ডাক বিভাগের ডাকাতি যেন থামছেই না। একটি ‘ডাকাতি’রও বিচার ও শাস্তি না হওয়া উৎসাহ যোগাচ্ছে আরেক ‘ডাকাতি’র। এখন এমন একটি ‘মিথ’ সৃষ্টি হয়েছে যে, ডাক বিভাগের অর্থ লোপাট হলেও তেমন কিছুই হয় না। ফলে একের পর এক ঐতিহ্যবাহী এ প্রতিষ্ঠানটিতে চলছে অভিনব পন্থার ডাকাতি। ধারাবাহিক এই ডাকাতি এবং লুটপাটের সঙ্গে জড়িতদের বিরুদ্ধে ফৌজাদারি মামলা দায়েরের সুপারিশ থাকলেও সেটি অদ্যাবধি বাস্তবায়ন করেনি ডাক ও টেলিযোগাযোগ বিভাগ। বরং প্রকল্পের নামে অর্থ লোপাটের নেপথ্য কারিগররা ডাক বিভাগেই চাকরি করছেন দোর্দ- প্রতাপে। এদের বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা গ্রহণ তো দূরের কথা, ডাকাতির সঙ্গে সংশ্লিষ্ট অনেকে ইতোমধ্যে স্বাভাবিক অবসরে চলে গেছেন। তথ্য ডাক অধিদফতর সূত্রের।
তথ্যানুসন্ধানে জানা যায়, তথাডাক সেবাকে গতিশীল ও আধুনিকায়নের নামে ১৪ জেলায় মেইল প্রসেসিং ও লজিস্টিক সার্ভিস সেন্টার (এমপিসি) স্থাপন করে আওয়ামী সরকার। প্রকল্প বাবদ ‘খরচ’ দেখায় ৩৬৫ কোটি টাকা। এর মধ্যে শুধু অবকাঠামো খাতে খরচ দেখায় সাড়ে ২৭ কোটি টাকা। ‘সরঞ্জাম ক্রয়’ দেখানো হয় ২৮৯ কোটি টাকা।
রাজধানীর তেজগাঁও, গোপালগঞ্জ, ময়মনসিংহ, খুলনা, চট্টগ্রাম, নোয়াখালী, রাজশাহী, পাবনা, রংপুর, বরিশাল, দিনাজপুর, হবিগঞ্জ, কুষ্টিয়া ও যশোরে স্থাপন করা হয় মেইল প্রসেসিং সার্ভিস সেন্টার। এসব সেন্টারে ব্যবহারের উপযোগিতা না থাকলেও কেনা হয় ৩৩ ধরনের যন্ত্রপাতি ও সরঞ্জাম। সরকারি ক্রয় নীতিমালা (পিপিআর) এড়াতে তৎকালীন ডাক অধিদফতর প্রকল্পের আওতায় যন্ত্রপাতিগুলো কেনে। শত শত কোটি টাকার এ ক্রয় প্রক্রিয়া সম্পন্ন করা হয় ডিরেক্ট পার্চেজ মেথড (ডিপিএম) অনুসরণে। স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা এড়াতে অবলম্বন করা হয় এই পদ্ধতির। ক্রয় বিধি অনুসারে সাধারণত উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠান যদি সরকারি মালিকানাধীন হয়, তাহলে ডিপিএম পদ্ধতিতে কেনাকাটা করা হয়। কিন্তু এ ক্ষেত্রে ঘটানো হয় ব্যতিক্রম। শুধুমাত্র অর্থ লোপাটের উদ্দেশ্যে অত্যন্ত চাতুর্যের সঙ্গে সরঞ্জামগুলো কেনা হয় একটি বাহিনী থেকে। অথচ নিয়মিত বাহিনীর কাজ সরকারি কোনো প্রতিষ্ঠানে সরঞ্জাম কেনাকাটা কিংবা সরবরাহ করা নয়। বাহিনীটি এ ধরনের কোনো সরঞ্জাম উৎপাদন করে না। মেরামত, আমদানি কিংবা রফতানিও করে না। শুধু তাই নয়। সরঞ্জামগুলোর ব্যবহার কৌশল সম্পর্কেও বাহিনীটির সম্যক ধারণাও প্রতিষ্ঠানটির নেই। শুধুমাত্র অর্থ লোপাটের জবাবদিহিতা এড়াতে ‘সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠান’ হিসেবে ‘চুক্তি’ এবং লেনদেন করা হয় বাহিনীটির সঙ্গে। যাতে কোনো অডিট না হয়। ভবিষ্যতে তদন্তের বিষয়বস্তু করা না যায়। ফলে এমপিসি প্রকল্পটি হয়ে যায় ফ্যাসিবাদী আওয়ামী লুটেরা সরকারের লুটপাটতন্ত্রের ‘স্মারক ডাক টিকিট’-এর মতো।
প্রাপ্ত তথ্য মতে, প্রকল্পের আওতায় কেনা অপ্রয়োজনীয় যন্ত্রপাতিগুলো এখন আবর্জনার মতো পড়ে আছে বিভিন্ন সেন্টারে। চিলার মেশিন, স্ট্যাম্প ক্যান্সেলার, স্মার্ট পোস্টেস সলিউশন (এসপিএস), নোট কাউন্টিং মেশিন, নোট বাইন্ডিং মেশিন, কিউ ম্যানেজমেন্ট সিস্টেম তেজগাঁও সেন্টারে পৌঁছানো হয় প্রকল্পের মেয়াদ শেষ হওয়ার কয়েক বছর পর। এখন এগুলো ব্যবহারের মতো উপযোগী নয়। প্যাকেটবন্দি হয়ে পড়ে আছে হ্যান্ড ট্রলি ও চেয়ার।
পচনশীল পণ্য এক এলাকা থেকে অন্য এলাকায় ডাক ব্যবস্থায় পাঠানোর ক্ষেত্রে যাতে পণ্য নষ্ট না হয় এ লক্ষ্যে ‘চিলার চেম্বার’ স্থাপন করা হয়। অথচ এটির কোনো ব্যবহার নেই। ফর্ক লিফট, ম্যানুয়াল হাইড্রোলিক ফর্ক লিফট, কলাপসিবল ট্রলি কেস, প্ল্যাটফর্ম ট্রলি, আর্চওয়ে গেট, সোলার সিস্টেম, ৫০০ কেভিএ ক্ষমতার জেনারেটর ও স্মার্ট অ্যাক্সেস কন্ট্রোল সিস্টেমটিও ব্যবহৃত হচ্ছে না।
সূত্র জানায়, প্রকল্পের মেয়াদ শেষ হয়েছে ২০২২ সালে। মেয়াদ শেষ হওয়ার দুই বছর পর ২০২৪ সালের জুন মাসে প্রজেক্টের পিসিআর জমা দেন সহকারী প্রকল্প পরিচালক (এপিডি) শাহ আলম ভুইয়া। পিসিআর-এ (প্রজেক্ট কমপ্লিশন রিপোর্ট) প্রকল্পের আওতায় স্মার্ট পোস্টেজ সল্যুশন কার্যক্রম সম্পন্ন করা হয়েছে-মর্মে পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়কে অবহিত করা হয়। পিসিআর জমা দেয়ার ১১ মাস পর ডাক বিভাগের সেবা আধুনিকায়ন, স্বচ্ছ ও ডিজিটাল ব্যবস্থাপনায় রূপান্তরের লক্ষ্যে ‘স্মার্ট পোস্টেজ সল্যুশন’র মাধ্যমে দেশের পাঁচটি সার্কেলে ৪২০টি ই-ফ্রাঙ্কিং ব্যবস্থা চালুর সিদ্ধান্ত হয়। কিন্তু স্মার্ট পোস্টেজ ডিভাইসের কার্যকারিতা যাচাই করতে গিয়ে দেখা যায়, ঢাকা মেট্রো সার্কেলের ৪৪টি ডিভাইসের মধ্যে ২০ টিই অকার্যকর। সেন্ট্রাল সার্কেল, ঢাকার ৭৬টি ডিভাইসের মধ্যে অচল ৫৭টি। দক্ষিণ সার্কেল, খুলনা ৯৭টি স্মার্ট পোস্টেজ ডিভাইসের মধ্যে কোনো ধরনের ব্যবহার ছাড়াই অকার্যকর হয়ে গেছে ৬৪টি। পূর্বাঞ্চল সার্কেল, চট্টগ্রামের ১০৭টি স্মার্ট পোস্টেজ ডিভাইসের মধ্যে ১০১টি অচল। উত্তরাঞ্চল সাকের্ল, রাজশাহীর ৯৬টি ডিভাইসের মধ্যে ৮২টি অকার্যকর। অকার্যকর হওয়া সত্ত্বেও ৪২০ সেট স্মার্ট পোস্টেজ সল্যুশন চালু করার লক্ষ্যে সব ইউনিটে প্রশিক্ষণ দেয়া হয়। প্রশিক্ষণে ব্যয় হয় বাড়তি এক-দেড় কোটি টাকা।
‘এমপিসি’ প্রকল্পের অন্তর্ভুক্ত ছিল ‘স্মার্ট পোস্টেজ সল্যুশন’। প্রকল্পটি ২০২৪ সালের জুন মাসে ‘সম্পন্ন’ হয়েছে মর্মে প্রকল্পের এপিডি মো: শাহ আলম ভুইয়া মন্ত্রণালয়ে প্রজেক্ট কমপ্লিশন রিপোর্ট-পিসিআর জমা দেন। বাস্তবে প্রকল্পের গুরুত্বপূর্ণ ‘স্মার্ট পোস্টেজ সল্যুশন’ সম্পন্ন না করেই তিনি জমা দেন এই প্রতিবেদন। ২০২৫ সালের এপ্রিলেও কোনো স্টেশনে স্মার্ট পোস্টেজ সল্যুশন চালু হয়নি।
ডাক অধিদফতর সূত্র জানায়, প্রকল্পটির শুরু থেকে তিনি সম্পৃক্ত রয়েছেন। নামকাওয়াস্তে প্রকল্প পরিচালক (পিডি) একজন থাকলেও নেপথ্য কারিগর হচ্ছেন ডাক বিভাগের সাবেক মহাপরিচালক সুধাংশু শেখর ভদ্র (এসএস ভদ্র)-এর অনুগত মো: শাহ আলম ভুইয়া। এ কারণে প্রকল্প সংশ্লিষ্ট আর কেউ এ বিষয়ে ততটা ওয়াকিবহালও নন। ফলে তিনি এ প্রকল্পের জন্য একমাত্র এবং ‘অবিকল্প’ হয়ে পড়েন। এমন নির্ভরতার সুযোগটি তিনি হাতছাড়া করেননি। স্মার্ট পোস্টেজ সল্যুশন চালু না করেই একক স্বাক্ষরে পিসিআর জমা দেন শাহ আলম ভুইয়া। স্মার্ট সল্যুশন চালুর জন্য পৃথক আরেকটি প্রকল্প গ্রহণের ফন্দি আঁটেন তিনি। ফলে ‘মেইল প্রসেস সেন্টার’ অন্তর্ভুক্ত ‘স্মার্ট পোস্টেজ সল্যুশন’র অন্তত ১৩ কোটি টাকা আত্মসাৎ ও অপচয় হয়। অথচ এ প্রকল্পের অর্থ আত্মসাতের দায়ে এসএস ভদ্র কারাগারে গেলেও এপিডি শাহ আলম ভুইয়া এখনো রয়েছেন ধরাছোঁয়ার বাইরে।
কোটি কোটি টাকা অপচয়ের ঘটনায় ডাক অধিদফতর কোনো ব্যবস্থা নিয়েছে কি না-জানতে চাওয়া হলে মহাপরিচালক কাজী আসাদুল ইসলাম বলেন, ‘বিষয়টি নিশ্চয়ই আমরা খতিয়ে দেখবো।’
এদিকে বিগত সময়ে ডাক অধিদফতরে প্রকল্পের নামে শত শত কোটি টাকা আত্মসাৎ হয়। আত্মসাতের দায়ে ডাকের সাবেক ডিজি (চলতি দায়িত্ব) এস এস ভদ্রের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নিলেও প্রকল্প সংশ্লিষ্ট অনেকে রয়ে গেছেন ধরাছোঁয়ার বাইরে। তাদের বিরুদ্ধে ফৌজদারি ব্যবস্থা নিতে মন্ত্রণালয়ের একাধিক তদন্ত কমিটির সুপারিশ রয়েছে। অথচ কোনো সুপারিশই বাস্তবায়ন করা হয়নি। এ প্রসঙ্গে ডাক ও টেলিযোগাযোগ বিভাগের সচিব আব্দুন নাসের খান প্রতিবেদককে বলেন, এ বিষয়ে সুনির্দিষ্ট তথ্য থাকলে নিশ্চয়ই আমরা ব্যবস্থা নেবো। প্রকল্প কিংবা প্রকল্প বহির্ভূত সব দুর্নীতিই আমরা খতিয়ে দেখবো। দুনর্ঁীতির সঙ্গে জড়িত যে-ই হোন না কেন- দোষী ব্যক্তিবর্গের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়া হবে।