চট্টগ্রামের বাকলিয়ায় সাড়ে ৩ বছরের এক শিশুকে ধর্ষণের ঘটনাকে কেন্দ্র করে গত ২১ মে রাতে পুলিশের সঙ্গে জনতার দফায় দফায় সংঘর্ষ হয়। এতে আহত হন ১৫ জনের বেশি পুলিশ সদস্য, পুড়িয়ে দেওয়া হয় একটি পুলিশ ট্রাক। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে পুলিশ ছুড়েছে রাবার বুলেট, টিয়ারশেল, সাউন্ড গ্রেনেডসহ বিপুল পরিমাণ ভিড়-নিয়ন্ত্রণ অস্ত্র- যা ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর চট্টগ্রামে এই প্রথম।
বাকলিয়া থানার চাক্তাই পুলিশ ফাঁড়ির ইনচার্জ এসআই মোবারক হোসেন মঙ্গলবার রাতে থানায় দায়ের করা মামলায় এই ঘটনার বিস্তারিত বিবরণ দিয়েছেন।
এজাহার অনুযায়ী, ২১ মে বিকেলে কুমিল্লার মুরাদনগর থানার গাংগাটিয়া গ্রামের বাসিন্দা মো. মনির হোসেন, যিনি বর্তমানে চট্টগ্রামের বাকলিয়া থানাধীন মিয়াখাননগরের আলী স্টোর বিল্ডিংয়ে বাস করতেন। বিসমিল্লাহ ম্যানশনের একটি রুমের ভেতরে ওই শিশুকে ধর্ষণ করে।
খবর পেয়ে ওইদিন বিকেল ৫টা ১২ মিনিটে এসআই মোবারক হোসেন সঙ্গীয় অফিসার ও ফোর্সসহ ঘটনাস্থলে পৌঁছান। ওই শিশুকে উদ্ধার করে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে পাঠানো হয়। পরে শিশুটিকে মেডিকেলের ওয়ান স্টপ ক্রাইসিস সেন্টারে ভর্তি করা হয়।
ঘটনাস্থলে স্থানীয় লোকজন আগেই মনির হোসেনকে আটক করে রেখেছিল। পুলিশ তাকে হেফাজতে নিতে গেলে জনতা বাধা দেয়। পুলিশের কাছে আসামি ছেড়ে না দেওয়া এবং তাকে "হত্যা করার" দাবিতে স্লোগান দিতে শুরু করে উত্তেজিত জনতা। পরিস্থিতি দ্রুত জটিল হয়ে উঠলে এসআই মোবারক বেতার যন্ত্রের মাধ্যমে ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের ঘটনাস্থলে আসার অনুরোধ জানান। এর পর ঘটনাস্থলে পৌঁছান উত্তর ও দক্ষিণের কর্মকর্তারা।
ইটপাটকেল, আগুন, রণক্ষেত্র: ৫ আগস্টের পর চট্টগ্রামে প্রথম এত গোলাগুলি
এজাহারে বলা হয়, জনতা পুলিশ সদস্যদের লক্ষ্য করে ইটপাটকেল নিক্ষেপ শুরু করলে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে পুলিশ কন্ট্রোল রুমের মাধ্যমে স্পেশাল পুলিশ, মহানগর গোয়েন্দা বিভাগ (ডিবি), আর্মড পুলিশ ব্যাটালিয়ন এবং র্যাব-০৭-এর সদস্যদের মোতায়েন করা হয়। উপ-পুলিশ কমিশনার (দক্ষিণ) প্রথমে হেলার (মেগাফোন) দিয়ে সতর্ক করলেও জনতা থামেনি। পরে লাঠিচার্জের নির্দেশ দেওয়া হয়। তাতেও কাজ না হলে, জনতা দেশি অস্ত্রশস্ত্রসহ সশস্ত্র অবস্থায় আরও ভয়ঙ্কর হয়ে উঠলে ব্যবহার করা হয় শক্তিশালী ভিড় নিয়ন্ত্রণ সরঞ্জাম।
এজাহারে উল্লিখিত নিক্ষেপের হিসাব অনুযায়ী রাবার বুলেট ছোড়া হয় ৭৬ রাউন্ড, লং রেঞ্জ টিয়ার শেল ৩৫ রাউন্ড, শর্ট রেঞ্জ টিয়ার শেল ৩১ রাউন্ড, টিয়ার গ্যাস হ্যান্ড গ্রেনেড ৫ রাউন্ড, সাউন্ড গ্রেনেড ৫৫ রাউন্ড, ৬-ব্যাং গ্রেনেড ১৬টি, ৭-ব্যাং গ্রেনেড ৯টি। ২০২৪ সালের ৫ আগস্টে শেখ হাসিনা সরকারের পতনের পর চট্টগ্রামে এত বড় পরিসরে এই ধরনের শক্তি প্রয়োগ এটাই প্রথম বলে সংশ্লিষ্টরা জানাচ্ছেন।
ইটপাটকেলের আঘাতে উপ-পুলিশ কমিশনার (দক্ষিণ) হোসাইন মোহাম্মদ কবির ভূঁইয়ার মাথার পেছনে গুরুতর আঘাত লাগে, তিনি চট্টগ্রাম জেনারেল হাসপাতালে প্রাথমিক চিকিৎসা নেন। কনস্টেবল সুজন কান্তি দে মাথায় গুরুতর আঘাত পেয়ে প্রচুর রক্তক্ষরণের পর ঘটনাস্থলে বমি করে অচেতন হয়ে পড়েন। তাকে দ্রুত চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নেওয়া হয়। এছাড়াও পায়ে আঘাত, মাথায় আঘাত, মুখে-কাঁধে জখম, বাম পায়ে অগ্নিদগ্ধসহ সারা শরীরে লাঠি ও রডের আঘাতে আহত হন আরও ১৩ জন পুলিশ সদস্ — যাদের মধ্যে একজনকে আগুনের মধ্যে ধাক্কা মেরে ফেলে দেওয়া হয়েছিল বলে এজাহারে উল্লেখ রয়েছে।
কৌশলে আসামিকে উদ্ধার, তারপরেও থামেনি জনতা
একপর্যায়ে এসআই মোবারক হোসেন, এসআই মিজানুর রহমান এবং এএসআই মোশারফ হোসেন কৌশলে মনির হোসেনকে ঘটনাস্থল থেকে মনসুরাবাদ পুলিশ লাইন্সস্থ মহানগর গোয়েন্দা পুলিশ কার্যালয়ে নিয়ে যেতে সক্ষম হন। জানা গেছে, পুলিশের পোশাক পরিয়েই আসামি মনিরকে ঘটনাস্থল থেকে সরিয়ে থানায় নেওয়া হয়। আসামি সরিয়ে নেওয়া হয়েছে বুঝতে পেরে জনতা ঘটনাস্থল থেকে তুলাতলী পর্যন্ত এলাকা রণক্ষেত্রে পরিণত করে।
১ম ঘটনাস্থলের পিকআপ সামনের গ্লাস ভেঙে আনুমানিক ৬০ হাজার টাকার ক্ষতি করা হয়। ড্রাইভার পুটন কান্তি বড়ুয়া কোনোমতে গাড়ি নিয়ে নিরাপদে সরে যেতে সক্ষম হন।
২য় ঘটনাস্থল রাত ১০টা ২০ মিনিটে তুলাতলীর শাহ আমানত সংযোগ সেতু সড়কে রাজাখালী ব্রিজের উত্তর পাশে পুলিশ বহনকারী ট্রাকে আগুন ধরিয়ে দেওয়া হয়। আনুমানিক ২০ লাখ টাকার ক্ষতি হয়। ট্রাকটি বাঁচাতে এগিয়ে আসতে গেলে ড্রাইভার কামাল হোসেনকে ধাওয়া করে জনতা। ৩য় ঘটনাস্থল রাত ১০টা ৩০ মিনিটে ৫ নম্বর ব্রিজ সংলগ্ন অনন্ত বিলাস কমিউনিটি সেন্টারে আশ্রয় নেওয়া বাকলিয়া থানার ওসির পিকআপের গ্লাস, হেড লাইট ও সিগনাল লাইট ভাঙচুর করে ১ লাখ টাকার ক্ষতি এবং কমিউনিটি সেন্টারের দরজা-জানালা ভেঙে ৪ লাখ টাকার ক্ষতি করা হয় বলে এজাহারে উল্লেখ করা হয়।
এ ছাড়া সহকারী পুলিশ কমিশনার (চকবাজার জোন) এবং সহকারী পুলিশ কমিশনার (বায়েজিদ বোস্তামী জোন)-এর দুটি পিকআপ গাড়িতেও হামলা চালিয়ে মোট আরও প্রায় ১ লাখ ২০ হাজার টাকার ক্ষতি করা হয়।
ধর্ষণের ঘটনায় শিশুটির বাবা মেহেদী হাসান বাদী হয়ে মনির হোসেনের বিরুদ্ধে নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইনে আলাদা মামলা করেছেন। এতে মোট আসামি গ্রেফতার ১১ জন। অজ্ঞাতনামা ৪০০-৫০০ জন আসামি করা হয়। আসামি মনির হোসেন পরে চট্টগ্রাম মহানগর হাকিম আবু বকর সিদ্দীকির আদালতে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিয়েছেন এবং তাকে কারাগারে পাঠানো হয়েছে।