Image description

জ্বালানি তেল নিয়ে অস্থিরতা থামছেই না। রাজধানী ঢাকাসহ সারা দেশে তেল পাম্পগুলোতে তেলের সরবরাহ নিশ্চিত করা হলেও কয়েক ঘণ্টার মধ্যে শেষ হয়ে যাচ্ছে। কেউ চাহিদা অনুযায়ী জ্বালানি পাচ্ছে না আবার কেউ কেউ জ্বালানি মজুত করছে ভবিষ্যৎ শঙ্কা থেকে। এ ছাড়া বিভিন্ন মজুত চক্রও গড়ে উঠেছে যারা তেল মজুত করে বিক্রি করছে উচ্চ দামে। সম্প্রতি অনলাইনেও এই চক্র তৎপর হয়েছে। মানবজমিন এমন একাধিক চক্রের তথ্য পেয়েছে যারা অনলাইনে জ্বালানি তেল বিক্রির প্রচারণা চালাচ্ছে। দুইশ’ থেকে আড়াইশ’ টাকা লিটারে তেল বিক্রির প্রচারণা চালানো হচ্ছে বিভিন্ন ফেসবুক আইডি থেকে। পাম্পে যেখানে তেল পেতে ঘণ্টার পর ঘণ্টা অপেক্ষা করতে হচ্ছে সেখানে কীভাবে খোলা বাজারে তেল বিক্রির ব্যবসা হচ্ছে তা নিয়ে প্রশ্ন দেখা দিয়েছে।

রাজধানীর মোহাম্মদপুর, বছিলা, মিরপুরসহ কয়েকটি বাজারে খোলা তেল বিক্রি হচ্ছে। গত কয়েকদিন বিভিন্ন পাম্প ঘুরে ও সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে যানবাহনচালকদের একটি অংশ মজুত প্রক্রিয়ার সঙ্গে যুক্ত। তাদের কেউ ভবিষ্যৎ শঙ্কা থেকে জ্বালানি মজুত করছেন আবার কেউ জ্বালানি তেল নিয়ে রীতিমতো ব্যবসায় নেমেছেন। প্রতিদিন লাইনে দাঁড়িয়ে তেল নিচ্ছেন। সেই তেল বাড়িতে ড্রামে ভর্তি করে রাখছেন। কেউ কেউ মজুত করে খুচবা বাজারে বিক্রিও করছেন। এমন অবস্থায় সরকার সরবরাহ স্বাভাবিক বললেও মাঠের পরিস্থিতি ভিন্ন।

বৃহস্পতিবার সরজমিন বিজয় সরণি এলাকার ট্রাস্ট ফিলিং স্টেশনে ঘুরে দেখা যায়, রাত থেকেই তেলের জন্য লাইনে দাঁড়িয়ে আছেন শত শত চালক। মহাখালী রেলগেট ছাড়িয়ে সেই লাইন গিয়ে মিলেছে অনেক দূরে। মোটরসাইকেল, প্রাইভেটকার, ট্রাক-সব মিলিয়ে কয়েক কিলোমিটার দীর্ঘ যানজট। অনেকেই রাত ১২টা থেকে দাঁড়িয়ে লাইনে। মোটরসাইকেলের লাইনে দেখা যায় ১০ থেকে ২০টি গাড়ি একসঙ্গে ভেতরে প্রবেশ করানো হচ্ছে। ওই মোটরসাইকেলগুলো তেল দেয়া শেষ হলে আবার ১০-২০টি প্রবেশ করানো হচ্ছে। এভাবেই লাইনে দাঁড়ানো বাইকগুলোতে তেল দেয়া হচ্ছে। গতকাল পাম্পগুলোতে আগের দিনের চেয়ে দীর্ঘ সারি দেখা যায়। এই যখন অবস্থা তখন সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের মার্কেটপ্লেইসগুলোতে সক্রিয় তেলমজুতদাররা। বিভিন্ন রকম চটকদার বিজ্ঞাপন দিচ্ছেন তেল বিক্রির। সাধারণত ১০ থেকে ১৫ লিটার পর্যন্ত তেল দিতে পারবেন বলে জানান তারা।

ক্রেতা সেজে মার্কেটপ্লেইসের বিভিন্ন বিক্রেতার সঙ্গে কথা বলেছে মানবজমিন। অনলাইনে আকরাম নামের একজন বিক্রেতা বিজ্ঞাপন দেন তেল বিক্রির। বিজ্ঞাপনে তিনি উল্লেখ করেন- “আমাদের বাড়ির পাশে পেট্রল পাম্প আছে। পাম্প কর্মীদের সঙ্গে ভালো সম্পর্ক থাকার কারণে আমরা অতিরিক্ত তেল সংগ্রহ করতে পারি। আপনারা চাইলে আমাদের থেকে সংগ্রহ করতে পারেন।’ ওই তেল বিক্রেতার সঙ্গে কথা বলে প্রতিবেদক। আকরাম নামের ওই বিক্রেতা জানান, কুষ্টিয়া থেকে তেল সাপ্লাই দিয়ে থাকি ঢাকার এলিফ্যান্ট রোড ও শাহবাগের আশপাশে। কুরিয়ারে করে তেল পাঠানো হয়। প্রতিলিটার এক দাম ২শ’ টাকা। তিনি বলেন, ৫ থেকে ১০ লিটার পর্যন্ত তেল বিক্রি হয়ে থাকে। ৫ লিটার তেলের জন্য ৩৫০ টাকা করে সার্ভিস চার্জ নিয়ে থাকি। তেল কীভাবে সংগ্রহ করেন সেই প্রশ্নের জবাবে আকরাম বলেন, সবাই সংগ্রহ করতে পারে না। আমাদের বাড়ির পাশে পাম্প, সেখানে সবার মালিক থেকে শুরু করে সবার সঙ্গে আমাদের সম্পর্ক ভালো। তাই তাদের কাছ থেকে চাহিদামতো তেল নিতে পারি।

গতকাল সন্ধ্যায় ফেসবুক মার্কেটপ্লেসে শিপু নামের একটি একাউন্ট থেকে অক্‌টেন বিক্রেতার সঙ্গে কথা হলে তিনি বলেন, মিরপুর-১ এলাকায় এসে তেল নিয়ে যেতে হবে। প্রতিলিটার একদাম ৩০০ টাকা বিক্রি করছি। তবে, কত লিটার দেয়া যাবে সেটি আগামীকাল একজন ৩০ লিটার নিবে এরপর বলতে পারবো। শাম্‌স নামের অন্য একটি একাউন্টের বিক্রেতা বলেন, ৩৫০ টাকা লিটারে বিক্রি করছি। এখন আসলেই ১০ লিটার নিতে পারবেন। পরে আসলে পাবেন কিনা সন্দেহ। কারণ অফিস শেষ করে সবাই নিতে আসেন।

ওদিকে, ট্রাস্ট ফিলিং স্টেশনে লাইনে দাঁড়ানো ফুড ডেলিভারি কর্মী আব্দুল্লাহ হোসেন বলেন, গতকাল রাত থেকে লাইনে আছি। সকাল হয়ে গেছে, এখনো তেলের লাইনের পাম্পের ভেতরে যেতে পারিনি। আমার সামনে আর কয়েকটি বাইক আছে এরপর হয়তো গেলেই তেল পাবো। এই পাম্পে একটি সুবিধা ২৪ ঘণ্টাই মোটামুটি তেল দেয়। যার কারণে মানুষ এখানে ভিড় করে। অনেক পাম্পে তো কিছুক্ষণ দিয়েই বলে তেল শেষ। তবে অনেকে সিরিয়ালে দাঁড়িয়ে এত কষ্ট করে বারবার তেল নেন বলেও অভিযোগ করেন তিনি।

রাইডশেয়ার চালক জসিম উদ্দিন বলেন, ১৬ থেকে ১৭ ঘণ্টার মতো লাইনে দাঁড়িয়ে আছি। এত কষ্ট করে তেল নিতে হয়- এভাবে আর কতদিন চলবে? লাইনে দাঁড়ানো হাসান ইমাম নামের এক ব্যক্তি বলেন, এই পাম্পের তেল ভালো। যার কারণে আমি চেষ্টা করি সবসময় এখান থেকেই তেল নেয়ার। তবে যুদ্ধ শুরুর দিকে আমি লিটার বিশেকের মতো তেল রিজার্ভে রেখেছি বাড়িতে। এরপর পাম্পের লাইনে চাপ বাড়ায় আর আসিনি। এখন তেল কিছু কমে এসেছে, ফলে আজকে লাইনে দাঁড়িয়েছি। ট্রাস্টের এখান থেকে নিয়ে আবার কালকে অন্য পাম্পে দেখবো। আতঙ্ক থেকেই মূলত তেল মজুত করে রাখা।

ট্রাকচালক আবির হোসেন বলেন, আমাদের এর আগে তো ফুল তেল দিতেন। এখন কতো দেবেন বলা যাচ্ছে না। তবে বাইকের বেলায় অনেকেই এক পাম্পে থেকে তেল নিয়ে গিয়ে আরেক পাম্পে লাইনে দাঁড়ান। এ ধরনের মানুষও আছে।
এদিকে পাম্পে দীর্ঘ লাইনে দাঁড়িয়ে কর্মঘণ্টা হারাচ্ছেন চালকরা। বিশেষ করে রাইডশেয়ার, চাকরিজীবী ও ডেলিভারি কর্মীরা পড়েছেন চরম বিপাকে।

রাজধানীর ফিলিং স্টেশনগুলোতে ঘুরে গত দুই সপ্তাহ তেলের জন্য যে লাইন দেখা গেছে, সে তুলনায় গতকালের লাইন ছিল সবচেয়ে দীর্ঘ। বেলা ১১টার দিকে রাজধানীর রাজারবাগ ফিলিং স্টেশনে দেখা যায়, মোটরসাইকেলের লাইন বিএনএন হসপিটাল অতিক্রম করে শান্তিবাগের গলির মাঝামাঝি পৌঁছে গেছে। অথচ গত দুই সপ্তাহে ফিলিং স্টেশনের সামনে থেকে মোটরসাকেলের লাইন সর্বোচ্চ শহীদবাগের বিএনএন হসপিটালের সামনে পর্যন্ত দেখা গিয়েছিল। একই চিত্র দেখা গেছে আরামবাগের মেসার্স এইচকে ফিলিং স্টেশনে। এই ফিলিং স্টেশনে গত দুই সপ্তাহ মোটরসাইকেলের লাইন স্টেশনের সামনে থেকে সর্বোচ্চ ফকিরাপুল পর্যন্ত দেখা গেছে। কিন্তু সেই মোটরসাইকেলের লাইন গতকাল ফকিরাপুল ঘুরে রাজারবাগ পুলিশ বক্স ঘুরে এজিবি কলোনির গলি পর্যন্ত পৌঁছে গেছে। একই রকম চিত্র দেখা যায়, মতিঝিলের করিম অ্যান্ড সন্স ফিলিং স্টেশনে।

এই ফিলিং স্টেশনে গত দুই সপ্তাহ ধরে মোটরসাইকেলের লাইন সর্বোচ্চ বাংলাদেশ ফুটবল ফেডারেশন (বাফুফে) ভবনের সামনে পর্যন্ত দেখা গেছে। আজকে সে মোটরসাইকেলের লাইন বাফুফে ভবন ঘুরে গাজী দস্তগীর সড়কের মাঝামাঝি পৌঁছে গেছে। এই তিনটি ফিলিং স্টেশনে বিশৃঙ্খলা এড়াতে গতকাল পুলিশ মোতায়েন করতে দেখা গেছে। বেলা ১টার দিকে আরামবাগের মেসার্স এইচ কে ফিলিং স্টেশনে লাইন ব্রেক করে কয়েকজন তেল নেয়ার চেষ্টা করলে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী তাদেরকে সরিয়ে দেন। বেলা ২টার দিকে মতিঝিলের করিম ফিলিং স্টেশনেও লাইনের বাইরে থেকে তেল নিতে আসা গাড়িগুলোকে পুলিশ সরিয়ে দেয়।

শাহবাগের পরিবাগ এলাকার মেঘনা মডেল সার্ভিস ফিলিং স্টেশনে সারাদিন অবস্থান করে বাইকার ও সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, পাম্পটিতে কিছু বাইকার আসেন যারা দিনে একাধিকবার তেল কিনেন। অনেকেই খুচরা বিভিন্ন দোকান থেকে বাড়তি দরে তেল কিনেন বলেও স্বীকার করেছেন। তবে পাম্পটিতে তেল নিতে সাধারণত ৪ থেকে ৫ ঘণ্টা সময় লাগলেও বৃহস্পতিবার পাম্পটিতে বাইকাররা একেকজন ৯ থেকে ১০ ঘণ্টা অপেক্ষা করে তেল নিতে পেরেছেন।

আব্দুল মুবিন নামের আরেকজন চালক বলেন, আমি আগে কেরানীগঞ্জের স্থানীয় অনেক দোকান থেকে তেল কিনতে পারতাম খুচরা। ২০ থেকে ৩০ টাকা বেশি দিয়েই নেয়া যেতো। সরকার সেটাকে কালোবাজারি বলুক আর যাই বলুক। আমার অনেক উপকার হয়েছে। কিন্তু এখন সরাসরি আর বিক্রি করছে না। লুকিয়ে লুকিয়ে বিক্রি করছে বলে দামও বেড়ে গেছে। লিটারপ্রতি ২০০ থেকে ২৫০ টাকায় অক্টেন বিক্রি করা হচ্ছে। তাই বাধ্য হয়ে লাইনেই দাঁড়িয়েছি। এদিকে, গতকাল সকাল সাড়ে ৭টার দিকে আসাদগেটে অবস্থিত তালুকদার ফিলিং স্টেশনে গিয়ে দেখা যায়, বাইরে কয়েক কিলোমিটার যানবাহনের দীর্ঘ লাইন। কেউ আগের রাত থেকে, কেউ ভোর থেকে, আবার কেউ সকালে এসে লাইনে দাঁড়িয়ে অপেক্ষা করছেন। এ কারণে রাজধানী ঢাকার গুরুত্বপূর্ণ প্রধান সড়কগুলোতে তীব্র যানজট তৈরি হয়।

গাড়িচালকদের তেল নিতে রাত পেরিয়ে দিন হচ্ছে। আবার দিনের প্রখর রোদে ঘণ্টার পর ঘণ্টা লাইনে দাঁড়িয়ে থেকে পড়েন চরম ভোগান্তিতে। ঘণ্টার পর ঘণ্টা লাইনে দাঁড়িয়ে থেকেও তেল পাওয়ার নিশ্চয়তা নেই। এ স্টেশন থেকে শুরু করে লাইন বিজয় সরণি মেট্রো স্টেশনে গিয়ে ঠেকে। তালুকদার ফিলিং স্টেশনে বুধবার রাত ৮টা থেকে তেল দেয়া শুরু হয়। পরদিন সকাল ১০টার দিকে তেল শেষ হয়ে যায়। তেল কখন আসবে তার নিশ্চয়তা দিতে পারেনি কর্তৃপক্ষ। এ সময় অপেক্ষারত ক্রেতাদের আক্ষেপ করতে দেখা যায়। কথা হয় রফিকুল নামের এক যুবকের সঙ্গে। তিনি বলেন, তেলের লাইনের শুরুতেই দাঁড়িয়ে ছিলাম।

আগের রাত সাড়ে ১২টার দিকে লাইনে দাঁড়ান তার বড় ভাই সিদ্দিক। বিজয় সরণি মেট্রো স্টেশন এলাকা থেকে সিরিয়ালে দাঁড়ান তিনি। ভোরবেলা রফিকুল ভাইয়ের জায়গায় লাইনে দাঁড়ান। এরপর তার ভাই ঘুমাতে যান। সকাল ১০টার দিকে সিরিয়ালে আসি। এমন সময় পাম্পের তেল শেষ হয়ে যায়। রাত সাড়ে ১২টার দিকে বড় ভাই লাইনে দাঁড়ান। সারারাত থেকেও তিনি সিরিয়াল পাননি। এরপর ভোরবেলা আমি এলে তিনি ঘুমাতে যান। এ মুহূর্তে তেল শেষ হয়ে গেছে। এখন সন্ধ্যা ছাড়া তেল আসবে না। দুপুরে বড় ভাই আসলে আমি খেতে যাবো। সন্ধ্যার মধ্যে তেল না পেলে আবার আমাকে ফিরে আসতে হবে।

দুপুর ২টার দিকে দেখা যায়, লাইনে দাঁড়ানো মোটরসাইকেল রেখে চারজন একসঙ্গে বসে লুডু খেলছেন। এ সময় তারা বিভিন্ন বিষয়ে কথা বলছেন। তাদের মধ্যে খাইরুল নামের এক ব্যক্তি বলেন, ভোর ৪টার দিকে লাইনে দাঁড়িয়েছি। সিরিয়াল ছেড়ে দিলে ফের হাজার হাজার গাড়ির পেছনে দাঁড়াতে হবে। তাই আমরা আর বাড়ি যাইনি। সবাই একসঙ্গে বসে গল্প করছি। লুডু খেলছি। এভাবেই সময় পার করছি।