Image description

চব্বিশের ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে হাসিনার ফ্যাসিবাদের লজ্জাজনক পতন ঘটে। এরপর দেড় বছরের অন্তবর্তী সরকারের শাসন। এই সময়ের মধ্যে রাষ্ট্র সংস্কারে নানা উদ্যোগ-প্রচেষ্টা ছিল দৃশ্যমান। ফ্যাসিবাদ বিরোধী রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে সিরিজ বৈঠক হয় সরকারের। বিশেষ করে সংস্কার কমিশনের সঙ্গে ধারাবাহিক বৈঠকে বিএনপি ও জামায়াতে ইসলামীসহ অন্যান্য দলগুলো তুলে ধরে তাদের মতামত। অবশেষে ১২ ফেব্রুয়ারি একই দিনে অনুষ্ঠিত হয় জাতীয় নির্বাচন ও গণভোট। নির্বাচনে ভূমিধ্বস বিজয় নিয়ে সরকার গঠন করে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল-বিএনপি।

জাতীয় নির্বাচনের আগে গণভোটের পক্ষে জোরালো প্রচারণা চালায় বিএনপি। দলটির শীর্ষ নেতৃত্ব থেকে শুরু করে তৃণমূল পর্যন্ত— সব স্তরেই বার্তা দেওয়া হয় জনগণের সরাসরি মতামতই হবে রাষ্ট্র পরিচালনার গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি। বিশেষ করে বর্তমান প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান নিজে ‘হ্যাঁ’ ভোটের পক্ষে সক্রিয়ভাবে প্রচারণা চালানোয় বিষয়টি আরও বেশি রাজনৈতিক গুরুত্ব পায়। ফলে গণভোট কেবল একটি সাংবিধানিক প্রক্রিয়া নয়, বরং একটি রাজনৈতিক অঙ্গীকার হিসেবেও প্রতিষ্ঠা পায় জনগণের সামনে।

তবে ক্ষমতায় আসার পর পরিস্থিতি দাঁড়িয়েছে যেন ভিন্ন এক বাস্তবতায়। জুলাই সনদ ও সংস্কার ইস্যুতে সংসদে যে তীব্র বিতর্ক শুরু হয়েছে, তা নতুন করে প্রশ্ন তুলছে— বিএনপি কি তাদের আগের অবস্থান থেকে সরে এসেছে? নাকি এটি রাজনৈতিক বাস্তবতারই একটি স্বাভাবিক রূপ, যেখানে প্রতিশ্রুতি ও প্রয়োগের মধ্যে ব্যবধান তৈরি হয়?

গণভোটের ধারণাটি নিজেই একটি শক্তিশালী গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়া। এটি জনগণের সরাসরি মতামতকে গুরুত্ব দেয় এবং রাষ্ট্রীয় সিদ্ধান্ত গ্রহণে নিশ্চিত করে জনগণের অংশগ্রহণ। বিএনপি যখন এই প্রক্রিয়ার পক্ষে অবস্থান নেয়, তখন তারা মূলত একটি অংশগ্রহণমূলক গণতন্ত্রের পক্ষে অবস্থান নিয়েছিল। কিন্তু গণভোটের ফলাফল বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে যে ধরনের রাজনৈতিক, সাংবিধানিক এবং প্রশাসনিক জটিলতা তৈরি হতে পারে, তা পূর্বানুমান করা সম্ভব হয় না অনেক সময়।

জুলাই সনদ ও সংস্কার ইস্যুটি ঠিক এমনই একটি জটিল বাস্তবতা তৈরি করেছে। গণভোটে ‘হ্যাঁ’ ভোট জয়ী হওয়ার পর জনগণের প্রত্যাশা ছিল দ্রুত এবং কার্যকর সংস্কার। কিন্তু বাস্তবে দেখা যাচ্ছে, সেই সংস্কার প্রক্রিয়া নিয়ে সংসদে তৈরি হয়েছে তীব্র মতবিরোধ। বিরোধী দলগুলো এই সুযোগ কাজে লাগিয়ে সরকারকে চাপে রাখার চেষ্টা করছে। তারা দাবি করছে, সরকার গণভোটের চেতনা বাস্তবায়নে আন্তরিক নয়, বরং তা ব্যবহার করেছে রাজনৈতিকভাবে।

ঐকমত্য কমিশনের সভায় দলগুলো গণভোটের বিষয়ে একমত হয়েছে
এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন উঠে আসে— বিএনপি কি সত্যিই গণভোটের চেতনার পরিপন্থী আচরণ করছে? এর উত্তর হলো: না। কেননা দলটি আগে থেকেই বলে আসছিল, ঐকমত্য কমিশনের সভায় যেসব বিষয়ে দলগুলো একমত হয়নি বা যেগুলোতে নোট অব ডিসেন্ট এসেছে সেগুলো দলগুলো তাদের মতো করে নির্বাচনী ইশতেহারে দেবে এবং ভোটারদের রায় পেলে তারা সেভাবেই তা বাস্তবায়ন করবে। ফলে নির্বাচনের পরের পরিস্থিতি অনুযায়ী দলটি এখন বাস্তবায়ন প্রক্রিয়া নিয়ে তাদের অবস্থান স্পষ্ট করছে। সংস্কার বাস্তবায়নের পথে দেখা দিয়েছে বাস্তব জটিলতা, আইনগত বাধা কিংবা রাজনৈতিক সমঝোতার প্রয়োজনীয়তা।

রাজনীতিতে প্রায়ই দেখা যায়— বিরোধী অবস্থানে থেকে যে প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়, ক্ষমতায় এসে তা বাস্তবায়ন করা অনেক বেশি কঠিন হয়ে পড়ে। কারণ তখন কেবল রাজনৈতিক বক্তব্য নয়, রাষ্ট্র পরিচালনার বাস্তবতা, প্রশাসনিক কাঠামো এবং আন্তর্জাতিক সম্পর্কসহ বিবেচনায় নিতে হয় নানা বিষয়। হয়তো সেই বাস্তবতার মুখোমুখি হতে হচ্ছে বিএনপির ক্ষেত্রেও।

অন্যদিকে বিরোধী দলগুলোর ভূমিকাও এখানে গুরুত্বপূর্ণ। তারা জুলাই সনদ ও সংস্কার ইস্যু সামনে এনে সংসদে যে তীব্র বিতর্ক সৃষ্টি করছে, তা গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ার অংশ হিসেবেই দেখা যেতে পারে। একটি সুস্থ গণতন্ত্রে বিরোধী দলের কাজই হচ্ছে সরকারের কার্যক্রমকে প্রশ্নবিদ্ধ করা, জবাবদিহির আওতায় আনা এবং জনগণের স্বার্থ রক্ষায় চাপ সৃষ্টি করা। তবে অনেক সময় এই চাপ হয়ে ওঠে রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত এবং মূল ইস্যুর চেয়ে মুখ্য হয়ে দাঁড়ায় রাজনৈতিক সুবিধা অর্জন।

অবস্থাদৃষ্টে মনে হচ্ছে বিরোধী দলগুলো একদিকে যেমন গণভোটের চেতনা বাস্তবায়নের দাবি তুলছে, অন্যদিকে এটি কেন্দ্র করে নিচ্ছে রাজনৈতিক মাঠ গরম করার সুযোগও। কারণ, যে কোনো বড় জাতীয় ইস্যু রাজনীতিতে নতুন করে মেরুকরণ সৃষ্টি করতে পারে, যা বিরোধী শক্তির জন্য একটি সুযোগ হিসেবে কাজ করে। পরিবর্তিত রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে ক্ষমতার কাছাকাছি চলে আসার সুযোগ পাওয়া যে কোনো রাজনৈতিক দলের জন্যই বিষয়টি সামাল দেওয়া কঠিন হয়ে উঠতে পারে। হচ্ছেও তাই।

চলছে জাতীয় সংসদ অধিবেশন

এখানে আরও একটি বিষয় বিবেচ্য— গণভোটের ফলাফল বাস্তবায়ন মানেই তাৎক্ষণিক পরিবর্তন নয়। অনেক ক্ষেত্রে এটি একটি দীর্ঘমেয়াদি প্রক্রিয়া, যেখানে ধাপে ধাপে বাস্তবায়ন করতে হয় সংস্কার। কিন্তু সেই প্রক্রিয়াটি যদি জনগণের কাছে স্পষ্টভাবে উপস্থাপন না করা হয়, তাহলে বিভ্রান্তি তৈরি হয় এবং বিরোধী পক্ষ পায় রাজনৈতিকভাবে ব্যবহার করার সুযোগ।

ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের অধিবেশন শুরু হওয়ার পর থেকে এখন পর্যন্ত চার বার ওয়াকআউট করেছে জামায়াত নেতৃত্বাধীন বিরোধী দল। সংসদের বাইরেও তাদের অবস্থান খুব মারমুখী। বক্তব্য-বিবৃতিতে অসহিষ্ণু ও অশালীন। কোনো কোনো ক্ষেত্রে রাজনৈতিক শিষ্টাচারবহির্ভূতও। এই অবস্থায় গণভোট নিয়ে তাদের অবস্থান প্রশ্নবিদ্ধ। বিএনপির পক্ষ থেকে আগেই জানানো হয়েছে জুলাই সনদের প্রতি পূর্ণ সমর্থন। এমনকি জুলাই সনদের ভিত্তিতে গণভোটের প্রস্তাব বিএনপিই আগে উত্থাপন করে।

সুতরাং এখন গণভোট নিয়ে গণবিতর্ক উসকে দেওয়ার যে প্রবণতা সেটি নিঃসন্দেহে রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত। গণতান্ত্রিক শাসন ব্যবস্থায় আমাদের সকলের কাম্য একটি স্থিতিশীল রাষ্ট্র ব্যবস্থা। এটি বাস্তবায়ন করতে চাইলে বিরোধীপক্ষকেও পালন করতে হবে দায়িত্বশীল ভূমিকা। সময় এবং সহযোগিতার মনোভাব নিয়ে দাঁড়াতে হবে সরকারের পাশে। তবেই রাষ্ট্র সংস্কারের যে আকাঙ্খা বিএনপি ধারণ করে সেটি বাস্তবায়ন করা সম্ভব বলে আমি বিশ্বাস করি।

লেখক: অধ্যাপক ও আহ্বায়ক, সাদা দল-ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়