Image description

চিররঞ্জন সরকার

বাংলাদেশে এসএসসি পরীক্ষা কেবল একটি পাবলিক পরীক্ষা নয়, এটি এক ধরনের সামাজিক ঘটনা, পারিবারিক প্রত্যাশা এবং একটি প্রজন্মের মানসিক অবস্থার প্রতিফলন। আগামী ২১ এপ্রিল শুরু হতে যাওয়া এই পরীক্ষাকে ঘিরে তাই স্বাভাবিকভাবেই উদ্বেগ, আশা এবং প্রস্তুতির সমন্বয় দেখা যায়। কিন্তু এবারের পরিস্থিতি কিছুটা ভিন্ন। কারণ এটি বর্তমান শিক্ষামন্ত্রী এহছানুল হক মিলনের দায়িত্ব গ্রহণের পর প্রথম বড় পাবলিক পরীক্ষা এবং তাঁর বক্তব্য ও নীতিগত ইঙ্গিতগুলো ইতোমধ্যে শিক্ষক, শিক্ষার্থী ও অভিভাবকদের মধ্যে এক ধরনের বিভ্রান্তি তৈরি করেছে।

সমস্যার মূল জায়গাটি এখানেই—শিক্ষামন্ত্রীর কথাবার্তা শুনলে মনে হয়, তিনি যেন সময়ের স্রোতে ভেসে এগোননি, বরং কোথাও ২০০১-২০০৬ সালের বাস্তবতায় আটকে আছেন। তাঁর বক্তব্যের কেন্দ্রে বারবার ফিরে আসে একটি শব্দ—‘নকল’। যেন পুরো শিক্ষাব্যবস্থার সংকটকে তিনি এককভাবে এই সমস্যার মধ্যেই সীমাবদ্ধ করে ফেলতে চাইছেন। অথচ বাস্তবতা অনেক বেশি জটিল, বহুমাত্রিক এবং গভীর।

স্বীকার করতেই হয়, ২০০১ সালে তিনি যখন প্রথম দায়িত্ব নেন, তখন ‘নকল’ ছিল শিক্ষার অন্যতম প্রধান ব্যাধি। সেই সময় অবাধে চলা টোকাটুকির বিরুদ্ধে তাঁর কঠোর ভূমিকা প্রশংসিত হয়েছিল। কিন্তু সময়ের সঙ্গে সঙ্গে সমস্যার প্রকৃতি বদলেছে। এখন আর পরীক্ষার হলে বসে পাশের খাতা দেখে লেখা বা ছোট কাগজ লুকিয়ে নকল করার যুগ নেই। এখন প্রশ্ন ফাঁস হয় পরীক্ষা শুরুর আগেই, ডিজিটাল ডিভাইসের মাধ্যমে তথ্য আদান-প্রদান হয় এবং পুরো মূল্যায়ন ব্যবস্থার ওপর আস্থা ক্ষয়প্রাপ্ত হয় অদৃশ্য উপায়ে। অর্থাৎ, সমস্যাটি আর দৃশ্যমান নয়, বরং কাঠামোগত।

কিন্তু এই পরিবর্তিত বাস্তবতাকে স্বীকার করার পরিবর্তে যদি পুরোনো সমস্যাকেই একমাত্র সমস্যা হিসেবে ধরে নেওয়া হয়, তাহলে নীতিনির্ধারণ স্বাভাবিকভাবেই ভুল পথে এগোবে। সিসিটিভি বসানো, পরীক্ষার হলে কঠোর শৃঙ্খলা আরোপ, শিক্ষকদের হুমকি—এসব পদক্ষেপ হয়তো কিছুটা শৃঙ্খলা আনতে পারে, কিন্তু মূল সমস্যাকে স্পর্শ করতে পারে না।

বর্তমান শিক্ষাব্যবস্থার সংকটের প্রথম স্তরটি কারিকুলাম। গত এক দশকে নানা পরীক্ষা-নিরীক্ষার মাধ্যমে কারিকুলামকে বারবার পরিবর্তন করা হয়েছে, কিন্তু এই পরিবর্তনগুলো বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই সুসংহত পরিকল্পনার অংশ ছিল না। ফলে একটি অস্থিরতা তৈরি হয়েছে। শিক্ষার্থীরা কী শিখবে, কেন শিখবে, এবং কীভাবে মূল্যায়ন হবে—এই মৌলিক প্রশ্নগুলোর উত্তর আজও অস্পষ্ট। এর ফলাফল আমরা দেখতে পাই বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হওয়া শিক্ষার্থীদের মধ্যেও—যারা জিপিএ-৫ পেয়েছে, কিন্তু একটি শুদ্ধ ইংরেজি অনুচ্ছেদ লিখতে পারে না, কিংবা মৌলিক গণিত করতে হিমশিম খায়। এটি নকলের সমস্যা নয়, এটি শেখার ব্যর্থতা।

শিক্ষকদের মান ও প্রণোদনার বিষয়টি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। একটি জাতির শিক্ষাব্যবস্থা তার শিক্ষকদের মানের ওপর দাঁড়িয়ে থাকে—এটি একটি স্বীকৃত সত্য। কিন্তু আমাদের দেশে শিক্ষকতা পেশাটি ক্রমশ আকর্ষণ হারাচ্ছে। পর্যাপ্ত বেতন নেই, সামাজিক সম্মান কমেছে এবং পেশাগত উন্নয়নের সুযোগ সীমিত। ফলে মেধাবীরা এই পেশায় আসতে আগ্রহী নয়। যারা আসছেন, তাদের অনেকেই অন্য কোনও সুযোগ না পেয়ে আসছেন। এর ফলে শিক্ষার গুণগত মান স্বাভাবিকভাবেই ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। একজন অযোগ্য শিক্ষক কখনোই যোগ্য শিক্ষার্থী তৈরি করতে পারে না—এটি একটি সহজ কিন্তু নির্মম বাস্তবতা।

এই বাস্তবতায় দাঁড়িয়ে যদি শিক্ষামন্ত্রী কেবল নকলের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করেন, তাহলে সেটি অনেকটা সমস্যার উপসর্গ নিয়ে ব্যস্ত থাকা, কিন্তু রোগের কারণকে উপেক্ষা করার মতো। তাঁর সাম্প্রতিক কিছু বক্তব্য—যেমন পরীক্ষায় ফেল করলে সীমিত সুযোগ দেওয়া, দেরি করে এলে ফেল, ঘাড় ঘোরালে বহিষ্কার, কোচিং সেন্টার বন্ধের ঘোষণা—এসব এক ধরনের নিয়ন্ত্রণমূলক মনোভাবের পরিচয় দেয়। কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে, এই নিয়ন্ত্রণ কাদের ওপর প্রয়োগ করা হচ্ছে? শিক্ষার্থীদের ওপর, যারা ইতোমধ্যে একটি অস্থির ব্যবস্থার ভুক্তভোগী!

শিক্ষা একটি ভয়ভিত্তিক প্রক্রিয়া হতে পারে না। যদি শিক্ষার্থীরা পরীক্ষাকে একটি শাস্তিমূলক অভিজ্ঞতা হিসেবে দেখে, তাহলে শেখার প্রতি তাদের আগ্রহ কমে যাবে। শিক্ষা হওয়া উচিত অনুসন্ধান, আবিষ্কার এবং আনন্দের একটি যাত্রা। কিন্তু আমাদের বর্তমান পরিবেশে সেটি ক্রমশ একটি মানসিক চাপের উৎসে পরিণত হচ্ছে। শিক্ষা হওয়া উচিত আনন্দময়, যেখানে ভুল ও শুদ্ধের মধ্য দিয়ে জ্ঞানের দরজা উন্মোচিত হবে। একজন শিক্ষার্থী যখন ক্লাসে আসবে, তখন তার মনে ভীতি নয়, বরং কৌতূহল আর জানার আগ্রহ কাজ করবে। শিক্ষকের ভূমিকা হবে পথপ্রদর্শকের, যিনি ছাত্রের ভুলগুলোকে ধৈর্য ও মমত্বের সঙ্গে শুধরে দেবেন। অথচ আমাদের শিক্ষাব্যবস্থায় এখন ‘মুক্তিপণ আদায়কারী ডাকাত দলের’ মতো ভীতি ছড়িয়ে দেওয়া হয়েছে। শিক্ষা নামক বৃক্ষের কাণ্ডে যেন ১০ ইঞ্চি পেরেক ঠুকে দেওয়া হচ্ছে। শিক্ষার্থীরা এখন পরীক্ষার হলে যায় আতঙ্কিত চিত্তে, যেন তাদের বাড়ি থেকে পিটিয়ে বের করা হচ্ছে। এই ভীতির বীজ বপন করে কখনও সুস্থ ও সৃজনশীল প্রজন্ম গড়ে তোলা যায় না। বরং দরকার একটি সহানুভূতিশীল ও গঠনমূলক শিক্ষানীতি, যেখানে শিক্ষার্থীর ব্যর্থতাকে শেষ বলে গণ্য না করে তাকে দ্বিতীয় সুযোগ দেওয়া হয়, যেখানে নকল বন্ধের জন্য কঠোর দণ্ড নয়, বরং সৎ পথে পড়াশোনার পরিবেশ তৈরি করা হয়।

এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে নীতিনির্ধারণে সমন্বয়ের অভাব। পরীক্ষার সময়সূচি হঠাৎ পরিবর্তন, সিলেবাস নিয়ে অনিশ্চয়তা, বিভিন্ন বোর্ড ও উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানের মধ্যে অসামঞ্জস্য—এসব শিক্ষার্থীদের প্রস্তুতিকে ব্যাহত করছে। একটি শিক্ষাব্যবস্থা কখনোই অনিশ্চয়তার ওপর দাঁড়িয়ে থাকতে পারে না। এখানে প্রয়োজন স্থিরতা, পূর্বানুমানযোগ্যতা এবং স্বচ্ছতা।

আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো, প্রযুক্তির ব্যবহার। বিশ্ব দ্রুত পরিবর্তিত হচ্ছে, এবং শিক্ষা সেই পরিবর্তনের সঙ্গে তাল মিলিয়ে এগোচ্ছে। অনলাইন লার্নিং, ডিজিটাল রিসোর্স, ইন্টারঅ্যাকটিভ ক্লাসরুম—এসব এখন বাস্তবতা। কিন্তু আমাদের নীতিনির্ধারণে এই দিকটি খুব কমই প্রতিফলিত হয়। বরং অনেক ক্ষেত্রে প্রযুক্তিকে হুমকি হিসেবে দেখা হয়, সম্ভাবনা হিসেবে নয়।

শিক্ষামন্ত্রীর প্রতি একটি ন্যায্য প্রত্যাশা হলো—তিনি মাঠ পর্যায়ে যাবেন, শিক্ষার্থীদের সঙ্গে কথা বলবেন, শিক্ষকদের অভিজ্ঞতা শুনবেন এবং বাস্তব সমস্যাগুলো বোঝার চেষ্টা করবেন। নীতিনির্ধারণ কেবল দফতরে বসে করা যায় না। এটি একটি অংশগ্রহণমূলক প্রক্রিয়া হওয়া উচিত।

এখানে একটি বিষয় পরিষ্কার করে বলা প্রয়োজন—কোনও ব্যক্তিকে আক্রমণ করে সমস্যার সমাধান হয় না। কিন্তু নীতির সমালোচনা করা প্রয়োজন, বিশেষ করে যখন সেটি একটি প্রজন্মের ভবিষ্যতের সঙ্গে সম্পর্কিত। যদি সত্যিই শিক্ষামন্ত্রী কাজ করতে চান, তাহলে তাঁকে সময়োপযোগী হতে হবে, তথ্যভিত্তিক সিদ্ধান্ত নিতে হবে, এবং সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ—নিজের পূর্ব ধারণা থেকে বেরিয়ে আসতে হবে।

বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ নির্ভর করছে তার শিক্ষাব্যবস্থার ওপর। এখানে যদি ভুল সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়, তার প্রভাব দীর্ঘমেয়াদে পড়বে। তাই প্রয়োজন একটি সুসংহত, বিজ্ঞানভিত্তিক এবং মানবিক দৃষ্টিভঙ্গি। নকল বন্ধ করা অবশ্যই গুরুত্বপূর্ণ, কিন্তু সেটি পুরো সমস্যার সমাধান নয়। বরং শিক্ষার মান উন্নয়ন, শিক্ষক প্রশিক্ষণ, কারিকুলাম সংস্কার এবং মূল্যায়ন পদ্ধতির আধুনিকীকরণ—এসব বিষয়কে অগ্রাধিকার দিতে হবে।

শেষ পর্যন্ত প্রশ্নটি খুব সহজ: আমরা কি শিক্ষার্থীদের শাস্তি দিতে চাই, নাকি তাদের সক্ষম করে তুলতে চাই? যদি উত্তর দ্বিতীয়টি হয়, তাহলে আমাদের দৃষ্টিভঙ্গি পরিবর্তন করতেই হবে এবং সেই পরিবর্তনের সূচনা হওয়া উচিত নীতিনির্ধারকদের মনোভাব থেকেই।

মন্ত্রী মহোদয়কে সময়ের চাহিদা বুঝতে হবে, শিক্ষার্থীদের সমস্যা হৃদয় দিয়ে উপলব্ধি করতে হবে এবং সে অনুযায়ী সুপরিকল্পিত উদ্যোগ নিতে হবে। শুধু সিসি ক্যামেরা বসিয়ে, শাস্তির মাত্রা বাড়িয়ে, পরীক্ষার তারিখ হুটহাট বদলে দিয়ে কিংবা অসম্ভব ঘোষণা দিয়ে শিক্ষার মান ফেরানো যাবে না। দরকার কারিকুলামে আমূল সংস্কার, শিক্ষকদের বেতন ও সম্মান বৃদ্ধি, প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করা এবং সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ—শিক্ষার্থীদের সঙ্গে একটি মানবিক সম্পর্ক গড়ে তোলা। তবেই না এই গোলকধাঁধা থেকে বেরিয়ে আসা সম্ভব। অন্যথায়, আমাদের আগামী প্রজন্মের জন্য একটি অন্ধকার ভবিষ্যৎ অপেক্ষা করছে।

লেখক: গণমাধ্যমকর্মী ও কলামিস্ট