Image description

ঢাকা-১৪ আসনের সংসদ সদস্য ব্যারিস্টার মীর আহমদ বিন কাসেম ৬ এপ্রিল এক ফেসবুক পোস্টে বলেন, “গুমের বিষয়ে আইনমন্ত্রী সংসদে সরাসরি অসত্য বলেছেন: সরকার কি গুমের সংস্কৃতি ফিরিয়ে আনতে চায়? গুমের অধ্যাদেশ ল্যাপ্স করে কেন আগামী রবিবার থেকে সরকার দেশে গুমের সংজ্ঞাই বিলুপ্ত করে দিচ্ছে আমার এমন প্রশ্নের জবাবে গতকাল আইনমন্ত্রী বলেন, ICT আইনে গুমের সর্বোচ্চ শাস্তি মৃত্যুদণ্ড। তবে গুম প্রতিরোধ অধ্যাদেশে শাস্তি হিসেবে সর্বোচ্চ ১০ বছর কারাদণ্ডের বিধান রাখা হয়েছে, যা গুমের শিকারদের প্রতি অবিচার। তাই নাকি এখন গুমের আইন ল্যাপ্স করা বাঞ্ছনীয়।

গুম অধ্যাদেশের ধারা ৪(২)-এ লেখা আছে: "উক্ত অপরাধের জন্য দায়ী ব্যক্তি সর্বোচ্চ মৃত্যুদণ্ড বা যাবজ্জীবন কারাদণ্ড বা অন্য কোনো মেয়াদের কারাদণ্ডে দণ্ডনীয় হইবেন।" অপরাধের মাত্রা অনুযায়ী সর্বোচ্চ সাজা মৃত্যুদণ্ডের বিধান অধ্যাদেশে ক্লিয়ারলি আছে। (লিংক কমেন্টে)

সুতরাং সরকার মিথ্যা অজুহাতে গুমের আইন বিলুপ্ত করে আবার গুমের পথ সুগম করছে। এতে শুধু আমাদের সাথে না, বিএনপির শত শত ভুক্তভোগীদের প্রতিও বেইনসাফি হচ্ছে।”

এই পোস্টের পর ফেসবুকে আইনমন্ত্রীর বক্তব্যকে ঘিরে বিতর্ক তৈরি হয়েছে। এই বিতর্ক এমন সময় হচ্ছে যখন সংবাদমাধ্যমের খবর মতে, নির্বাচিত বিএনপি সরকার অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সময়ের গুম প্রতিরোধ সংক্রান্ত অধ্যাদেশ বাতিলের উদ্যোগ নিচ্ছে।

এ প্রেক্ষিতে গত রোববার (৫ এপ্রিল) সংসদ সদস্য ব্যারিস্টার মীর আহমদ বিন কাসেমের এক প্রশ্নের জবাবে সরকারের আইনমন্ত্রী অ্যাডভেকেট মো. আসাদুজ্জামান দাবি করেছেন, গুমের অর্ডিন্যান্সে ১০ বছর পর্যন্ত সাজা দেওয়ার সুযোগ রাখা হয়েছে। 

বিরোধী দলকে ইঙ্গিত করে আইনমন্ত্রী তার বক্তব্যে বলেন, ‘‘উনারা যে আইনটা নিয়ে হইচই করছেন। উনারা মনে হয় আইনটি ভালোভাবে দেখেননি। মানবাধিকার কমিশন আইন এবং গুম প্রতিরোধ আইন যেভাবে করা হয়েছে অর্ডিন্যান্সে সেটা করলে গুমের শিকার সদস্যদের প্রতি অবিচার করা হবে। গুমের যে আইনটার কথা বলা হয়েছে অর্ডিন্যান্সে সেখানে ১০ বছর পর্যন্ত সাজা দেওয়ার সুযোগ রাখা হয়েছে। বক্তব্যে তিনি এসব আইনে সর্বোচ্চ মৃত্যুদন্ড করে আইন করা হবে বলেও আশ্বস্ত করেন।’’

আইনমন্ত্রী আরও বলেন, “আমরা একইসাথে আইসিটি এ্যক্ট ১৯৭৩ সালে ক্রাইম এগেইনস্ট হিউম্যানিটির মধ্যে গুমের সংজ্ঞা অন্তর্ভুক্ত করেছি। সেখানে বিচার হবে, তদন্ত হবে, একই সাথে এদিকে এটা করেছি। আবার গুম আইনে আমরা এটাকে ভিন্ন একটা তদন্তের কথা বলছি। ওখানে সর্বোচ্চ শাস্তি মৃত্যুদণ্ড কিংবা গুমের যারা অপরাধী সর্বোচ্চ শাস্তি মৃত্যুদণ্ড কিংবা যাবজ্জীবন কারাদণ্ড।”

আইনমন্ত্রীর পুরো বক্তব্য দেখুন এখানে, এখানে

BNP Media Cell এর ফেসবুক পেজের একটি পোস্টে (আর্কাইভ) বলা হয়েছে, ‘‘আইনমন্ত্রী উল্লেখ করেন, বর্তমানে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল (আইসিটি) আইন, ১৯৭৩-এ গুমকে ‘মানবতা বিরোধী অপরাধ’ হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে, যেখানে সর্বোচ্চ শাস্তি মৃত্যুদণ্ড। তবে গুম প্রতিরোধ অধ্যাদেশে শাস্তি হিসেবে সর্বোচ্চ ১০ বছর কারাদণ্ডের বিধান রাখা হয়েছে, যা গুমের শিকারদের প্রতি অবিচার বলে তিনি উল্লেখ করেন।’’

তবে দ্য ডিসেন্টর যাচাইয়ে দেখা গেছে, আইনমন্ত্রী গুমের অর্ডিন্যান্সে ১০ বছর পর্যন্ত সাজা দেওয়ার সুযোগ রাখার কথা বললেও প্রকাশিত অধ্যাদেশে দুই ধরণের সাজা এমনকি সর্বোচ্চ মৃত্যুদণ্ড বা যাবজ্জীবন কারাদণ্ড থাকার কথা উল্লেখ রয়েছে। 

গত ১ ডিসেম্বর ২০২৫ ‘গুম প্রতিকার ও প্রতিরোধ অধ্যাদেশ, ২০২৫’ নামে একটি গেজেট প্রকাশ করেছে সাবেক অন্তবর্তীকালীন সরকার। সেই অধ্যাদেশের ৪ নং ধারায় গুমের সংজ্ঞা ও সাজার বিষয়ে উল্লেখ আছে। 

সেখানে ১ নং ‍উপধারায় বলা হয়েছে, কোনো সরকারি কর্মচারী বা শৃঙ্খলা-বাহিনীর কোনো সদস্য উক্তরূপ পরিচয়ের বলে নিজে, অথবা শৃঙ্খলা-বাহিনী বা সরকারি কোনো কর্তৃপক্ষের অনুমোদন, সমর্থন বা সম্মতির বলে যেকোনো ব্যক্তি বা ব্যক্তিবর্গ সংজ্ঞা অনুযায়ী গুমের অপরাধ করেন তবে দায়ী ব্যক্তি যাবজ্জীবন কারাদণ্ডে বা অনধিক ১০ (দশ) বৎসর কারাদণ্ডে দণ্ডনীয় হবেন এবং দণ্ডের অতিরিক্ত অনধিক ৫০ (পঞ্চাশ) লক্ষ টাকা অর্থদণ্ডে দণ্ডনীয় হবেন।

২ নং উপধারায় বলা হয়েছে, যদি গুমের ফলে গুম হওয়া ব্যক্তির মৃত্যু ঘটে বা গুম হওয়া ব্যক্তির লাশ পাওয়া যায় অথবা গুমের ঘটনার ৫ (পাঁচ) বছর অতিক্রান্ত হওয়ার পরও তাকে জীবিত কিংবা মৃত অবস্থায় উদ্ধার করা সম্ভব না হয়, তাহলে দায়ী ব্যক্তি সর্বোচ্চ মৃত্যুদণ্ড বা যাবজ্জীবন কারাদণ্ড বা অন্য কোনো মেয়াদের কারাদণ্ডে দণ্ডনীয় হবেন এবং উক্ত দণ্ডের অতিরিক্ত অনধিক ১ (এক) কোটি টাকা অর্থদণ্ডে দণ্ডনীয় হবেন।

অর্থাং, এই অধ্যাদেশ অনুযায়ী সাধারণত গুমের সর্বোচ্চ শাস্তি যাবজ্জীবন এবং ৫০ লক্ষ টাকা অর্থদণ্ড। এছাড়া গুম হওয়া ব্যক্তির মৃত্যু হয় বা লাশ পাওয়া যায় অথবা গুমের ঘটনার ৫ বছর পর হওয়ার পরেও জীবিত কিংবা মৃত অবস্থায় উদ্ধার করা সম্ভব না হয় তাহলে সর্বোচ্চ মৃত্যুদণ্ড এবং দণ্ডের অতিরিক্ত অনধিক এক কোটি টাকা অর্থদণ্ড।

এ ব্যাপারে জানতে চাইলে আইনমন্ত্রী মো. আসাদুজ্জামান দ্য ডিসেন্টকে বলেন, “আমি বলেছি কমপক্ষে দশ বছর পর্যন্ত!’’

তবে সংসদে দেওয়া আইনমন্ত্রীর বক্তব্যে ‘‘কমপক্ষে ১০ বছর পর্যন্ত’ শব্দের উল্লেখ পাওয়া যায়নি। তিনি বলেছেন, “গুমের অর্ডিন্যান্সে ১০ বছর পর্যন্ত সাজা দেওয়ার সুযোগ রাখা হয়েছে।”

বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্টের জ্যেষ্ঠ আইনজীবী ব্যারিস্টার ইমরান আবদুল্লাহ সিদ্দিক দ্য ডিসেন্টক বলেন, আমি তাঁর (আইনমন্ত্রী) বক্তব্যটি শুনেছি। আমার মনে হয়েছে তিনি ভ্রান্ত ধারণা থেকে এই ধরণের মন্তব্য করেছেন। গুম প্রতিরোধ ও প্রতিকার অধ্যাদেশ, ২০২৫ এর ৪ ধারায় দুই ধরণের সাজার বিষয়ে স্পষ্ট উল্লেখ আছে। সেখানে কোথাও কেবল মাত্র সর্বোচ্চ ১০ বছরের সাজার কথা বলা হয়নি।

তিনি আরও বলেন, ‘‘তাছাড়া আইসিটি অ্যাক্টের বিচার হয় বিশেষ কিছু ক্ষেত্রে। সাধারণ গুমের আইনের সাথে আইসিটি অ্যাক্টকে মেলানোর সুযোগ নেই। আইসিটি অ্যাক্টে কোন গুমের ঘটনার বিচার কেবল তখনই সম্ভব যখন তা  সাধারণ জনগোষ্ঠীর বিরুদ্ধে কোনো ব্যাপক বা পরিকল্পিত আক্রমণের অংশ হিসেবে সংঘটিত হয়। তবে গুমের কোন বিচ্ছিন্ন ঘটনার ক্ষেত্রে আইসিটি অ্যাক্টে বিচারের কোন সুযোগ নেই। বরং গুম প্রতিরোধ ও প্রতিকার আইনেই এর বিচার করতে হবে।’’