Image description

মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধের কারণে জ্বালানি সংকটে বিশ্ব জুড়ে ত্রাহি অবস্থা। এর রেশ পড়ছে দেশেও। যানবাহনে প্রয়োজনীয় জ্বালানি দিতে হিমশিম খাচ্ছে পাম্পগুলো। গ্রীষ্মকাল শুরু হওয়ায় বাড়ছে বিদ্যুতের চাহিদা। বাড়তি এই চাহিদা অনুযায়ী বিদ্যুৎ উৎপাদনে জ্বালানির ওপর নতুন করে চাপ বাড়বে। প্রয়োজনীয় জ্বালানি মজুত না থাকলে লোডশেডিং বাড়ার শঙ্কা তৈরি হয়েছে। ইতিমধ্যে অনেক এলাকায় ঘন ঘন লোডশেডিং হচ্ছে।

গ্যাসের ঘাটতি ও বড় কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রে উৎপাদন ব্যাহত হওয়ায় বিদ্যুৎ খাতের কর্মকর্তারা আশঙ্কা করছেন। চাহিদার সর্বোচ্চ সময় অর্থাৎ পিক আওয়ারে দুই হাজার মেগাওয়াট লোডশেডিং হতে পারে। পরিস্থিতি মোকাবিলায়, বিশেষ করে সন্ধ্যার পর বিদ্যুতের ব্যবহার কমাতে বেশ কিছু পদক্ষেপ নেয়ার কথা ভাবছে সরকার।

দেশের বিদ্যুৎ উৎপাদন মূলত গ্যাস, কয়লা ও ফার্নেস অয়েলের ওপর নির্ভরশীল হওয়ায় বৈশ্বিক যেকোনো অস্থিরতায় দেশের ওপর বড় প্রভাব ফেলে। বর্তমানে বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোতে প্রতিদিন ৯০০ থেকে ৯৫০ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস সরবরাহ করা হচ্ছে। যা দিয়ে দিনে প্রায় ৫ হাজার ২০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদিত হচ্ছে। তবে বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের (পিডিবি) এক অভ্যন্তরীণ বিশ্লেষণে দেখা গেছে, গ্যাস সরবরাহ যদি ৮০০ মিলিয়ন ঘনফুটের নিচে নেমে আসে, তবে উৎপাদন সাড়ে ৪ হাজার মেগাওয়াটের নিচে নেমে যেতে পারে। পিডিবি’র বিশ্লেষণ অনুযায়ী, জ্বালানির সরবরাহ স্থিতিশীল থাকলেও এপ্রিলে-মে মাসে দেশে বিদ্যুতের সর্বোচ্চ চাহিদা দাঁড়াতে পারে ১৮ হাজার ৫০০ মেগাওয়াট। আর এর বিপরীতে জ্বালানি সরবরাহ স্বাভাবিক থাকলে মোট উৎপাদন হতে পারে মাত্র ১৬ হাজার ২০০ মেগাওয়াট।

এ বিষয়ে পিডিবি’র সদস্য (উৎপাদন) মো. জহুরুল ইসলাম মানবজমিনকে বলেন, জ্বালানি সরবরাহের জন্য বিদ্যুৎ উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে এটা অস্বীকার করার কিছু নেই। গতকালের সন্ধ্যার হিসাব তুলে ধরে তিনি বলেন, ঘাটতি কম বেশি ১০০০ মেগাওয়াট রয়েছে। কয়লা ভিত্তিক কেন্দ্রগুলোর টেকনিক্যাল সমস্যার কারণে উৎপাদন কম হচ্ছে। রামপালের একটা কেন্দ্র বন্ধ রয়েছে। কয়লাভিত্তিক মাতারবাড়ি ৫০০ মেগাওয়াট কয়লা সরবাহ ঠিক না থাকার কারণে উৎপাদন করা যাচ্ছে না। কয়লা সরবরাহ পাইপলাইনে রয়েছে বলে জানান তিনি। তিনি আরও বলেন, বিদ্যুৎ উৎপাদনের জন্য পেট্রোবাংলার কাছে ১১০০ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস চেয়েছি। ১০৫০ মিলিয়ন ঘনফুট দিলেও চলতো। কিন্তু এপ্রিল-মে মাসে ৯০০ থেকে ৯৫০ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস পাওয়া যেতে পারে।

পিডিবি’র কর্মকর্তারা বলেন, বিদ্যুতের চাহিদা আবহাওয়ার ওপরও নির্ভর করে। বৃষ্টিপাত অব্যাহত থাকলে এবং তাপমাত্রা সহনীয় পর্যায়ে থাকলে বিদ্যুৎব্যবস্থায় হয়তো অতটা চাপ পড়বে না। জাতীয় পাওয়ার গ্রিডের তথ্য মতে, গতকাল সন্ধ্যায় দেশে সর্বোচ্চ ১৫ হাজার ২০০ মেগাওয়াট চাহিদার বিপরীতে বিদ্যুৎ সরবরাহ ছিল ১৪ হাজার মেগাওয়াট। সাধারণত ১ হাজার মেগাওয়াট ঘাটতি হলে সারা দেশে এক থেকে দেড় ঘণ্টা লোডশেডিং হয়।

এদিকে ফার্নেস অয়েলভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোর প্রায় ১৪ হাজার কোটি টাকা বকেয়া থাকায় পরিস্থিতি আরও জটিল আকার ধারণ করেছে। বকেয়া পরিশোধ না করা হলে উৎপাদন অব্যাহত রাখা সম্ভব হবে না বলে সতর্ক করেছেন কেন্দ্রগুলোর পরিচালনাকারীরা। এর ফলে সরবরাহ আরও কমে যাওয়ার ঝুঁকি দেখা দিয়েছে। গত সপ্তাহের বৈঠকে ব্যবসায়ীরা বেশ কিছু বিকল্প প্রস্তাবও দিয়েছেন। অবৈধ বিদ্যুৎ সংযোগ, বিশেষ করে ব্যাটারিচালিত রিকশার অবৈধ চার্জিংয়ের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়া। ব্যাটারিচালিত রিকশা ৭৫০ থেকে ৮০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ হজম করে বলেও সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো বলছে। যা দু’বছর আগে ছিল না।

এদিকে বাংলাদেশ সাস্টেইনেবল অ্যান্ড রিনিউএবল এনার্জি এসোসিয়েশনের সভাপতি মোস্তফা আল মাহমুদ বলেন, বর্তমানে গভীর জ্বালানি সংকটের মধ্যদিয়ে যাচ্ছে দেশ। যার মূল কারণ আমদানিনির্ভর জ্বালানি ব্যবস্থার ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা, বৈশ্বিক বাজারে জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধি এবং বৈদেশিক মুদ্রার ওপর ক্রমবর্ধমান চাপ। বিদ্যুৎ উৎপাদনে ব্যবহৃত এলএনজি, কয়লা ও তেলের উচ্চমূল্যের কারণে সরকারকে প্রতিদিন আনুমানিক ২০০ কোটিরও বেশি টাকা ভর্তুকি দিতে হচ্ছে, যা দীর্ঘমেয়াদে অর্থনীতির জন্য বড় ঝুঁকি তৈরি করছে। দেশের মোট জ্বালানি চাহিদার ৬০ শতাংশের বেশি আমদানিনির্ভর হওয়ায় মূল্যবৃদ্ধি ও সরবরাহ বিঘ্ন উভয়ের চাপ একসঙ্গে পড়ছে। সরবরাহ ঘাটতির কারণে বিদ্যুৎ উৎপাদনে বড় ধরনের সংকট তৈরি হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। তিনি জানান, বিদ্যুৎ খাতে দৈনিক গ্যাসের চাহিদা ২৫০০ এমএমসিএফডি’র বেশি হলেও সরবরাহ নেমে এসেছে ৮৫০ থেকে ৯০০ এমএমসিএফডিতে। এতে প্রায় ১ হাজার ৫০০ থেকে এক হাজার ৮০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদন ঘাটতির ঝুঁকি তৈরি হয়েছে।

পাওয়ার সেলের তথ্য মতে, ক্যাপটিভসহ ও নবায়নযোগ্য জ্বালানিসহ বিদ্যুৎ উৎপাদন ক্ষমতা ৩২ হাজার ৩২২ মেগাওয়াট। গ্রাহক সংখ্যা ৪ কোটি ৯৬ লাখ। তবে এখন জাতীয় সঞ্চালন লাইনে প্রতিদিন যোগ হচ্ছে মাত্র ১৪ হাজার মেগাওয়াট বিদ্যুৎ। কর্মকর্তারা জানান, জ্বালানি সংকটসহ নানা কারণে বর্তমানে ১৮ হাজার মেগাওয়াট ক্ষমতার বিদ্যুৎকেন্দ্র বন্ধ রয়েছে। এর মধ্যে কয়েকটি বিদ্যুৎকেন্দ্রকে ক্যাপাসিটি চার্জ বাবদ মোটা অঙ্কের টাকা পরিশোধ করতে হচ্ছে।

কর্মকর্তারা জানান, বর্তমানে দেশে গ্যাসভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের উৎপাদন ক্ষমতা ১২ হাজার মেগাওয়াট হলেও উৎপাদন হচ্ছে মাত্র ৪ হাজার মেগাওয়াট। এ খাতের প্রায় ৮ হাজার মেগাওয়াট ক্ষমতার বিদ্যুৎকেন্দ্র বসিয়ে রাখতে হচ্ছে শুধু গ্যাসের অভাবে। কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের উৎপাদন ক্ষমতা সাড়ে ৭ হাজার মেগাওয়াট হলেও উৎপাদন হচ্ছে সাড়ে ৪ হাজার মেগাওয়াট। কয়লার জোগানের অভাবে এ খাতের প্রায় ৩ হাজার মেগাওয়াট বিদ্যুৎ জাতীয় গ্রিডে যোগ হচ্ছে না। আর তেলভিত্তিক ৬২টি বিদ্যুৎকেন্দ্রের উৎপাদন ক্ষমতা সাড়ে ৫ হাজার মেগাওয়াট। বর্তমানে এসব কেন্দ্র থেকে সাড়ে ৩ হাজার মেগাওয়াট বিদ্যুৎ জাতীয় গ্রিডে যুক্ত হচ্ছে। দেশে উৎপাদিত ও ভারত থেকে আমদানি করা বিদ্যুৎসহ বর্তমানে ১৪ হাজার মেগাওয়াট বিদ্যুৎ জাতীয় গ্রিডে সরবরাহ করা হচ্ছে, যা বর্তমান গ্রাহক চাহিদার কাছাকাছি। তবে গ্রীষ্মের ভরা মৌসুমে এ চাহিদা বেড়ে ১৮ হাজার মেগাওয়াটে পৌঁছতে পারে। চলমান জ্বালানি সংকট বজায় থাকলে আসন্ন দিনগুলোতে বিদ্যুতে ভয়াবহ বিপর্যয় হতে পারে বলে আশঙ্কা করছেন সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাসহ এ খাতের বিশেষজ্ঞরা।
দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে গ্যাসভিত্তিক ৫৯টি কেন্দ্র ও ইউনিটের মধ্যে গ্যাস সংকটের কারণে ১৯টি পুরোপুরি বন্ধ রয়েছে। কোনোটি থেকে ৫০ ভাগ, আবার কোনোটি থেকে কিছু বেশি বিদ্যুৎ সরবরাহ হলেও পূর্ণ সক্ষমতায় কোনো কেন্দ্র থেকেই বিদ্যুৎ সরবরাহ করা সম্ভব হচ্ছে না। এক্ষেত্রে গ্যাস সংকটের পাশাপাশি কেন্দ্রগুলোর দক্ষতা (এফিশিয়েন্সি) নিয়েও সমস্যার কথা জানিয়েছেন কর্মকর্তারা।

গ্যাসের উৎপাদন বাড়ানোর বিষয়ে পেট্রোবাংলার চেয়ারম্যান (অতিরিক্ত সচিব) মো. এরফানুল হক মানবজমিনকে বলেন, বিদ্যুৎ ও সার উৎপাদনের জন্য আমাদের গ্যাস কোন মাসে কতোটুকু দেয়া হবে তা আগেই নির্ধারণ করা থাকে। এপ্রিল মাসে ৯৩৫ মিলিয়ন ঘনফুট দেয়া হচ্ছে। আর মে মাসে ৯৫০ মিলিয়ন ঘনফুট দেয়া হবে। তবে পিডিবি একটু বেশি চেয়েছে। তিনি আরও জানান, আমাদের ১৮০ দিনের এবং ৩ বছরের পরিকল্পনা রয়েছে। চেয়ারম্যান জানান, আমরা স্থানীয় উৎস থেকে গ্যাস উৎপাদন বাড়ানোর উদ্যোগ নিয়েছি। ইতিমধ্যে শ্রীকাইল গ্যাসক্ষেত্র থেকে আট মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস জাতীয় গ্রিডে সরবরাহ করা হচ্ছে। বিয়ানীবাজার থেকেও কিছু গ্যাস এসেছে। আরও কিছু ক্ষেত্র থেকেও কিছু জাতীয় গ্রিডে যুক্ত হয়েছে। স্থানীয় পর্যায়ে কূপ খনন কার্যক্রম ?শুরু করতে নতুন দু’টি রিগ কেনার উদ্যোগ নেয়া হয়েছে।

গ্যাস ও জ্বালানি তেলের সংকটের কারণে এখন কয়লাভিত্তিক তাপবিদ্যুৎ কেন্দ্রগুলোকে পুরোপুরি চালুর বিষয়ে সরকারের বিশেষ নির্দেশনা রয়েছে বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা। সাতটি কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রে মোট ১১ লাখ ৬৫ হাজার টন কয়লা মজুত রয়েছে বলেও জানান তারা।

সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানান, আগামী দিনগুলোতে দেশে বিদ্যুতের চাহিদা ১৮ হাজার মেগাওয়াটের বেশি হবে। এ চাহিদা মেটাতে গ্যাসভিত্তিক কেন্দ্রগুলো থেকে ৬ হাজার ৪০০ মেগাওয়াট, কয়লা থেকে সাড়ে পাঁচ হাজার মেগাওয়াট ও ফার্নেস অয়েলভিত্তিক কেন্দ্র থেকে চার হাজার মেগাওয়াট বিদ্যুৎ প্রয়োজন, যা অনেকটাই দুরূহ বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা। এর মধ্যে ফার্নেস অয়েলভিত্তিক কেন্দ্রগুলোর সবই বেসরকারি খাতে। বকেয়া বিল না পাওয়ার কারণে এসব উদ্যোক্তা জ্বালানি আমদানি করতে পারছেন না। ফলে গ্রীষ্মে ফার্নেস অয়েল চালিত কেন্দ্রগুলো চালানো নিয়ে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে।

বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদমন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকু এপ্রিল মাসের প্রথম সপ্তাহে বিদ্যুৎ ভবনে বাংলাদেশ দোকান মালিক সমিতির নেতাদের সঙ্গে এক বৈঠক করেন। বৈঠকে সন্ধ্যা ছয়টার মধ্যে দোকানপাট বন্ধের নির্দেশনার বিষয়ে আলোচনা হয়। এরপর সরকার প্রধানের সম্মতিতে তা ৭টা পর্যন্ত করা হয়েছে। ওই সভায় সামনের দিনগুলোতে লোডশেডিং বাড়ার ব্যাপারেও ইঙ্গিত দেন বিদ্যুৎমন্ত্রী।

কনজ্যুমারস এসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (ক্যাব)-এর জ্বালানি বিষয়ক উপদেষ্টা এবং দেশের জ্বালানি বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক ড. এম শামসুল আলম মানবজমিনকে বলেন, দীর্ঘ দিনের সংকট। এটা পরিকল্পিত। ১৭ বছর লণ্ঠুন হয়েছে এ থাতে। গত দুই দশক ধরে অফশো’র বা অনশোরে নতুন করে গ্যাস কূপ অনুসন্ধানে কার্যকর কোনো উদ্যোগ নেয়া হয়নি। আমদানিকৃত জ্বালানি দিয়ে ঘাটতি পূরণের উদ্যোগ নেয়া হয় ওই সময়। অন্তর্বর্তী সরকারও এ নীতি থেকে বের হতে পারেনি। যার খেসারত এখন পুরো জাতিকে দিতে হচ্ছে। এখন নতুন গ্যাস কূপ অনুসন্ধানের উদ্যোগ নিলেও এর ফলাফল আসতে কমপক্ষে তিন-চার বছর সময় লেগে যাবে। জ্বালানি খাতের লুণ্ঠনমূলক নীতির খেসারত এখন জাতিকে দিতে হচ্ছে বলেও জানান তিনি। বিইআরসি’র মাধ্যম অংশীজনদের সঙ্গে কথা বলে কর্মপরিকল্পা নেয়ার পরামর্শ দেন এই বিশেষজ্ঞ।