বিচ্ছিন্নতাবাদীদের অন্ধকার জগৎ সমৃদ্ধ হচ্ছে ডিজিটাল মুদ্রা ক্রিপ্টোকারেন্সিতে। অস্ত্র কিংবা মাদক কেনাবেচায় তারা ব্যাগভর্তি টাকার পরিবর্তে স্মার্টফোনে বিভিন্ন ‘ক্রিপ্টো ওয়ালেট’ নিচ্ছে ডিজিটাল মুদ্রায়। পরে নামধারী আইটি ফ্রিল্যান্সার ও ছোট ছোট টেলিকম দোকানদাররা ‘বাইনান্স’ অ্যাপের পিটুপি অপশন ব্যবহার নগদায়ন করছে সেই মুদ্রা। জাতিসংঘের মাদক ও অপরাধসংক্রান্ত কার্যালয়ের (ইউএনওডিসি) ২০২৫ সালের প্রতিবেদনে উঠে এসেছে এ অঞ্চলের বর্ডারলেস ডিজিটাল ইকোনমির অন্ধকার সাম্রাজ্যের চাঞ্চল্যকর তথ্য। ওই প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়- মিয়ানমার ও থাইল্যান্ড সীমান্তের ‘স্পেশাল ইকোনমিক জোন’ বা ক্যাসিনো সিটিগুলো এখন অপরাধীদের প্রধান ‘ক্রিপ্টো এক্সচেঞ্জ হাউস’। অপরাধী চক্রগুলো তাদের অবৈধ আয়ের একটি বড় অংশ সরাসরি এ ক্যাসিনোগুলোর মাধ্যমে ক্রিপ্টোকারেন্সিতে রূপান্তর করছে। বিশেষ করে ডিজিটাল মুদ্রাগুলোর লেনদেন এনক্রিপ্টেড হওয়ায় আন্তর্জাতিক গোয়েন্দা সংস্থাগুলোও এর উৎস খুঁজে পেতে হিমশিম খাচ্ছে। এ ছাড়াও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার অপরাধী চক্রগুলো এখন এই মাধ্যম গড়ে তুলেছে। যার ঢেউ আছড়ে পড়ছে পার্বত্য চট্টগ্রামের ভূরাজনীতিতে।
শঙ্কার কথা জানিয়ে নিরাপত্তা বিশ্লেষক মেজর (অব.) এমদাদুল ইসলাম বলেন, ‘দেশের প্রতিরক্ষা ব্যবস্থাকে ধোঁকা দিতেই বিচ্ছিন্নতাবাদী সংগঠনগুলো ক্রিপ্টোকারেন্সিতে ঝুঁকছে। এতে দেশের অর্থনৈতিক ঝুঁকিও বাড়ছে। তাদের এ কৌশল দেশের প্রতিরক্ষা বাহিনীর জন্য নতুন নতুন ঝুঁকি তৈরি করছে। সরকারের উচিত তা রোধে ডেটা ইন্টারসেপ্টার ব্যবস্থা আধুনিকায়ন করা।’
অনুসন্ধানে জানা যায়, বাংলাদেশ-মিয়ানমারের বিচ্ছিন্নতাবাদী সংগঠনগুলো এই ডিজিটাল ইকোনমির বিশাল সাম্রাজ্য তৈরি করেছে। বিশেষ করে কুখ্যাত ব্ল্যাক ট্রায়াঙ্গেলের সক্রিয় বিচ্ছিন্নতাবাদী সংগঠনগুলো বর্তমানে স্যাটেলাইট ইন্টারনেট প্রযুক্তি ব্যবহার করে তৈরি করে বিশেষ অন্ধকার জগৎ। প্রযুক্তির মাধ্যমে তারা দুর্গম পাহাড়ের ভিতর বসে ডার্ক ওয়েবে আন্তর্জাতিক অস্ত্র ও মাদক ডিলারদের সঙ্গে যোগাযোগ স্থাপন করছে। তারা টাকা বা হুন্ডির মাধ্যমে লেনদেনের পরিবর্তে ‘কিউআর কোড’ স্ক্যান করে ডিজিটাল মুদ্রায় হাজার টাকা থেকে শত কোটি টাকার লেনদেন করছে চোখের পলকে। তারা ‘মোনেরো’ নামক ক্রিপ্টোকারেন্সি অত্যধিক ব্যবহার করছে। মূল পেমেন্ট থাইল্যান্ড-মিয়ানমার গেটওয়ে দিয়ে ক্রিপ্টোকারেন্সিতে রূপান্তর হচ্ছে। এ ডিজিটাল মুদ্রা এমনভাবে ডিজাইন করা যে প্রেরককে কোনোভাবেই শনাক্ত করা যায় না। সশস্ত্র গ্রুপগুলো এগুলো ব্যবহার করেই বিদেশি সোর্স থেকে অত্যাধুনিক ড্রোন ও কমিউনিকেশন গিয়ার সংগ্রহ করছে। এ ছাড়া মাদক ও অস্ত্র বিক্রির টাকাও ডিজিটাল মুদ্রায় গ্রহণ করছে। অনুসন্ধানে আরও জানা গেছে, বাংলাদেশে বর্তমানে শত শত মার্চেন্ট সক্রিয়, যারা প্রতিদিন কোটি কোটি টাকার ক্রিপ্টোকারেন্সি কেনাবেচা করে। ডিজিটাল অর্থ সাধারণ মুদ্রায় রূপান্তরের জন্য চট্টগ্রাম নগরে গড়ে উঠেছে একাধিক ‘ক্যাশ আউট’ সিন্ডিকেট। নগরের আগ্রাবাদ, জিইসি মোড় এবং লালখান বাজার এলাকার কিছু নামধারী আইটি ফ্রিল্যান্সার ও ছোট ছোট টেলিকম দোকানদার ‘বাইনান্স’ অ্যাপের পিটুপি অপশন ব্যবহার করে এগুলো টাকায় রূপান্তর করে দিচ্ছে। পরে ডিজিটাল হুন্ডির মাধ্যমে টাকা সরাসরি অপরাধী চক্রগুলোর মোবাইল ব্যাংকিং অ্যাকাউন্টে পৌঁছে যাচ্ছে।
আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সাইবার ইউনিটের একাধিক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, পাহাড়ের দুর্গম এলাকায় যেখানে সাধারণ মোবাইল নেটওয়ার্কও পৌঁছায় না, সেখানে এখন স্যাটেলাইট ইন্টারনেট ব্যবহার করে অপরাধী চক্রগুলো ডার্ক ওয়েবের সঙ্গে সরাসরি যোগাযোগ স্থাপন করছে। ডার্ক ওয়েবের বিভিন্ন ব্ল্যাক মার্কেট ফোরামে দক্ষিণ এশীয় সীমান্ত এলাকার এমন কিছু প্রোফাইল সক্রিয়, যারা অস্ত্র ও মাদকের বিনিময়ে ‘মোনেরো’ বা ‘বিটকয়েন’ দাবি করে। ব্ল্যাক ট্রায়াঙ্গেলের বাংলাদেশ অংশে অনেক অভিযানে জব্দ করা স্মার্টফোনে বিভিন্ন ‘ক্রিপ্টো ওয়ালেট’ পাওয়া যাচ্ছে। তবে কারিগরি সীমাবদ্ধতার কারণে সেই ওয়ালেটের পাসওয়ার্ড ভাঙা বা লেনদেনের গন্তব্য খুঁজে বের করা কঠিন হয়ে পড়ছে। বিশেষ করে ভিপিএন ব্যবহার করায় অপরাধীদের আইপি অ্যাড্রেস প্রতি মুহূর্তে পরিবর্তিত হচ্ছে।