স্বাধীন বিচার বিভাগ প্রতিষ্ঠার জন্য অন্তর্বর্তী সরকারের নেওয়া নানা পদক্ষেপ এখন অনিশ্চয়তার দোলাচলে। বিচারপতি নিয়োগ অধ্যাদেশ, বিচার বিভাগের জন্য পৃথক সচিবালয় এবং অধস্তন আদালত নিয়ন্ত্রণ সংক্রান্ত বিধিবিধানের অধ্যাদেশগুলো বাতিলের উদ্যোগ ও সংশোধনের সরকারি পদক্ষেপ তারই ইঙ্গিত বহন করছে। এদিকে সরকারের এসব পদক্ষেপের কড়া প্রতিবাদ জানিয়েছে বিরোধী দল।
সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, এর মাধ্যমে এ সংক্রান্ত উচ্চ আদালতের রায় এবং সর্বশেষ অন্তর্বর্তী সরকারের সংস্কার কাঠামোগুলোর বাস্তবায়ন নিয়ে সংশয় সৃষ্টি হয়েছে।
জুলাই গণঅভ্যুত্থান-পরবর্তী ব্যাপক আলোচনার পর গত বছরের ২০ নভেম্বর অন্তর্বর্তী সরকার স্বাধীন বিচার বিভাগ প্রতিষ্ঠার অংশ হিসেবে সুপ্রিম কোর্ট সচিবালয় অধ্যাদেশ, ২০২৫-এর খসড়ার চূড়ান্ত অনুমোদন দেয়। বিচার বিভাগের প্রাতিষ্ঠানিক স্বতন্ত্রীকরণ নিশ্চিতে প্রধান বিচারপতির উদ্যোগে ২০২৪ সালের ২৭ অক্টোবর সুপ্রিম কোর্ট থেকে পৃথক বিচার বিভাগীয় সচিবালয় গঠনসংক্রান্ত প্রস্তাবের অংশ হিসেবে এটি করা হয়। পরে গত বছরের ১১ ডিসেম্বর থেকে সুপ্রিম কোর্ট সচিবালয় তার কার্যক্রম শুরু করে। পৃথক এ সচিবালয়ের জন্য একজন সচিব, ১৫ জন জুডিশিয়াল অফিসার এবং ১৯ জন স্টাফ ইতোমধ্যে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে।
অনিশ্চয়তায় স্বাধীন বিচার বিভাগ
অন্তর্বর্তী সরকারের সময় জারি করা অধ্যাদেশের আলোকে সুপ্রিম কোর্ট পৃথক সচিবালয় কার্যক্রম শুরু করলেও সদ্য সমাপ্ত নির্বাচনের পর থেকে এর কার্যক্রমে অনেকটা স্থিতাবস্থা ও অনিশ্চতায় রয়েছে। স্বাধীন বিচার বিভাগ নিয়ে যে আশা তৈরি হয়েছিল, তা মুখ থুবড়ে পড়েছে। বিশেষ করে, বিচারপতি নিয়োগ অধ্যাদেশ এবং পৃথক সচিবালয় সংক্রান্ত বিধিবিধানগুলো নিয়ে সরকারের ভেতরে-বাইরে অনীহায় নতুন বিতর্ক তৈরি করেছে।
এ প্রসঙ্গে সদ্য সাবেক প্রধান বিচারপতি সৈয়দ রেফাত আহমেদ আমার দেশকে বলেন, স্বাধীন বিচার বিভাগ প্রতিষ্ঠার অংশ হিসেবে কঠোর পরিশ্রম ও একান্ত প্রচেষ্টায় অনেক কাজের অংশ হিসেবে পৃথক বিচার বিভাগ সচিবালয় প্রতিষ্ঠা করি। এছাড়া আমার সময়ই বিচারপতি নিয়োগে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিতে বিচারপতি নিয়োগ অধ্যাদেশ জারি করা হয়। সব উদ্যোগই ছিল স্বচ্ছ, স্বাধীন বিচার বিভাগ প্রতিষ্ঠায় আমার অঙ্গীকারের অংশ। আশা করছি, এগুলো আরো এগিয়ে নেওয়া হবে। বর্তমানে সরকারের এ সংক্রান্ত সর্বশেষ আপডেট পাওয়ার জন্য আমাদের হয়তো আরো কিছুদিন অপেক্ষা করতে হবে।
সুপ্রিম কোর্টের সিনিয়র আইনজীবী আহসানুল করিম বলেন, ‘বিচার বিভাগের জন্য পৃথক সচিবালয় হয়েছে, এটা ভালো খবর ছিল। কিন্তু মাসদার হোসেন মামলার ১২ দফা নির্দেশনা মানার ব্যাপারে সরকারের আন্তরিকতা প্রশ্নের সম্মুখীন। বিচারক নিয়োগ, বদলি, পদোন্নতি কিংবা সুপ্রিম জুডিশিয়াল কাউন্সিলের কার্যক্রমÑসব ক্ষেত্রেই সরকার চাইলে তার ক্ষমতা দেখাতে পারে। তাই বিচার বিভাগ পৃথক হলেও সম্পূর্ণ স্বাধীন হবে কি না তা নিয়ে সন্দেহ থেকেই যায়।’
তিনি বলেন, অধ্যাদেশের ধারা ১ (২)-এ উল্লেখ রয়েছে, ‘(২) সুপ্রিম কোর্ট সচিবালয় স্থাপন সম্পন্ন ও ইহার কার্যক্রম পূর্ণরূপে চালু হওয়া সাপেক্ষে সরকার, বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্টের সহিত পরামর্শক্রমে, ধারা ৭-এর বিধানাবলি সরকারি গেজেটে প্রজ্ঞাপন দ্বারা কার্যকর করিবে।’ অর্থাৎ সুপ্রিম কোর্ট সচিবালয় প্রতিষ্ঠার আইন হলেও তা বাস্তবায়ন হওয়ার আগ পর্যন্ত বিচারকদের বদলি, পদায়ন, নিয়ন্ত্রণ ও শৃঙ্খলাবিধান-সংক্রান্ত বিষয় সরকারের অধীনই রয়ে গেছে।
অন্যদিকে এখন বিচারপতি ও বিচারকদের জবাবদিহিতা সুপ্রিম জুডিশিয়াল কাউন্সিলের কাছে। আর প্রধান বিচারপতির জবাবদিহিতা রাষ্ট্রপতির কাছে। প্রধান বিচারপতির নিয়োগ রাষ্ট্রপতির হাতেই আছে। রাষ্ট্রপতি এক্ষেত্রে কাজ করেন প্রধানমন্ত্রীর পরামর্শে। তাহলে প্রধান বিচারপতির নিয়োগ কীভাবে রাজনীতিমুক্ত হবে বলে প্রশ্ন উত্থাপন করেন তিনি।
সুপ্রিম কোর্টের সিনিয়র আইনজীবী শিশির মনির বলেন, বিচারপতি নিয়োগ অধ্যাদেশসহ সংশ্লিষ্ট অধ্যাদেশগুলো বাতিলের মাধ্যমে সরকার আবারও আগের অবস্থায় ফিরে যেতে চায়। অর্থাৎ আবার আগের মতোই দলীয় বিবেচনায় বিচারপতি নিয়োগ শুরু করার চেষ্টা করা হবে। যা জুলাই অভ্যুত্থানের স্পিরিট এবং গণমানুষের আকাঙ্ক্ষা ধূলিসাৎ করবে।
সিনিয়র এ আইনজীবী আরো বলেন, অন্তর্বর্তী সরকারের করা সংস্কারের ১৩৩টি অধ্যাদেশের ১২টি প্রধান সংস্কার অধ্যাদেশ বাতিল করার উদ্যোগ নিয়েছে বর্তমান বিএনপি সরকার। যার মধ্যে অন্যতম হলো বিচারপতি নিয়োগ অধ্যাদেশ, সুপ্রিম কোর্ট সচিবালয় অধ্যাদেশ, মানবাধিকার ও গুম অধ্যাদেশ ইত্যাদি। এসবই দীর্ঘদিন গণমানুষের আকাঙ্ক্ষা।
বিদ্যমান পরিস্থিতিতে অধস্তন আদালতের বিচারকদের সংগঠন ‘ইয়াং জাজেস ফর জুডিশিয়াল রিফর্ম’ নেতারা বলছেন, অন্তর্বর্তী সরকারের স্বাধীন বিচার বিভাগ সচিবালয় প্রতিষ্ঠা যুগান্তকারী পদক্ষেপ। ২০০৭ সালে আংশিক পৃথকীকরণ হলেও অধস্তন আদালতের নিয়ন্ত্রণ কার্যত নির্বাহী বিভাগের হাতেই ছিল। তারা জানান, রাষ্ট্র সংস্কারে সরকারি দল বিএনপির ঘোষিত ৩১ দফার ৯নং দফায় স্পষ্টভাবে অঙ্গীকার করা হয়েছে, মাসদার হোসেন মামলার রায়ের আলোকে বিচার বিভাগের কার্যকর স্বাধীনতা নিশ্চিত করা হবে, অধস্তন আদালতের নিয়ন্ত্রণ ও শৃঙ্খলা বিধানের কর্তৃত্ব সুপ্রিম কোর্টের ওপর ন্যস্ত করা হবে এবং বিচার বিভাগের জন্য সুপ্রিম কোর্টের নিয়ন্ত্রণাধীন একটি পৃথক সচিবালয় থাকবে। পাশাপাশি বিএনপির নির্বাচনি ইশতেহারের সাংবিধানিক সংস্কার অংশের ২০ নং দফায় অধস্তন আদালতের বিচারকদের চাকরির নিয়ন্ত্রণ সম্পূর্ণভাবে সুপ্রিম কোর্টের ওপর ন্যস্ত করতে সংবিধান সংশোধনের অঙ্গীকার রয়েছে এবং স্বাধীন বিচার বিভাগ অংশে পৃথক সচিবালয়কে আরো শক্তিশালী করার প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছে।
অন্যদিকে, জুলাই-আগস্ট গণঅভ্যুত্থানের অন্যতম মূল স্পিরিট ছিল রাষ্ট্রের প্রতিটি প্রতিষ্ঠানের জবাবদিহিতা ও স্বাধীনতা নিশ্চিত করা। জুলাই জাতীয় সনদে দেশের সব প্রধান রাজনৈতিক দল স্বাধীন বিচার বিভাগ প্রতিষ্ঠার বিষয়ে একমত হয়েছে। তাই জাতীয় ঐকমত্যকে সম্মান জানানোই নির্বাচিত সরকারের সাংবিধানিক ও নৈতিক দায়িত্ব বলে মনে করে ‘ইয়াং জাজেস ফর জুডিশিয়াল রিফর্ম।’
এমতাবস্থায় সংসদের প্রথম অধিবেশন শুরুর তারিখ থেকে ৩০ দিনের মধ্যে ‘সুপ্রিম কোর্ট সচিবালয় অধ্যাদেশ, ২০২৫’ আইন হিসেবে পাস করার জন্য সরকারের কাছে জোর দাবি জানান ‘ইয়াং জাজেস ফর জুডিশিয়াল রিফর্ম’ নেতারা। একইসঙ্গে রাজনৈতিক দলগুলোর নির্বাচনি ইশতেহারে দেওয়া অঙ্গীকার এবং জুলাই জাতীয় সনদের ঐকমত্য অনুযায়ী বিচার বিভাগের পূর্ণাঙ্গ স্বাধীনতা নিশ্চিত করতে সংবিধানের প্রয়োজনীয় সংশোধনেরও অনুরোধ জানান তারা।
এ বিষয়ে সুশাসনের জন্য নাগরিক (সুজন) সম্পাদক বদিউল আলম মজুমদার আমার দেশকে বলেন, অন্তর্বর্তী সরকারের ১৩৩ অধ্যাদেশের মধ্যে সরকারি দলের পক্ষ থেকে ১১৩টি অনুমোদনের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। বাকি ২০টি অধ্যাদেশ যাচাই-বাছাই চলছে। তারা প্রস্তাব করেছে, এর মধ্যে কয়েকটি অধ্যাদেশ সংসদে আলোচনার মাধ্যমে সিদ্ধান্ত হবে। যেগুলোর মধ্যে অন্তর্ভুক্ত দুর্নীতি দমন কমিশন অধ্যাদেশ, জাতীয় মানবাধিকার কমিশন সংশোধন অধ্যাদেশ, পুলিশ কমিশন অধ্যাদেশ, গুম প্রতিরোধ ও প্রতিকার অধ্যাদেশ, বিচারক নিয়োগ অধ্যাদেশ ইত্যাদি। দুর্ভাগ্যবশত অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে জারি করা জরুরি ও গুরুত্বপূর্ণ অধ্যাদেশগুলোই সংসদের অনুমোদনের ওপর ছেড়ে দেওয়া হয়েছে বলে শোনা যাচ্ছে। এগুলোর মাধ্যমেই গুরুত্বপূর্ণ সংস্কার অর্জিত হওয়ার সম্ভাবনা সৃষ্টি হয়েছে। আশা করি, গুরুত্বপূর্ণ এসব অধ্যাদেশ নিয়ে অযথা বিতর্ক তৈরি না করে জনমতের প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে এগুলো কার্যকর করা হবে।
তিনি আরো বলেন, ‘আমরা যখন ঐকমত্য কমিশনে ছিলাম, বিএনপির পক্ষ থেকে যারা সেখানে প্রতিনিধিত্ব করেছিলেন, তারা যে বক্তব্য দিয়েছেন, তারা কিন্তু গণভোটের রায় মানার কথা বলেছিলেন। আমরা আশা করি, জনগণের রায় মেনে নিয়ে দরকার হলে সরকারি দল ও বিরোধী দল আলাপ-আলোচনা করে জনগণের রায়কে সমুন্নত রাখবে। গণভোটে যে ৪৮টি বিষয় জনগণের কাছে উপস্থাপন করা হয়েছে, জনগণ ‘হ্যাঁ’-এর পক্ষে রায় দিয়েছে। সংশ্লিষ্ট সবাই এটা মেনে নিয়ে সংবিধান সংশোধন করবে বলে আশাবাদ ব্যক্ত করেন তিনি।