সরকারের সমালোচনা করে ফেসবুকে পোস্ট দেওয়ার অভিযোগে গ্রেপ্তার হওয়া জামায়াতে ইসলামীর নারী কর্মী বিবি সাওদা সুমি মুক্তি পেয়েছেন। মঙ্গলবার (৭ এপ্রিল) জামায়াতে ইসলামীর আমির ডা. শফিকুর রহমান তার ভেরিফায়েড ফেসবুক পেজে এক পোস্টের মাধ্যমে সুমির মুক্তির বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন।
ডা. শফিকুর রহমান তার পোস্টে লেখেন, ‘আলহামদুলিল্লাহ, বোন সাওদা সুমি মুক্ত।’ গত রোববার (৫ এপ্রিল) রাত ১১টার দিকে জ্বালানি তেল সংকট নিয়ে ফেসবুকে ফটোকার্ড শেয়ার করার অভিযোগে নিজ বাসভবন থেকে তাকে গ্রেপ্তার করা হয়েছিল।
কারাগার থেকে মুক্তি পাওয়ার পর গণমাধ্যমে দেওয়া এক তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়ায় সাওদা সুমি তার ওপর হওয়া অন্যায়ের বর্ণনা দেন। তিনি বলেন, ‘আলহামদুলিল্লাহ। আল্লাহ তাআলা আমাকে মুক্ত করেছেন। আমি আবার সবার মধ্যে ফিরে আসতে পেরেছি। আমি সমসাময়িক বিষয়গুলো আমার ফেসবুকে লিখেছিলাম। আপনারা দেখেছেন, বিশেষ করে আমি বাচ্চাদের হামের সমস্যা এবং বর্তমানে তেলের সমস্যাগুলো নিয়ে লিখেছি। আমি আজকে থেকে না, ইউনুস সরকার বলেন বা হাসিনা সরকার বলেন—সবার সময়ই ফেসবুকে লেখালেখি করি। আমি এগুলো নিয়েই আছি, এটা আমি দেশকে ভালোবেসে করেছি। কিন্তু এই জন্য যদি আমাদের গলা চেপে ধরা হয়, কথা বলতে না দেওয়া হয়, তাহলে তো আমরা আবার ফ্যাসিজমে ফিরে যাব। আমরা তো ফ্যাসিজম চাই না দেখেই হাসিনাকে তাড়িয়েছি। সবাই মিলে আমরা জুলাইকে ধারণ করি, আমরা চাই না আবার ফ্যাসিজমে ফিরে যাই। আমি চাই না যে আমাদের মতো আর কাউকে এভাবে গলা চেপে ধরা হোক।’
সুমি সরকারের প্রতি আহ্বান জানিয়ে বলেন, ‘আমাদের সরকারের কাছে এটাই আবেদন, আমাদের অন্তত কথা বলতে দেওয়া হোক যাতে সরকার সঠিক পথে থাকে। সরকার যদি আমাদের কথা না শোনে, শুধুমাত্র তাদের দলের কথাই শোনে, তাহলে সরকার কখনোই সঠিক পথে থাকতে পারবে না। তাদের বিরোধী দলের কথাও শুনতে হবে, জনগণের কথাও শুনতে হবে। জনগণ ম্যান্ডেট দিয়ে তাদের সরকারে পাঠিয়েছে। সেই সরকার যদি জনগণের না হয়, তাহলে আমরা এই সরকার দিয়ে কী করব? আজকে সরকারের হস্তক্ষেপের কারণে আমার দুই ছোট বাচ্চা ও অসুস্থ বাচ্চাকে রেখে দুইটা রাত জেলখানায় কাটাতে হয়েছে। অবর্ণনীয় কষ্ট সহ্য করতে হয়েছে। না খেয়ে, না ঘুমিয়ে আছি আজকে দুইটা দিন। এই কষ্ট পাওয়ার জন্য তো আমরা এই সরকারকে নির্বাচিত করিনি। আমরা চাই সামনের দিনগুলোতে অন্তত আমাদের কথা বলতে দেওয়ার সুযোগ দেওয়া হোক।’
নিজের কর্মকাণ্ডের ব্যাখ্যা দিয়ে তিনি আরও বলেন, ‘আমি একজন ফ্রিল্যান্সার। আমি শুধুমাত্র ভিউ বা টাকার জন্য এই কাজ করতে যাব না। আমি অবশ্যই আমার দেশকে ভালোবেসে এই কাজ করেছি, আমার জনগণের জন্য কাজ করেছি। এটা আমার ব্যক্তিগত মতামত, আমি কাউকে চাপিয়ে দিইনি। আমি সরকারকে বলিনি যে আমার কথা আপনাদের শুনতেই হবে। আমি জনগণের জন্য কথা বলছি। এখন এই কথা বলার জন্য যদি আমাদের জনে জনে জেলে আটকে রাখা হয়, তবে সামনের দিকে কেউ কথা বলবে না। সবাই চুপ করে বোবা হয়ে থাকবে। তাহলে কি আগামী ১৭ বছর আমরা আবার জেলের মধ্যে থাকব? এই আন্দোলনে ২০০০ মানুষের রক্ত কি শুধু শুধু বৃথা যাবে? এতগুলো মানুষ অন্ধ হলো, পঙ্গু হলো। আমার ভাই-বোনদের এই ত্যাগের বিনিময়ে যদি আমরা সবাই চুপ করেই থাকি, তবে লাভ কী হলো? আমরা বাকস্বাধীনতা ফিরে পেতে এত রক্ত দিয়েছি, আমাদের সেই বাকস্বাধীনতা অন্তত কেড়ে নেওয়া না হোক।’
উল্লেখ্য, সাওদা সুমিকে গ্রেপ্তারের খবর ছড়িয়ে পড়ার পর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তীব্র প্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি হয়েছিল। বিশেষ করে তার তিন বছর বয়সী এক বাকপ্রতিবন্ধী সন্তানকে ঘরে রেখে মধ্যরাতে একজন নারীকে তুলে নেওয়ার বিষয়টিকে সাধারণ মানুষ চরম অমানবিক হিসেবে আখ্যায়িত করেন। সুমি দাবি করেন, তাকে দিয়ে অনেক কথা বলানোর চেষ্টা করা হলেও তিনি তার দেশপ্রেম এবং জনগণের অধিকারের প্রশ্নে অটল ছিলেন। অবশেষে দুই দিন কারাভোগের পর তিনি পরিবারের কাছে ফিরেছেন।