চলতি বছরের শুরুতেই দেশের বিভিন্ন স্থানে খুব ছোঁয়াচে ভাইরাসজনিত হামের রোগী শনাক্ত হয় । অতি সংক্রামক রোগটি মার্চে এসে দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে । হাম টিকা প্রয়োগের মাধ্যমে প্রায় শতভাগ প্রতিরোধযোগ্য রোগ হওয়া সত্ত্বেও এর রোগী ও মৃত্যুর সংখ্যা বাড়ছে । নিয়মিত টিকাদান কর্মসূচি চললেও গত পাঁচ বছরে কোনো বিশেষ কর্মসূচি ( ক্যাম্পেইন ) হয়নি ।
সরকারি কর্তৃপক্ষ বলছে , বর্তমানে হামের প্রায় ২ কোটি টিকা হাতে থাকলেও লজিস্টিক , জনবল ও অর্থসংকটের কারণে এখনই ক্যাম্পেইন শুরু করা যাচ্ছে না । জানুয়ারি থেকে শুরু হয়ে হামের প্রকোপ অন্তত ১২ জেলায় ছড়িয়ে পড়েছে । এটি কার্যত জনস্বাস্থ্য সংকটে রূপ নিয়েছে । হামে আক্রান্ত হয়ে বেশ কিছু শিশুর মৃত্যু হয়েছে । সারা দেশে হাজারের বেশি শিশু রোগটিতে আক্রান্ত হয়েছে । সংক্রমণ বেশি ঢাকা, নরসিংদী, গাজীপুর , ময়মনসিংহ , রাজশাহী , পাবনা , চাঁপাইনবাবগঞ্জ , চট্টগ্রাম , খুলনা ও ভোলায় ।
জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা বলছেন, দীর্ঘদিন ধরে টিকাদান কার্যক্রমে ঘাটতি , প্রশাসনিক অব্যবস্থাপনা এবং নজরদারির দুর্বলতার ফল এবারের প্রকোপ । টিকা সরবরাহ ও বিতরণে জটিলতা , মাঠপর্যায়ের কার্যক্রমের ভাটা এবং সঠিক তথ্যের অভাব—সব মিলিয়ে চলতি বছরে হামের এই মাত্রার প্রাদুর্ভাব দেখা দিয়েছে ।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের সম্প্রসারিত টিকাদান কর্মসূচি ( ইপিআই ) সূত্রে জানা গেছে , চলতি বছরের ফেব্রুয়ারিতে দেশে প্রায় ২ কোটি হাম ও রুবেলার ( এমআর ) টিকা সরকারের হাতে এসেছে । তবে লোকবল ও প্রয়োজনীয় সরঞ্জামের অভাবে এখনই তা ক্যাম্পেইনের মাধ্যমে প্রয়োগ করা যাচ্ছে না । দেশে সরকারি পর্যায়ে ১৯৮৮ সালে এমআর টিকাদান কার্যক্রম শুরু হয়ে এ পর্যন্ত ধারাবাহিকভাবে চলে আসছে । ক্যাম্পেইনের জন্য গঠিত বৈশ্বিক জোট গ্লোবাল অ্যালায়েন্স ফর ভ্যাকসিনস অ্যান্ড ইমিউনাইজেশন (গ্যাভি) এই টিকা দেওয়ার খরচ বহন করে । আর নিয়মিত ইপিআইয়ের টিকা সরকার নিজে কেনে ।
ইপিআইয়ের উপপরিচালক ডা . মোহাম্মদ শাহরিয়ার সাজ্জাদ আজকের পত্রিকাকে বলেন, ‘ বর্তমানে হাম ও এমআর ক্যাম্পেইনের জন্য প্রয়োজনীয় ২ কোটি টিকা সরকারের হাতে আছে । তবে ক্যাম্পেইন কার্যকরভাবে চালানোর জন্য সিরিঞ্জ , লজিস্টিক , প্রশিক্ষণ এবং অন্যান্য খরচের তহবিল এখনো গ্যাভি থেকে পাওয়া হয়নি । সিরিঞ্জ পাঠানোর জন্য ইতিমধ্যেই চিঠি দেওয়া হয়েছে এবং মে , জুন , জুলাই মাসে পর্যায়ক্রমে ৭২ লাখ , ৮০ লাখ ও ৫৪ লাখ সিরিঞ্জ পাঠানোর কথা রয়েছে ।
ইপিআই উপপরিচালক জানান , ক্যাম্পেইনের প্রস্তুতি শুরু হলেও তহবিল না পাওয়া পর্যন্ত তার সুনির্দিষ্ট সময় নির্ধারণ সম্ভব নয় । সাধারণভাবে প্রস্তুতি নিতে দুই মাস সময় লাগে । একই সঙ্গে শিক্ষা , মহিলা ও শিশু , সংস্কৃতি , ধৰ্ম , স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়সহ অনেক অংশীজনের সঙ্গে সমন্বয় করতে হয় । নিয়মিত টিকাদান কর্মসূচিতে বর্তমানে কিছু জেলায় টিকার স্বল্পতা রয়েছে । আগামী সপ্তাহে ইউনিসেফে ৪১৯ কোটি টাকা অগ্রিম পাঠানো হলে আশা করা হচ্ছে দ্রুত টিকা সরবরাহ হবে এবং মাঠপর্যায়ে স্বল্পতা থাকবে না । যেসব স্থানে এমআর টিকা নেই সেসব জায়গায় আপাতত ক্যাম্পেইনের জন্য পাওয়া টিকাই পাঠানো হতে পারে । স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের কর্মকর্তারা আভাস দিয়েছেন টিকা ক্যাম্পেইন শুরু হতে জুন - জুলাই মাস হয়ে যেতে পারে বলে । সে ক্যাম্পেইনের আওতায় দেশজুড়ে ১ কোটি ৯৮ লাখ শিশুকে টিকা দেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে । এ জন্য এপ্রিলে স্বাস্থ্যকর্মীদের প্রশিক্ষণ দেওয়ার প্রস্তুতিও চলছে । প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা, সংক্রামক ও অসংক্রামক রোগ নিয়ন্ত্রণ, টিকাসহ দেশের স্বাস্থ্য খাতের ৩০ টির বেশি উদ্যোগ পাঁচ বছর মেয়াদি কৌশলগত পরিকল্পনা বা ওপির মাধ্যমে পরিচালিত হয়ে আসছে । সর্বশেষ ওপি ছিল ‘চতুর্থ স্বাস্থ্য , জনসংখ্যা ও পুষ্টি সেক্টর কর্মসূচি ( এইচপিএনএসপি ) ' ,যা ২০২৪ সালের জুনে শেষ হয় । এরপর আর ওপি অনুমোদিত হয়নি । ২০২৫ সালের আগস্টে রাজস্ব খাতের মাধ্যমে সমস্ত স্বাস্থ্যসেবা কার্যক্রম চালু রাখার পরিকল্পনা নেয় সরকার ।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা বলেছেন , প্রকল্প তৈরি , অনুমোদন , প্রকল্প পরিচালক নিয়োগ এবং অর্থছাড় ইত্যাদি সবকিছুতে দেরি হওয়ায় টিকাসহ স্বাস্থ্য খাতের কার্যক্রমে বিলম্ব ঘটেছে । অন্তত দুজন কর্মকর্তা জানিয়েছেন, ২০২৪ সালের ডিসেম্বরে নিয়মিত টিকাদান কার্যক্রমের কেনা টিকা দিয়ে ২০২৫ সালের জুন পর্যন্ত ভালোভাবেই চলে । এরপর নতুন অর্থ ছাড় না হওয়ায় সরবরাহে বিঘ্ন তৈরি হয়েছে । তবে এই ঘাটতি সারা দেশে একরকম ছিল না । উন্নয়ন প্রকল্প অনুমোদিত হলেও প্রকল্প পরিচালক নিয়োগ না হওয়ায় অর্থ ছাড় করা সম্ভব হয়নি । একই সঙ্গে রাজস্ব খাত থেকে অর্থ পাঠানোর ক্ষেত্রে পিপিআরসহ প্রক্রিয়াগত জটিলতা সময়মতো অর্থ সরবরাহ করা যায়নি । এসব কারণে টিকা সরবরাহব্যবস্থা ধীরে ধীরে অস্থিতিশীল হয়ে পড়েছে । এর ফলেই বর্তমান সংকট তৈরি হয়েছে ।
হাম প্রতিরোধে ইপিআইয়ের অধীনে ৯-১৫ মাস বয়সী শিশুদের নিয়মিত টিকা দেওয়া হয় । নিয়মিত কর্মসূচিতে প্রায় ৮৬-৯০ শতাংশ শিশু টিকা পায় । অর্থাৎ অন্তত ১০ শতাংশ শিশু টিকার বাইরে থাকে । বিশেষজ্ঞদের মতে , এই টিকাবঞ্চিত শিশুদের সংখ্যা ধীরে ধীরে বেড়ে গিয়ে কয়েক বছর পর বিষয়টি বড় ঝুঁকিতে পরিণত হয় এবং প্রকোপ দেখা দেয় । বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার নির্দেশনা অনুযায়ী প্রতি চার বছর অন্তর ‘ ফলোআপ ’ হাম টিকাদান ক্যাম্পেইন পরিচালিত হয় । বাদ পড়া শিশুদের টিকার আওতায় আনাই এর লক্ষ্য ।
সরকারের তথ্য অনুযায়ী , ২০১৭- ২০২৪ সালের মধ্যে এমআর -১ ( হাম - রুবেলা ) ও এমআর -২ টিকার কভারেজ সাধারণত ৮০ শতাংশের ওপরে থাকলেও ২০২৫ সালে তা ৬০ শতাংশের নিচে নেমে আসে । সর্বশেষ ২০২০ সালে বিশেষ কর্মসূচি পরিচালিত হলেও করোনা মহামারির কারণে ৩১ শতাংশ শিশু সঠিক সময়ে টিকা নিতে পারেনি । এদিকে বিদ্যমান পরিস্থিতির আলোকে ক্যাম্পেইনের ক্ষেত্রে ৬ মাস থেকে ৫ বছর বয়সী শিশুদের টিকা দেওয়ার সিদ্ধান্ত হয়েছে বলে জানিয়েছে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর । এত দিন ৯ মাস বয়স পূর্ণ হলেই কেবল শিশুরা হামের টিকা পেত । আর যেসব জেলায় সংক্রমণ বেশি সেখানে ৬ মাস থেকে ১০ বছর পর্যন্ত শিশুদের টিকা দেওয়া হবে । গতকাল সোমবার জাতীয় টিকাদান-সংক্রান্ত কারিগরি উপদেষ্টা গ্রুপের ( নাইট্যাগ ) সভায় এ সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে বলে জানান স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের পরিচালক ( রোগ নিয়ন্ত্রণ ) অধ্যাপক ডা . হালিমুর রশিদ ।
ডা . হালিমুর রশিদ আজকের পত্রিকাকে বলেন , বিশ্বের বিভিন্ন দেশে ক্যাম্পেইনে নির্ধারিত বয়সের আগেও টিকা দেওয়া হয় । এ বিষয়ে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার নির্দেশনা রয়েছে । তবে নিয়মিত কর্মসূচিতে ৯ মাসের আগে টিকা দেওয়া যাবে না । নিয়মিত কর্মসূচিতে বয়সসীমা অপরিবর্তিত রাখার কারণ হিসেবে ডা . রশিদ বলেন , এ বিষয়ে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার কোনো সুপারিশ নেই এবং এটি এখনো গবেষণাধীন । স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের পরিচালক ( হাসপাতাল ও ক্লিনিক ) ডা . আবু হোসেন মো . মঈনুল আহসান জানিয়েছেন , সারা দেশেই কমবেশি হামে আক্রান্ত হওয়ার তথ্য পাওয়া যাচ্ছে । বড় ১০ টি মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে আলাদা ওয়ার্ড খোলা হয়েছে । ঢাকায় শিশু হাসপাতাল, সংক্রামক ব্যাধি হাসপাতাল এবং ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশন মার্কেট হাসপাতালে হাম আক্রান্ত শিশুদের জন্য বিশেষ ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে । বিশেষজ্ঞের মূল্যায়ন হাম প্রতিরোধে টিকা কার্যক্রমে অব্যবস্থার পেছনে তিনটি বিষয় উল্লেখ করছেন পাবলিক হেলথ অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের প্রেসিডেন্ট (ইলেক্ট) অধ্যাপক ডা . আবু জামিল ফয়সাল ।
এই জনস্বাস্থ্যবিদ আজকের পত্রিকাকে বলেন, ‘ প্রথমত , সরকারি কর্মকর্তাদের মধ্যে পরিকল্পনার দূরদর্শিতার অভাব এবং রাজনৈতিক পরিবর্তনের প্রভাব। কয়েকবার সরকার পরিবর্তনের কারণেও কর্মকর্তারা দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা করতে পারেননি । ২০২৪ সালের নির্ধারিত ক্যাম্পেইনটি অনুষ্ঠিত হয়নি । দ্বিতীয়ত , ওপি অনুমোদন অনুমোদন ও বাস্তবায়নপ্রক্রিয়ায় বিলম্ব । এটি বাতিল করার আগে সম্ভাব্য সমস্যার পূর্বানুমান করা হয়নি । তৃতীয়ত , মাঠপর্যায়ে টিকাদান কর্মসূচিতে জনবল ঘাটতি । এসব কারণে টিকা কার্যক্রম স্থবির হয়েছে । এটি শিশুদের সুরক্ষা তথা জনস্বাস্থ্যের ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে । ’