টানা আট মাস ধরে কমছে দেশের রপ্তানি আয়। ছোট-বড় সব বাজারেই রপ্তানি আয় কমছে। এতে উদ্বিগ্ন সরকারের নীতিনির্ধারক ও রপ্তানিকারকরা।
ট্রাম্প শুল্কের ধাক্কা এবং চলমান ইসরাইল-যুক্তরাষ্ট্র ও ইরান যুদ্ধের কারণে বাংলাদেশের রপ্তানি বাণিজ্যে এই বেহাল দশা বলে মনে করেন অর্থনীতিবিদরা। রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরোর (ইপিবি) রপ্তানি আয়ের দেশভিত্তিক তথ্যে দেখা গেছে, চলতি ২০২৫-২৬ অর্থবছরের প্রথম ৯ মাসে (জুলাই-মার্চ) বাংলাদেশের রপ্তানি পণ্যের বড় দুই বাজার যুক্তরাষ্ট্র, জার্মানিসহ সব বাজারেই রপ্তানি কমেছে। এই নয় মাসে পণ্য রপ্তানি থেকে মোট ৩ হাজার ৩৫.৩৮ বিলিয়ন ডলার আয় করেছে বাংলাদেশ, যা গত অর্থবছরের একই সময়ের চেয়ে ৪.৮৫ শতাংশ কম। ২০২৪-২৫ অর্থবছরের একই সময়ে রপ্তানির অঙ্ক ছিল ৩ হাজার ৩২.৯৪ বিলিয়ন ডলার। সবশেষ মার্চ মাসে ৩৪৮ কোটি ৭ লাখ (৩.৪৮ বিলিয়ন) ডলারের পণ্য রপ্তানি করেছেন বিভিন্ন খাতের রপ্তানিকারকরা। যা গত বছরের মার্চ মাসের চেয়ে ১৮.০৭ শতাংশ কম।
যুক্তরাষ্ট্রে কমেছে: একক দেশ হিসেবে যুক্তরাষ্ট্র বাংলাদেশের রপ্তানি আয়ের সবচেয়ে বড় বাজার। গত ২০২৪-২৫ অর্থবছরে বিশ্বের সবচেয়ে বড় অর্থনীতির এই দেশটিতে ৮.৬৯ বিলিয়ন ডলারের পণ্য রপ্তানি হয়েছিল, যা মোট রপ্তানি আয়ের ১৮ শতাংশ। এর মধ্যে ৯০ শতাংশই এসেছে বাংলাদেশের প্রধান রপ্তানি পণ্য তৈরি পোশাক থেকে। সেই ধারাবাহিকতায় চলতি ২০২৫-২৬ অর্থবছরেও বাংলাদেশি পণ্যের আমদানিকারক দেশগুলোর তালিকায় যুক্তরাষ্ট্র শীর্ষে অবস্থান করছে। এই আর্থিক বছরের প্রথম নয় মাসে যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে ৬.৫৪ বিলিয়ন ডলারের বিভিন্ন ধরনের পণ্য রপ্তানি করেছে, যা গত অর্থবছরের একই সময়ের চেয়ে ১.১০ শতাংশ কম।
ইপিবি’র তথ্য পর্যালোচনায় দেখা যায়, চলতি অর্থবছরের জুলাই-মার্চ সময়ে পণ্য রপ্তানি থেকে বাংলাদেশ মোট যে বিদেশি মুদ্রা দেশে এনেছে তার ১৮.৪৮ শতাংশেই এসেছে যুক্তরাষ্ট্র থেকে। এর মধ্যে তৈরি পোশাক থেকে এসেছে ৫.৫৯ বিলিয়ন ডলার, যা গত অর্থবছরের একই সময়ের চেয়ে ২.৫৪ শতাংশ কম। ২০২৪-২৫ অর্থবছরের জুলাই-মার্চ সময়ে পোশাক রপ্তানি থেকে ৫ দশমিক ৭৪ বিলিয়ন ডলার আয় হয়েছিল।
জার্মানিতে কমেছে ১৩.৫৪ শতাংশ: বরাবরই বাংলাদেশের রপ্তানি পণ্যের দ্বিতীয় বৃহত্তম বাজার জার্মানি। গত ২০২৪-২৫ অর্থবছরে ইউরোপের এই দেশটিতে ৫.২৯ বিলিয়ন ডলারের পণ্য রপ্তানি হয়েছিল, যা মোট রপ্তানি আয়ের প্রায় ১১ শতাংশ। চলতি ২০২৫-২৬ অর্থবছরে জুলাই-মার্চ সময়ে এই বাজারে ৩.৫২ বিলিয়ন ডলারের পণ্য রপ্তানি হয়েছে, যা গত অর্থবছরের একই সময়ের চেয়ে ১৩.৫৪ শতাংশ কম।
যুক্তরাজ্যে কমেছে: যুক্তরাজ্য বাংলাদেশের রপ্তানি পণ্যের তৃতীয় বৃহত্তম আমদানিকারক দেশ। ২০২৫-২৬ অর্থবছরের জুলাই-মার্চ সময়ে দেশটিতে ৩.৫১ বিলিয়ন ডলারের পণ্য রপ্তানি হয়েছে, যা গত অর্থবছরের একই সময়ের চেয়ে ১.৩৯ শতাংশ কম।
ফ্রান্সে কমেছে ১৩.২৪ শতাংশ: চলতি অর্থবছরের জুলাই-মার্চে ইউরোপের আরেক দেশ ফ্রান্সে ১.৬০ বিলিয়ন ডলারের পণ্য রপ্তানি করেছে বাংলাদেশ। এই অঙ্ক গত অর্থবছরের একই সময়ের চেয়ে ১৩.২৪ শতাংশ কম।
অন্যদিকে ২৭ দেশের জোট ইউরোপীয় ইউনিয়নে (ইইউ) এই নয় মাসে ১৪.০১ বিলিয়ন ডলারের পোশাক রপ্তনি করেছে বাংলাদেশ, যা গত বছরের একই সময়ের চেয়ে ৭ শতাংশ কম।
নিট পোশাক শিল্প মালিকদের সংগঠন বিকেএমইএ’র সভাপতি মোহাম্মদ হাতেম বলেন, গত কয়েক মাস ধরেই আমাদের রপ্তানি আয়ে নেতিবাচক ধারা চলছে। অতীতে বাংলাদেশের তৈরি পোশাক খাত এমন পরিস্থিতির মুখোমুখি হয়নি। হরমুজ প্রণালি বন্ধ হয়ে যাওয়ায় আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি তেলের দাম বাড়ছে এবং সরবরাহ সংকট তৈরি হয়েছে। এর প্রভাবে বাংলাদেশেও ডিজেলের সংকট দেখা দিয়েছে, ফলে কারখানায় উৎপাদন বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। এটিও আমাদের রপ্তানিতে নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে।
বিজিএমইএ সভাপতি মাহমুদ হাসান খান বলেন, প্রতিদিন মোট কর্মঘণ্টার ২ থেকে ৩ ঘণ্টা ব্যাহত হচ্ছে। মোটাদাগে উৎপাদন সক্ষমতা হ্রাস পেয়েছে ২৫ থেকে ৩০ শতাংশের মতো।