চট্টগ্রাম জুড়ে জ্বালানি তেলের বাজারে অস্থিরতা চরমে পৌঁছেছে। এরই মধ্যে তেলের সরবরাহ, মূল্য এবং বিতরণব্যবস্থা নিয়ে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। নগর ও উপজেলার বিভিন্ন এলাকায় পেট্রোল পাম্পে দীর্ঘ লাইন, কোথাও ‘তেল নেই’ সাইনবোর্ড, আবার কোথাও সীমিত সরবরাহ- সবমিলিয়ে ভোগান্তিতে সাধারণ মানুষ ও পরিবহন খাত সংশ্লিষ্টরা। এ অবস্থার পেছনে সরবরাহ চাপের পাশাপাশি বেপরোয়া মজুতদারদের তৎপরতাকে দায়ী করছেন সংশ্লিষ্টরা। ভোক্তারা অভিযোগ করছেন, অনেক পাম্পে তেল থাকা সত্ত্বেও ‘সংকট’ দেখিয়ে বিক্রি সীমিত করা হচ্ছে। আবার কোথাও নির্ধারিত দামের চেয়ে বেশি দাম নেয়ার অভিযোগও রয়েছে।
বিপিসি’র তথ্য মতে, চট্টগ্রাম বিভাগে পেট্রোল পাম্প আছে ৩৮৩টি। আর এজেন্ট ডিস্ট্রিবিউটর আছেন ৭৯৯ জন। প্যাকড পয়েন্ট ডিলার আছেন ২৫৫ জন। এর মধ্যে চট্টগ্রাম নগরীতে পেট্রোল পাম্প আছে ৪৬টি। যার অধিকাংশই বন্ধ। পেট্রোল পাম্প ওনার্স এসোসিয়েশনের চট্টগ্রাম বিভাগের সাবেক সভাপতি এহসানুর রহমান চৌধুরী বলেন, চাহিদা অনুযায়ী জ্বালানি তেল মিলছে না। এজন্য সংকট সৃষ্টি হয়েছে। এসোসিয়েশনের চট্টগ্রাম বিভাগের সাধারণ সম্পাদক মাঈনুদ্দিন চৌধুরী বলেন, তেলের ঘাটতি আছে। তবে মানুষ আতঙ্কিত হয়েও বেশি তেল নিচ্ছে। এতেই সংকট সৃষ্টি হচ্ছে।
এদিকে, চাহিদা অনুযায়ী জ্বালানি (ডিজেল) না পাওয়ায় সাগরে মাছ ধরতে পারছেন না জেলেরা। ফলে ভরা মৌসুমেও ঘাটে অলস সময় পার করছেন হাজারো জেলে। ফিলিং স্টেশন বা ডিলাররা চাহিদা অনুযায়ী ডিজেল সরবরাহ করতে পারছেন না। রেশনিং পদ্ধতিতে যে পরিমাণ ডিজেল দেয়া হচ্ছে তাতে মাঝ সাগরে গিয়ে আবার ফিরে আসার মতো পরিস্থিতি থাকছে না।
চট্টগ্রামে কয়েক হাজার ফিশিং ট্রলার থাকলেও সাগরে নিয়মিত মাছ ধরে অন্তত কয়েকশ’। মাছ ধরার জেলে রয়েছেন ২ লাখের মতো। সমুদ্রগামী একটি ট্রলারের ইঞ্জিনের আকার অনুযায়ী এক হাজার থেকে দুই হাজার লিটার পর্যন্ত ডিজেল ধারণক্ষমতা রয়েছে। জলদাশ নামে ফিশিং ট্রলারের এক মালিক জানান, তার কাছে সাতটি ট্রলার রয়েছে। যেগুলো তিনি ভাড়া দেন। এর মধ্যে জ্বালানি সংকটের কারণে চারটি ঘাটে বসে আছে। অন্য তিনটি এক সপ্তাহ আগে সমুদ্রে গেছে। তবে সেগুলো ফিরে এসে পুনরায় সাগরে যেতে পারবে কিনা তা নিয়ে শঙ্কিত তিনি।
এদিকে, দেশের একমাত্র সরকারি তেল শোধনাগার ইস্টার্ন রিফাইনারি লিমিটেডের (ইআরএল) মজুতও দ্রুত ফুরিয়ে আসছে। আগামী ১০ দিনের মধ্যে অপরিশোধিত তেলের নতুন চালান না এলে বন্ধ হয়ে যেতে পারে প্রতিষ্ঠানটির উৎপাদন। বর্তমানে প্রতিষ্ঠানটির হাতে অপরিশোধিত (ব্রেন্ট ক্রুড অয়েল) তেলের মজুত আছে মাত্র ৪০ হাজার টন। যা দিয়ে চলবে আগামী ৮ থেকে ১০ দিন। দৈনিক সাড়ে ৪ হাজার পরিশোধনের সক্ষমতাসম্পন্ন এই কারখানায় বর্তমানে দৈনিক ৩ হাজার ৮০০ টন করে তেল পরিশোধন করা হচ্ছে। পরিশোধিত এসব তেল বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশনের (বিপিসি) মাধ্যমে যাচ্ছে ভোক্তার হাতে।
ইস্টার্ন রিফাইনারি লিমিটেড সূত্রে জানা যায়, আগামী ১ অথবা ২রা মে প্রায় ১ লাখ টন ব্রেন্ট ক্রুড অয়েল বহন করা জাহাজ দেশে প্রবেশ করতে পারে। জাহাজটিতে আগামী ২১শে এপ্রিল সৌদি আরবের একটি বন্দর থেকে তেল লোড করার শিডিউল রয়েছে। সেটি বর্তমান সময়ের বিপজ্জনক রোড হরমুজ প্রণালি বাদ দিয়ে বিকল্প রোডে দেশে আসার কথা রয়েছে। যদিও হরমুজ প্রণালি দিয়ে আসতে বাধা নেই বলছে ইরান।
চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষের সর্বশেষ তথ্যমতে, গত ২৬শে মার্চ ৩১ হাজার ২০৩ টন ডিজেল নিয়ে একটি জাহাজ দেশে পৌঁছেছে। এ নিয়ে চলতি মাসে ২৮টি জাহাজ মোট ৭ লাখ ৯০ হাজার ৭৪০ টন জ্বালানি পরিবহন করেছে। এসব চালানে বিদ্যুৎ উৎপাদন, শিল্প-কারখানা এবং গৃহস্থালি ব্যবহারের জন্য প্রয়োজনীয় বিভিন্ন ধরনের জ্বালানি রয়েছে। এর মধ্যে ৪ লাখ ৭৮ হাজার ৬৯ টন তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি), ৩৯ হাজার ৭১৬ টন তরলীকৃত পেট্রোলিয়াম গ্যাস (এলপিজি), ৭৮ হাজার ২৫ টন হাই সালফার ফার্নেস অয়েল, ১ লাখ ৭৬ হাজার ২০২ টন গ্যাস অয়েল, ৯ হাজার ৯০৯ টন বেস অয়েল এবং ৫ হাজার ১৯ টন মনোইথিলিন গ্লাইকল রয়েছে। এ ছাড়া পাইপলাইনে ভারত থেকে ডিজেল আমদানিও অব্যাহত আছে।
বিপিসি জানায়, ফার্নেস অয়েল ২৮ দিন এবং জেট ফুয়েল ২২ দিনের মজুত থাকায় বিমান চলাচল ও বিদ্যুৎ উৎপাদনে আপাতত ঝুঁকি নেই। তবে হরমুজ প্রণালি দীর্ঘ মেয়াদে বন্ধ থাকলে বিকল্প পথে তেল আনতে বাড়তি জাহাজভাড়া গুনতে হবে, যা সামগ্রিকভাবে জ্বালানি আমদানির ব্যয় বাড়িয়ে দেবে।
বিপিসি’র কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, দেশে ক্রুড অয়েলের সংকট থাকলেও পর্যাপ্ত পরিশোধিত তেল আমদানি করা হচ্ছে। তুলনামূলক কম হলেও ইআরএলের উৎপাদন কার্যক্রম চালু রাখার চেষ্টা করছে কর্তৃপক্ষ। চলতি মাসে মধ্যপ্রাচ্য থেকে পরিশোধিত তেল নিয়ে ১৬টি ও অপরিশোধিত তেল নিয়ে দুটি জাহাজ ছেড়ে আসার কথা ছিল। এখন পর্যন্ত আটটি জাহাজ এসেছে। পথে আছে আরও তিনটি। বাকি জাহাজগুলো কোনটি কখন আসবে, তা অনিশ্চিত। গত ৪ঠা মার্চ সৌদি আরব ও ২০শে মার্চ আবুধাবি ন্যাশনাল অয়েল কোম্পানি থেকে অপরিশোধিত তেলবাহী জাহাজ আসার শিডিউল ছিল। জাহাজগুলো হরমুজ প্রণালি পার হতে পারেনি। এগুলো কবে আসবে তাও নিশ্চিত হওয়া যায়নি। বিকল্প উৎস হিসেবে যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা, রাশিয়া ও ইরাকের কথা বিবেচনায় আনে বিপিসি। তবে এসব দেশ থেকে তেল আনতে সময় ও খরচ দুটিই উল্লেখযোগ্যভাবে বেশি। মধ্যপ্রাচ্য থেকে জাহাজ আসতে যেখানে ১২ থেকে ১৩ দিন সময় লাগে, সেখানে বিকল্প এসব উৎস থেকে আনতে সময় দ্বিগুণেরও বেশি লাগতে পারে। একইসঙ্গে জাহাজ ভাড়া লাগতে পারে তিনগুণ। এই বাস্তবতায় এখনো এই অঞ্চলের দেশের ওপর বেশি জোর দিচ্ছে বাংলাদেশ। এ বিষয়ে ইস্টার্ন রিফাইনারি লিমিটেডের উপ-মহাব্যবস্থাপক (প্ল্যানিং অ্যান্ড শিডিং) মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, গত ২৮শে ফেব্রুয়ারি এক লাখ টন অপরিশোধিত তেল আমরা রিসিভ করেছি। সেগুলো পরিশোধন করা হচ্ছে। প্রতিদিন ৩ হাজার ৮০০ থেকে চার হাজার টন তেল পরিশোধ করা হচ্ছে এই কারখানায়। বর্তমানে কারখানায় অপরিশোধিত তেলের সংকট আছে। এদিকে বিপিসি কর্মকর্তারা বলছেন, মাঠে জ্বালানির সরবরাহ থাকলেও মজুতদারের কারণে কৃত্রিম সংকট সৃষ্টি হয়েছে। মানুষ আতঙ্কিত হয়ে প্রয়োজনের বেশি তেল সংগ্রহ ও মজুত করছেন। ফলে পরিস্থিতি স্বাভাবিক হচ্ছে না। এ ছাড়া অবৈধ সুযোগসন্ধানী মজুতদার তো আছেই।
গত ২৮শে মার্চ ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের ভাটিয়ারী পেট্রোল পাম্প নামের এক প্রতিষ্ঠানকে তেল মজুতের তথ্য গোপন করায় ৫০ হাজার টাকা জরিমানা করে ভ্রাম্যমাণ আদালত। গত ২৭শে মার্চ ওই পেট্রোল পাম্পের দেয়া তথ্য অনুসারে ১ হাজার ১০০ লিটার ডিজেল ট্যাংকে মজুত ছিল। কিন্তু ২৮শে মার্চ বিকালে পাম্পে গিয়ে দেখা যায় ওই ট্যাংকে ১ হাজার ৭০০ লিটার ডিজেল মজুত রয়েছে। এ ছাড়া ২৭ মার্চ থেকে ২৮শে মার্চ বিকাল পর্যন্ত তেল বিক্রি করেছিল প্রতিষ্ঠানটি। তারপরও ১ হাজার ৭০০ লিটার ডিজেল মজুত পাওয়া গেছে। এ ছাড়া গত ২৭শে মার্চ নগরের বিমানবন্দর সংলগ্ন এলাকা থেকে ২৭টি ড্রামে অবৈধ মজুত ৫ হাজার ৪০০ লিটার ডিজেল জব্দ করে ভ্রাম্যমাণ আদালত।