দেব’, যার অর্থ ‘অশ্রুর দুয়ার’। সংকীর্ণ ও দুর্গম হওয়ার কারণেই এর এমন নামকরণ।
মাত্র ৩২ কিলোমিটার চওড়া এই প্রণালিটি বিশ্ব বাণিজ্যের অন্যতম প্রধান তেলের রুট। এর দুটি চ্যানেলের মধ্যে ‘দাকত-এল-মায়ুন’ চ্যানেলটি বড় জাহাজ ও মার্কিন যুদ্ধজাহাজ চলাচলের জন্য ব্যবহৃত হয়। হুতিরা ইতিমধ্যেই যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলকে হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেছে, তাদের ‘আঙুল এখন ট্রিগারে’।
সাধারণত নরফোক থেকে লোহিত সাগর হয়ে আরব সাগরে পৌঁছাতে দূরত্ব অতিক্রম করতে হয় ৮ হাজার থেকে ৯ হাজার নটিক্যাল মাইল। কিন্তু আফ্রিকা ঘুরে যাওয়ার কারণে এই দূরত্ব বেড়ে দাঁড়াচ্ছে ১৩ হাজার থেকে ১৫ হাজার নটিক্যাল মাইলে। অর্থাৎ, হুতি আতঙ্কে মার্কিন এই সুপারক্যারিয়ারকে স্বাভাবিকের চেয়ে প্রায় দেড় গুণ (১.৫ গুণ) বেশি পথ পাড়ি দিতে হচ্ছে।
বিশ্লেষকদের মতে, বিশ্বের সবচেয়ে শক্তিশালী নৌবাহিনী হওয়া সত্ত্বেও এই দীর্ঘ পথ বেছে নেওয়া প্রমাণ করে যে, লোহিত সাগরে হুতিদের আস্ফালন মার্কিন রণকৌশলে বড় ধরনের পরিবর্তন আনতে বাধ্য করেছে।
সূত্র: এনডিটিভি