রূপগঞ্জের পূর্বাচল নতুন শহরের ৩ নম্বর সেক্টর লাগোয়া গড়ে ওঠা ‘আনন্দ হাউজিং সোসাইটি’ এখন স্থানীয় বাসিন্দাদের কাছে এক আতঙ্কের নাম। অভিযোগ উঠেছে, পুলিশের নাম ভাঙিয়ে এবং প্রভাব খাটিয়ে শত শত পরিবারকে ভিটেমাটি থেকে উচ্ছেদ করে গড়ে তোলা হয়েছে এ আবাসন প্রকল্প। প্রতিবাদ করতে গেলে প্রকল্পের বালুর নিচে চাপা দেওয়ার হুমকি দেওয়া হয়েছে। হামলা-মামলার শিকার হতে হয়েছে অনেককে। রিমান্ডে নিয়ে চালানো হয়েছে ব্যাপক নির্যাতন। জেলও খাটতে হয়েছে অনেককে। এভাবেই হাজারো মানুষের চোখের পানি ও অসহায়ত্বের ওপর দাঁড়িয়ে কয়েক হাজার কোটি টাকার সম্পদের পাহাড় গড়েন পুলিশের সাবেক অতিরিক্ত ডিআইজি গাজী মোজাম্মেল হক।
গতকাল নিজেদের জমি ফেরতের দাবিতে আনন্দ হাউজিংয়ের ভিতরে মানববন্ধন ও বিক্ষোভ করেন শত শত ভোক্তভোগী। এতে অংশ নেন আগারপাড়া, মধ্যপাড়া, নামাপাড়া, মধুখালী, গুতিয়াবো ও পিতলগঞ্জসহ আশপাশের এলাকার বাসিন্দারা। এক পর্যায়ে পুলিশ এসে কর্মসূচি ছত্রভঙ্গ করে দেয়।
জানা গেছে, গত বছর অবসরে যাওয়া অতিরিক্ত ডিআইজি গাজী মো. মোজাম্মেল হক ২০০৬-০৭ সালের দিকে এ প্রকল্পের কাজ শুরু করেন। শুরুতে ‘আনন্দ পুলিশ হাউজিং’ নাম ব্যবহার করে সাধারণ মানুষকে বিভ্রান্ত করা হয়। একই সঙ্গে পুলিশ সদস্যদের প্লট দেওয়া হবে বলে ঘোষণা দেওয়া হয়। তবে অনেক পুলিশ সদস্য টাকা পরিশোধ করেও প্লট বুঝে পাননি। যদিও পুলিশ সদর দপ্তর নিশ্চিত করেছে, এ নামে পুলিশের কোনো অনুমোদিত প্রকল্প নেই।
অভিযোগ রয়েছে, গত প্রায় দুই দশকে প্রকল্পের নামে অন্তত সাড়ে ৩ হাজার বিঘা জমি জবরদখল করা হয়েছে। অথচ প্রতিষ্ঠানটির নিজস্ব দাবি, প্রকল্পের আয়তন ১ হাজার ২০০ বিঘা। স্থানীয়রা বলছেন, প্রকল্পের বড় অংশই জোরপূর্বক দখল, জাল দলিল কিংবা ভয়ভীতি দেখিয়ে নামমাত্র মূল্যে নেওয়া হয়েছে। জমি ছাড়তে অস্বীকৃতি জানালে তাদের বিরুদ্ধে মিথ্যা মামলা দিয়ে রিমান্ডে নিয়ে নির্যাতন করা হয়েছে। এমনকি প্রাণনাশের হুমকিও দেওয়া হয়েছে। জেলও খাটতে হয়েছে অনেককে। আর জমির দখল ও প্রকল্পের সুবিধা নিশ্চিত করতে সাবেক আইজিপি বেনজীর আহমেদকে জমিসহ ডুপ্লেক্স বাড়ি উপহার দেন মোজাম্মেল। সেখানেই হতো সব পরিকল্পনা। বেনজীরের বিরুদ্ধে দুর্নীতির অভিযোগ ওঠার পর হাউজিং কোম্পানির নাম থেকে পুলিশ শব্দটি ছেঁটে ফেলা হয়।
গতকাল মানববন্ধনে কথা বলতে গিয়ে হাউমাউ করে কেঁদে ফেলেন স্থানীয় বাসিন্দা হাজী সোলাইমান। তিনি বলেন, ‘আগে আমার অনেক জমি ছিল, সব দখল করে নিয়েছে। নিজের জমিতে তিনটা মাছের ঘের করেছিলাম। মাছসহ সব ঘেরে বালু ফেলে ভরাট করে দিয়েছে। আজ আমি পথের ভিখারি। এখন মানুষের জমিতে কাজ করে খাই। আমার ছেলে রাজমিস্ত্রির কাজ করে জীবিকা নির্বাহ করছে। আমি এর বিচার চাই।’
আগারপাড়ার বাসিন্দা মানিক মিয়া বলেন, ‘জোরপূর্বক জমি দখল করে আমাদের সব দিকে যাওয়া-আসার পথ বন্ধ করে দিয়েছে। সরকারি একটা রাস্তা ছিল, ব্রিজ ভেঙে সেটাও বন্ধ করে দিয়েছে। পানি নিষ্কাশনের একমাত্র খালটি ভরাট করে ফেলেছে। এজন্য প্রতি বছর বর্ষাকালে পানিবন্দি হয়ে পড়ে হাজারো পরিবার। থানা, হাসপাতাল, উপজেলা পরিষদে ছয়-সাত কিলোমিটার ঘুরে যেতে হয়।’ একই অভিযোগ করেন নামাপাড়ার মহসিন মোল্লা।
স্থানীয় আরেক বাসিন্দা মিঠু সরকার জানান, তার বাবার আড়াই বিঘা জমি জোরপূর্বক দখল করে নিয়েছেন মোজাম্মেল হক। একসময় ওই জমিতে তারা চাষাবাদ করতেন।
নামাপাড়ার হাজী মোহাম্মদ আমানুল্লাহ বলেন, ‘আমাদের পূর্বপুরুষের সব জমি জোরপূর্বক ভরাট করে বাউন্ডারি দিয়েছে। প্রতিবাদ করতে গেলে ১২ হাত মাটির নিচে পুঁতে ফেলার হুমকি দেয়। পুলিশ দিয়ে হয়রানি করেছে। গুন্ডা বাহিনী দিয়ে ধরে নিয়ে নির্যাতন করত। আমরা এর বিচার চাই।’
রূপগঞ্জের বাসিন্দা জাহের আলী জানান, তাকে মিথ্যা মামলায় গ্রেপ্তার করে ১০ দিনের রিমান্ডে নিয়ে প্রায় ৬২ বিঘা জমি লিখে নেওয়া হয়েছে। তিনি বলেন, ‘এমন কোনো নির্যাতন নেই যা আমার ওপর করা হয়নি। আমার মেয়ে জামাইয়ের সামনে আমাকে মারধর করা হয়েছে। জীবন রক্ষায় জমি লিখে দিতে বাধ্য হয়েছি।’
অনুসন্ধানে জানা গেছে, ‘আনন্দ পুলিশ পরিবার কল্যাণ সমবায় সমিতি’ নামে একটি সংগঠনের মাধ্যমে প্রকল্পটি পরিচালিত হয়। এর নিয়ন্ত্রণে রয়েছেন সাবেক অতিরিক্ত ডিআইজি গাজী মোজাম্মেল হক। তাঁর স্ত্রী ফারজানা মোজাম্মেলের মালিকানাধীন ‘আনন্দ প্রপার্টিজ লিমিটেড’ নামে আরেকটি প্রতিষ্ঠান রয়েছে। যার মাধ্যমে বিপুল পরিমাণ জমি কেনাবেচা করা হয়েছে।
সূত্র জানায়, শুধু রূপগঞ্জেই নয়, বিভিন্ন এলাকায় শত শত বিঘা জমি, বাংলোবাড়ি, মেঘনা নদীতে রিসোর্ট, ওষুধ কারখানা রয়েছে মোজাম্মেল হকের মালিকানায়। তার স্ত্রীর নামেও রয়েছে বিপুল সম্পত্তি। পুলিশে ২৭ বছরের চাকরি জীবনে তিনি এই অঢেল সম্পদের মালিক হয়েছেন।
ভুক্তভোগীরা বলছেন, দীর্ঘদিন তারা মুখ খুলতে পারেননি। রাজনৈতিক পরিবর্তনের পর এখন অনেকে এলাকায় ফিরে এসে নিজেদের জমি ফেরত চাইছেন। তারা প্রধানমন্ত্রীর হস্তক্ষেপ কামনা করে দ্রুত তদন্ত ও ন্যায়বিচারের দাবি জানিয়েছেন।
এদিকে গত বছর অবসরের পর তার বিরুদ্ধে দুর্নীতির তদন্ত শুরু হলে অনেকটাই লোকচক্ষুর অন্তরালে চলে যান মোজাম্মেল হক। তবে আড়ালে থেকেই নিজস্ব লোকজন ও পেটোয়া বাহিনী দিয়ে জবরদখল ও অন্যান্য কর্মকান্ড পরিচালনা করছেন বলে অভিযোগ রয়েছে।