Image description

দৈর্ঘ্যে ৬ ইঞ্চি। উপরে পুশ-বাটন। সামনে সূচালো নিব। মাথার অংশ পিতলের তৈরি গোলাকার। দেখতে কলমসদৃশ। কিন্তু এটি একটি ভয়ঙ্কর মারণঘাতী অস্ত্র। নাম পেনগান বা কলম পিস্তল। কলমের ক্লিপ আকৃতির অংশ ট্রিগার হিসাবে

ব্যবহৃত হয়। নিচের অর্থাৎ নিবের অংশ খোলা যায়। যার মধ্যে .২২ গুলি ব্যবহার করা যায়। একটি হত্যাচেষ্টা মামলার তদন্তে নেমে মঙ্গলবার ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশ প্রথমবার একটি পেনগান উদ্ধার করে। তারপর থেকে এটি নিয়ে দেশ জুড়ে নানা আলোচনা। গোয়েন্দা বলছেন, নতুন এই অস্ত্র নিয়ে ইতিমধ্যে তারা তদন্ত শুরু করেছেন। ক্ষুদ্রাকৃতির এই প্রাণঘাতী অস্ত্র কোন দেশ থেকে কোন রুটে দেশে এসেছে, সেই রুট ও উৎসের সন্ধান চলছে। দেশে কোনো কোনো অবৈধ অস্ত্র ব্যবসায়ী এই অস্ত্র কেনাবেচা করছেন, এই অস্ত্র কারা কিনছেন, কার কার হাতে এই অস্ত্র মজুত আছে সেসব বিষয় নিয়ে তৎপরতা শুরু করেছেন গোয়েন্দা কর্মকর্তা।

তদন্ত সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন, গত ৩রা এপ্রিল যুবদল নেতা রাসেলকে নয়াবাজারের একটি বাসায় ডেকে নিয়ে গুলি করা হয়। এতে গুরুতর আহত হন রাসেল। এ ঘটনার পর ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশ যাত্রাবাড়ি ও কেরানীগঞ্জ থেকে সন্দেহভাজন সোহেল ওরফে কাল্লু এবং সাইমনকে গ্রেপ্তার করে। পরে কাল্লুর তথ্যানুযায়ী কেরানীগঞ্জের একটি বাসার টেবিলের ড্রয়ার থেকে বের করা হয় একটি সিগারেটের প্যাকেট। পাওয়া যায় পলিথিনে মোড়ানো ৫টি টুকরো। সেগুলো জোড়া লাগিয়েই তৈরি হয় পেনগান। ডিবি’র জিজ্ঞাসাবাদে গ্রেপ্তার কাল্লু জানিয়েছে, কাল্লু ৮০ হাজার টাকা দিয়ে আরেক সন্ত্রাসীর কাছ থেকে অস্ত্রটি কিনেছে। এরপরই বিক্রেতাকে ধরতে অভিযান চালিয়ে যাচ্ছে গোয়েন্দা পুলিশ। ইতিমধ্যে রাজধানীর বেশ কয়েকটি এলাকায় অভিযান চালানো হয়েছে। পাশাপাশি গোয়েন্দা তথ্যের ভিত্তিতে গুপ্ত এই অস্ত্রটির চোরাচালান রুট অনুসন্ধান চলছে। কাল্লু আরও জানায়, ৮০ হাজার টাকায় বিক্রি করলে সে ১০ হাজার টাকা কমিশন পেতো। ওই অস্ত্র দিয়েই ব্যবসায়ী রাসেলকে গুলি করে সাইমন হোসেন। রাসেলকে গুলি করার আগে কাল্লু, সাইমন ও রিপন দাশ (পলাতক) ইয়াবা সেবন করে। তারা কৌশলে সাইমনের বাসায় ডেকে নেয় রাসেলকে। চেয়ারে বসা অবস্থায় রাসেল কিছু বুঝে ওঠার আগেই বুকের দিকে পেনগান তাক করে গুলি ছোড়ে সাইমন।

পেনগান নিয়ে কাজ করছেন এমন গোয়েন্দারা বলছেন, ইউনিক এই অস্ত্র এখন দেশে নিরাপত্তা ঝুঁকি তৈরি করেছে। কারণ কলমসদৃশ এই অস্ত্র যে কারও চোখ ফাঁকি দিয়ে ব্যবহার করা যায়। সহজে লুকিয়ে রাখা যায়। সাধারণ বস্তু মনে হওয়ায় নজরদারির বাইরে রাখা যায়। খুব কাছে থেকে টার্গেট কিলিং বা পরিকল্পিত হামলায় এই অস্ত্র ব্যবহার করা যায়। ফলে জনসমাগম, রাজনৈতিক সমাবেশ বা ব্যক্তিকে লক্ষ্য করে হামলায় এটি ব্যবহার করা যায়। আর এতেই আতঙ্ক বেড়েছে। সীমান্তবর্তী একটি দেশ হয়ে বাংলাদেশে এই অস্ত্র ঢুকেছে। যা হাত-বদল হয়ে আন্ডারওয়ার্ল্ডের অপরাধীদের পাশাপাশি দেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের চরমপন্থি গ্রুপগুলোর সদস্যদের হাতে চলে গেছে। তাই পেনগান এখন মাথাব্যথার বড় কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর।

অপরাধ জগতের সূত্রগুলো বলছে, আন্ডারওয়ার্ল্ডের সন্ত্রাসীদের কাছে অনেক পেনগান মজুত রয়েছে। আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে বেশ কয়েকজন রাজনৈতিক ক্যাডারের কাছে এই অস্ত্র ছিল। কিন্তু সরকার পতনের পর অস্ত্রগুলো কোথায় আছে সেটি কারও জানা নাই।

অস্ত্র নিয়ে কাজ করেন পুলিশের এমন কর্মকর্তারা বলছেন, পেনগান দেখতে অত্যন্ত ছোট ও গোপনে বহনযোগ্য আগ্নেয়াস্ত্র। পেনগান দিয়ে একবারে সাধারণত সিঙ্গল-শট বা একটিমাত্র গুলি করা যায়। এতে .২২ এলআর .২৫ এসিপির মতো ক্ষুদ্র ক্যালিবারের কার্তুজ ব্যবহার করা হয়। খুব কাছ থেকে হামলার জন্য ব্যবহৃত এই অস্ত্র অত্যন্ত বিপজ্জনক। পেনগানে সাধারণত একটি ছোট ব্যারেল, ফায়ারিং পিন এবং একটি ট্রিগার মেকানিজম থাকে। খুব স্বল্প দূরত্বে শত্রুকে ঘায়েল করতে এটি ব্যবহৃত হয়। এটি মূলত পিনফায়ার, রিমফায়ার বা সেন্টারফায়ার পদ্ধতির হতে পারে। এফবিআইর মতো সংস্থা একে অন্যান্য হ্যান্ডগানের মতোই ভয়ঙ্কর হিসাবে সংজ্ঞায়িত করেছে। ডিবি বলছে, ফরেনসিক করে পেনগানের কার্যকারিতা কতোটুকু, এটা দিয়ে কতোটুকু দূরত্ব থেকে গুলি করলে কী হয়, এটির বোর, ব্যারেল, বিভিন্ন যে এক্সপ্লেনেশন আছে-প্রতিটি জিনিস সম্পর্কে জানতে ফরেনসিক বিশেষজ্ঞের মতামতের জন্য পাঠানো হবে। এ ছাড়া এই অস্ত্রের বিষয়ে সংশ্লিষ্টদের সতর্ক করতে একটি গোপন প্রতিবেদন দাখিল করবেন গোয়েন্দারা। যাতে ভিআইপি ও ভিভিআইপিদের নিরাপত্তা আরও জোরদার করা যায়।

পেনগান কোথায় তৈরি হয়, এর আগে কোথায় এর অস্তিত্ব পাওয়া গেছে সে নিয়েও চলছে ব্যাপক আলোচনা। তথ্যমতে, সাম্প্রতিক বছরগুলোতে পেনগান উদ্ধারের তেমন কোনো তথ্য নাই। পেনগান প্রথম গোয়েন্দাদের নজরে আসে ২০২৪ সালে। ওই বছরের ১৬ই মে গোয়েন্দা পুলিশ সাভার থেকে গ্রেপ্তার করে খুলনা অঞ্চলের একসময়ের দুর্ধর্ষ চরমপন্থি সন্ত্রাসী শিমুল ভূঁইয়াকে। তার বিষয়ে তদন্তে নেমে গোয়েন্দারা জানতে পারেন, দীর্ঘদিন ধরেই অবৈধ অস্ত্র কারবারে জড়িত শিমুল ভূঁইয়া। তার মোবাইল ফোন থেকে পেনগানের ভিডিও উদ্ধার করা হয়। সে সময় শিমুল ভূঁইয়া গোয়েন্দাদের জানান, বাংলাদেশে পেনগানের চাহিদা দিন দিন বাড়ছে।

সন্ত্রাসীদের পাশাপাশি অনেক রাজনৈতিক নেতাও পেনগান কিনতে চান। কিন্তু তখন কোনো অস্ত্র উদ্ধার হয়নি। এ নিয়ে তেমন কোনো তদন্তও হয়নি। তবে ভারতের কিছু অঞ্চলে পেনগানের অস্তিত্ব মিলেছে। ভারতের উত্তরপ্রদেশ ও বিহারের কিছু অবৈধ অস্ত্র কারখানায় ছোট আকারের এমন অস্ত্র তৈরি হওয়ার অভিযোগ রয়েছে। ভারতের বিভিন্ন রাজ্যে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর অভিযানে কয়েকবার পেনগান উদ্ধার হয়েছে।

২০২২ সালে উত্তরপ্রদেশে সন্ত্রাসবিরোধী ইউনিটের অভিযানে একটি অস্ত্র চোরাচালান চক্রের কাছ থেকে পেনগান উদ্ধার করা হয়। তদন্তে জানা যায়, অপরাধীরা এটি গোপনে বহন করে টার্গেট হামলায় ব্যবহার করার পরিকল্পনা করেছিল। এ ছাড়া ছত্তিশগড় রাজ্যে মাওবাদীদের অস্ত্রভাণ্ডার থেকেও পেনগান উদ্ধার হওয়ার ঘটনা রয়েছে। তদন্ত সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো বলছে, ভারত থেকে যশোর, ঝিনাইদহ ও চুয়াডাঙ্গা জেলার সীমান্তবর্তী এলাকা দিয়ে দেশে ঢুকছে পেনগান। ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের যুগ্ম কমিশনার মো. নাসিরুল ইসলাম বলেন, পেনগান নিয়ে ডিবি কাজ করছে। তদন্তে অনেক কিছু পাওয়া যাচ্ছে। আমাদের অভিযান চলছে।