উচ্চ আদালতে বিচারক নিয়োগ অধ্যাদেশ ও সুপ্রিম কোর্ট সচিবালয় অধ্যাদেশ বাতিলের মাধ্যমে যে পরিস্থিতির সৃষ্টি হলো, তা দেশকে ভয়ানক পরিস্থিতির দিকে টেনে নিয়ে যাবে বলে মন্তব্য করেছেন বক্তারা। গতকাল জাতীয় প্রেস ক্লাবের তফাজ্জল হোসেন মানিক মিয়া হলে আয়োজিত এক মুক্ত আলোচনায় তারা এসব কথা বলেন। ‘সুপ্রিম কোর্ট সচিবালয় (রহিতকরণ) বিল ও সুপ্রিম কোর্টের বিচারক নিয়োগ (রহিতকরণ) বিল হতে লেগেছে ৫৫ বছর, স্বাধীনতা আর কতদূর?’ শীর্ষক এ অনুষ্ঠানের আয়োজন করে স্বেচ্ছাসেবী মানবাধিকার সংগঠন ‘হিউম্যানিটি ফাউন্ডেশন’ এবং ‘আইন ও বিচার’ পত্রিকা। হিউম্যানিটি ফাউন্ডেশনের প্রতিষ্ঠাতা চেয়ারপারসন এবং আইন ও বিচার পত্রিকার সম্পাদক মুহাম্মদ শফিকুর রহমানের সভাপতিত্ব ও সঞ্চালনায় অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে বক্তব্য রাখেন আপিল বিভাগের অবসরপ্রাপ্ত বিচারপতি আবদুল মতিন। অনুষ্ঠানে অন্যদের মধ্যে আরও বক্তব্য রাখেন আলোচিত মাসদার হোসেন মামলার বাদী ও সাবেক জেলা জজ মাসদার হোসেন, সুপ্রিম কোর্টের জ্যেষ্ঠ আইনজীবী ব্যারিস্টার এহসান এ সিদ্দিক, হাসান তারিক চৌধুরী, ব্যারিস্টার ওমর ফারুক প্রমুখ।
বিচারপতি আবদুল মতিন বলেন, বিদ্যমান সংবিধানে যে পরিমাণ কাটাছেঁড়া করা হয়েছে তাতে একে সংস্কার করতেই হবে। যদি গণ অভ্যুত্থানকে বৈধ মনে করা না হয়, তবে অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে যেসব সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা হয়েছিল তার অধিকাংশই বৈধতা হারায় এবং বর্তমান সরকারও বৈধতা হারাবে। তিনি বলেন, অধ্যাদেশগুলো রহিতকরণের মাধ্যমে বর্তমান সরকার অক্ষরে অক্ষরে জুলাই সনদকে পরিত্যাগ করল। এটা তাদের আত্মঘাতী কাজ। অমীমাংশিত বিষয় সমঝোতার মাধ্যমে বাস্তবায়নের সুপারিশ করেন তিনি।
মাসদার হোসেন বলেন, উচ্চ আদালতে বিচারক নিয়োগ অধ্যাদেশ ও সুপ্রিম কোর্ট সচিবালয় অধ্যাদেশ বাতিলের ফল ভালো হবে না। ক্ষমতা আছে কলমের খোঁচায় এতগুলো জিনিস মসনদে বসে বাতিল করে দিচ্ছেন। এই মুহূর্তে হ্যাঁ-না ভোট করুন, জরিপ করুন, ৯৯ ভাগ লোক আপনাদের কাজের বিরুদ্ধে মতামত দেবে। যেগুলো হচ্ছে বিচার বিভাগকে পদদলিত করা। বিচার বিভাগ সংস্কার কমিশনের এই সদস্য বলেন, গুটি কয়েক মানুষের চিন্তাচেতনায় এসব কাজ করছেন, এগুলোর ফল ভালো হবে না। এই দিন দিন না, আরও দিন আছে। আপনারা পথ হারিয়ে ফেললে জনগণ আপনাদের সঠিক পথে নিয়ে আসবে।
সুপ্রিম কোর্টেও জ্যেষ্ঠ আইনজীবী ব্যারিস্টার এহসান এ সিদ্দিক বলেন, এ অধ্যাদেশ রহিতকরণের মাধ্যমে দেশ কঠিন পরিণতির দিকে এগিয়ে যাচ্ছে। পরবর্তী ২০ বছর পরও যদি আওয়ামী লীগ ফিরে আসে, তখন তারা এ নিয়ে প্রশ্ন তুলবে।
বর্তমান সরকার ক্ষমতার অপব্যবহার করছে, যা ভয়ের কারণ। জানি পৃথক সচিবালয় এবং স্বাধীন বিচার বিভাগ পাব না। তার পরও আমি আশাবাদী হতে চাই। সুপ্রিম কোর্টেও জ্যেষ্ঠ আইনজীবী হাসান তারিক চৌধুরী বলেন, অতীতের সরকারগুলোর মতো বর্তমান সরকারও চায় ক্রীতদাস বিচারক। লুটপাটের অর্থনীতি বজায় রাখতে তারা স্বাধীন বিচার বিভাগ ও দুদক চায় না। তারা চায়, মন্ত্রী ও আমলাদের হাতে থাকুক নিম্নআদালতের বিচারকদের প্রমোশন-বদলিসহ সব নিয়ন্ত্রণ। অথচ এ দানবদের বিরুদ্ধেই অভ্যুত্থান হয়েছিল।
সুপ্রিম কোর্টেও জ্যেষ্ঠ আইনজীবী ব্যারিস্টার ওমর ফারুক বলেন, জুলাইয়ের শহীদ এবং আহতদের রক্ত এখনো দগদগে। এর মধ্যেই কী করে জুলাইয়ের ভুক্তভোগীরা ভুলে গেলেন তাদের পরিণতির কথা। কিছুদিন আগেও যে ব্যক্তি এ অধ্যাদেশের পক্ষে বলেছেন, আজ মন্ত্রী হয়ে তিনি ভোল পাল্টেছেন।
সভাপতির বক্তব্যে মুহাম্মদ শফিকুর রহমান বলেন, অধ্যাদেশ রহিতকরণের ফলে গণতন্ত্রের বিকাশ এবং গণতন্ত্র চর্চায় অন্তরায় তৈরির সম্ভাবনা রয়েছে। এর ফলে সরকার কর্তৃত্ববাদী ও ফ্যাসিবাদী হয়ে ওঠার সম্ভাবনা প্রবল। ভিন্নমত দমনে আদালতকে ব্যবহারের সুয়োগ সৃষ্টি হবে। দাগি অপরাধীরা সরকারি দলের ছত্রছায়ায় থেকে বিচারের হাত থেকে বাঁচার চেষ্টা করবে। প্রশাসনিক ও রাজনৈতিক বিষয় আদালতে নিয়ে আদালতকে ব্যবহারের চেষ্টাও বৃদ্ধি পাবে। বিচার বিভাগের স্বাধীনতার নিশ্চিতে বাধা হবে এ রহিতকরণ।