Image description

রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠান কেরু অ্যান্ড কোম্পানির নিয়ন্ত্রণে রয়েছে তিন হাজার ৫৫৬ একর বা ১০ হাজার ৬৬৮ বিঘা জমি। কিন্তু কোম্পানিটি এই জমির দাম দেখিয়েছে মাত্র পাঁচ লাখ ৬২ হাজার ৬০৪ টাকা। যেখানে প্রতি বিঘা জমির দাম প্রায় ৫৩ টাকা। সম্প্রতি নিরীক্ষা প্রতিবেদনে উঠে এসেছে এমন তথ্য।

 

২০২৪-২৫ অর্থবছরে কেরু অ্যান্ড কোম্পানি ১২৯ কোটি টাকা নিট মুনাফা অর্জন করেছে। এটি প্রতিষ্ঠানটির ৮৮ বছরের ইতিহাসে রেকর্ড। তবে বিপুল মুনাফা সত্ত্বেও সম্পত্তির হিসাবে এমন গোলমালে প্রতিষ্ঠানের অভ্যন্তরীণ বিশৃঙ্খলার বিষয়টি সামনে এসেছে।

 

নিরীক্ষা প্রতিবেদনটি প্রস্তুত করেছে হাবিব সারোয়ার ভূইয়া অ্যান্ড কো. নামের একটি চার্টার্ড অ্যাকাউন্ট্যান্ট প্রতিষ্ঠান। এতে নিরীক্ষকরা উল্লেখ করেন, দীর্ঘদিন ধরে জমির কোনো পুনর্মূল্যায়ন করা হয়নি, যা আন্তর্জাতিক হিসাবমানের স্পষ্ট লঙ্ঘন।

আর্থিক বিবরণীতে কেরু তাদের ৩৫ কোটি ৯৬ লাখ ৭৮ হাজার ৬৯৬ টাকার স্থায়ী সম্পদ দেখিয়েছে। কিন্তু প্রতিবেদন প্রস্তুতের একেবারে শেষ পর্যায়ে অডিটকারীদের কাছে এই সংক্রান্ত তথ্য দেওয়ায় সেগুলো সশরীরে যাচাই করা সম্ভব হয়নি। সম্পদের অবস্থান, শনাক্তকরণ নম্বর ও অন্যান্য বিস্তারিত তথ্যও দেওয়া হয়নি। কেনাকাটার ক্ষেত্রে কোনো সুনির্দিষ্ট নীতিমালা অনুসরণ করা হয়নি।

 

 

নিরীক্ষা প্রতিবেদন।
নিরীক্ষা প্রতিবেদন।

 

প্রতিষ্ঠানটিতে রয়েছে প্রচুর আখ ও অন্যান্য ফসল উৎপাদনকারী গাছ, যা থেকে কোম্পানি আয় করে থাকে। নিয়ম অনুযায়ী, এই গাছগুলোকে জৈবিক সম্পদ হিসেবে সঠিক দাম নির্ধারণ করে আর্থিক বিবরণীতে অন্তর্ভুক্ত করা বাধ্যতামূলক। কিন্তু এটিও করা হয়নি। এসবের মাধ্যমে মোট সম্পদের পরিমাণ প্রকৃত হিসাবের চেয়ে কম দেখানো হয়েছে।

 

প্রতিষ্ঠানটি ৭২ কোটি ৭৩ লাখ ৯৬ হাজার ৫৮৭ টাকার মজুত পণ্য এবং ৩৪ কোটি ২৪ লাখ ৬৬ হাজার ৬০৪ টাকার স্টোরসামগ্রীর স্বপক্ষে কোনো বিস্তারিত তথ্য বা ইনভেন্টরি রিপোর্ট দিতে পারেনি। উৎপাদনের প্রক্রিয়ায় থাকা পণ্যের দাম নির্ধারণে সমাপ্ত পণ্যের মূল্যের ৮০ শতাংশ ধরা হয়েছে, কিন্তু এর পেছনে কোনো দাপ্তরিক অনুমোদন বা বোর্ডের সিদ্ধান্ত ছিল না।

 

বৈদেশিক মুদ্রার ঋণ রূপান্তরের ক্ষেত্রে কেরু বছরের শেষ দিনের ক্লোজিং রেট ব্যবহার করেনি। বিলম্বিত করের কোনো হিসাবও করা হয়নি। এর ফলে আর্থিক বিবরণীতে আয়ের ভুল চিত্র ফুটে উঠেছে।

 

কেরু আগের বছরগুলোর জন্য আরজেএসসিতে বার্ষিক রিটার্ন জমা দিতে ব্যর্থ হয়েছে। এ কারণে অডিটকারীরা কোম্পানির শেয়ারহোল্ডিং কাঠামোর যথার্থতা যাচাই করতে পারেননি।

 

দুর্বল ব্যবস্থাপনা
কেরু অ্যান্ড কোম্পানির শ্রমিকদের লভ্যাংশ অংশগ্রহণ তহবিল (ডব্লিউপিপিএফ) এবং কল্যাণ তহবিলের জন্য কোনো ট্রাস্টি চুক্তি নেই। অডিট প্রতিবেদনে দেখা গেছে, তহবিলের অবশিষ্ট ৫ কোটি ৬০ লাখ ৩৯ হাজার ৫৬২ টাকার মধ্যে বণ্টন না করা অংশের ওপর শ্রমিকদের কোনো সুদ দেওয়া হয়নি, যা শ্রম আইনের সুস্পষ্ট লঙ্ঘন।

 

এনবিআরের নিয়মিত ত্রৈমাসিক ট্যাক্স রিটার্নও জমা দেয়নি কেরু, যা আয়কর আইনের লঙ্ঘন। এ কারণে প্রতিষ্ঠানটি বড় অঙ্কের জরিমানার মুখে পড়তে পারে।

 

যা বলছে নিরীক্ষা প্রতিষ্ঠান
চলতি বছরের ১০ ফেব্রুয়ারি প্রকাশিত নিরীক্ষা প্রতিবেদনে বলা হয়, ভুল থেকে হওয়া কোনো অসংগতি শনাক্ত করার চেয়ে জালিয়াতি বা প্রতারণা থেকে হওয়া অসংগতি শনাক্ত করা অনেক বেশি কঠিন। কারণ, জালিয়াতির ক্ষেত্রে যোগসাজশ বা ইচ্ছাকৃতভাবে ভুল তথ্য দেওয়ার মতো বিষয় থাকতে পারে। তবে প্রয়োজনীয় সব তথ্য আমরা যথাযথভাবে যাচাই করেছি।

 

কেরুর প্রতিক্রিয়া
কেরু অ্যান্ড কোম্পানির ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. রাব্বিক হাসান এশিয়া পোস্টকে বলেন, ‘২০২৪-২৫ অর্থবছরে কেরু ১২৯ কোটি টাকা মুনাফা অর্জন করেছে। আর অডিটের বিষয়ে আমি কিছু জানি না। এটা হিসাব বিভাগ বলতে পারবে।’

 

কেরু অ্যান্ড কোম্পানির উপমহাব্যবস্থাপক (হিসাব বিভাগ) মুহম্মদ আব্দুছ ছাত্তার জানান, ‘সম্পদের হিসাব দেওয়া হয়নি, এটা ঠিক না। সম্পদের রিভেলুয়েশন (পুনর্মূল্যায়ন) করতে হবে, গাছের রিভেলুয়েশন করতে হবে; এভাবে লেখা আছে। আমাদের তথ্য সব দেওয়া আছে। ওরা (অডিটকারী প্রতিষ্ঠান) বলছে, যেভাবে করা প্রয়োজন ছিল সেভাবে করা হয়নি।’