পয়লা বৈশাখ ঘিরে ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তাদের (এসএমই) বড় একটি অংশ তাদের বিনিয়োগ নিয়ে উদ্বিগ্ন হয়ে পড়েছেন। সন্ধ্যায় দোকান বন্ধের সরকারের সিদ্ধান্তে উৎসবমুখর এ সময়ে বিক্রি কমে যাওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে, যা অনেকের জন্য আর্থিক ঝুঁকিতে রূপ নিচ্ছে।
বাংলা নববর্ষ পয়লা বৈশাখ দেশের সবচেয়ে বড় ও সর্বজনীন উৎসবগুলোর একটি। এ সময়টিতে খুচরা বাজারে ব্যাপক ভোক্তা ব্যয় হয়, যা এসএমই খাতের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বছরের একটি বড় অংশের আয় অনেক উদ্যোক্তা এ কয়েক দিনের বিক্রির ওপর নির্ভর করে থাকেন।
বর্তমানে সকাল ১০টা থেকে সন্ধ্যা ৭টা পর্যন্ত দোকান খোলা রাখার নিয়ম কার্যকর থাকলেও, ফ্যাশন উদ্যোক্তা ও শিল্প খাতের নেতারা সময় পরিবর্তনের অনুরোধ করেছেন। তাদের মতে, দুপুর ১টা থেকে রাত ১০টা পর্যন্ত দোকান খোলা রাখলে তা ক্রেতাদের বাস্তব আচরণের সঙ্গে বেশি সামঞ্জস্যপূর্ণ হবে এবং বিক্রি বাড়াতে সহায়ক হবে।
অ্যাপেক্স ফুটওয়্যারের ব্যবস্থাপনা পরিচালক সৈয়দ নাসিম মঞ্জুর বলেন, অধিকাংশ এসএমই উৎসবভিত্তিক অর্থনীতির ওপর নির্ভরশীল। তারা সাধারণত তিন থেকে চার মাস আগে বিনিয়োগ করে এবং এ সময়েই তাদের মূল বিক্রি হয়, যা প্রায় ১২ কোটি টাকা পর্যন্ত পৌঁছাতে পারে। তিনি বলেন, কম সময় দোকান খোলা থাকায় ছোট উদ্যোক্তারা সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন।
রাজধানীর গুলশানের পিংক সিটির জায়া গোল্ড অ্যান্ড ডায়মন্ডের মালিক উত্তম বণিক বলেন, সোনার দামের ওঠানামার কারণে এমনিতেই ক্রেতা কম। তার পর আবার সন্ধ্যায় দোকান বন্ধ করায় বিক্রি কমে যাচ্ছে, যা আমাকে উদ্বিগ্ন করে তুলেছে। হঠাৎ করে সময়সূচি পরিবর্তন হওয়ায় মৌসুমি উদ্যোক্তারা চরম ধাক্কা খেয়েছেন। ফ্যাশন ব্র্যান্ডের উদ্যোক্তারা বলেন, ঈদের সঙ্গে মাঝারি ব্যবধান থাকায় এ বছর বৈশাখের বিক্রি আরও ভালো হওয়ার সম্ভাবনা ছিল। কিন্তু বর্তমান পরিস্থিতিতে ব্যবসায়ীরা ক্ষতির মুখে পড়ছেন।
এসএমই ফাউন্ডেশনের ব্যবস্থাপনা পরিচালক আনোয়ার হোসেন চৌধুরী বলেন, জ্বালানি নিরাপত্তা পরিস্থিতি বিবেচনায় এ সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। তবে ক্ষতিগ্রস্ত উদ্যোক্তাদের সহায়তায় আজ থেকে ১৮ এপ্রিল পর্যন্ত কম ভাড়ায় স্টল দিয়ে একটি এসএমই মেলার আয়োজন করা হচ্ছে। ব্যবসায়ীরা জানান, বাংলাদেশে ক্রেতাদের কেনাকাটার অভ্যাস মূলত সন্ধ্যাকেন্দ্রিক, বিশেষ করে অফিস শেষে। ফলে এ সময়টিতে দোকান বন্ধ থাকলে বিক্রি কমে যাওয়াই স্বাভাবিক। ঢাকা চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির (ডিসিসিআই) সাবেক সভাপতি রিজওয়ান রাহমান বলেন, উৎসবনির্ভর বিনিয়োগকারীরাই সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হবেন। তবে সম্পদের সীমাবদ্ধতার কারণে সব খাতকেই কিছুটা সমঝোতা করতে হতে পারে। বর্তমান বৈশ্বিক প্রেক্ষাপটে জ্বালানি সংকটের কারণে সরকার দেশব্যাপী দোকান ও শপিং মল সন্ধ্যা ৭টার মধ্যে বন্ধ করার নির্দেশ দিয়েছে। তবে শিল্প খাতের তথ্য অনুযায়ী, খুচরা খাতে ৮৪ লাখ থেকে ১ কোটি ২০ লাখ মানুষ কর্মরত এবং এটি দেশের জিডিপির প্রায় ১৪-১৫ শতাংশ অবদান রাখে।
ব্যবসায়ীদের মতে, সন্ধ্যার বাণিজ্য সীমিত হলে ভ্যাট আদায়ও ১৫-২০ শতাংশ পর্যন্ত কমে যেতে পারে। অন্যদিকে, তথ্য অনুযায়ী বাণিজ্যিক খাত জাতীয় বিদ্যুৎ ব্যবহারের মাত্র ৮-১০ শতাংশের জন্য দায়ী, যার মধ্যে খুচরা খাতের অংশ মাত্র ২-৩ শতাংশ। ফলে বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, সব খাতে একযোগে বিধিনিষেধ আরোপের পরিবর্তে লক্ষ্যভিত্তিক ও দক্ষ ব্যবস্থাপনা আরও কার্যকর হতে পারে।
পয়লা বৈশাখ শুধু একটি উৎসব নয়, এটি একটি মৌসুমি অর্থনীতি, যেখানে লাখো মানুষের জীবিকা জড়িয়ে আছে। তাই নীতিনির্ধারণে জ্বালানি সাশ্রয় এবং ব্যবসায়িক বাস্তবতার মধ্যে একটি ভারসাম্য তৈরি করা এখন সময়ের দাবি। উৎসবের আনন্দ যাতে ক্ষতির কারণ না হয়, সেদিকে নজর দেওয়াই হবে টেকসই অর্থনৈতিক ব্যবস্থাপনার মূল চাবিকাঠি।