দেশের বাজারে বোতলজাত ভোজ্য তেলের সংকট তীব্র আকার ধারণ করেছে। রাজধানী ঢাকাসহ বিভিন্ন জেলা শহরের খুচরা ও পাইকারি বাজারে নির্ধারিত দামের বোতলজাত সয়াবিন পাওয়া যাচ্ছে না। বোতলজাত ভোজ্য তেলে সংকটের কারণে বাড়ছে পাম ওয়েলের দামও। এতে সাধারণ ভোক্তারা চরম ভোগান্তিতে পড়েছেন, পাশাপাশি ব্যবসায়ীদের মধ্যেও অস্থিরতা দেখা দিয়েছে।
জানা যায়, তেলের দাম বাড়াতে বাজারে ভোজ্য তেলের সরবরাহ বন্ধ করে দেয় কোম্পানিগুলো। এতে বাজারে কৃত্রিম সংকট তৈরি হয়েছে। লিটার প্রতি ১২ টাকা দাম বাড়ায় ইতিমধ্যে সরকারের উচ্চপর্যায়ে চিঠিও দিয়েছে বিপণন প্রতিষ্ঠানগুলো। দাম বাড়ানো না হলে সরবরাহ স্বাভাবিক হবেনা বলেও জানিয়েছেন তারা।
বাজার পর্যবেক্ষণে দেখা গেছে, অধিকাংশ দোকানে ১ লিটারের বোতলজাত তেলের সরবরাহ খুবই কম, আর ৫ লিটারের বোতল একেবারেই নাই। অনেক দোকানে মজুত শেষ হয়ে গেছে, আবার কিছু দোকানে তেল এলেও সীমিত পরিমাণে বিক্রি করা হচ্ছে। ফলে ক্রেতাদের একাধিক দোকান ঘুরেও প্রয়োজনীয় তেল সংগ্রহ করতে হচ্ছে। খুচরা ব্যবসায়ীরা জানান, পাইকারি বাজার থেকেই পর্যাপ্ত সরবরাহ পাওয়া যাচ্ছে না। যে পরিমাণ তেল আসছে তা দ্রুত শেষ হয়ে যাচ্ছে। এতে অনেক দোকান নিয়মিত চাহিদা মেটাতে পারছে না। বিশেষ করে নিম্ন ও মধ্যবিত্ত পরিবারের ওপর এর প্রভাব সবচেয়ে বেশি পড়ছে, কারণ ভোজ্য তেল দৈনন্দিন রান্নার একটি অপরিহার্য উপকরণ।
রাজধানীর মগবাজারারের সততা স্টোরের মালিক মো. আব্দুল্লাহ্ শীর্ষনিউজ ডটকমকে বলেন, বেশ কয়েকদিন যাবতই বোতলজাত সয়াবিন তেলের ব্যাপক সংকট, কাস্টমারের চাহিদা অনুযায়ী দিতে পারছি না। ডিলারদেরকে জিজ্ঞেস করলে তারা শুধু আশ্বাসই দিয়ে যায়, তেল আর আসে না।
এদিকে ভোক্তাদের অভিযোগ, সংকটের সুযোগ নিয়ে কিছু অসাধু ব্যবসায়ী বোতলজাত তেল নির্ধারিত দামের চেয়ে বেশি দামে বিক্রি করছেন। কোথাও কোথাও কৃত্রিম সংকট তৈরি করে মজুতদারি করা হচ্ছে বলেও অভিযোগ উঠেছে, যা বাজার পরিস্থিতিকে আরও অস্থিতিশীল করে তুলেছে।
মারজিয়া নামের একজন গৃহীনি শীর্ষনিউজ ডটকমকে বলেন, অকেদিন যাবত ঠিক মতো তেল পাচ্ছি না। ১ লিটার তেলের জন্য অন্তত ৮ থেকে ১০ দোকানে ঘুরছি, তাও পাইনি। এক দোকানে পেয়েছি তাও গায়ের দাম থেকে ৩০ টাকা বেশি দিয়ে কিনতে হয়েছে।
জাতীয় ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তর জানিয়েছে, তারা নিয়মিত বাজার তদারকি ও অভিযান পরিচালনা করছে। অতিরিক্ত দামে বিক্রি, মজুতদারি ও অনিয়মের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে। তবে সংস্থাটির মতে, সরবরাহ ব্যবস্থা স্বাভাবিক না হলে পুরোপুরি বাজার স্থিতিশীল করা কঠিন।
দেশে গত বছরের ৮ ডিসেম্বর সর্বশেষ বোতলজাত সয়াবিন তেলের দাম বেড়েছিল। তখন প্রতি লিটারে ছয় টাকা দাম বাড়ানো হয়। তাতে এক লিটারের বোতলের সর্বোচ্চ খুচরা মূল্য (এমআরপি) দাঁড়ায় ১৯৫ টাকা, দুই লিটার ৩৯০ টাকা এবং ৫ লিটারের বোতলের খুচরা মূল্য ঠিক হয় ৯৫৫ টাকা। এরপর কোম্পানিগুলো আর দাম বাড়ায়নি। সাধারণত পরিবেশক বা সরবরাহকারীদের কাছ থেকে খুচরা বিক্রেতারা তেল কেনেন। গত দেড় মাসে পরিবেশক পর্যায়ে তেলের দাম বেড়েছে। ফলে খুচরা পর্যায়ে কিছুটা বাড়তি দামে তেল কিনতে হচ্ছে ভোক্তাদের।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, আন্তর্জাতিক বাজারে অপরিশোধিত সয়াবিন ও জ্বালানি তেলের দাম বেড়েছে এবং ডলার সংকটের অজুহাত দেখিয়ে স্থানীয় বাজারে দাম বাড়ানো হচ্ছে। তবে সরকারের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, সয়াবিন তেলের দাম বৃদ্ধির কোনও বৈধ কারণ নেই। বাণিজ্যমন্ত্রী খন্দকার আব্দুল মুক্তাদির নিজে বাজারে গিয়ে ক্রেতা ও বিক্রেতার সঙ্গে কথা বলে পরিস্থিতি খতিয়ে দেখেছেন।
কনজুমারস এসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ ( ক্যাব ) এর সহ-সভাপতি এস এম মুস্তাফিজুর রহমান শীর্ষনিউজ ডটকমকে বলেন, আমার জানামতে দেশে ভোজ্য তেলের সংকট থাকার কথা নয়। কেবল মাত্র দাম বাড়ানোর জন্য সরবরাহকারি প্রতিষ্ঠানগুলো ভোক্তাদের জিম্মি করে বাজারে কৃত্রিম সংকট তৈরি করেছে।
তিনি আরও বলেন, বাজারে স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে মনিটরিং ব্যবস্থা জোরদার করতে হবে। দীর্ঘমেয়াদে স্থিতিশীলতা আনতে সরবরাহ চেইনে বৈচিত্র আনা এবং বিকল্প উৎস তৈরি করার পরামর্শও দিয়েছেন তিনি।
সব মিলিয়ে বোতলজাত ভোজ্য তেলের এই সংকট সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রায় সরাসরি প্রভাব ফেলছে। দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ না নিলে পরিস্থিতি আরও জটিল হতে পারে বলে সংশ্লিষ্টরা আশঙ্কা করছেন।