Image description

কুষ্টিয়ার দৌলতপুরে পীরের দরবারে হামলা, ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগ এবং দরবারের মধ্যমনি পীর শামীমকে পিটিয়ে ও কুপিয়ে হত্যা করে দুর্বৃত্তরা।

রোববার (১২ এপ্রিল) লাশের ময়না তদন্ত শেষে বাদ আছর আইন শৃংখলা বাহিনীর নিরাপত্তা প্রহরায় স্থানীয় কবরস্থানে লাশ দাফন সম্পন্ন হয়।

এ ঘটনায় এলাকায় এখন থমথমে অবস্থা।

 

শনিবার (১১ এপ্রিল) দুপুরে উপজেলার ফিলিপনগর ইউনিয়নে 'শামীম বাবার দরবার শরিফ' নামে পরিচিত আস্তানায় এ হামলার ঘটনা ঘটে।

এঘটনায় ওই আস্তানার আরো তিন ভক্ত মহন আলী, জামিরুন ও জুবায়ের গুরুতর আহত হন।

 

এলাকায় আইন শৃংখলা বজায় রাখতে অতিরিক্ত পুলিশ মোতায়েন করা হয়েছে।

ইতিমধ্যে পুলিশ, বিজিবি, সেনাবাহিনী ও র‌্যাবে ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেছেন। এছাড়া, জেলা ও  উপজেলা প্রশাসনসহ স্থানীয় সংসদ সদস্যও ঘটনাস্থল দেখেছেন।

 

রোববার (১২ এপ্রিল) দুপুর আড়াইটায় লাশ ময়না তদন্ত সম্পন্ন করে পরিবারের কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে বলে জানায় পুলিশ।

তবে ঘটনার ২৪ ঘণ্টা পরও সংশ্লিষ্ট থানায় কোন মামলা হয়নি এবং এঘটনায় জড়িত  কাউকে আটকও করতে পারেনি পুলিশ।

নিহত পীরের লাশ আস্তানাসংলগ্ন পারিবারিক কবরস্থানে দাফন করা হয়েছে। পরে পরিবারের পক্ষ থেকে আলাপ আলোচনা সাপেক্ষে মামলার সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে বলে জানান নিহতের বড়ভাই ফজলুর রহমান।

দৌলতপুর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) আরিফুর রহমান বলেন, এখনো পরিবারের পক্ষ থেকে কোনো লিখিত অভিযোগ পাওয়া যায়নি। এ ঘটনায় কাউকে আটক করা সম্ভব হয়নি, তবে এলাকায় পুলিশ মোতায়েন রয়েছে।

স্থানীয়দের দাবি, ইসলাম ও কোরআন অবমাননার অভিযোগকে কেন্দ্র করে বিক্ষুব্ধ জনতা এ হামলা চালায়। 

প্রশাসনের ভাষ্য, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া একটি পুরোনো ভিডিও নতুন করে ভাইরাল হওয়ার পর এলাকায় উত্তেজনা সৃষ্টি হয়। 

এক পর্যায়ে তারা হামলা ভাংচুর ও অগ্নিসংযোগ করে দরবারের দলবার হলসহ বিভিন্ন স্থানে। 

খবর পেয়ে ভেড়ামারা ফায়ার সার্ভিসের একটি টিম ঘটনাস্থলে গিয়ে আগুন নিয়ন্ত্রণে আনে। তবে হামলার শুরু থেকেই ঘটনাস্থলে দৌলতপুর থানা পুলিশের লোকজন উপস্থিত ছিল।

নিহত পীর আব্দুর রহমান ওরফে শামীম রেজার পরিবার ও ভক্ত অনুসারীরা জানান, শামীম ২০১৮ সালের দিকে পৈতৃক ভিটায় এই আস্তানা গড়ে তোলেন। তিনি নিজেকে 'সংস্কারপন্থী ইমাম' পরিচয় দিতেন। 

তিনি প্রাথমিক ও মাধ্যমিক শিক্ষা শেষে উচ্চশিক্ষাও সম্পন্ন করেন এবং পরবর্তীতে কিছুদিন ঢাকায় চাকরি করেন। পরে চাকরি ছেড়ে আধ্যাত্মিক ধর্ম চর্চায় নিজেকে যুক্ত করেন। 

২০২১ সালের মে সাসের দিকে তার দরবারে এক শিশুর লাশ বাদ্যযন্ত্র বাজিয়ে দাফনের একটি ভিডিও সামাজিক মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ার ঘটনায় এই পীর আলোচনায় উঠে আসেন। 

ওই বছরই তার আর একটি ভিডিও ভাইরাল হয়। পরে ওই ভিডিওর সূত্র ধরে ধর্ম অবমাননার অভিযোগ এনে এক হেফাজতে ইসলামের নেতা বাদী হয়ে আদালতে মামলা করেন। 

ওই মামলায় তিনি বেশ কিছুদিন করাবাস করে জামিনে মুক্তি পান। ঠিই ওই একই ভিডিও হঠাৎ করে গত দুইদিন আগে কে বা কারা সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ছড়িয়ে দিয়ে এলাকার সাধারণ লোকজনকে উত্তেজিত করে তোলে। 

এই হামলা একেবারে ঠান্ডা মাথায় পরিকল্পিতভাবে মব সৃষ্টি করে করেছে তারা'।

বিষয়টির সত্যতা নিশ্চিত করে কুষ্টিয়ার পুলিশ সুপার (এসপি) মোহাম্মদ জসীম উদ্দীন বলেন, 'পুরোনো একটি ভিডিও নতুন করে সামাজিক মাধ্যমে ছড়িয়ে দেওয়ায় পরিস্থিতি উত্তপ্ত হয়ে ওঠে। ঘটনার সময় সেখানে পুলিশ উপস্থিত হয়ে আক্রান্ত শামীমকে উদ্ধার করার চেষ্টাও করেন।

কিন্তু সেখানে হামলাকারীদের তুলনায় পুলিশের সংখ্যা কম থাকায় পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যায়। নিজ ঘরে তাকে পিটিয়ে হত্যার ঘটনায় যারা জড়িত তাদের শণাক্তের কাজ করছে পুলিশ'।

ঘটনাস্থল পরিদর্শন শেষে কুষ্টিয়া জেলা প্রশাসক তৌহিদ বিন-হাসান সাংবাদিকদের জানান, 'বর্তমানে এলাকার পরিস্থিতি শান্ত। সেখানে আইনশৃঙ্খলা রক্ষায় অতিরিক্ত আইন শৃংখলা বাহিনীর সদস্যদের মোতায়েন করা হয়েছে।
 
স্থানীয় সংসদ সদস্য রেজা আহম্মেদ বাচ্চু ঘটনাস্থল পরিদর্শন শেষে প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করে বলেন, 'কে পীর কে বাউল কে ফকির কোথায় কীভাবে ধর্ম অবমাননা করলো সেটা দেখার জন্য রাষ্ট্রের প্রশাসন আছে। আইন আছে, বিচার আছে। 

কারো কোন আপত্তি থাকলে বা সংক্ষুব্ধ হলে তার জন্য বিচার বিভাগ আছে। তাই বলে এভাবে তান্ডব চালিয়ে মানুষ হত্যার অধিকার কাউকে দেওয়া হয়নি। আমি আইন শৃংখলা বাহিনীকে বলেছি ঘটনার সঙ্গে যারাই জড়িত জড়িত থাক না কেনো তাদের শণাক্ত করে নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে আইনের আওতায় আনা হবে'।