মধ্যপ্রাচ্যে ইরান ও ইসরাইল-যুক্তরাষ্ট্র যুদ্ধের কারণে জ্বালানি সংকটের প্রভাব পড়েছে দেশের তৈরি পোশাক খাতে। পর্যাপ্ত জ্বালানির অভাবে দুশ্চিন্তায় পড়েছে তৈরি পোশাক খাতের ব্যবসায়ীরা। তাদের অভিযোগ, শিল্প মালিকরা কারখানা সচল রাখতে চাহিদা মতো ডিজেল, ফার্নেস অয়েল, প্রাকৃতিক গ্যাস ও এলএনজি পাচ্ছেন না। এ ছাড়া যুদ্ধ যদি লম্বা সময় স্থায়ী হয় তখন এর প্রভাব সরাসরি পড়বে। বিজিএমইএ’র প্রতিবেদন ও পোশাক খাত সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে কথা বলে এসব তথ্য জানা গেছে।
পোশাক খাত সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন, গ্যাসের চাপ কমে যাওয়ায় অনেক কারখানা পূর্ণ সক্ষমতার অর্ধেকও উৎপাদন করতে পারছে না। বিকল্প হিসেবে ডিজেলচালিত জেনারেটর ব্যবহার করতে গিয়ে উৎপাদন খরচ দ্বিগুণ হয়ে যাচ্ছে। অনেক পাম্পে তেল থাকলেও দিচ্ছে না। অনেক সময় তেল নিতে অতিরিক্ত টাকা দিতে হচ্ছে। এমন পরিস্থিতিতে শিল্প খাতকে অগ্রাধিকার দিয়ে জ্বালানি সরবরাহ নিশ্চিত করার দাবি জানিয়েছেন তারা। তাদের মতে, জ্বালানি ব্যবস্থাপনায় পরিকল্পিত ও অগ্রাধিকারভিত্তিক পদক্ষেপ নেয়া এখন গুরুত্বপূর্ণ। এ অবস্থায় শিল্পকারখানায় নিরবচ্ছিন্ন জ্বালানি, গ্যাস ও বিদ্যুৎ সরবরাহে সরকারের প্রয়োজনীয় উদ্যোগ গ্রহণ এবং করণীয় নির্ধারণের ওপর গুরুত্বারোপ করেছেন সংশ্লিষ্টরা।
সূত্র বলছে, বিশ্ববাজারে প্রতিনিয়ত মূল্যবৃদ্ধি, দেশে সরবরাহ কমে যাওয়া এবং ব্যবসায়ী সিন্ডিকেটের অবৈধ মজুতের কারণে জ্বালানি তেলের বাজারে অস্থিরতা ছড়িয়ে পড়েছে। ফলে বিদ্যুতের লোডশেডিংয়ের সময় জ্বালানি তেলের অভাবে জেনারেটর চলছে না শিল্পকারখনায়। এতে করে অনেক সময় উৎপাদন বন্ধ রাখতে হচ্ছে উদ্যোক্তাদের।
তথ্য বলছে, দেশের শিল্প খাত প্রধানত গ্যাস ও বিদ্যুতের ওপর নির্ভরশীল। বর্তমানে বিদ্যুৎ উৎপাদনের প্রায় ৬৬ শতাংশ গ্যাসভিত্তিক। মধ্যপ্রাচ্য থেকে এলএনজি আমদানি ব্যাহত হওয়ায় শিল্পাঞ্চলগুলোতে গ্যাসের চাপ আশঙ্কাজনকভাবে কমে গেছে।
বাংলাদেশ গার্মেন্টস ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যান্ড এক্সপোর্টার্স এসোসিয়েশন (বিজিএমইএ) সভাপতি মাহমুদ হাসান খান বলেন, বিশ্ববাজারে জ্বালানি তেলের দাম বাড়ায় উৎপাদন খরচ বৃদ্ধির পাশাপাশি পশ্চিমা ক্রেতাদের ক্রয়ক্ষমতা কমে যায়। ফলে আমাদের অর্ডার কমার একটি বড় ঝুঁকি তৈরি হয়েছে। তবে জ্বালানি-সংকটে এখনো আমাদের সেভাবে সমস্যায় পড়তে হচ্ছে না। যদি লম্বা সময় এটি অব্যাহত থাকে তখন এর প্রভাব পড়বে। আমরা ইতিমধ্যেই আমাদের মেম্বারদের কারখানা পরিচালনার জন্য জেনারেটরের কী পরিমাণ ডিজেল প্রয়োজন তার একটি চাহিদাপত্র সংগ্রহ করেছি। এই চাহিদাপত্র নিয়ে সরকারের সঙ্গে আলোচনা করবো। যাতে উৎপাদন ও ট্রান্সপোর্ট সচল থাকে।’
বাংলাদেশ নিটওয়্যার ম্যানুফ্যাকচার্স অ্যান্ড এক্সপোর্টার্স এসোসিয়েশনের (বিকেএমইএ) সংশ্লিষ্টরা বলছেন, এখনো সরাসরি যুদ্ধের প্রভাব ব্যাপকভাবে না পড়লেও লম্বা সময় এই সংকট চলতে থাকলে উৎপাদন ব্যাহত হবে। এ পরিস্থিতিতে অবৈধ মজুতদারদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেয়া জরুরি। পাশাপাশি বিকল্প উৎস থেকে জ্বালানি আমদানির উদ্যোগ নিতে হবে, তা না হলে রপ্তানিমুখী শিল্প মারাত্মক ঝুঁকিতে পড়বে।
বিকেএমইএ সভাপতি মো. হাতেম বলেন, মধ্যপ্রাচ্যে চলমান যুদ্ধের কারণে দেশের প্রধান বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনকারী পোশাক খাত বর্তমানে বহুমুখী চ্যালেঞ্জের মুখে রয়েছে। বিশেষ করে জ্বালানি তেলের অভাবে কারখানার নিজস্ব যানবাহনগুলো চলতে পারছে না। কারখানার জেনারেটর চালানো সম্ভব হচ্ছে না। ফলে লোডশেডিংয়ের সময় উৎপাদন পুরোপুরি বন্ধ রাখতে হচ্ছে। এ ছাড়া গ্যাসের চাপ কম থাকায় কারখানার বয়লার ও ডাইং ইউনিটগুলো কাক্সিক্ষত গতিতে চলছে না। তিনি বলেন, যারা এই দুঃসময়ে জ্বালানি তেলের অবৈধ মজুত করছে, তাদের দ্রুত আইনের আওতায় আনতে হবে। একইসঙ্গে জ্বালানি তেলের সংকট কাটাতে শিগগিরই বিকল্প উৎস থেকে তেল আমদানির উদ্যোগ নেয়া প্রয়োজন। অন্যথায় রপ্তানিমুখী শিল্পের উৎপাদন ব্যবস্থা ভেঙে পড়ার আশঙ্কা রয়েছে। তিনি আশঙ্কা প্রকাশ করে বলেন, সময়মতো পণ্য পাঠাতে না পারলে বিদেশি ক্রেতারা অর্ডার বাতিল করতে পারেন।
সম্প্রতি ঢাকা চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রি এক বিবৃতিতে উদ্বেগ প্রকাশ করে বলেছে, জ্বালানি তেলের দাম প্রতি ব্যারেলে মাত্র ১০ ডলার বাড়লে বাংলাদেশের মাসিক আমদানি বিল ৭০-৮০ মিলিয়ন ডলার বেড়ে যাবে, যা দেশের ভঙ্গুর রিজার্ভের ওপর মরণকামড় দিতে পারে। ইতিমধ্যে গত কয়েক মাসে জ্বালানি ও গ্যাস সংকটে শুধু নারায়ণগঞ্জেই ১৯টি পোশাক কারখানা বন্ধ হয়ে গেছে।
এদিকে সরকার বলছে, পরিস্থিতি নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে এবং চাহিদামতো প্রয়োজনীয় জ্বালানি আমদানির অনুমোদন দিচ্ছে। স্পট মার্কেট থেকে এলএনজি আমদানির চেষ্টা করা হচ্ছে। কমিটির পক্ষ থেকে বিকল্প জ্বালানি উৎস হিসেবে অন্যান্য দেশের সঙ্গে জি টু জি ভিত্তিতে চুক্তি করার প্রক্রিয়া শুরু করা হয়েছে।
মার্চে গতিহীন রপ্তানি: গতিহীন হয়ে পড়েছে দেশের রপ্তানি খাত। গত মার্চ মাসে আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় রপ্তানি কমেছে ১৮ শতাংশের বেশি। চলতি ২০২৫-২৬ অর্থবছরের গত ৯ মাসে আর কোনো মাসে এত বড় ব্যবধানে রপ্তানি কমেনি। এ নিয়ে গত ৮ মাস টানা রপ্তানি কমলো। দেশের রপ্তানির ইতিহাসে কখনো টানা ৮ মাস রপ্তানি কমার নজির নেই। রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরো (ইপিবি) তথ্যে দেখা গেছে, গত মার্চ মাসে রপ্তানির পরিমাণ ৩৪৮ কোটি ডলারে নেমে এসেছে। গত বছরের মার্চ মাসে রপ্তানির পরিমাণ ছিল ৪২৫ কোটি ডলার। অর্থাৎ এক মাসের ব্যবধানে রপ্তানি কমেছে ৭৭ কোটি ডলার, যা দেশীয় মুদ্রায় ৯ হাজার ৩৯৫ কোটি টাকা। সাধারণত মাসে সাড়ে ৪০০ থেকে ৫০০ কোটি ডলার পণ্য রপ্তানি হয়ে থাকে।
যুক্তরাষ্ট্রে পোশাক রপ্তানি কমেছে: যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক অফিস অব টেক্সটাইলস অ্যান্ড অ্যাপারেল (ওটেক্সা) প্রকাশিত সর্বশেষ তথ্যে দেখা যায়, ২০২৫ সালের একই সময়ের তুলনায় চলতি বছরের জানুয়ারি ও ফেব্রুয়ারি মাসে দেশটির বাজারে বাংলাদেশের রপ্তানি আয় কমেছে ৮.৫৩ শতাংশ। শুধু রপ্তানি আয় নয়, ইউনিটপ্রতি গড় মূল্য ও রপ্তানির পরিমাণ দুই ক্ষেত্রেই হ্রাস পেয়েছে। ওটেক্সার হিসাবে এ সময়ে ইউনিটপ্রতি দাম কমেছে ২.৪৭ শতাংশ এবং রপ্তানির ভলিউম কমেছে ৬.২১ শতাংশ। ফলে মূল্য ও পরিমাণ- উভয় সূচকের পতনের কারণে মোট আয় সংকুচিত হয়েছে।