বাংলাদেশি তরুণ নাবিক এহসান সাবরি রিহাদ। চাকরির প্রথম সমুদ্রযাত্রায় যাচ্ছিলেন ওমান। জাহাজে রওনা দেন চীনের সাংহাই থেকে। আরব সাগর পার হওয়ার সময় হঠাৎ বিকট শব্দ কানে অসে রিহাদের। কেঁপে ওঠে পুরো জাহাজ।
স্থানীয় সময় গত মঙ্গলবার (৭ এপ্রিল) বেলা সাড়ে ১১টার দিকে খাবার খেয়ে বিশ্রামের প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন রিহাদ। তখনকার অভিজ্ঞতা তিনি বলেন, ‘দ্রুত ইঞ্জিনকক্ষে গিয়ে দেখি সব ঠিক আছে। উপরে আসতেই দেখি ক্রেনের নিচে দাউ দাউ করে আগুন জ্বলছে। বুঝলাম আমরা হামলার শিকার হয়েছি।’
পানামার পতাকাবাহী ‘এমভি গোল্ড অটাম’ জাহাজটিতে রিহাদসহ ছিলেন ২২ নাবিক। তাদের মধ্যে ৬ জন বাংলাদেশি। রিহাদ কক্সবাজারের বাসিন্দা। ১০ মাস আগে ইঞ্জিন ক্যাডেট পদে এই জাহাজে যোগ দেন তিনি। এটি ছিল নাবিক হিসেবে তার প্রথম সমুদ্রযাত্রা।
শুক্রবার (১০ এপ্রিল) যখন তার সঙ্গে কথা হয় রিহাদ বলছিলেন, হামলার পর নিরাপদ আশ্রয়ের জন্য সবাই যখন একটি কক্ষে জড়ো হন, তখন দ্বিতীয় মিসাইলটি আঘাত হানে। কয়েক সেকেন্ডের ব্যবধানে প্রাণে বেঁচে যান রিহাদ ও তার সহকর্মীরা। কিন্তু জাহাজের ভেতর তখন তৈরি হয়েছে এক বিভীষিকাময় মুহূর্ত।
রিহাদ জানান, হামলায় জাহাজের ইঞ্জিন বিকল হয়ে যায়, ফাটল ধরে একপাশে। আগুন ছড়িয়ে পড়ে জাহাজে থাকা মালামালের ওপর। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে গেলে ক্যাপ্টেন জাহাজ পরিত্যক্ত ঘোষণা করেন।
জাহাজের পেছনের ডেক ছাড়া মোটামুটি সব অংশেই তখন আগুন জ্বলছিল। ডেকে পণ্য হিসেবে বড় বাস ছিল, যেগুলো আগুনে পুড়ে অঙ্গার হয়ে যায়। নাবিকরা আগুন নিয়ন্ত্রণে আনার চেষ্টা করেন। পরে সবাই জাহাজের পেছনের ডেকে জড়ো হন। একই সঙ্গে ইঞ্জিন সচল করার চেষ্টাও চলতে থাকে। কিন্তু দুপুর একটা পর্যন্ত চেষ্টা করেও ইঞ্জিন চালু করা যায়নি।
রিহাদসহ চারজন একটি লাইফবোটে করে সাগরে ভাসতে শুরু করেন। কিন্তু সেখানেও বিপদ পিছু ছাড়েনি। বোমার আঘাতে লাইফবোটের ইঞ্জিনও ছিল অচল। উত্তাল সাগরের ঢেউ আছড়ে পড়ছিল বোটের ভেতর। রিহাদ বলেন, ‘মনে হচ্ছিল আজই জীবনের শেষ দিন। বাঁচার আশা ছেড়ে দিয়ে শুধু আল্লাহর নাম স্মরণ করছিলাম।’
তিনি বলেন, ‘পরে এমভি ইউনাইচ জাহাজ থেকে স্যাটেলাইট ফোনে মালিকপক্ষের সঙ্গে যোগাযোগ করি আমরা। কোম্পানি থেকে পাকিস্তান দূতাবাসের মাধ্যমে দেশটির নৌবাহিনীর সহায়তা চাওয়া হয়।’
প্রায় সাত ঘণ্টা সাগরে ভেসে থাকার পর রাত সাড়ে আটটার দিকে একটি মালবাহী জাহাজের দেখা পান তারা। এরপর শুরু হয় উদ্ধারের পালা। পাকিস্তান নৌবাহিনীর জাহাজ ‘পিএনএস হুনাইন’ এসে উদ্ধার করে বাংলাদেশি ৫ নাবিকসহ ১৮ জনকে।
রিহাদ বলেন, ‘রাত ১টার দিকে পাকিস্তান নৌবাহিনী ঘটনাটি জেনে উদ্ধারে এগিয়ে আসে। প্রায় সাত ঘণ্টা পর, বুধবার সকাল আটটার দিকে পাকিস্তান নৌবাহিনীর জাহাজ পিএনএস হুনাইন এসে প্রথমে পরিত্যক্ত জাহাজে আটকে থাকা ১৮ জনের মধ্যে ১৪ জনকে উদ্ধার করে। ততক্ষণে জাহাজের আগুনও অনেকটা নিয়ন্ত্রণে আসে।’
জাহাজের ক্যাপ্টেনসহ ৪ জন এখনও ওমান উপকূলে নেওয়ার অপেক্ষায় পরিত্যক্ত জাহাজটিতেই অবস্থান করছেন বলে জানা গেছে। সাগর শান্ত হলে সাহায্যকারী জলযান দিয়ে টেনে ওমানের উপকূলে নেওয়া হবে জাহাজটি, সেই আশায় তারা থেকে যান।
উদ্ধারকৃতরা বর্তমানে পাকিস্তানের করাচি বন্দরে নিরাপদ আছেন। কক্সবাজারের বাসিন্দা রিহাদসহ অন্য বাংলাদেশি নাবিকরা যেন দ্রুত দেশে ফিরতে পারেন, সে লক্ষ্যে কাজ করছে বাংলাদেশ মার্চেন্ট মেরিন অফিসার্স অ্যাসোসিয়েশন।