২০২৪ সালের ৫ আগস্টের গণ - অভ্যুত্থানের পর অস্থিতিশীল পরিস্থিতিতে দেশজুড়ে বেশ কিছু পীর - ফকিরের খানকা , দরগাহ ও মাজারে হামলা করা হয় । এসব হামলায় প্রাণহানির ঘটনা এবং কবর থেকে মরদেহ তুলে পোড়ানোর মতো ঘটনাও ঘটেছে ।
তবে ড . ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকারের দেড় বছরের প্রায় পুরোটা সময় যত হামলা হয়েছে, তার বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই মামলা হয়নি । যে কয়েকটি মামলা করা হয়েছে , তার তদন্তেও পুলিশের বিশেষ আগ্রহ দেখা যায়নি । হামলার পর থেকে বেশির ভাগ খানকা ও মাজার বন্ধ রয়েছে । এদিকে হামলার ঘটনা কমে এলেও তা এখনো চলছে ।
পুলিশ কর্তৃপক্ষ ও ‘সেন্টার ফরসুফি হেরিটেজ' নামে বেসরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠানের হিসাবে , ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট থেকে চলতি বছরের ১৬ এপ্রিল পর্যন্ত দেশের সুফিদের মাজার , দরগাহ , খানকার মতো স্থাপনা এবং ওরস , লালন মেলা, পালাগানসহ বিভিন্ন অনুষ্ঠান - আয়োজনে ১৩৮ টি হামলার ঘটনা তাদের ওপর হামলা করার এই ঘৃণ্য অপরাধ বন্ধ করতে হবে । বিচার হলে এ ধরনের হামলা বারবার হতো না । ফরহাদ মজহার কবি ও চিন্তক ঘটেছে ।
এর মধ্যে মাজার ও দরগায় ৯৯ টি হামলা করা হয়েছে । হামলার সময় মাজারে ভাঙচুর , অগ্নিসংযোগ , মারধর ও লুটপাট চলেছে । হামলার আগে সংশ্লিষ্ট মাজারে ‘ ইসলামবিরোধী কর্মকাণ্ড চলে বলে প্রচার করা হয়েছে । এসব হামলায় স্বয়ং একজন ‘ পীর’সহ চারজন নিহত হয়েছেন । আহত হয়েছে অন্তত দেড় হাজার মানুষ । কোনো কোনো মাজারে কয়েকবার হামলার ঘটনা ঘটেছে । হামলায় ক্ষতিগ্রস্ত মাজারগুলো আর খুলতে পারেনি তাদের কর্তৃপক্ষ ; বরং দেশের অস্থিরতা কমে নির্বাচিত রাজনৈতিক সরকার আসার পরও মাজারে নতুন হামলার ঘটনা ঘটছে ।
সর্বশেষ ১১ এপ্রিল কুষ্টিয়ার দৌলতপুরের দরবার শরিফে ' পীর ' আব্দুর রহমান শামীমকে পিটিয়ে ও কুপিয়ে হত্যা করা হয় । ইসলামবিরোধী কর্মকাণ্ডের গুজব ছড়িয়ে এ হামলা চালানো হয় । নিহত শামীমের বড় ভাই অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক ফজলুর রহমান কুষ্টিয়া জেলা ইসলামী ছাত্রশিবিরের সাবেক সভাপতি খাজা আহম্মেদকে হুকুমের আসামি করে মামলা করেছেন ।
পুলিশ ১৯ জনকে শনাক্ত করলেও ১৬ এপ্রিল রাত পর্যন্ত কাউকে গ্রেপ্তার করতে পারেনি । এ বিষয়ে কুষ্টিয়া জেলার অতিরিক্ত পুলিশ সুপার ফয়সাল মাহমুদ আজকের পত্রিকাকে বলেন , ঘটনা তদন্তে একটি বিশেষ টিম তৈরি করা হয়েছে । কাজ চলছে । সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলছেন , দেশের ইতিহাসে এত অল্প সময়ে এতসংখ্যক মাজারে আর কখনোই হামলা হয়নি । তাঁদের অভিযোগ , আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর নিষ্ক্রিয়তা ও বিচারহীনতার কারণেই একের পর এক এ ধরনের হামলার ঘটনা ঘটছে । হামলার পর অভিযুক্ত ব্যক্তিদের গ্রেপ্তারের ক্ষেত্রেও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর ভূমিকার সমালোচনা করেছেন কেউ কেউ । মাজারসংশ্লিষ্টরা অভিযোগ করেছেন , আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্য ও স্থানীয়দের বাধার মুখে মাজারগুলোর সংস্কার বা পুনরায় চালু করতে পারছেন না তাঁরা । হামলার আতঙ্কে মাজারে দর্শনার্থী কমে নেমেছে শূন্যের কোঠায় । হামলার ঘটনায় মামলা করা হয়েছে খুব কম । মামলা করা হলেও আসামি গ্রেপ্তার ও তদন্তে অগ্রগতি নেই ।
পুলিশের বিশেষ শাখা ও সেন্টার ফর সুফি হেরিটেজের তথ্যে বলা হয়েছে , দেশের অন্তত ২৪ জেলার মাজার , দরগাহ , খানকা ও সংশ্লিষ্ট মতাদর্শের মানুষের ওপর হামলা করা হয়েছে । সবচেয়ে বেশি হামলা করা হয়েছে ঢাকা বিভাগের মাজার ও এ- সম্পর্কিত স্থাপনায় । এরপর রয়েছে চট্টগ্রাম । এই বিভাগের পাঁচ জেলায় ২৮ টিতে হামলা - ভাঙচুর করা হয়েছে । সারা দেশের এসব ঘটনার মধ্যে মাত্র ১৩ টি মামলা করা হয়েছে । এ পর্যন্ত শুধু একটি মামলার অভিযোগপত্র দিয়েছে পুলিশ । অনুসন্ধানে দেখা গেছে , কুমিল্লার ১৩ টি মাজারে হামলার মধ্যে মামলা করা হয়েছে মাত্র দুটি ।
হোমনা উপজেলার আসাদপুর গ্রামের চার মাজারে হামলার এক মামলায় চারজনকে গ্রেপ্তার করা হলেও তদন্তে তেমন অগ্রগতি নেই । হোমনা থানার ওসি তমাস বড়ুয়া বলেন , প্রত্যক্ষদর্শীদের অনীহা ও সামাজিক চাপের কারণে অনেকেই সাক্ষ্য দিতে এগিয়ে আসছেন না । ফলে মামলাগুলোর অগ্রগতি ধীর হয়ে পড়ছে এবং চার্জশিট দাখিলে বিলম্ব হচ্ছে । ময়মনসিংহে হজরত শাহ সুফি সৈয়দ কালু শাহ ( রহ . ) , খাজা বাবার দায়রা শরিফ ও শাহজাহান উদ্দিন ( রহ . ) আউলিয়া নামে তিনটি মাজার ও খানকায় হামলার ঘটনা ঘটে । এতে তিনটি মামলা করা হলেও এখনো কোনো আসামি গ্রেপ্তার হয়নি । অভিযোগ রয়েছে , পুলিশ এগুলোর তদন্তই করেনি । ক্ষোভ প্রকাশ করে সৈয়দ কালু শাহের ( রহ . ) মাজার কমিটির অর্থ সম্পাদক মো . খলিলুর রহমান বলেন , পুলিশ কোনো তদন্ত করেনি বা কোনো আসামিও গ্রেপ্তার করেনি । পুলিশের এমন অবহেলার কারণেই দেশব্যাপী মাজার ভাঙচুর , হত্যার মতো ঘটনা বেড়ে চলেছে ।
অভিযোগের বিষয়ে ময়মনসিংহের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার ( অর্থ - প্রশাসন ) মো . আব্দুল্লাহ আল মামুন বলেন , মাজারসংশ্লিষ্ট বা মামলার বাদীরা কোনো ব্যক্তির নাম - পরিচয় বলতে পারেননি ; যে কারণে মামলার কার্যক্রম এগিয়ে নেওয়া সম্ভব হয়নি । অন্তর্বর্তী সরকারের সময় সবচেয়ে আলোচিত হামলাটি হয় রাজবাড়ীর গোয়ালন্দের নুরুল হক ওরফে নুরাল পাগলার মাজারে । সেখানে হামলা- ভাঙচুর করে আগুন ধরিয়ে দেওয়া হয় । একপর্যায়ে কবর থেকে নুরুল হকের লাশ উঠিয়ে পুড়িয়ে দেওয়া হয় । রোগে মৃত্যুর পর মাটি থেকে বেশ কয়েক ফুট উঁচুতে ভিত্তি তৈরি করে নুরুল হককে কবর দেওয়া হয়েছিল । নুরুল নিজেকে ইমাম মেহেদী দাবি করেন এবং তাঁকে বিশেষভাবে কবর দেওয়া নিয়ে এলাকায় ক্ষোভ ছিল । এ হামলার ঘটনায় একাধিক মামলায় ২৬ জনের বেশি গ্রেপ্তার হলেও সাত মাসেও তদন্ত শেষ হয়নি ।
রাজশাহীর পবার ‘ হক বাবা গাউছুল আজম মাইজভান্ডারি গাউছিয়া পাক দরবার শরিফে ' গত বছরের ৫ সেপ্টেম্বর হামলা হয় । এতে কোনো মামলা করা হয়নি । হামলার পর থেকে খানকা বন্ধ । পীর আজিজুর রহমান বলেছেন , গত ঈদুল ফিতরের পরদিন একটি অনুষ্ঠান আয়োজন করার চেষ্টা করা হলে পবা থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা ( ওসি ) অনুষ্ঠান বন্ধ করে দেন । এ বিষয়ে জানতে চাইলে ওসি আব্দুল মতিন বলেন , ওই অনুষ্ঠান বন্ধ না করলে অপ্রীতিকর ঘটনা ঘটতে পারত । তাই বন্ধ করতে বলা হয়েছে । সিলেটে অন্তত তিনটি মাজারে হামলা ও সংঘর্ষ হলেও কোনো মামলা হয়নি । স্থানীয়ভাবে মীমাংসার চেষ্টা করা হয়েছে । দিনাজপুর ঘোড়াঘাটের পীর রহিম শাহ ভান্ডারির মাজারে হামলা- ভাঙচুরে মামলা করেননি ভুক্তভোগীরা । মামলা করা হয়নি পাবনায় দোগাছী ইউনিয়নের কায়েমকোলা গ্রামে মাজার শরিফে হামলা ও ভাঙচুরের ঘটনায়ও । এসব ক্ষেত্রে ভুক্তভোগীরা জানিয়েছেন , ভয়ে তাঁরা মামলা করতে পারছেন না । পুলিশও তাঁদের সহযোগিতা করছে না । ব্যতিক্রম হয়েছে নোয়াখালীর একটি ঘটনায় ।
২০২৫ সালের ফেব্রুয়ারিতে সুধারাম থানার শাহ সুফি আইয়ুব আলী দরবেশের মাজারে হামলা হয় । মাজারের পক্ষ থেকে ৪৪ জনের নাম উল্লেখসহ অজ্ঞাতনামা ১৫০-২০০ জনকে আসামি করে মামলা করা হয়েছিল । পুলিশ ২৫ জনকে গ্রেপ্তার করে । সুধারাম মডেল থানার ওসি তৌহিদুল ইসলাম জানান , ইতিমধ্যে মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা ৪২ আসামির বিরুদ্ধে অভিযোগপত্র দিয়েছেন । শঙ্কায় মাজার - খানকা বন্ধ : দুই বছর ধরে দেশের বিভিন্ন এলাকায় মাজারে হামলা হওয়ায় ভক্ত ও অনুসারীদের মধ্যে আতঙ্ক বিরাজ করছে । তাই মাজারে দর্শনার্থী ও অনুষ্ঠান আয়োজন হ্রাস পেয়েছে বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা । আক্রান্ত মাজারগুলো আবার চালুও করতে পারছেন না তাঁরা ।
২০২৪ সালের নভেম্বরে দুই দফা হামলার শিকার হয় শেরপুরের খাজা বদরুদ্দোজা হায়দার ( রহ . ) ওরফে দোজা পীরের দরবার ( মুর্শিদপুর পীরের দরবার ) । এখনো ধ্বংসস্তূপ হয়ে আছে মাজারটি । খাদেম মাহমুদান মাসুদ গত বৃহস্পতিবার আজকের পত্রিকাকে বলেন , মাজারে কেউ ঢুকতে পারছে না । প্রশাসন থেকে কোনো ক্লিয়ারেন্স মেলেনি । এ ছাড়া নারায়ণগঞ্জ , রাজবাড়ী , সিলেট ও চট্টগ্রামে আক্রান্ত অনেক মাজার ও দরগাহ আবার চালু করতে পারেনি কর্তৃপক্ষ । সারা দেশে মাজারে হামলার প্রভাব পড়েছে রাজধানীর ঐতিহ্যবাহী মাজারগুলোতেও ।
দেখা গেছে , এসব মাজারেও দর্শনার্থী হ্রাস পেয়েছে । বৃহস্পতিবার মিরপুরের সুলতানুল আউলিয়া হজরত শাহ আলী বাগদাদী ( রহ . ) মাজারে গিয়ে দেখা যায় , হাতে গোনা কয়েকজন দর্শনার্থী । তাদের মধ্যে মো . আলাউদ্দিন আহম্মেদ নামের একজন ছিলেন । সাভারের বাসিন্দা আলাউদ্দিন আগে সুযোগ পেলেই মাজারে ছুটে আসতেন । তিনি বললেন , মাজারে এখন নিরাপদ লাগে না । মানুষ আসে না । ভক্ত পাগল - ফকিরেরা এখন মাজারে না এসে রাস্তায় রাস্তায় ঘুরছে । '
ঢাকার হাইকোর্ট এলাকায় হযরত হাজি খাজা শাহবাজ ( রহ . ) মাজার , রমনার খাজা শরফুদ্দীন চিশতি ( রহ . ) মাজার , আজিমপুরের দায়রা শরিফ , পুরানা পল্টন মোড়ে পীর ইয়ামেনি ( রহ . ) মাজার , গুলিস্তানে গোলাপ শাহ মাজার , চকবাজারে শাহ নেয়ামত উল্লাহ বুরাইন চিশতি ( রহ . ) মাজার এবং মিরপুর - ১ - এ অবস্থিত হজরত মুসা শাহ ( রহ . ) মাজারেও আগের চেয়ে অনুষ্ঠান ও দর্শনার্থী হ্রাস পেয়েছে । আগে এসব মাজারে থাকা দুস্থ মানুষদের দুই বেলা খাবার দেওয়া হলেও এখন কোনো কোনোটিতে খাবার বিতরণ বন্ধ রয়েছে । সেন্টার ফর সুফি হেরিটেজের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে , মাজারে হামলায় দেশের কয়েকটি রাজনৈতিক দলের স্থানীয় নেতা - কর্মীদের ইন্ধন ছিল । প্রতিষ্ঠানটি সরকারের প্রতি অবিলম্বে এ ধরনের হামলা বন্ধে উদ্যোগ নেওয়ার অনুরোধ জানিয়েছে ।
মাজারে হামলা নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করে এর প্রতিবাদ জানিয়েছেন কবি ও চিন্তক ফরহাদ মজহার । তিনি বলেন , কারও মতাদর্শ পছন্দ না হলে তাদের ওপর হামলা করার এ ঘৃণ্য অপরাধ বন্ধ করতে হবে । বিচার হলে এ ধরনের হামলা বারবার হতো না । তাই বিচার হতেই হবে । প্রতিটি ঘটনার তদন্ত করে কঠোর শাস্তি নিশ্চিত করতে হবে । সরকারকে আরও কঠোর হতে হবে । পাশাপাশি জন - আন্দোলন গড়ে তুলতে হবে । [ প্রতিবেদন তৈরিতে তথ্য দিয়েছেন সংশ্লিষ্ট জেলার প্রতিবেদক ও প্রতিনিধিরা ]