লক্ষ্মীপুরে দালাল বাজার খোয়াসাগর দিঘি থেকে রাতের অন্ধকারে মাছ ধরার ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকে ছড়িয়ে পড়েছে। এতে দেখা যায়, জেলা প্রশাসনের সহকারী কমিশনার হাসান মুহাম্মদ নাহিদ শেখ সুমন ও হাবিবুর রহমান ঘটনাস্থলে ছিলেন। পরে সরকারি গাড়িতেই মাছগুলো নিয়ে যায়। প্রত্যক্ষদর্শীদের দাবি, প্রায় ১০ লাখ টাকার মাছ ধরা হয়েছে।
বৃহস্পতিবার (২ এপ্রিল) রাত ২টা থেকে ভোর ৪টা পর্যন্ত লক্ষ্মীপুর পৌরসভার ১৫নং ওয়ার্ডের রায়পুর-ঢাকা আঞ্চলিক মহাসড়কের পাশে ঐতিহ্যবাহী খোয়াসাগর দিঘি থেকে মাছ ধরার কর্মযজ্ঞ চলে। খবর পেয়ে কয়েকজন সাংবাদিক সেখানে উপস্থিত হয়ে ভিডিও ধারণ করেন। ঘটনার সময় সহকারী কমিশনার শেখ সুমনের কাছ থেকে ভিডিও বক্তব্য চাইলে তিনি কৌশলে সটকে পড়েন।
স্থানীয়দের দাবি, দিঘিটি ইজারা না দেওয়ায় রাজস্ব হারাচ্ছে সরকার। আর রাতের অন্ধকারে প্রশাসনের লোকজন মাছ ধরে নিয়ে যাচ্ছে। এটি দুঃখজনক ঘটনা। রাতের অন্ধকারে কেন মাছ ধরতে হবে?
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, প্রায় আড়াইশ বছরের ঐতিহ্যবাহী খোয়াসাগর দিঘি বিস্তৃত প্রায় ২৫ একর। একসময় এ দিঘী লক্ষ্মীপুর পৌরসভা থেকে ইজারা দেওয়া হতো। প্রায় ১০ বছর আগে সাবেক ডিসি জিল্লুর রহমান চৌধুরী দিঘিটি জেলা প্রশাসনের অধীনে নিয়ে আসে। এরপর থেকে দিঘিটি ইজারা দেওয়া হয় কি না কেউ জানে না। দীর্ঘসময় দিনের আলোতে মাছ ধরতেও কেউ দেখেনি। সবশেষ সরকার পতনের পর মানুষ বড়শিসহ বিভিন্নভাবে দিঘির মাছ লুট করে। এরপর প্রায় দেড় বছরেও মাছ ধরতে দেখেনি কেউ। এই দিঘিতে এখন কারা মাছ ফেলে, কারা ধরে কেউ বলতে পারছে না।
এদিকে হঠাৎ করে বৃহস্পতিবার রাতে দুজন সহকারী কমিশনারের উপস্থিতিতে দিঘি থেকে মাছ ধরা হয়। আবার ওই মাছ সরকারি গাড়িতে (লক্ষ্মীপুর-ঠ ১১-০০১৯) উঠিয়ে নিয়ে যাওয়া হয়। ঘটনাস্থলে (ঢাকা মেট্রো- ১৩-৩৭৭৮) নাম্বারের আরও একটি সরকারি গাড়ি ছিল। দুটি গাড়ি করেই মাছ নিয়ে যাওয়া হয়। এসব দৃশ্য ভিডিও দেখা যায়।
প্রত্যক্ষদর্শীরা জানায়, প্রায় দুই টন মাছ ধরে নিয়ে গেছে প্রশাসনের লোকজন। এতে কাতল, রুই, চিতল, আইড় ও পাঙ্গাস মাছ ছিল। একেকটি চিতল প্রায় ৭-৮ কেজি ওজনের হবে। সব মাছ প্রশাসনের গাড়িতে করে নিয়ে যাওয়া হয়েছে। প্রায় ১০ লাখ টাকার মাছ ধরে নিয়ে গেছে প্রশাসন। তবে কোথায় নিয়েছে, কি করেছে, রাতের অন্ধকারেই কেন ধরতে হয়েছে তা বলতে পারেনি কেউ। তবে দুজন ব্যবসায়ীর কাছে প্রায় ১১২ কেজি তেলাপিয়া মাছ বিক্রি করা হয়েছে।
দালাল বাজারের মাছ ব্যবসায়ী তুহিন বলেন, ‘প্রশাসনের পক্ষ থেকে আমাদের ডাকা হয়েছে। আমাকে ৪২ কেজি তেলাপিয়া মাছ দিয়েছে। আর সিরাজ নামে লক্ষ্মীপুরের মাছ ব্যবসায়ী সিরাজকে ৭০ কেজি মাছ দেওয়া হয়েছে। তাও তেলাপিয়া মাছ। অন্য মাছ বিক্রি করেননি। যে মাছ আমাদের দিয়েছে, এতে আমাদের পোষাবে না।’
রাতে মাছ নিয়ে প্রশ্ন করলে সহকারী কমিশনার হাবিবুর রহমান সাংবাদিকদের বলেন, ‘মাছগুলো নিয়ে ডিসি অফিস থেকে পরে জানানো হবে। মাপজোপ করে তারপর জানানো হবে। মাছগুলো ডিসি অফিসে নেওয়া হচ্ছে।’
এদিকে শুক্রবার সকাল ১০টার দিকে সহকারী কমিশনার ও নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট হাসান মুহাম্মদ নাহিদ শেখ সুমন বলেন, ‘মাছ ধরে এতিমখানায় দিয়ে দেওয়া হয়েছে। মাছ বিক্রিও করা হয়েছে। সারাদিন ব্যস্ত ছিলাম, অফিস করেছি, এজন্য রাত হয়েছে। কত টাকার মাছ বিক্রি ও কি পরিমাণ মাছ এতিমখানায় দিয়েছে এমন প্রশ্নে তিনি আরও বলেন, ‘এটা আমি জানি না।’ কে জানেন তাও তিনি বলেননি।
এ বিষয়ে জানতে জেলা প্রশাসন এসএম মেহেদী হাসান, অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (সার্বিক) সম্রাট খীসা ও সদর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) ক্যাথোয়াইপ্রু মারমার দাপ্তরিক মোবাইল ফোনে একাধিকবার কল করলেও তারা রিসিভ করেননি। এ বিষয়ে তাদের বক্তব্য পাওয়া গেলে পরবর্তীতে সংযুক্ত করা হবে।