Image description
জ্বালানি তেল সংকট

চট্টগ্রাম বন্দর থেকে আমদানি করা পণ্য নিয়ে প্রতিদিন প্রায় সাড়ে চার হাজার ট্রাক, লরি, কাভার্ডভ্যান ও প্রাইমমুভার দেশের বিভিন্ন স্থানে যায়। অন্যদিকে, বিভিন্ন কারখানা ও অফডক থেকে প্রায় ৩ হাজার গাড়ি পণ্য জাহাজিকরণের উদ্দেশে এই বন্দরে প্রবেশ করে। শুধু চট্টগ্রাম বন্দর ঘিরে প্রতিদিন প্রায় সাড়ে ৭ হাজার গাড়ি আসা-যাওয়া করে।

এর বাইরে দেশের সবচেয়ে বড় পাইকারি বাজার খাতুনগঞ্জে প্রতিদিন প্রায় দুই হাজার, রেয়াজউদ্দিন বাজারে হাজারখানেক ও পাহাড়তলী চালের আড়তে আরো পাঁচ শতাধিক ট্রাক, লরি ও কাভার্ডভ্যান পণ্য পরিবহন করে। এর বাইরে সীতাকুণ্ড, কালুরঘাট, নাসিরাবাদ ও ইপিজেড এলাকার কলকারখানাগুলোতে আরো এক থেকে দেড় হাজার ভারী যানবাহন চলাচল করে। সব মিলিয়ে প্রতিদিন কমবেশি ১৩ হাজার গাড়িতে পণ্য পরিবহন করা হয় বন্দর নগরী চট্টগ্রামে।

কিন্তু বর্তমানে জ্বালানি সংকটের কারণে ট্রাক, লরি, কার্ভাডভ্যানসহ পণ্যবাহী যান চলাচল নেমে এসেছে ৮ হাজারের নিচে অর্থাৎ প্রায় ৩০ শতাংশ কমেছে। একই সঙ্গে ভাড়া বেড়েছে ২০-৪০ শতাংশ পর্যন্ত। ফলে আমদানিকারক ও রপ্তানিকারকরা পণ্য সরবরাহে বিপাকে পড়েছেন। এর ফলে বাজারে কৃত্রিম সংকট হওয়ার শঙ্কা তৈরি হয়েছে।

আমদানি-রপ্তানি বাণিজ্যের সঙ্গে সংশ্লিষ্টরা জানান, আগে বন্দরের আশপাশে ভাড়া পাওয়ার আশায় পণ্যবাহী যানবাহন দাঁড়িয়ে থাকত। অনেক মিডিয়া অফিস তাদের সঙ্গে গাড়ি ভাড়ার ব্যাপারে যোগাযোগ করত। জ্বালানি সংকট শুরু হওয়ার পর থেকে গাড়ি ভাড়া দিতে কেউ যোগাযোগ করা তো দূরের কথা নিজেরা ঘুরে ঘুরেও গাড়ি পাচ্ছে না।

পরিবহন চালক ও ভাড়ার সঙ্গে জড়িত অফিসগুলো বলছে, জ্বালানি সংকটের কারণে রাস্তায় গাড়ি কমে গেছে। এ কারণে চাহিদামতো গাড়ি পাওয়া যাচ্ছে না। যে দুয়েকটা পাওয়া যাচ্ছে তাতেও অতিরিক্ত ভাড়া গুনতে হচ্ছে। আগে যেখানে একটি খোলা ট্রাক চট্টগ্রাম থেকে ঢাকায় যেতে ভাড়া নিত ২৪-২৫ হাজার টাকা, এখন সেখানে দিতে হচ্ছে ৩৩-৩৫ হাজার টাকা। কাভার্ড ভ্যান চট্টগ্রাম থেকে ঢাকায় যেতে ভাড়া নিত ২৮-৩০ হাজার টাকার মধ্যে। এখন সেই ভ্যান ৪২-৪৫ হাজারের নিচে মিলছে না। একই দূরত্বে যেতে কন্টেইনারবাহী লরির ভাড়া ছিল ৪০-৪২ হাজার টাকা। এখন ৫৫ হাজারের নিচে কোনো লরি চট্টগ্রাম থেকে বের হচ্ছে না। অন্যান্য গন্তব্যেও আনুপাতিকহারে প্রায় ৩০ শতাংশ ভাড়া বেড়েছে শুধু জ্বালানি সংকটের অজুহাতে।

চট্টগ্রাম বন্দরের টোল রোডের মুখে অপেক্ষা করা ট্রাক চালক নজরুল ইসলাম বলেন, তার মালিকের তিনটি গাড়ি। জ্বালানি সংকটে গত একমাস ধরে ২টি গাড়ি বন্ধ রেখেছেন। একটি গাড়ি চলছে তবে যে কোনো সময় সেটিও বন্ধ হয়ে যেতে পারে। কারণ, নগরীর হালিশহর এলাকার একটি পেট্রোল পাম্পের সঙ্গে তার মালিকের দীর্ঘমেয়াদি চুক্তি আছে। তিনটি গাড়ির চালকই ওই পাম্প থেকে তেল সংগ্রহ করতেন। পরে গাড়ির মাইল মিটারের সঙ্গে মালিককে হিসাব বুঝিয়ে দিতেন। কিন্তু ওই পেট্রল পাম্প এখন চাহিদামতো তেল দিতে পারছে না।

তিনি আরো বলেন, ভাড়া নিয়ে একবার চট্টগ্রাম থেকে ঢাকায় যেতে-আসতে ৩৫০ লিটার তেল লাগে। যাওয়ার সময় পুরো তেল লোড করে নিতেন। কিন্তু প্রায় দেড় মাস ধরে একসঙ্গে ৫০ লিটারের বেশি তেল দিচ্ছে না পাম্পটি। ফলে বারবার গাড়ি থামিয়ে তেল নিতে হচ্ছে। গাড়িতে পর্যাপ্ত তেল নিয়ে চট্টগ্রাম ছাড়তে না পারলে ফেরার সময় তেল পাওয়া যাবে কি না সন্দেহ থাকে। তাই অনেক মালিক গাড়ি চলাচল বন্ধ রেখেছেন। পাম্পের সামনে পণ্যবাহী গাড়ির নিরাপত্তা ঝুঁকি থাকে বলেও জানান তিনি।

ফরিদপুর থেকে খাতুনগঞ্জে পেঁয়াজ নিয়ে এসেছেন ট্রাকচালক আব্দুর রহমান। তিনি জানান, স্বাভাবিক সময়ে ফরিদপুর থেকে পদ্মা সেতু হয়ে চট্টগ্রামে পণ্য নিয়ে আসতে সময় লাগে ১০-১২ ঘণ্টা। এখন ৩০ ঘণ্টায়ও আসা যাচ্ছে না। কারণ, অন্তত ৩ বার পাম্পে দাঁড়িয়ে লম্বা লাইন ঠেলে তেল সংগ্রহ করতে হয়। এরপর গাড়ির নিরাপত্তার জন্য অতিরিক্ত একজন সহকারীও প্রয়োজন। মাঝে মধ্যে পাম্পের স্টাফদের বখসিসও দেওয়া লাগে। সব মিলিয়ে ৩০-৩২ হাজার টাকার ভাড়া এখন ৪২ হাজার নিয়েও লাভ থাকছে না।

খাতুনগঞ্জ ডাল মিল ও আড়তদার মালিক সমিতির সাবেক সভাপতি সোলাইমান বাদশা বলেন, চট্টগ্রাম বন্দরে পণ্য খালাস করার পর খাতুনগঞ্জে এনে এরপর দেশের বিভিন্ন স্থানে পাঠানো হয়। খাতুনগঞ্জ থেকে সারা দেশেই পণ্য সরবরাহ করা হয়। এর বাইরে বেনাপোল থেকেও বিপুল পরিমাণ পণ্য খাতুনগঞ্জে আসে। বর্তমানে প্রতিটি রুটে পরিবহন ভাড়া বেড়েছে ৩০-৩৫ শতাংশ। অথচ সরকার এখনো তেলের দাম বাড়ায়নি। জ্বালানি তেলের সংকট অজুহাতে রাস্তা থেকে গাড়ি উঠিয়ে দিয়ে একটি সিন্ডিকেট দেশে পণ্যের সাপ্লাই চেনে ভাঙন ধরাতে চাইছে। তবে এর প্রভাব ভোগ্যপণ্যের বাজারে এখনো সেভাবে পড়েনি। কারণ, ঈদের পর বাজারে ক্রেতার আনাগোনা তুলনামূলক কম। কিন্তু এভাবে চললে দ্রুত সময়ের মধ্যেই খোলা বাজারও অস্থির হয়ে উঠবে।

আন্তঃজেলা পণ্য পরিবহন সংস্থা ট্রাক ও কাভার্ডভ্যান মালিক সমিতির সাধারণ সম্পাদক চৌধুরী জাফর আহম্মদ বলেন, বর্তমানে চট্টগ্রাম বন্দরের জেটিতে খালাস হওয়া ৯০ শতাংশ পণ্যই সড়কপথে ট্রাক, লরি ও কাভার্ডভ্যানে পরিবহন করা হয়। জ্বালানি সংকটে ইতিমধ্যে ৩০ শতাংশের বেশি পণ্য পরিবহন বন্ধ হয়ে গেছে। বন্ধ যানবাহনের তালিকায় প্রতিদিনই নতুন নতুন গাড়ি যুক্ত হচ্ছে। এতে চট্টগ্রাম বন্দরের স্বাভাবিক অপারেশন বাধাগ্রস্ত হওয়ার শঙ্কা তৈরি হয়েছে। এই বাস্তবতায় বন্দরে নিয়োজিত পণ্য পরিবহনগুলোকে অগ্রাধিকার ভিত্তিতে জ্বালানি সরবরাহের ব্যবস্থা না করলে ক্ষতিগ্রস্ত হবে জাতীয় অর্থনীতি।

চট্টগ্রাম চেম্বারের সাবেক পরিচালক মাহফুজুল হক শাহ বলেন, মধ্যপ্রাচ্য যুদ্ধ পরিস্থিতির কারণে জ্বালানি তেলের সাপ্লাই চেন ভেঙে পড়েছে। সরকার মোটা অংকের ভর্তুকি দিয়ে হলেও দেশের বাজারে তেলের দাম ধরে রেখেছে। কিন্তু এক শ্রেণির অসাধু ব্যবসায়ী এই সংকট পুঁজি করে ফায়দা লোটার চেষ্টা করছে।