যুক্তরাষ্ট্র-ইসরাইল ও ইরানকে ঘিরে মধ্যপ্রাচ্যে সংঘাতের পর যুদ্ধবিরতি চলছে। তবে বৈশ্বিক উত্তেজনা কমেনি। এর মধ্যে জ্বালানির বড় সংকট দেখা দিয়েছে দেশে। সেই সঙ্গে নতুন করে ডলারের দর উঠানামা করছে। এদিকে আন্তর্জাতিক বাজারে চাহিদা বাড়ায় কিছুটা বেড়েছে ডলারের দাম। যার প্রভাব দেশের বাজারেও পড়েছে। সবমিলিয়ে অন্যান্য প্রধান মুদ্রার বিপরীতে মার্কিন ডলারের অবস্থান এখন নড়বড়ে।
খোলা বাজারে গত এক মাস আগে প্রতি ডলার নগদ বিক্রি হয়েছে ১২৫ টাকায়, যা গত সপ্তাহে বিক্রি হয়েছে ১২৬ টাকার কিছুটা বেশি। আর গত মাসে ছিল প্রায় ১২৪ টাকা। দীর্ঘদিন ধরে ব্যাংক থেকে এক টাকা বেশিতে বিক্রি করলেও সম্প্রতি দাম বাড়িয়ে দিয়েছে মানি চেঞ্জার্স প্রতিষ্ঠানগুলো। মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাতে বিশ্বের অস্থিরতার সঙ্গে দেশেও প্রভাব পড়েছে বলে জানায় প্রতিষ্ঠানগুলো। সেই সঙ্গে ডলার সরবরাহ কমেছে।
এদিকে ব্যাংকগুলোর সূত্রে দেখা গেছে, গত এক মাসে প্রতি ডলারের দাম এক টাকা বেড়েছে। এক মাস আগে ব্যাংকগুলো প্রতি ডলার ১২২ টাকা ৩০ পয়সায় বিক্রি করেছে। ৭ই এপ্রিল তা ১২৩ টাকা ৫০ পয়সায় ওঠে। তবে পরের দু’দিনে সেটা ১২৩ টাকায় নামে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে প্রতি ডলার সর্বোচ্চ ১২২ টাকা ৭৫ পয়সায় লেনদেন হচ্ছে। মার্চের প্রথম সপ্তাহে এই হার ছিল ১২২ টাকা ৩০ পয়সা। অর্থাৎ এক মাসে বৃদ্ধি মাত্র ৪৫ পয়সা।
ব্যাংক-সংশ্লিষ্টরা বলছেন, ডলারের দাম বাড়ার পেছনে মূলত চাহিদা বৃদ্ধি কাজ করেছে। রেমিট্যান্স প্রবাহ বাড়লেও রপ্তানি কম থাকায় সরবরাহের তুলনায় চাহিদা কিছুটা বেশি। এ ছাড়া ইরানকে ঘিরে উত্তেজনার কারণে তেলের দাম বাড়ার আশঙ্কায় ব্যাংকগুলো ফরওয়ার্ড বুকিং বাড়িয়েছে, অনেক ক্ষেত্রে জুন পর্যন্ত বুকিং নেয়া হয়েছে। এতে ডলারের ওপর অতিরিক্ত চাপ তৈরি হয়েছে।
রিজার্ভের সবশেষ তথ্য বলছে, মার্চে ইতিহাসের রেকর্ড পরিমাণ ৩৭৫ কোটি ৫০ লাখ ডলার প্রবাসী আয় দেশে এসেছে। তবে চলতি ২০২৫-২৬ অর্থবছরের প্রথম আট মাসে আমদানি বৃদ্ধি ও পণ্য রপ্তানি কমায় বাণিজ্য ঘাটতি বেড়ে হয়েছে ১৭ বিলিয়ন ডলার। যা গত অর্থবছরের একই সময়ের তুলনায় ৩২০ কোটি ডলার বেশি। এমন পরিস্থিতিতে সবশেষ ৯ই এপ্রিল দেশের মোট রিজার্ভ দাঁড়িয়েছে ৩৪.৬৪ বিলিয়ন ডলার, যা বিপিএম-৬ পদ্ধতি অনুযায়ী হয়েছে ২৯.৯৫ বিলিয়ন ডলার।
তবে এই মুহূর্তে ডলারের দাম বৃদ্ধির কোনো কারণ নেই বলে সম্প্রতি এক বিজ্ঞপ্তিতে জানিয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক। সংস্থাটি জানিয়েছে, বর্তমানে ডলারের সরবরাহ ও চাহিদার মধ্যে ভালো ভারসাম্য রয়েছে।
বিজিএমইএ’র সাবেক পরিচালক এবং ডেনিম এক্সপার্টের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মহিউদ্দিন রুবেল বলেন, এলসি নিষ্পত্তিতে ডলারের দাম বাড়লে ক্ষতিগ্রস্ত হবেন উদ্যোক্তারা। বিষয়টি অবশ্যই নিয়ন্ত্রণ সংস্থাকে (কেন্দ্রীয় ব্যাংক) দেখতে হবে।
বিশ্বব্যাংকের সাবেক মুখ্য অর্থনীতিবিদ ড. জাহিদ হোসেন বলেন, যদি তেলের দাম দীর্ঘ সময় ১২০ ডলারের উপরে থাকে, তাহলে বৈশ্বিক অর্থনীতিতে মন্দা দেখা দেয়ার ঝুঁকি রয়েছে। জ্বালানি তেলের এলসি খোলা আগের তুলনায় কিছুটা বেড়েছে এবং এসব এলসি অনেক ক্ষেত্রে ফরওয়ার্ড বুকিংয়ের মাধ্যমে দেয়া হচ্ছে, যা ডলারের ওপর অতিরিক্ত চাহিদা তৈরি করছে। আর রেমিট্যান্স বাড়লেও রপ্তানি কম থাকায় বাজারে ডলারের চাহিদা সরবরাহের চেয়ে বেশি।
ওদিকে বিদেশি মুদ্রার বাজার স্থিতিশীল রাখতে অতিরিক্ত দামে ডলার কেনা কয়েকটি বাণিজ্যিক ব্যাংককে মৌখিকভাবে সতর্ক করেছে বাংলাদেশ ব্যাংক। গত বৃহস্পতিবার এসোসিয়েশন অব ব্যাংকার্স বাংলাদেশের (এবিবি) সঙ্গে বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর মোস্তাকুর রহমানের আলোচনার সময় কেন্দ্রীয় ব্যাংকের পক্ষ থেকে এই সতর্ক করা হয়েছে।