Image description

আন্দামান সাগরের কাছে ডুবে যাওয়া মালয়েশিয়াগামী একটি যাত্রীবাহী ট্রলার থেকে ভাসমান অবস্থায় ৯জনকে উদ্ধার করেছে বাংলাদেশ কোস্ট গার্ড। উদ্ধারকৃতদের মধ্যে ৬ জন বাংলাদেশি ও ৩ জন রোহিঙ্গা রয়েছে। বেঁচে ফেরা যাত্রীদের ভাষ্য, ট্রলারে নারী-শিশুসহ প্রায় ২৮০ জন যাত্রী ছিল। তবে তাদের বর্তমান অবস্থা সম্পর্কে কোনো তথ্য পাওয়া যায়নি। উদ্ধারকৃতদের টেকনাফ মডেল থানায় হস্তান্তর করেছে কোস্টগার্ড পরে তাদের আদালতের মাধ্যমে কারাগারে পাঠানো হয়েছে।

উদ্ধার হওয়া ব্যক্তিরা জানিয়েছেন, গত ৪ এপ্রিল কক্সবাজারের ইনানী, টেকনাফের নোয়াখালী ও রাজারছড়া এলাকা থেকে ছোট ছোট নৌকায় করে তাদের একটি বড় ট্রলারে তোলা হয়। প্রায় আড়াই শতাধিক যাত্রী নিয়ে ট্রলারটি মালয়েশিয়ার উদ্দেশ্যে যাত্রা করে। আট দিনের মাথায় আন্দামান দ্বীপপুঞ্জের কাছে পৌঁছালে বৈরী আবহাওয়ার কবলে পড়ে ট্রলারটি ডুবে যায়।

বেঁচে ফেরা একাধিক যাত্রীর ভাষ্য, ট্রলারে নারী-শিশুসহ প্রায় ২৮০ জন যাত্রী ছিল। দুর্ঘটনার পর তারা পানির বোতল ও তেলের ট্যাংকি ধরে দুই দিন সাগরে ভাসতে থাকেন। পরে একটি বাংলাদেশি জাহাজ তাদের উদ্ধার করে কোস্ট গার্ডের কাছে হস্তান্তর করে। তবে বাকি যাত্রীদের বর্তমান অবস্থা কী সেটি তারা বলতে পারেননি।

উদ্ধার যাত্রীদের মধ্যে ফেরত আসা উখিয়ার কুতুপালং রোহিঙ্গা ক্যাম্পের বাসিন্দা রফিকুল ইসলাম বলেন, কাজের প্রলোভন দেখিয়ে গত ৪ এপ্রিল আমাকে টেকনাফে নিয়ে যাওয়া হয়। পরে রাজারছড়া এলাকার একটি পাহাড়ে বন্দী করে রাখা হয়, যেখানে আরও ৫০-৬০ জন লোক ছিল। গভীর রাতে আমাদের একটি কার্গো বোটে তোলা হয়। সেখানে গিয়ে দেখি ক্যাম্পের পরিচিত কয়েকজনসহ প্রায় আড়াই শতাধিক মানুষ গাদাগাদি করে বসে আছে।

তিনি আরও বলেন, টানা আট দিন সাগরে চলার পর ৯ এপ্রিল আন্দামান দ্বীপপুঞ্জের কাছে পৌঁছাই। এসময় মাঝি ও তার লোকজনের সঙ্গে যাত্রীদের বিরোধ সৃষ্টি হয়। একপর্যায়ে সবাইকে জিম্মি করে বোটের বরফঘরে ঢুকিয়ে রাখা হয়। এর প্রায় আধা ঘণ্টা পরই বোটটি ডুবে যায়। তখন আমি ও আরও কয়েকজন পানির বোতল ও তেলের ট্যাংকি ধরে দুই দিন সাগরে ভাসতে থাকি। পরে ১১ এপ্রিল একটি বাংলাদেশি জাহাজ আমাদের উদ্ধার করে।

এ বিষয়ে টেকনাফ মডেল থানার ওসি সাইফুল ইসলাম জানান, সাগর থেকে উদ্ধার হওয়া ৯ জনকে থানায় আনা হয়। প্রাথমিকভাবে জিজ্ঞাসাবাদের পর দালালদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে এবং ভিকটিমদের আদালতে পাঠানো হয়েছে।

মঙ্গলবার (১৪ এপ্রিল) এই দুর্ঘটনায় গভীর শোক প্রকাশ করে বিবৃতি দিয়েছে জাতিসংঘের শরণার্থী সংস্থা (ইউএনএইচসিআর) এবং আন্তর্জাতিক অভিবাসন সংস্থা (আইওএম)।

বিবৃতিতে বলা হয়, ‘এই মর্মান্তিক ঘটনাটি দীর্ঘস্থায়ী বাস্তুচ্যুতি এবং রোহিঙ্গাদের জন্য টেকসই সমাধানের অভাবের এক ভয়াবহ পরিণতি। রাখাইন রাজ্যে চলমান সহিংসতা অদূর ভবিষ্যতে নিরাপদে বাড়ি ফেরার আশা ম্লান করে দিয়েছে। অন্যদিকে, মানবিক সহায়তা কমে যাচ্ছে। ক্যাম্পের জীবনযাপন কঠিন হয়ে পড়েছে; সেখানে রয়েছে শিক্ষা ও কর্মসংস্থানের অভাব।’

‘এসব কারণে মানুষ নিরাপত্তা ও সুযোগের আশায় এমন বিপজ্জনক সমুদ্রযাত্রা বেছে নিচ্ছে। বিদেশে ভালো বেতনের আশা এবং পাচারকারীদের ভুল তথ্য মানুষকে বিশাল ঝুঁকি নিতে প্রলুব্ধ করে। এই পরিস্থিতি পাচারকারীদের অসহায় মানুষকে চরম বিপদের মুখে ঠেলে দেওয়ার সুযোগ করে দেয়। আন্দামান সাগর বারবার এমন বিপজ্জনক যাত্রায় বের হওয়া মানুষের প্রাণ কেড়ে নিচ্ছে।’

এতে বলা হয়, ‘আমরা আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের প্রতি জরুরি আহ্বান জানাই, তারা যেন তাদের সংহতি জোরদার করে এবং অর্থায়ন অব্যাহত রাখে। এতে বাংলাদেশে আশ্রয় নেওয়া রোহিঙ্গা শরণার্থীদের জীবনরক্ষাকারী সহায়তা নিশ্চিত হবে, পাশাপাশি স্থানীয় বাংলাদেশি জনগোষ্ঠীও উপকৃত হবে।’

‘বাংলাদেশ যখন নতুন বছরকে বরণ করছে, তখন এই মর্মান্তিক ঘটনা আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে, মিয়ানমারে বাস্তুচ্যুত হওয়ার মূল কারণগুলো দ্রুত সমাধান করা জরুরি। একই সঙ্গে এমন পরিবেশ তৈরি করতে হবে, যাতে রোহিঙ্গারা স্বেচ্ছায়, নিরাপদে এবং মর্যাদার সঙ্গে নিজ দেশে ফিরে যেতে পারে।’