Image description

ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে জনগণের কাছে নির্বাচনী প্রতিশ্রুতির অংশ হিসেবে কৃষক কার্ড প্রকল্প বাস্তবায়ন শুরু করছে বিএনপি। টাঙ্গাইল সদর উপজেলার সুরুজ ব্লকের কৃষকদের হাতে তুলে দেওয়ার মাধ্যমে কৃষক কার্ডের উদ্বোধন করবেন প্রধানমন্ত্রী ও বিএনপি চেয়ারম্যান তারেক রহমান। 

আগামীকাল মঙ্গলবার (১৪ এপ্রিল) বাংলা নববর্ষের প্রথমদিন টাঙ্গাইলের শহীদ মারুফ স্টেডিয়ামে আয়োজিত অনুষ্ঠানে কৃষকদের হাতে কার্ড তুলে দিয়ে কর্মসূচির আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন করবেন তিনি।

কৃষিমন্ত্রী মোহাম্মদ আমিন উর রশিদ জানান, কৃষক কার্ডের মাধ্যমে কৃষকরা ন্যায্যমূল্যে বীজ, সার, কীটনাশকসহ প্রয়োজনীয় কৃষি উপকরণ ক্রয়, ফসল বিক্রি, সহজ শর্তে কৃষিঋণ, বীমাসহ আরও বেশকিছু সুবিধা পাবেন। দরিদ্র কৃষকদের এই কার্ডের মাধ্যমে বছরে একটি নির্দিষ্ট অঙ্কের আর্থিক সহায়তা দেওয়া হবে। 

প্রাথমিকভাবে ১০টি জেলার ২২ হাজার ৬৫ জন কৃষকের মাঝে কার্ড বিতরণ করা হবে। পরবর্তীতে ধাপে ধাপে এটি সারা দেশের সকল কৃষকের হাতে পৌঁছে দেওয়া হবে বলে জানান কৃষিমন্ত্রী।

সরকারী তথ্যমতে, বর্তমানে বাংলাদেশে কৃষক পরিবারের সংখ্যা এক কোটি ৬৫ লাখ। এসব কৃষকদেরকে ‘ভূমিহীন, প্রান্তিক, ক্ষুদ্র, মাঝারি এবং বড় কৃষক’-এই পাঁচটি শ্রেণিতে ভাগ করে কার্ড দেওয়া হবে বলে জানিয়ে কৃষি মন্ত্রণালয়। এর মধ্যে পাঁচ শতকের কম জমি রয়েছে যাদের, তারা রয়েছেন ভূমিহীন ক্যাটাগরিতে।

পাঁচ থেকে ৪৯ শতক জমির মালিক যেসব কৃষক, তারা প্রান্তিক কৃষক। এর বাইরে, কৃষকদের মধ্যে যারা ৫০ থেকে ২৪৯ শতক জমির মালিক, তারা ক্ষুদ্র এবং যারা ২৫০ থেকে ৭৪৯ শতকের মালিক, তারা মাঝারি কৃষকের শ্রেণিতে পড়েছেন। অন্যদিকে, যাদের জমির পরিমাণ ৭৫০ শতকের বেশি, তাদেরকে বড় কৃষক হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে।

প্রথম পর্যায়ে কৃষক কার্ড পাওয়া কৃষকদের মধ্যে দুই হাজার ২৪৬ জনই ভূমিহীন বলে এক সংবাদ সম্মেলনে জানিয়েছেন কৃষিমন্ত্রী। বাকিদের মধ্যে প্রায় নয় হাজার ৪৫৮ জন প্রান্তিক কৃষক, আট হাজার ৯৬৭ জন ক্ষুদ্র কৃষক, এক হাজার ৩০৩ জন মাঝারি কৃষক এবং ৯১ জন বড় কৃষক রয়েছেন বলে কৃষি মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে।

পহেলা বৈশাখ যে ২২ হাজার ৬৫ জন কৃষকের মধ্যে কার্ড বিতরণ শুরু হচ্ছে, তাদের বেশিরভাগই ভূমিচাষী বলে জানা যাচ্ছে। কৃষি মন্ত্রণালয়ের তথ্যমতে, কার্ড পেতে যাওয়া ব্যক্তিদের মধ্যে ফসল উৎপাদনকারী কৃষকের সংখ্যা ২১ হাজার ১৪১ জন। তবে সংখ্যায় অল্প হলেও কার্ডধারীদের তালিকায় মৎস্যজীবী, প্রাণিসম্পদ খাতে নিয়োজিত খামারি এবং লবণচাষীদেরও নাম রয়েছে। এর মধ্যে গরু-ছাগল ও হাঁস-মুরগি পালন এবং দুগ্ধ খামারির সংখ্যা প্রায় ৮৫৫ জন।

এছাড়া কার্ড পেতে যাওয়া ব্যক্তিদের মধ্যে ৬৬ জন মৎস্যজীবী এবং তিন জন লবণ চাষী রয়েছেন বলে জানিয়েছেন কর্মকর্তারা। সরকারের নির্বাচনী প্রতিশ্রুতির এই কৃষক কার্ড তিনটি ধাপে বাস্তবায়নের পরিকল্পনা নিয়েছে সরকার। এর মধ্যে প্রাথমিক পর্যায়ে প্রি-পাইলটিং বা প্রাক- পরীক্ষামূলক ধাপ। এর আওতায় দরিদ্র কৃষকের সংখ্যা বেশি এমন ১০টি জেলার ১১টি উপজেলা অন্তর্ভূক্ত রয়েছে বলে জানিয়েছে কৃষি মন্ত্রণালয়। 

জনপ্রশাসন ও জনপ্রতিনিধিদের সঙ্গে স্থানীয় কৃষি কর্মকর্তা ও কৃষক নেতারা সমন্বয় করে এলাকাগুলোতে কৃষকদের তালিকা হালনাগাদ করেছেন বলে জানিয়েছে মন্ত্রণালয়। প্রাথমিক ধাপ শেষে আগামী আগস্ট মাসে শুরু হবে পাইলট বা পরীক্ষামূলক কার্যক্রম।

কৃষিমন্ত্রী জানান, পাইলাটিংয়ের অভিজ্ঞতার আলোকে (তৃতীয় ধাপে) আগামী চার বছরে সারা দেশে এই কার্ড বিতরণ ও ডাটাবেজ তৈরির কাজ পর্যায়ক্রমে সম্পন্ন করার পরিকল্পনা রয়েছে সরকারের। 

টাঙ্গাইল ছাড়াও অন্য জেলাগুলোর কৃষি ব্লকের মধ্যে বগুড়ার শিবগঞ্জ উপজেলার উথলি ব্লক, পঞ্চগড় সদর উপজেলার কমলাপুর ও পঞ্চঘরের বোদা উপজেলার পাঁচপীর ব্লক, ঝিনাইদহের শৈলকূপা উপজেলার কৃপালপুর ব্লক, পিরোজপুরের নেছারাবাদ উপজেলার রাজাবাড়ি ব্লক এবং কক্সবাজারের টেকনাফ উপজেলার রাজারছড়া ব্লকে কার্ড বিতরণ করা হবে বলে জানিয়েছেন কর্মকর্তারা। এছাড়া রাজবাড়ির গোয়ালন্দ উপজেলার তেনাপচা ব্লক, মৌলভিবাজারের জুড়ী উপজেলার ফুলতলা ব্লক এবং জামালপুরের ইসলামপুর উপজেলার গাইবান্ধা ব্লকেও ১৪ই এপ্রিল কৃষক কার্ড বিতরণ শুরু হওয়ার কথা রয়েছে।

কুমিল্লা জেলার আদর্শ সদর উপজেলার অরণ্যপুর ব্লকে আগামী ১৭ই এপ্রিল কৃষক কার্ড দেওয়া শুরু হবে বলে জানিয়েছে কৃষি মন্ত্রণালয়। 

সাধারণ কৃষকদের তুলনায় কার্ডধারী কৃষকরা ন্যায্যমূল্যে কৃষি উপকরণ, ন্যায্যমূল্যে সেচ প্রদানের সুবিধা, স্বল্পমূল্যে কৃষি যন্ত্রপাতি এবং সহজ শর্তে কৃষিঋণ পাবেন। এছাড়া মোবাইল ফোনে সহজে বাজারের তথ্য ও আবহাওয়ার পূর্বাভাস, ফসলের রোগ-বালাই দমনের পরামর্শ, কৃষি বিষয়ক প্রশিক্ষণ ও কৃষি বীমা সুবিধার পাওয়া যাবে।

সেইসঙ্গে, সরকারের কাছে ন্যায্যমূল্যে কৃষিপণ্য বিক্রয়ের পাশাপাশি কৃষিতে সরকারি বিভিন্ন ভর্তুকি ও প্রণোদনার অর্থও কৃষকের জন্য পাওয়া সহজ হবে বলে জানিয়েছেন কৃষিমন্ত্রী। তিনি বলেন, কার্ডের মাধ্যমে কৃষকরা (সরকারি) প্রণোদনা ও সেবা নেবেন, সংশ্লিষ্ট ডিলারের সরবরাহ করা মেশিন ব্যবহার করে সার, বীজ, মৎস্য বা প্রাণিখাদ্যসহ বিভিন্ন কৃষি উপকরণ কিনতে পারবেন। 

এক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট এলাকায় বীজ বা সারের ব্যবসায়ী বা ডিলারের কাছে ডিজিটাল পয়েন্ট অব সেল (পিওএস) মেশিন রাখার ব্যবস্থা করবে সরকার, যাতে কার্ডের মাধ্যমে কৃষকরা সহজেই লেনদেন সম্পন্ন করতে পারেন।