যশোর-ঝিনাইদহ মহাসড়কের ৪৮ কিলোমিটার ছয় লেনে উন্নীতকরণ প্রকল্প বাস্তবায়নে গতি নেই। ছয় বছরে যশোর অংশের ১৫ কিলোমিটারে মাত্র ২ শতাংশ কাজ হয়েছে। আর ঝিনাইদহ অংশে ৩ শতাংশ কাজ হয়েছে। সবমিলিয়ে ৫ শতাংশ কাজ হয়েছে। প্রকল্পের কাজ শেষ করার জন্য সময় আছে আর আট মাস।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, কাজে ধীরগতির কারণ জমি অধিগ্রহণ না হওয়া। প্রকল্পের মেয়াদ শেষ দিকে হলেও জমি অধিগ্রহণে থমকে আছে এ মহাসড়কের উন্নয়নকাজ। এতে যাতায়াতে জনদুর্ভোগ বেড়েছে। প্রকল্পের আওতায় জোড়াতালি দিয়ে চলাচলের উপযোগী করার চেষ্টা করা হচ্ছে। কিন্তু ভারী বর্ষণে মহাসড়কে আরও ভয়াবহ পরিস্থিতি সৃষ্টি হচ্ছে। মহাসড়ক দিয়ে চলাচলকারী লাখো মানুষ প্রতিদিন দুর্ভোগ পোহাচ্ছেন।
প্রকল্প সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা বলছেন, প্রকল্পের মেয়াদ শেষ হতে আর আট মাস বাকি। কিন্তু এখন পর্যন্ত দৃশ্যমান অগ্রগতি হয়েছে ৪ থেকে ৫ শতাংশ। ২০২০ সালে প্রকল্প অনুমোদন হলেও ২০২৪ সালের জানুয়ারিতে কাজ শুরু হয়। এখনও মূল সড়ক উন্নয়নকাজ শুরু করা যায়নি। ঝিনাইদহ শহরের বাইপাসের চুটলিয়া মোড় এলাকায় ফ্লাইওভারের আংশিক কাজ হয়েছে। এ ছাড়া ধোপাঘাটা সেতুর জন্য গার্ডার নির্মাণ এবং কয়েকটি কালভার্টের আংশিক কাজ হয়েছে। তবে সড়কের মূল অংশে কোনও অংশ কাজের কোনও অগ্রগতি নেই।
প্রকল্প সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, ২০২০ সালের ২৪ নভেম্বর একনেক সভায় ওয়েস্টার্ন ইকোনমিক করিডর (উইকেয়ার, ফেজ-১) যশোর-ঝিনাইদহ মহাসড়কের ৪৭ দশমিক ৪৮ কিলোমিটার সড়ক ছয় লেনে উন্নীতকরণের প্রকল্প পাস হয়। চার হাজার ১৮৭ কোটি ৭০ লাখ টাকার প্রকল্পের মেয়াদ ২০২১ সালের জানুয়ারি থেকে ২০২৩ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত নির্ধারণ করা হয়। পরে প্রকল্পের ব্যয় ছয় হাজার ৬২৬ কোটি ৭৩ লাখ টাকা ও মেয়াদ ২০২৬ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত বর্ধিত করা হয়।
প্রকল্পের আওতায় মহাসড়কে একটি ফ্লাইওভার, চারটি সেতু, ৫৫ কালভার্ট, পাঁচটি ভেহিকুলার ওভারপাস, আটটি পেডিস্ট্রিয়ান ওভারপাস ও একটি রেলওয়ে ওভারপাস থাকবে। এ ছাড়া প্রকল্প করিডরকে স্মার্ট হাইওয়েতে রূপান্তরের লক্ষ্যে ইন্টেলিজেন্ট ট্রান্সপোর্টেশন সিস্টেম ও অপটিক্যাল ফাইবার কেবল ডিজাইন করা হবে। পৌর এলাকার মধ্যে চার লেন এবং পৌর এলাকার বাইরে ছয় লেনে উন্নীত করা হবে মহাসড়কটি। প্রকল্পটি বাস্তবায়নে তিনটি লটে ভাগ করা হয়েছে। প্রথম লটে ঝিনাইদহ শহরের বাস টার্মিনাল থেকে কালীগঞ্জ মাহাতাব উদ্দিন কলেজ পর্যন্ত ১৫ দশমিক ৯ কিলোমিটার মহাসড়ক। দ্বিতীয় লটে কালীগঞ্জের মাহাতাব উদ্দিন কলেজ থেকে যশোর সদরের মুরাদগড় পর্যন্ত ১৫ দশমিক ৮ কিলোমিটার। সদরের মুরাদগড় থেকে যশোর শহরের চাঁচড়া মোড় পর্যন্ত তৃতীয় লটে ১৫ দশমিক ৮ কিলোমিটার রয়েছে। প্রায় ছয় বছর পেরিয়ে গেলেও প্রকল্পটির কাজের অগ্রগতি হতাশাজনক। প্রকল্পের যশোর অংশে কাজের অগ্রগতি মাত্র ২ শতাংশ। আর ঝিনাইদহের অংশে ৩ শতাংশ। এ অবস্থায় নির্ধারিত সময়ে প্রকল্প বাস্তবায়ন নিয়ে সংশয় আছে। কারণ মেয়াদ শেষ হতে আট মাস বাকি থাকলেও এখন পর্যন্ত কাজের অগ্রগতি সর্বোচ্চ ৫ শতাংশ। কবে নাগাদ কাজ শেষ হবে, তা জানা নেই প্রকল্প সংশ্লিষ্টদের।
জমি অধিগ্রহণ জটিলতায় থমকে আছে ঝিনাইদহ-যশোর ছয় লেন প্রকল্প
এ ব্যাপারে জানতে চাইলে উইকেয়ার ফেজ-১ প্রকল্পের উপ-বিভাগীয় প্রকৌশলী নিলন আলী বলেন, ‘জমি অধিগ্রহণ প্রক্রিয়া সম্পন্ন না হওয়ায় নির্ধারিত স্থানে কাজ শুরু করা যাচ্ছে না। যেসব স্থানে জমি বুঝে পাওয়া গেছে, সেখানে আংশিক কাজ চলছে। জমি অধিগ্রহণ করা হলে দ্রুত কাজ এগিয়ে নেওয়া যাবে। সবমিলিয়ে কাজের দৃশ্যমান অগ্রগতি হয়েছে ৫ শতাংশ।’
তিনি বলেন, ‘প্রকল্পটি ২০২০ সালে অনুমোদন হলেও ডিজাইন ও ঠিকাদার নিয়োগ করতে প্রায় সাড়ে তিন বছর সময় লেগেছে। এটি বাস্তবায়নে মূল চ্যালেঞ্জ ভূমি অধিগ্রহণ। যশোর অংশের ৫৩ একর জমি অধিগ্রহণে চূড়ান্ত অনুমোদন পাওয়া গেছে। আরও ৭ একর জমি অধিগ্রহণ প্রক্রিয়াধীন আছে। জেলা প্রশাসক জমি ও স্থাপনার ক্ষতিপূরণ নির্ধারণ করবে। তাদের চাহিদার ভিত্তিতে ক্ষতিপূরণ পরিশোধ করা হবে। জমি অধিগ্রহণ সম্পন্ন হলে দ্রুত কাজ এগিয়ে নিতে পারবো।’
এ বিষয়ে ঝিনাইদহের অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক সাইফুর রহমান বলেন, ‘প্রকল্পের জন্য প্রয়োজনীয় জমি অধিগ্রহণের কাজ চলমান আছে। কিছু জটিলতা থাকলেও তা দ্রুত সমাধানের চেষ্টা করা হচ্ছে। আশা করছি, অল্প সময়ের মধ্যেই জমি অধিগ্রহণ সম্পন্ন হবে এবং প্রকল্পের কাজ পুরোদমে শুরু করা যাবে।’
যশোরের জেলা প্রশাসক বলেন, ‘ভূমি অধিগ্রহণের চূড়ান্ত অনুমোদন হয়েছে। এবার মৌজা মূল্য অনুযায়ী সরকারি নিয়মে জমির প্রাক্কলন ব্যয় নির্ধারণ করা হবে। প্রাক্কলন ব্যয় নির্ধারণের পর জমি ও স্থাপনার মালিককে ক্ষতিপূরণের টাকা পরিশোধ করা হবে। টাকা পরিশোধের পর জমি প্রকল্পে হস্তান্তর করা হবে।’
এদিকে, বেহাল মহাসড়ক বর্তমানে মরণফাঁদে পরিণত হয়েছে। বর্ষায় খানাখন্দে চরম ভোগান্তি হচ্ছে চলাচলকারীদের। মহাসড়কের তদারকি প্রতিষ্ঠান সড়ক ও জনপথ বিভাগ। কিন্তু মহাসড়কটি উন্নয়ন প্রকল্পে হস্তান্তর করায় প্রতিষ্ঠানটি এখন আরও উন্নয়ন করতে পারছে না। প্রকল্পের আওতায় জোড়াতালি দিয়ে চলাচলের উপযোগী করার চেষ্টা করা হচ্ছে।
হতাশ স্থানীয়রা
ঝিনাইদহ উন্নয়ন সংগ্রাম সমন্বয় কমিটির সভাপতি আশরাফুল আলম বলেন, ‘মহাসড়কটি ছয় লেনে উন্নীত করার পরিকল্পনা থাকলেও বাস্তবায়ন প্রক্রিয়া অত্যন্ত হতাশাজনক। দীর্ঘ সময়েও অগ্রগতি খুবই কম।’
কালীগঞ্জ থেকে ঝিনাইদহগামী ইজিবাইক চালক রাশেদ উদ্দিন বলেন, ‘সড়কটি প্রকল্পের আওতায় যাওয়ার পর থেকে নিয়মিত মেরামত বন্ধ হয়ে গেছে। ফলে সড়কের বিভিন্ন স্থানে সৃষ্টি হয়েছে খানাখন্দ। ভাঙাচোরা সড়কে চলতে হয়। এতে যান চলাচল ধীরগতির ও ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে পড়েছে। প্রতিদিন যাত্রী ও চালকদের ভোগান্তি পোহাতে হচ্ছে। কবে নাগাদ এই কাজ শেষ হবে, তা আমাদের জানা নেই।’
স্থানীয় বাসিন্দা মাজেদা খাতুন বলেন, ‘প্রতিদিন কালীগঞ্জ থেকে ঝিনাইদহ যেতে হয়। কিন্তু সড়কের অবস্থা এতই খারাপ যে চলাচল করতে খুব কষ্ট হয়। আমাদের ছয় লেন দরকার নেই, ভালো সড়ক দরকার।’