Image description

প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নেতৃত্বাধীন বিএনপি সরকারের মাত্র দেড় মাস হলো। একে শিশু সরকারই বলা চলে। কিন্তু এরমধ্যেই মন্ত্রীরা দু’একজন নিয়মনীতির বাইরে আগ বাড়িয়ে কথা বলতে গিয়ে এমন বিতর্ক সৃষ্টি করছেন যা নিয়ে সরকার বিব্রত হচ্ছে বার বার। সরকারের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন হচ্ছে। এ বিষয়ে এগিয়ে রয়েছেন সড়ক, রেল ও নৌমন্ত্রী শেখ রবিউল আলম। দলের ভেতরে-বাইরে অনেকেই এখন তার ওপর অত্যন্ত বিরক্ত। ঈদের আগে বাস টার্মিনাল পরিদর্শনে গিয়ে তিনি নাজেহালও হয়েছেন, যা সরকারের জন্যই বিব্রতকর। তাকে মন্ত্রিপরিষদ থেকে বাদ দেওয়ার দাবিও উঠেছে। সরকারের শুভাকাক্সক্ষীরাই কেউ কেউ এ দাবি জানিয়েছেন। এদিকে শুধু রবিউল আলমই নন, আরেক মন্ত্রীও নিজের মন্ত্রণালয় কেন্দ্রীক বিভিন্ন ইস্যুতে আগ বাড়িয়ে উল্টাপাল্টা কথা বলতে গিয়ে ইতিমধ্যে অনেক বিতর্ক তৈরি করেছেন। তিনি হলেন শিক্ষামন্ত্রী ড. আ ন ম এহছানুল হক মিলন। প্রথম শ্রেণিতে ভর্তিতে লটারির পরিবর্তে পরীক্ষা পদ্ধতি চালু, বিগত বছরের বৃত্তি পরীক্ষা এখন নেওয়া, ইতিপূর্বের ঘোষিত এইচএসসি পরীক্ষার সময়সূচি হঠাৎ করে এগিয়ে আনা এবং সর্বশেষ পদক্ষেপ- তিন দিন অনলাইনে ক্লাসের পরিকল্পনা। এসব প্রতিটি ইস্যুই চরম বিতর্ক ও সমালোচনার জন্ম দিচ্ছে। এতে প্রশ্ন দেখা দিয়েছে, মন্ত্রী এহছানুল হক মিলন আদতে সরকারের পক্ষে নাকি বিপক্ষে কাজ করছেন?

তিন দিন অনলাইনে ক্লাস করা নিয়ে যদিও এখন পর্যন্ত সরকারই কোনো সিদ্ধান্ত নিতে পারেনি, মন্ত্রী কেন আগ বাড়িয়ে গণমাধ্যমে কথা বলে বিতর্ক তৈরি করলেন এ প্রশ্ন দেখা দিয়েছে। সিদ্ধান্ত নেওয়া হোক বা না হোক- কোনো বিষয়ে সমালোচনা বা বিতর্ক তৈরি হলে তাতে সরকারের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন হয়। সরকারের অদক্ষতা ফুটে উঠে। নিয়ম হলো, সরকার কোনো বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে নিজেদের মধ্যে আলোচনা করবে। নিজেরা আলোচনা করে সিদ্ধান্ত নিতে না পারলে অথবা জনমত নেওয়ার প্রয়োজন হলে মন্ত্রণালয়ের ওয়েবসাইটে এ সম্পর্কে মতামত আহ্বান করবে অথবা বিশেষজ্ঞের মতামত নেবে। কিন্তু দেখা যাচ্ছে, শিক্ষামন্ত্রী একেক বার একেক সিদ্ধান্তের কথা গণমাধ্যমে ঘোষণা করছেন, আবার নিজেই পাল্টাচ্ছেন।

গভর্নিং বডির সভাপতি পদে ডিগ্রি পাস লাগবে কি লাগবে না
সরকারের শুরুতেই শিক্ষামন্ত্রী আ ন ম এহছানুল হক মিলন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের গভর্নিং বডির সভাপতি পদে ডিগ্রি পাসের শর্ত তুলে দেওয়ার কথা বলে বিতর্ক তৈরি করেন। গত ১০ মার্চ শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের এক সভায় বেসরকারি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের ম্যানেজিং কমিটি ও গভর্নিং বডির সভাপতি পদের জন্য নির্ধারিত ন্যূনতম স্নাতক পাশের শর্ত বাতিল করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। সভায় উপস্থিত কর্মকর্তারা এই নতুন সিদ্ধান্তের ব্যাপারে রাজি ছিলেন না। কিন্তু মন্ত্রী নিজের সিদ্ধান্ত চাপিয়ে দেন। এরফলে আর অন্য কারো কিছু বলার ছিল না। তবে এ সিদ্ধান্তের খবর গণমাধ্যমে আসার সঙ্গে সঙ্গে সর্বত্র ব্যাপক সমালোচনা শুরু হতে থাকে। একে শিক্ষা খাত ধ্বংসের চক্রান্ত বলেও আখ্যায়িত করা হয়। এমন কড়া সমালোচনার পরিপ্রেক্ষিতে এক সপ্তার মাথায় মন্ত্রী ঘোষণা দিতে বাধ্য হলেন, বেসরকারি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের ম্যানেজিং কমিটি অথবা গভর্নিং বডির সভাপতি হওয়ার জন্য ন্যূনতম শিক্ষাগত যোগ্যতা লাগবে ডিগ্রি পাস। মাঝ থেকে মন্ত্রীর এবং সরকারের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন হলো।

ভর্তিতে লটারির পরিবর্তে পরীক্ষা পদ্ধতি
এ মুহূর্তে সবচেয়ে বড় বিতর্ক ও সমালোচনা চলছে প্রথম শ্রেণিতে ভর্তিতে লটারির পরিবর্তে পরীক্ষা পদ্ধতি চালুর ঘোষণা নিয়ে। গত ১৫ মার্চ সাবেক ছাত্রনেতা, সংসদ সদস্য আবুল হাসনাত আবদুল্লাহ জাতীয় সংসদের প্রশ্নোত্তরপর্বে প্রথম শ্রেণিতে ভর্তিতে পরীক্ষা পদ্ধতি চালুর পক্ষে কথা বলেন এবং এ ব্যাপারে সরকারের পদক্ষেপ জানতে চান। জাতীয় সংসদে এ প্রশ্্েনর জবাবে মন্ত্রী এহছানুল হক মিলন সবার সঙ্গে আলোচনা করে সিদ্ধান্ত নেবেন বলে জানান। কিন্তু এরপর দিনই হঠাৎ করে মন্ত্রণালয় থেকে লটারির পরিবর্তে পরীক্ষা পদ্ধতি চালুর আদেশ জারি হয়। তারপর থেকে এ নিয়ে গণমাধ্যমে এবং সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ব্যাপক সমালোচনা চলছে। মন্ত্রী এবং সরকারকে ধুয়ে দিচ্ছেন অনেকে। গণমাধ্যমে এমনও খবর বেরিয়েছে যে, হাজার কোটি টাকার কোচিং ব্যবসা চালু হয়ে গেছে ইতিমধ্যে। এ জন্য সরকারের বিতর্কিত সিদ্ধান্তকে দায়ী করা হচ্ছে। এসব কোচিং ব্যবসার সঙ্গে মন্ত্রীর সংশ্লিষ্টতার অভিযোগও তুলছেন কেউ কেউ সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে। এ প্রতিবেদন লেখা পর্যন্ত ব্যাপক সমালোচনা চলছিল। সরকারের ভাবমূর্তি মারাত্মকভাবে ক্ষুণ্ন হচ্ছে এতে।

অসময়ে পরীক্ষার আয়োজন
গত বছরের পঞ্চম শ্রেণির বৃত্তি পরীক্ষা অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে এই এপ্রিলে। ১৫ এপ্রিল থেকে শুরু হবে। যদিও এ রিপোর্ট লেখা পর্যন্ত পরীক্ষার্থীদের তথ্য এন্ট্রি, যাচাই, কেন্দ্র নির্বাচনসহ বিভিন্ন কার্যক্রম এখনও সম্পন্ন হয়নি। পরীক্ষক, নিরীক্ষক ও প্রধান পরীক্ষকের তথ্যও এন্ট্রি হয়নি। অত্যন্ত তড়িঘড়ি করে এ কাজগুলো সম্পন্ন করার চেষ্টা চলছে। এতে ভুলভ্রান্তির আশংকা বেশি থেকে যাচ্ছে। তাছাড়া শিক্ষার্থীদের জন্য এটি বাড়তি চাপ হিসেবেও বিবেচিত হচ্ছে। নিয়ম অনুযায়ী পঞ্চম শ্রেণির বৃত্তি পরীক্ষা হয়ে থাকে বার্ষিক পরীক্ষার পরে ডিসেম্বর মাসে। তখন শিক্ষার্থীরা অলস সময় না কাটিয়ে বৃত্তি পরীক্ষার কাজে সময় ব্যয় করে। তাদের মন-মেজাজও ভালো থাকে। ষষ্ঠ শ্রেণির শিক্ষার্থীরা এখন পঞ্চম শ্রেণির বৃত্তি পরীক্ষা দিবে। এদিকে একই সময়ে ষষ্ঠ শ্রেণির অর্ধবার্ষিক পরীক্ষারও প্রস্তুতি নিচ্ছে। এতে উভয় সংকটে পড়েছে শিক্ষার্থীরা। শিক্ষার্থী এবং অভিভাবক সবাই শিক্ষামন্ত্রীর এমন তুঘলকি পদক্ষেপে ক্ষুব্ধ ও অসন্তুষ্ট বলে জানা গেছে। সরকারের তথা শিক্ষামন্ত্রীর এমন সিদ্ধান্তকে অযৌক্তিক বলে আখ্যায়িত করছেন অভিজ্ঞমহলও।

অভিজ্ঞমহলের মতে, আইনি জটিলতার কারণে ডিসেম্বরে বৃত্তি পরীক্ষা নেওয়া যায়নি। তাই বলে এখন নিতে হবে কেন? বৃত্তি পরীক্ষা অপরিহার্য কোনো বিষয় নয়। এক বছর বৃত্তি পরীক্ষা না হলে তাতে বড় কোনো ক্ষতি হয়ে যাবে না। এই শিক্ষার্থীরা নতুন ক্লাসে, নতুন পাঠ্যবইয়ে প্রায় চারমাস পড়ালেখা করেছে। পঞ্চম শ্রেণির সেই পাঠ্যবই-নোট-গাইড কিছুই নেই তাদের হাতে। এতে মধুর বিড়ম্বনায় পড়েছে প্রায় পাঁচ লাখ শিক্ষার্থী। পাশাপাশি পড়ালেখা নিয়েও তালগোল পাকিয়ে ফেলছে সদ্য মাধ্যমিকের গণ্ডিতে পা রাখা শিক্ষার্থীরা।

শিক্ষা-সংশ্লিষ্টরা বলছেন, মাধ্যমিক স্তরের বই পড়তে পড়তে হঠাৎ প্রাথমিকের বৃত্তির প্রস্তুতি নিতে বসে মানসিক চাপে পড়ছে শিক্ষার্থীরা। এ ধরনের বৃত্তি পরীক্ষা শিক্ষায় ইতিবাচক প্রভাব আনবে না। বরং দুই শ্রেণির পড়ার চাপ সামলাতে গিয়ে মানসিকভাবে বিপর্যস্ত হয়ে পড়বে শিক্ষার্থীরা। তারা অসময়ে এ বৃত্তি পরীক্ষা নেওয়ার প্রয়োজনীয়তা দেখছেন না

এইচএসসি পরীক্ষা এগিয়ে আনা নিয়ে অসন্তোষ
সরকার ইতিপূর্বে ঘোষণা দিয়েছে জুনের শেষে চলতি বছরের এইচএসসি পরীক্ষা শুরু হবে। সেভাবেই শিক্ষার্থীরা প্রস্তুতি নিচ্ছিলো। কিন্তু মন্ত্রী এহছানুল হক মিলন হঠাৎ করে এখন সিদ্ধান্ত চাপিয়ে দিলেন পরীক্ষা এগিয়ে আনার। পরীক্ষার যে সিডিউল ঘোষণা করা হয়েছে তাতে ঈদুল আযহার পরপরই পরীক্ষা অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে। তাছাড়া পরীক্ষার সিডিউলে গুরুত্বপূর্ণ সাবজেক্টের আগে কোনো গ্যাপও রাখা হয়নি। এসব নিয়ে পরীক্ষার্থী এবং অভিভাবকদের মধ্যে চরম অসন্তোষ রয়েছে।

তারা বলছেন, পরীক্ষা এগিয়ে আনার এই খবর শুনে অনেক শিক্ষার্থীর মাথায় যেন আকাশ ভেঙে পড়ার অবস্থা হয়েছে। এটাই স্বাভাবিক। একজন স্টুডেন্ট তার পরীক্ষার প্রস্তুতি সবসময় একটি নির্দিষ্ট সময় ধরে পরিকল্পনা করে। কতদিন সময় আছে, কখন কোন বিষয় পড়বে, কোন বিষয়ে কতটা সময় দেবে- সব কিছু আগেই ঠিক করে রাখে। এমন পরিস্থিতিতে হঠাৎ করে সময় এগিয়ে আনা কোনোভাবেই যৌক্তিক নয়। এতে হাজার হাজার শিক্ষার্থীর প্রস্তুতির পরিকল্পনা ভেঙে যায়। শিক্ষার্থীদের স্বার্থ ও মানসিক প্রস্তুতির বিষয়টি বিবেচনায় নেওয়া খুবই জরুরি।

অনলাইন ক্লাস নিয়ে বিতর্ক ও সমালোচনা
অনলাইন ক্লাস তিন দিন করা নিয়েও চরম বিতর্ক দেখা দিয়েছে। বলা হচ্ছে, এর মাধ্যমে দেশে হাইব্রিড শিক্ষার্থী তৈরি করা হবে, যা আদতে ভবিষ্যতে দেশের কোনো কাজে আসবে না। করোনার সময় অনলাইন ক্লাসের অভিজ্ঞতা আমাদের ভালো নয়। প্রযুক্তিগত সীমাবদ্ধতা ও অভিভাবকদের অসচেতনতার কারণে শিক্ষার্থীদের বড় একটি অংশ পিছিয়ে পড়েছিল। আবার অনলাইনে ক্লাস করে শিখবে- এমন মনমানসিকতা এখনো অনেক শিক্ষার্থীর তৈরি হয়নি। শিক্ষার্থীরা ক্লাসবিমুখ হওয়ার শঙ্কাও রয়েছে।

শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের এ পরিকল্পনার সমালোচনা করে সচেতন মহল বলছেন, তিন দিন অনলাইন ক্লাসের বিষয়ে নীতিগত সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে মন্ত্রণালয়ের আরও চিন্তা করার দরকার। শিক্ষা কোনো ছেলেখেলা নয়। এর সঙ্গে পুরো জাতির ভবিষ্যৎ জড়িত। প্রয়োজনে অন্যান্য খাতে জ্বালানি নিয়ন্ত্রণ করে শিক্ষাকে অগ্রাধিকার দিতে হবে।
যদিও সরকার এ বিষয়ে এখন পর্যন্ত চূড়ান্তভাবে কোনো নির্দেশ জারি করেনি, কিন্তু এরমধ্যেই বিষয়টি নিয়ে ব্যাপক সমালোচনা তৈরি হয়েছে। গত ৩১ মার্চ শিক্ষামন্ত্রী এহছানুল হক মিলন সাংবাদিকদের সঙ্গে আলোচনায় সপ্তাহে তিন দিন অনলাইনে ক্লাস নেওয়ার কথা জানিয়েছিলেন। তারপর থেকেই শুরু হয়েছে কড়া সমালোচনা। তেল সংকটের দায় শিক্ষার্থীদের ওপর চাপিয়ে না দিয়ে অফিস সময় অর্ধেকে নামিয়ে এনে অথবা অন্য কোনোভাবে এটিকে ম্যানেজ করে নেওয়ার পরামর্শ দিচ্ছেন বিশ্লেষকরা।

ভালো-খারাপ চিন্তা না করে, এমনকি নিজেরা আলোচনা করে গণমাধ্যমে আগাম ঘোষণা করার ঘটনায় প্রশ্ন দেখা দিয়েছে। কারণ এতে অযথাই সরকারের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন হচ্ছে। সরকারের ব্যর্থতা, অদক্ষতা ফুটে উঠছে। সরকারের শুভাকাক্সক্ষীরা এরজন্য মন্ত্রীকে দায়ী করছেন।

সরকারের ভাবমূর্তি উজ্জ্বল করার পক্ষে কাজ করছেন নাকি বিপক্ষে?
শিক্ষামন্ত্রী হিসেবে ড. আ ন ম এহছানুল হক মিলন এমন ধারাবাহিক বিতর্কিত কর্মকাণ্ড থেকে বেরিয়ে না আসলে সরকারের বিরুদ্ধে অসন্তোষ ছড়িয়ে দেওয়ার জন্য তিনি একাই যথেষ্ট হবেন, বলছেন শিক্ষা সংশ্লিষ্টরা। শিক্ষার্থী, অভিভাবক, শিক্ষক প্রভৃতি মিলে হিসাব করলে দেখা যাবে, দেশের অধিকাংশ মানুষ কোনো না কোনোভাবে শিক্ষা খাতের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট। সেই বিবেচনায় শিক্ষা খাতে সরকারের সম্পর্কে নেতিবাচক কোনো ধারণা তৈরি হলে এর প্রভাবে গোটা সরকারের ভাবমূর্তিতে আঘাত লাগবে, এতে কোনো সন্দেহ নেই। শেখ হাসিনা ও আওয়ামী লীগ সরকারের সবচেয়ে বেশি ক্ষতি করেছে শেষ দিকের শিক্ষা নীতি। হাতে-কলমে শিক্ষার নামে যে অযৌক্তিক বিষয়গুলো প্রাথমিক ও মাধ্যমিকের পাঠ্যক্রমে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছিল তাতে সাধারণ মানুষ এমনকি কট্টর আওয়ামী সমর্থকরাও ক্ষেপে উঠেছিল। অভিজ্ঞমহলের মতে, আওয়ামী সরকারের বিরুদ্ধে গণঅভ্যুত্থানে এটিও পরোক্ষভাবে বড় রকমের ভূমিকা রেখেছে।

নবগঠিত বিএনপি সরকারের শিক্ষামন্ত্রী ড. এহছানুল হক মিলন অতীতে নানা বেপরোয়া কর্মকাণ্ডের কারণে বিশেষভাবে পরিচিত। ইতিবাচক দিক বিবেচনা করলে শুধুমাত্র ২০০১-০৬ সময়ে শিক্ষা প্রতিমন্ত্রী থাকাকালে নকল বিরোধী পদক্ষেপ তাকে আজকের ‘শিক্ষামন্ত্রী’র অবস্থানে নিয়ে এসেছে। বলা যায়, প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান এই ইতিবাচক দিকটি বিবেচনা করেই তাকে শিক্ষামন্ত্রীর মতো গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব দিয়েছেন। কিন্তু শিক্ষা খাতে এখনকার সমস্যা শুধু ‘নকল’ই নয়। অনেক সমস্যায় জর্জরিত এখনকার শিক্ষাখাত। তারমধ্যে বহুল আলোচিত এবং বড় সমস্যা হলো ‘দুর্নীতি’। বর্তমান বিএনপি সরকারেরও এটা সবচেয়ে বড় এবং গুরুত্বপূর্ণ নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি। নির্বাচনী প্রচারণায় তারেক রহমান সবচেয়ে বেশি বার বলেছেন, যে কোনো মূল্যে দুর্নীতি দূর করার কথা। যদিও নতুন শিক্ষামন্ত্রী ড. আ ন ম এহছানুল হক মিলন এখন পর্যন্ত এ কাজে হাতই দেননি। বরং দেখা যাচ্ছে, শিক্ষা খাতের দুর্নীতিবাজদের সবাইকে স্বপদেই বহাল রেখেছেন তিনি। তাঁর এমন পদক্ষেপকে ‘দুর্নীতিবাজদের জামাই আদর’ বলে আখ্যায়িত করছেন কেউ কেউ। এ নিয়ে নানা কথা উঠছে। যেহেতু এখন পর্যন্ত নবগঠিত বিএনপি সরকার ‘হানিমুন’ সময়ে আছে তাই সমালোচনা এড়িয়ে চলছে গণমাধ্যমগুলো, তবে ‘হানিমুন’ সময় অতিক্রান্ত হওয়ার পর এ ইস্যুতে ব্যাপক সমালোচনা আশংকা রয়েছে। তখন আর শোধরানোর সময় পাওয়া যাবে কিনা সন্দেহ রয়েছে।

শুধুমাত্র প্রতিমন্ত্রী থাকাকালের ‘নকল বিরোধী অভিযান’র কথাটি বাদ দিলে ড. আ ন ম এহছানুল হক মিলনের বিগত দিনের পুরো সময়টাই ছিল নেতিবাচক। এমনকি প্রতিমন্ত্রী থাকাকালেও তিনি ‘হেলিকপ্টার মিলন’ নামে কুখ্যাতি পেয়েছিলেন। ওয়ান ইলেভেনে বিএনপি ক্ষমতাচ্যুতির পরে গত দুই দশকে মিলন রাজনীতিতে বলা যায় অনেকটাই নিষ্ক্রিয় ছিলেন। যদিও তিনি পদের দিকে ‘আন্তর্জাতিক বিষয়ক সম্পাদক’র মতো গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বে ছিলেন। আওয়ামী ফ্যাসিস্ট সরকারের আমলে ২০১৮ সালের নির্বাচনের সময় বিএনপিকে সবচেয়ে বেশি বিব্রতকর অবস্থায় ফেলেন এই মিলন। দীর্ঘকাল বিদেশে বসবাসের পর নির্বাচনের আগ মুহূর্তে হঠাৎ করে দেশে আসেন। পুরনো মামলায় গ্রেফতার হয়ে জামিনে মুক্তি পান। কিন্তু মনোনয়ন না পাওয়াকে কেন্দ্র করে নজিরবিহীন বিশৃঙ্খলার সৃষ্টি করেন। বিএনপি চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়া তখন মিথ্যা মামলায় কারাগারে আটক। আর এদিকে এহছানুল হক মিলনের সমর্থকরা নয়াপল্টনস্থ বিএনপির কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে প্রধান ফটকে তালা দিয়ে কার্যালয়ের সামনে লাগাতার বিক্ষোভ মিছিল করতে থাকে। ওই সময় ‘জিয়া পরিবার’ নিয়েও কটুক্তি এবং নানা রকমের মিথ্যা প্রচারণা চালানো হয়। এসবের পেছনে এহছানুল হক মিলন ছাড়াও ফ্যাসিস্ট আওয়ামী সরকারের ইন্দন ছিল বলে অভিযোগ রয়েছে। এতো কিছুর পরও বিএনপি ওই সময় তার বিরুদ্ধে কোনোই ব্যবস্থা নেয়নি, যেহেতু বিএনপির জন্য ওই সময়টা ছিল চরম সংকটকাল। কিন্তু এরপরও দেখা গেলো, মিলন নিজেকে আর শুধরে নেননি। দীর্ঘকাল দূরে সরে ছিলেন। বিএনপির আন্তর্জাতিক বিষয়ক সম্পাদকের মতো গুরুত্বপূর্ণ পদে থাকলেও এ বিষয়ে কোনোই ভূমিকা রাখছিলেন না। নিজের এলাকা থেকেও বিচ্ছিন্ন। এমন অবস্থায় ২০২২ সালে আন্তর্জাতিক বিষয়ক সম্পাদক পদ থেকে পদাবনতি দিয়ে নির্বাহী সদস্য করা হয় মিলনকে। তিনি বিএনপির কেন্দ্রীয় এ সিদ্ধান্তকে নিজের ‘ভারমুক্তি’ বলে কটাক্ষ করেন গণমাধ্যমে দেওয়া প্রতিক্রিয়ায়। অর্থাৎ তিনি বোঝাতে চেয়েছেন বিএনপির পদটা তার জন্য বোঝা।

অথচ সেই বিএনপির কল্যাণেই তিনি এখন শিক্ষার মতো বড় এবং গুরুত্বপূর্ণ মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বে। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান এহছানুল হক মিলনের অতীতের নেতিবাচক দিকগুলো এড়িয়ে শুধুমাত্র নকল বিরোধী অভিযানের কথাটি বিবেচনা করেই ভেবে নিয়েছিলেন, ভালো কিছু দিতে পারবেন মিলন। তাই তিনি শিক্ষা খাতের যাবতীয় জঞ্জাল, অনিয়ম-দুর্নীতি, বিশৃঙ্খলা দূর এবং শিক্ষা খাতকে এগিয়ে নেওয়ার দায়িত্ব দিয়েছিলেন মিলনকে। প্রধানমন্ত্রী আশা করেছিলেন মিলনের মাধ্যমে সরকার, দেশ এবং জাতি উপকৃত হবে; বিএনপি সরকারের ভাবমূর্তি উজ্জ্বল হবে। কিন্তু দেখা যাচ্ছে, মন্ত্রী পদে আসীন হওয়ার পর মিলন এ পর্যন্ত যে ক’টি পদক্ষেপ নিয়েছেন প্রতিটি পদক্ষেপই ব্যাপক সমালোচনা ও বিতর্কের জন্ম দিচ্ছে। এতে বিএনপি সরকারের ভাবমূর্তি দফায় দফায় ক্ষুণ্ন হচ্ছে। সাধারণ মানুষ বিরক্ত হচ্ছেন। তাঁর এমন কর্মকাণ্ডে প্রশ্ন দাঁড়াচ্ছে, এহছানুল হক মিলন কি আদতে সরকারের ভাবমূর্তি উজ্জ্বল করার পক্ষে কাজ করছেন নাকি বিপক্ষে? বিশ্লেষকদের মতো, মিলনের এসব কর্মকাণ্ডে সরকারের ভাবমূর্তি যতটা ক্ষুণ্ন হচ্ছে তা শুধুমাত্র নকল বিরোধী অভিযানের মাধ্যমে পূরণ করা যাবে কিনা এ ব্যাপারে সন্দেহ রয়েছে।
শীর্ষনিউজ