দেশের চলমান জ্বালানি সংকট মানুষের আয় ও ব্যয়ের ওপর সরাসরি প্রভাব ফেলছে। একদিকে আয় কমছে, অন্যদিকে ব্যয় বেড়ে যাওয়ায় সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রা আরও কঠিন হয়ে উঠেছে। আয় কম, কিন্তু ব্যয় বেশি-এই দ্বৈত চাপে সাধারণ মানুষ অনেকটা দিশেহারা। বিশেষ করে নিম্ন আয়ের মানুষ আর্থিকভাবে বিপর্যস্ত হয়ে পড়ছে। কর্মসংস্থানের সবচেয়ে বড় খাত ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্পের (এসএমই) বেশ কিছু কারখানা ইতোমধ্যে বন্ধ বা আংশিক চালু রয়েছে। এতে শ্রমিকরা চাকরি হারাচ্ছে। কমে যাচ্ছে বেতন। রাস্তায় যানবাহন কম। এর ফলে চালক ও সংশ্লিষ্ট শ্রমিকদের আয়ও কমছে।
এদিকে ব্যবসা-বাণিজ্য অনেকটাই স্থবির। ছোট ব্যবসায়ী থেকে শুরু করে বড় গ্রুপগুলোও ক্ষতিগ্রস্ত। অপরদিকে উৎপাদন ও পরিবহণ খরচ বেড়ে যাওয়ায় নিত্যপণ্যের দাম বাড়ছে। পাশাপাশি যানবাহনের ভাড়া বেড়েছে। ফলে যাতায়াতে অতিরিক্ত খরচ হচ্ছে। বিদ্যুৎ ঘাটতির কারণে বিকল্প ব্যবস্থার (যেমন জেনারেটর বা আইপিএস) ব্যবহারও বাড়ছে। এতে বাড়তি ব্যয়ও হচ্ছে। অর্থনীতিবিদরা বলছেন, আওয়ামী আমলের নানা অপকর্মের কারণে বর্তমানে খাদের কিনারায় দেশের অর্থনীতি। ইতোমধ্যে দেশের আর্থিক খাতের শৃঙ্খলা নষ্ট হয়েছে। এ অবস্থায় জ্বালানি সংকট দেশের অর্থনীতিকে আরও বিপর্যস্ত করে তুলবে। পরিস্থিতি মোকাবিলায় সরকারের অন্যান্য ব্যয় কমাতে হবে। পাশাপাশি বিকল্প পথে জ্বালানির ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে হবে।
জানতে চাইলে অর্থনীতিবিদ অধ্যাপক আবু আহমেদ সোমবার যুগান্তরকে বলেন, জ্বালানি এমন একটি পণ্য, যার সঙ্গে দেশের সব কিছুর সম্পৃক্ততা রয়েছে। বর্তমানে জ্বালানি খাতে যে সংকট চলছে, তা অর্থনীতিকে অত্যন্ত খারাপের দিকে নিয়ে যাচ্ছে। যুদ্ধ না থামলে সামনে পরিস্থিতি হবে আরও ভয়াবহ। তিনি বলেন, এরমধ্যে ঋণের ফাঁদে পড়েছে দেশ। কারণ বর্তমানে বিদেশি ঋণ রয়েছে ১১৫ বিলিয়ন ডলার। এছাড়াও বাজেট ঘাটতি মোকাবিলায় সরকারকে বিশাল অঙ্কের ঋণ নিতে হচ্ছে। যার অন্যতম একটি কারণ হলো- বড় অঙ্কের সুদ পরিশোধের চাপ। তিনি বলেন, চলতি অর্থবছরে রাজস্ব বাজেটের ৭০ শতাংশই সরকারের পরিচালন ব্যয়ে চলে যাচ্ছে। আবার এর মধ্যে ২৫ শতাংশ চলে যাচ্ছে সুদ পরিশোধে। এ অবস্থায় আগামীতে আমাদের ব্যালেন্স অব পেমেন্ট (বৈদেশিক লেনদেনের ভারসাম্য) স্বস্তিদায়ক অবস্থায় থাকবে না। ফলে আগামীতে ঋণের সুদ পরিশোধে আবার ঋণ করতে হবে। আবু আহমেদ বলেন, অর্থনীতির পরিস্থিতি ভয়াবহ। তবে তা একদিনে সৃষ্টি হয়নি। এ অবস্থায় জ্বালানি তেলের দাম বৃদ্ধি অর্থনীতিকে বিপর্যস্ত করে তুলবে। তিনি বলেন, পরিস্থিতি মোকাবিলায় সরকারকে পরিচালন ব্যয় কমাতে হবে। কারণ সরকারের এতগুলো মন্ত্রণালয় দরকার নেই। পাশাপাশি বিদ্যমান এই বৈশ্বিক সংকট মোকাবিলায় সবাইকে জ্বালানি ব্যবহারে সাশ্রয়ী হতে হবে। এটি এক অর্থে সরকারের সমস্যা নয়, এটি একটি জাতীয় সংকট। তাই সবাই মিলে ধৈর্যের সঙ্গে মোকাবিলা করতে হবে। পাশাপাশি সরকারকে অবশ্যই বিকল্প পথে জ্বালানির ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে হবে।
প্রসঙ্গত, জ্বালানি তেল ও গ্যাস সমৃদ্ধ মধ্যপ্রাচ্যের দেশ ইরানের ওপর গত ২৮ ফেব্রুয়ারি হামলা শুরু করে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইল। পালটা পদক্ষেপ হিসাবে তেল পরিবহণের অন্যতম রুট হরমুজ প্রণালি বন্ধ করে দেয় ইরান। এর ফলে বাংলাদেশসহ অধিকাংশ দেশে তেলের সংকট দেখা দেয়। এতে দেশে বহুমুখী সংকট তৈরি হয়। শুরুতে পরিবহণ খাতে তেল কেনায় রেশনিং পদ্ধতি চালু করেছিল সরকার। তবে ব্যাপক সমালোচনার মুখে তা কিছুটা শিথিল করা হয়। বর্তমানে তেলের জন্য পেট্রোল পাম্পগুলোতে যুদ্ধ চলছে। মালিক ও ক্রেতাদের মধ্যে বিভিন্ন স্থানে সংঘর্ষ হচ্ছে। তবে সংসদে বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদবিষয়ক মন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকু বলেছেন, দেশে পর্যাপ্ত জ্বালানি মজুত আছে। প্রাপ্ত তথ্য অনুসারে ইতোমধ্যে দেশে জ্বালানি সংকটের বহুমুখী প্রভাব পড়েছে। এই সংকট ক্রমেই জাতীয় সমস্যায় রূপ নিচ্ছে। এর প্রভাব পড়ছে দেশের সামষ্টিক অর্থনীতি এবং সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন জীবনে। বিশেষ করে মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) তিনটি খাত কৃষি, শিল্প ও সেবা খাতে প্রভাব পড়তে শুরু করেছে। এছাড়াও জাতীয় বাজেট ও বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভে প্রভাব পড়তে পারে। তেলের ঘাটতির কারণে বিদ্যুৎ উৎপাদন কমে গেছে। ফলে দেশে ঘন ঘন লোডশেডিং হয়। ছোট-বড় কারখানা ও কৃষি সেচে ডিজেল জেনারেটরের খরচ বাড়ছে। শিল্প উৎপাদনও ব্যাহত হচ্ছে। সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে এসএমই। উৎপাদন খরচ বেড়ে যাওয়ায় অনেক ছোট কারখানা বন্ধ হয়ে যেতে পারে। বহুমুখী সমস্যায় পড়ছে কৃষি খাতও।
জানতে চাইলে প্রাণ আরএফএল গ্রুপের পরিচালক (বিপণন) কামরুজ্জামান কামাল সোমবার যুগান্তরকে বলেন, জ্বালানির সঙ্গে সবকিছুই জড়িত। বর্তমানে ডিজেল সংকট চরমে। ফলে সবকিছু স্বাভাবিকভাবে চলছে না। এতে পণ্যের উৎপাদন কমছে। এছাড়াও গাড়ির মুভমেন্ট আগের মতো করা যাচ্ছে না। এর ফলে পণ্য বিপণনেও সমস্যা হচ্ছে। তিনি বলেন, মধ্যপ্রাচ্যকিন্দ্রিক কিছু দেশে আমাদের রপ্তানিও কমতে শুরু করছে। এর সবকিছুই অর্থনীতিতে নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে।
জানা গেছে, জ্বালানি সংকটের কারণে অনেক শিল্পপ্রতিষ্ঠান বন্ধ বা আংশিক চালু আছে। বিশেষ করে জ্বালানি নির্ভর প্রতিষ্ঠানগুলোতে এই সমস্যা মারাত্মক আকার ধারণ করেছে। এতে শ্রমিকরা কাজ হারাচ্ছে। ইতোমধ্যে অনেকের বেতন কমিয়ে দেওয়া হয়েছে। সামনে আরও কমবে। আগে শ্রমিকরা নির্ধারিত কর্মঘণ্টার পর ওভার টাইম করত। কিন্তু এখন নিয়মিত কর্মঘণ্টাই কমে যাচ্ছে। ফলে ওভার টাইম কল্পনাই করা যায় না। এতে শ্রমিকদের আয় সরাসরি কমে যাচ্ছে। এছাড়াও রাস্তায় গাড়ি চলাচল কম। বিশেষ করে ব্যক্তিগত গাড়ি এবং মোটরসাইকেল চলাচল সীমিত হয়ে এসেছে। এতে গাড়ির ড্রাইভার ও হেলপারদের আয় কমছে। রাইড শেয়ারের অথবা ভাড়ার গাড়ির আয়ও কমছে। কমে গেছে ব্যবসা-বাণিজ্য। বাজারে পণ্যের সরবরাহ কম। ফলে স্বাভাবিকভাবেই এতে পণ্যের দাম বাড়ছে। জ্বালানি তেল নিতেই তাদের ঘণ্টার পর ঘণ্টা বসে থাকতে হচ্ছে।
এছাড়াও জ্বালানি সংকটের কারণে রাস্তায় পরিবহণ চলাচলও কমে যাচ্ছে। সীমিত সংখ্যায় যেসব পরিবহণ চলছে, সেখানে এ অজুহাতে বাড়তি ভাড়া চাওয়া হচ্ছে। অপরদিকে পণ্য পরিবহণে ব্যয়ও বেড়েছে। বিকল্প পরিবহণের কারণে বাড়তি ভাড়া গুনতে হচ্ছে। এসব কারণে এতে বাড়ছে মূল্যস্ফীতি।
দেশের জিডিপিতে কৃষি খাতের অবদান ১৩ শতাংশের মতো। আর কর্মসংস্থানে প্রথম অবস্থানে রয়েছে এ খাত। কিন্তু বর্তমানে ডিজেল সংকটে সেচ কার্যক্রম ব্যাহত হচ্ছে। এছাড়াও কৃষির অন্যতম উপকরণ সার। এর সঙ্গে জ্বালানির সম্পর্ক রয়েছে। কিন্তু সংকটের কারণে সার পেতে সমস্যা হচ্ছে।
গবেষণা প্রতিষ্ঠান ‘চেঞ্জ ইনিশিয়েটিভ’র প্রধান গবেষক এম জাকির হোসেন খানের মতে, বিশ্ববাজারে তেলের দাম প্রতি ব্যারেল ১০ ডলার বাড়লে বাংলাদেশে বছরে অতিরিক্ত প্রায় ১ বিলিয়ন ডলার ব্যয় বাড়বে। আর দীর্ঘ সময় ধরে দাম ১২০ ডলারের বেশি থাকলে বছরে অতিরিক্ত ব্যয় দাঁড়াতে পারে ৪ থেকে ৫ বিলিয়ন ডলার। দেশীয় মুদ্রায় যার পরিমাণ (প্রতি ডলার ১২২ টাকা হিসাবে) প্রায় ৬১ হাজার কোটি টাকা। তিনি বলেন, বর্তমানে বাংলাদেশ প্রায় ৯৫ শতাংশ জ্বালানির জন্য আমদানির ওপর নির্ভরশীল। ফলে জ্বালানির দাম বাড়লে সরকার দীর্ঘদিন ভর্তুকির মাধ্যমে পরিস্থিতি সামাল দিতে পারবে না। একপর্যায়ে মূল্য সমন্বয় করতে বাধ্য হবে। এতে শিল্প খাতে ‘ডি-ইন্ডাস্ট্রিয়ালাইজেশন’-এর ঝুঁকি তৈরি হতে পারে। তিনি উল্লেখ করেন, এসএমই খাত সবচেয়ে বেশি ক্ষতির মুখে পড়বে। কারণ দেশের মোট কর্মসংস্থানের প্রায় ৭০ থেকে ৮০ শতাংশই এ খাতনির্ভর। ফলে এসএমই খাত ক্ষতিগ্রস্ত হলে ব্যাপক কর্মসংস্থান হুমকির মুখে পড়বে এবং এর প্রভাব পড়বে সামগ্রিক অর্থনীতিতে।