Image description

চব্বিশের গণঅভ্যুত্থানের পর পুলিশিং ব্যবস্থা ভেঙে পড়ায় মবের আতঙ্ক ছড়িয়েছিল সবখানেই। সেই পরিস্থিতিতে ‘ছাত্র-জনতা’ নাম দিয়ে চট্টগ্রামে ছিনতাইকারী সন্দেহে এক যুবককে রীতিমতো উল্লাস করে পিটিয়ে হত্যা করা হয়। নগরীর দুই নম্বর গেট এলাকায় শাহাদাত হোসেন নামে সেই যুবককে নেচে-গেয়ে পিটিয়ে হত্যার ঘটনায় পাঁচজনের বিরুদ্ধে আদালতে অভিযোগপত্র (চার্জশিট) জমা দিয়েছে পুলিশ। দেড় বছরের তদন্ত শেষে গত ৮ এপ্রিল পাঁচলাইশ থানা-পুলিশ চট্টগ্রাম আদালতে এই প্রতিবেদন দাখিল করে।

 

অভিযোগপত্রে বলা হয়েছে, ছিনতাইকারী সন্দেহে শাহাদাতকে একটি স্টিলের পাইপের সঙ্গে বেঁধে গান গেয়ে ও বাঁশি বাজিয়ে পৈশাচিক কায়দায় মারধর করা হয়। পরে তার লাশ উদ্ধার করা হয় আধা কিলোমিটার দূরের একটি নালা থেকে।

 

এ ঘটনায় এক কিশোরসহ পাঁচজনকে আসামি করে চার্জশিট জমা দিয়েছে পুলিশ। আসামিরা হলেন—ফরহাদ আহমেদ চৌধুরী, আনিসুর রহমান, মেহেদী হাসান ও মো. মাজেদ। এ ছাড়া ১৬ বছর বয়সী এক কিশোরের বিরুদ্ধে আলাদা চার্জশিট দেওয়া হয়েছে। শিশু আদালতে ওই কিশোর হত্যার দায় স্বীকার করে ১৬৪ ধারায় জবানবন্দিও দিয়েছে। সে জানায়, রাত ১১টার দিকে শাহাদাতকে ট্রাফিক সিগন্যালের খুঁটির সঙ্গে বেঁধে ১৫-২০ জন মিলে মারধর করে। পরে লাশটি অটোরিকশায় করে প্রবর্তক মোড় এলাকার একটি নালার পাশে ফেলে আসা হয়।

 

পুলিশ জানিয়েছে, ঘটনার সঙ্গে জড়িত সোহান ও আসিফ উল মেজবাহ নামে আরও দুজনকে শনাক্ত করা গেলেও পূর্ণাঙ্গ ঠিকানা না পাওয়ায় বর্তমানে তাদের আসামি করা সম্ভব হয়নি। এ ছাড়া হত্যায় জড়িত শান্ত নামের একজন কারাগারে থাকা অবস্থায় মারা গেছে। তাকেও চার্জশিট থেকে বাদ দেওয়া হয়েছে।

 

২০২৪ সালের ১৩ আগস্ট রাতে নগরের দুই নম্বর গেট এলাকায় এই হত্যাকাণ্ড হয়। তৎকালীন রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে রাস্তায় পুলিশ না থাকায় শিক্ষার্থীরা ট্রাফিক নিয়ন্ত্রণ করছিল। তাদের নেতৃত্বেই ওই ঘটনা সংগঠিত হয়।

 

অভিযোগপত্রে ২০ জনকে সাক্ষী করা হয়েছে। তাদের একজন প্রত্যক্ষদর্শী খিচুড়ি বিক্রেতা মীর নাজমুল হোসেন। তিনি বলেন, ৫ আগস্টের পর রাস্তায় পুলিশ না থাকায় শিক্ষার্থীরা ট্রাফিক নিয়ন্ত্রণ করছিল। ১৩ আগস্ট রাত ১১টার দিকে দুই নম্বর গেট এলাকায় শাহাদাতকে ট্রাফিক সিগন্যালের সঙ্গে বেঁধে মারধর করা হয়।

 

ঘটনার প্রায় এক মাস পর ২১ সেপ্টেম্বর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ২০ সেকেন্ডের একটি ভিডিও ছড়িয়ে পড়ে। সেখানে দেখা যায়, এক যুবককে বেঁধে রাখা হয়েছে এবং তাকে ঘিরে কয়েকজন তরুণ চট্টগ্রামের আঞ্চলিক গান গাইছে ও বাঁশি বাজাচ্ছে। ভিডিওটি ছড়িয়ে পড়ার চার দিনের মধ্যে পুলিশ তিনজনকে গ্রেপ্তার করে। গ্রেপ্তার হওয়া কিশোর আদালতে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিয়ে জানায়, ছিনতাইকারী সন্দেহে তারা সবাই মিলে এই মারধরে অংশ নিয়েছিল।

 

নিহত শাহাদাত হোসেন নোয়াখালীর সোনাইমুড়ী উপজেলার বাসিন্দা ছিলেন। তিনি নগরের বিআরটিসি এলাকায় থাকতেন এবং ফলমণ্ডির একটি দোকানে কাজ করতেন। তার বিরুদ্ধে একটি ছিনতাইয়ের মামলা থাকলেও এমন নৃশংস হত্যাকাণ্ডের বিচার দাবি করেছেন তার পরিবার।

 

শাহাদাতের বাবা মো. হারুন বলেন, আমার ছেলে দিনমজুর ছিল। তাকে যারা পিটিয়ে মেরেছে, আমি তাদের বিচার চাই। আর কোনো বাবার বুক যেন এভাবে খালি না হয়।

 

তদন্ত কর্মকর্তা এসআই এসএম সফিউল আজম মুন্সী বলেন, ভিডিও ফুটেজ ও জবানবন্দির ভিত্তিতে এই নৃশংসতার প্রমাণ পাওয়া গেছে এবং সেই আলোকেই অভিযোগপত্র প্রস্তুত করা হয়েছে। এসআই মনির এই মামলার মূল তদন্ত কাজ এগিয়ে নিয়েছেন। উনি বদলি হওয়ার পর আমি প্রতিবেদন দিয়েছি।