Image description
জ্বালানি সংকট

মধ্যপ্রাচ্যের চলমান সংঘাতের জেরে দেশের পরিবহন ব্যবস্থার ওপর সরাসরি নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে। জ্বালানি তেলের সংকটের ফলে বাস, ট্রাক থেকে শুরু করে সব যানবাহনেই ভোগান্তি বেড়েছে। দেশের পাইকারি বাজারগুলোতে গুরুত্বপূর্ণ খাদ্যদ্রব্য আর কাঁচামাল আনা-নেয়া করে দূরপাল্লার ট্রাকগুলো। জ্বালানি সংকটের ফলে এসব ট্রাকের ট্রিপের সংখ্যা কমে গেছে। তেল সংকটের অজুহাতে বেড়েছে ট্রাকের ভাড়াও। ট্রাক ও কাভার্ডভ্যানের ভাড়া অনেক বেড়ে গেছে। অন্যদিকে ট্রাকভাড়ার সঙ্গে সমন্বয় করে বেড়েছে নিত্যপণ্যের দামও। শনিবার সরজমিন রাজধানীর যাত্রাবাড়ি কাঁচাবাজার, কাওরান বাজার কাঁচাবাজার আড়ত ও তেজগাঁও ট্রাকস্ট্যান্ডে ঘুরে সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে কথা বলে এসব তথ্য জানা গেছে।

সমপ্রতি সরকারের অর্থ ও পরিকল্পনামন্ত্রী আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী বলেছেন, বৈশ্বিক জ্বালানি সংকট ‘মড়ার উপর খাঁড়ার ঘা’র মতো পরিস্থিতি তৈরি করেছে। শুধু জ্বালানি নয়, এর প্রভাব পড়ছে সব ধরনের পণ্য, খাদ্যদ্রব্য ও পুরো সরবরাহ ব্যবস্থার ওপর। ফলে আগামীদিনে নিত্যপণ্যের দাম বাড়বে, এ ব্যাপারে কোনো সন্দেহ নেই। তখন মন্ত্রী বলেন, বাংলাদেশ এখনো দাম নিয়ন্ত্রণে রাখার আপ্রাণ চেষ্টা করছে। তবে জনগণের ওপর হঠাৎ করে অতিরিক্ত চাপ সৃষ্টি না করার চেষ্টা থাকলেও, দীর্ঘ সময় এই চাপ সরকারের পক্ষে বহন করা সম্ভব নয়। সরকারের আশঙ্কার প্রমাণ মিলেছে বাজারে। চলমান অস্থিরতায় বেড়েছে বেশির ভাগ নিত্যপণ্যের দাম।

আড়তদার ও ব্যবসায়ীরা বলছেন, জ্বালানি সংকটের কারণে এখন তারা চাহিদামাফিক ট্রাক পাচ্ছেন না। অর্থাৎ, চাইলেই এখন সময়মতো ট্রাক পাচ্ছেন না, এমনকি ট্রাকগুলো নির্দিষ্ট সময়ে গন্তব্যে যাওয়া কিংবা আসতে পারছে না। ফলে পণ্য আনা-নেয়ায় বেশ ভোগান্তি পোহাতে হচ্ছে ব্যবসায়ী ও আড়তদারদের। দেশের নানা প্রান্ত থেকে রাজধানীতে খাদ্যপণ্য আসে। পাইকারি বিক্রেতারাই সেসব পণ্য নিয়ে আসেন। পরে খুচরা ব্যবসায়ী কিংবা ক্রেতাদের কাছে সেসব বিক্রি করেন। বাজারে পর্যাপ্ত পণ্য না আসায় কৃত্রিমভাবেই বেড়ে যাচ্ছে খাদ্যপণ্য ও কাঁচামালের দাম।

 

যাত্রাবাড়ি আড়তের ব্যবসায়ী আবু তাহের বলেন, তেলের সংকটের কারণে ট্রাক ঠিকমতো পাওয়া যায় না। ঢাকায় পাম্প অনেকগুলো থাকায় এখানে তেল পাওয়া গেলেও ঢাকার বাইরে তেলের অনেক সংকট। ট্রাকগুলো পাম্পে অপেক্ষা করার কারণে ট্রাক পাওয়া যাচ্ছে না। এখন বাড়তি ভাড়া দিয়ে ট্রাক ভাড়া করতে হয়। যেই ট্রাক কিছুদিন আগে পটুয়াখালী থেকে ট্রিপ দিয়েছে ২৮ হাজার টাকা সেই ট্রাক এখন নিচ্ছে ৩৫-৪২ হাজার করে। তাই এই বাড়তি টাকা তো পণ্যের থেকে তুলতে হবে। সবকিছু হিসেব করেই তো পণ্য বিক্রি করি।

একই বাজারের আরেক ব্যবসায়ী আমান উল্লাহ বলেন, তেল সংকটের পর থেকে ট্রাক ঠিকমতো পাওয়া যাচ্ছে না। আগে বড় ট্রাকে বরিশালের ভাড়া ছিল ৪০ হাজার কিন্তু এখন চাইছে ৬০ হাজার করে। আর মাঝারি ট্রাক ৪০ হাজার করে নিচ্ছে। ফলে সবজির দাম আগের থেকে বেশি হচ্ছে। তিনি বলেন, পাম্পগুলোতে তেলের জন্য ট্রাক ঘণ্টার পর ঘণ্টা অপেক্ষা করতে হয়, ফলে সবসময় রাস্তায় খালি ট্রাক পাওয়া যায় না। তাদেরকে জিজ্ঞেস করলে বলছে তেলের জন্য অনেকক্ষণ ধরে অপেক্ষা করতে হয়, তারা আগের মতো ট্রিপ দিতে পারে না, যেই জায়গায় ৪ ট্রিপ দিতো সেখানে অর্ধেক ট্রিপ মারতে পারছে।

কাওরান বাজারের ব্যবসায়ী শামীম হোসেন বলেন, পঞ্চগড়ের ভাড়া আগে ছিল ১৫ থেকে ১৬ হাজার টাকা কিন্তু এখন ২০ হাজারের নিচে ট্রাক ভাড়া করা যাচ্ছে না। তেল সংকটের কারণে এই অবস্থার সৃষ্টি হয়েছে, তেল নিতেই চালকদের অর্ধেক দিন পার হয়ে যায়। ট্রাক চালকরা যেখানে ৪টা ট্রিপ দিতে পারতো সেখানে ২টা দিতে পারছে, তাদের ইনকাম বন্ধ হয়ে যাওয়ায় কিছুটা ভাড়া বেশি নিচ্ছে। আবার পাম্পে বাড়তি টাকা দিয়ে তেল নিতে হয় তাদের।

কাওরান বাজারের পিয়াজ ব্যবসায়ী রুবেল হোসেন বলেন, ফরিদপুর থেকে চাঁদপুরে পণ্য নেয়ার জন্য ট্রাক খুঁজে পাচ্ছেন না। আগে যেখানে ভাড়া ছিল ১৫ থেকে ২০ হাজার টাকা এখন সেখানে ৩০ হাজার টাকা চাচ্ছে। এ ছাড়া চাঁদপুর থেকে ঢাকায় ভাড়া ছিল ২০ থেকে ২৪ হাজার টাকা- এখন ৩০ হাজারের নিচে পাওয়া যাচ্ছে না। রমজান থেকেই এই পরিস্থিতি, ট্রাকের ভাড়া বেড়েই চলেছে।

গত এক মাসের ব্যবধানে সোনালি জাতের মুরগির দাম কেজিতে বেড়েছে সর্বোচ্চ ১৪০ টাকা। পাইকারি বাজারে মুরগির সরবরাহ কমে গেছে। এ ছাড়া পরিবহন ভাড়াও বেড়েছে। খুচরা ব্যবসায়ীদের বেশি দামে কিনে এনে বেশি দামেই বিক্রি করতে হচ্ছে। ব্যবসায়ীরা জানান, আগে ময়মনসিংহ থেকে মুরগি পরিবহনের জন্য খরচ হতো ৮ থেকে ১০ হাজার টাকা। কিন্তু এখন ব্যবসায়ীদের ১৮ থেকে ২০ হাজার টাকা গুনতে হচ্ছে। কয়েক সপ্তাহে বাংলাদেশের প্রধান পাইকারি বাজারগুলোতে ভোজ্য তেল, চিনি ও মসলার দামও বেড়েছে।

অন্যদিকে তেজগাঁও ট্রাকস্ট্যান্ডের চালকদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, তাদের অনেকেই তেলের অভাবে ভাড়া থাকলেও যেতে পারছেন না। কারও কারও ট্রাক তেলশূন্য পড়ে আছে। কেউ সামান্য পরিমাণের তেল ট্রাকে রেখেছেন। ট্রাকচালকরা বলছেন, তারা ১৫ থেকে ২০ লিটার তেল পান সর্বোচ্চ। সেটিও ৪ থেকে ৫ ঘণ্টা অপেক্ষা করে। অথচ, দূরে ট্রিপে শতাধিক লিটার তেল লাগে।

যাত্রাবাড়ী এলাকার ট্রাকচালক বিপ্লব হোসেন বলেন, আগে প্রতিদিন ঢাকার মধ্যে ৫টা ট্রিপ দিতে পারতাম এখন তেলের সংকটের কারণে ২টা ট্রিপ দিতে পারি। পাম্পে অনেক্ষণ ধরে অপেক্ষা করে তেল নিতে হয় তারপরে আবার চাহিদামতো তেল পাওয়া যায় না। বাড়তি টাকা দিয়ে ট্যাংকি ফুল করতে হয়। এখন এই সংকটের কারণে কিছুটা ভাড়া বেশি নিচ্ছি আবার খুব বেশি ভাড়া নেয়া যায় না, কারণ এমনিতেই গাড়ি খালি পড়ে থাকে বেশি টাকা নিলে ট্রিপ পাওয়া যাবে না।

তেজগাঁও ট্রাকস্ট্যান্ডের পিকআপ চালক লিটন বলেন, তেলের সংকটে এখন ট্রিপ অর্ধেকের বেশি কমে গেছে। আগে দিনে ২টা ট্রিপও হয়েছে। এখন সপ্তাহে ৩ থেকে ৪টার বেশি ট্রিপ দেয়া যাচ্ছে না। কয়দিন আগে ঢাকার মধ্যেই একটি পাম্পে আমি তিনদিন লাইন ধরেছিলাম তেলের জন্য।

একেকদিন ৫ থেকে ৬ ঘণ্টা করে লাইনে দাঁড়িয়েও তেল নিতে পারিনি। কাভার্ডভ্যান চালক মোহাম্মদ সাদ্দাম বলেন, বিশেষ করে যে সমস্ত গাড়ি ব্যবসায়ীরা রিজার্ভ করে রাখেন পণ্য আনা-নেয়ার জন্য, তার ভাড়া বাড়াতে পারেন না। কিন্তু অনিয়মিতভাবে যারা পণ্য আনা-নেয়া করেন, তারা কিছুটা বাড়িয়ে নিতে পারছে। বাংলাদেশ ট্রাক-কাভার্ডভ্যান ড্রাইভার্স ইউনিয়নের সভাপতি তালুকদার মোহাম্মদ মনির বলেন, একটি গাড়ির তেল নিতে আট থেকে ১০ ঘণ্টা, কোনো কোনো দিন আরও বেশি সময় লাগছে। আগে ঢাকা থেকে চট্টগ্রাম যেখানে ছয়-সাত ঘণ্টা সময় লাগতো, এখন ১৫ থেকে ২০ ঘণ্টা লাগছে। কখনো কখনো তা দুই থেকে তিনদিনে গড়াচ্ছে। কারণ পাম্পে সিরিয়াল পেতে সময় গচ্চা যাচ্ছে। এতে চালক-শ্রমিকদের দৈনন্দিন খরচ বেড়ে গেছে, যা পণ্য পরিবহন ভাড়ায় যুক্ত হচ্ছে।