Image description
অবসরভাতা যেন সোনার হরিণ

নানা রোগশোকে জর্জরিত আব্দুল ওয়াহেদ মিয়া। ২০২৩ সালে অবসরে যান তিনি। নিদারুণ অর্থকষ্টে আছেন এমপিওভুক্ত এই সাবেক শিক্ষক। মেয়ের বিয়েতে অনেক টাকা খরচ হয়েছে, ছেলের লেখাপড়া চলছে। প্রতি মাসে পরিবারের ওষুধের খরচই হয় সাড়ে তিন হাজার টাকা। রংপুরের এই শিক্ষক বলেন, আমি চাকরি শেষে হজে যাবো বলে ঠিক করেছিলাম। হজে তো যেতে পারিনি, উল্টো মেয়ের বিয়ের জন্য টাকা ধার করতে হয়েছে। আবাদি জমি বন্ধক রাখতে হয়েছে।

ললিত চন্দ্র চৌধুরী শিক্ষকতা করেছেন বরিশালের গৌরনদীতে। তিনিও বার্ধক্যজনিত নানা রোগে জর্জরিত। তার মেরুদণ্ডের হাড় ক্ষয়, প্রস্টেট গ্রন্থি বড় হওয়া, আইডিএস, কশেরুকার মধ্যস্থ ডিক্স সরে যাওয়া ইত্যাদি রোগে ভুগছেন। তিনি অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে একজন উপদেষ্টার একান্ত সচিবের অনুরোধপত্রসহ আবেদন করলেও সুবিধা পাননি। তিনি বলেন, আমি প্রায় ৩২ বছর শিক্ষকতা করেছি। এই টাকা আমার প্রাপ্য। আমার অবসরকালীন সময়ে আমি নিরুপায় হয়ে পড়েছি। আমি চাইলেও উন্নত চিকিৎসা নিতে পারছি না।

এই দুই শিক্ষকের মতো এক লাখের অধিক শিক্ষক অর্থকষ্টে অবসর সময় কাটাচ্ছেন। মানবেতর জীবনযাপন করছেন তারা। অনেক শিক্ষক টাকা না পেয়েই শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেছেন। নীলক্ষেত থেকে ইস্কাটন। অফিস পরিবর্তন হলেও ভোগান্তি শেষ হয়নি শিক্ষকদের। আওয়ামী লীগ আমলে শিক্ষকদের অবসরকালীন ভাতার নয়ছয় হয়। যার কারণে ভেস্তে গেছে চেইন অব কমান্ড। ২০২৬ সালে এসেও এখনো ২০২২ সালের আবেদন জমা পড়া টাকাই দেয়া সম্ভব হয়নি।

আওয়ামী আমলে শিক্ষকদের জন্য বরাদ্দ দেয়া ১০ হাজার কোটি টাকার মধ্যে সাত থেকে আট হাজার কোটি টাকা লোপাট হয়। অন্তর্বর্তী সরকারের পরিকল্পনা ও শিক্ষা উপদেষ্টা অধ্যাপক ড. ওয়াহেদউদ্দীন মাহমুদ বিষয়টি নিয়ে ব্যাপক ক্ষোভ প্রকাশ করলেও অগ্রগতি হয়নি। সে সময় অর্থ মন্ত্রণালয়কে টাকার হদিস দিতে ডিও লেটার দিয়েছিলেন। কিন্তু তিনি উদ্যোগ নেয়ার পরই শিক্ষার দায়িত্ব থেকে তাকে সরানো হয়। যার কারণে অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে তা আর সুরাহা হয়নি। আবার নতুন দায়িত্ব পাওয়া শিক্ষা উপদেষ্টা অধ্যাপক ড. সি আর আবরার এই বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে দেখার কথা বললেও তা আর খাতা কলমে আসেনি।

বর্তমানে শিক্ষকদের অবসর সুবিধা স্বাভাবিক করতে সরকারের প্রয়োজন প্রায় সাড়ে সাত হাজার কোটি টাকা। তবে নতুন সরকার আসার পর আশাবাদী হয়েছেন বঞ্চিত শিক্ষকরা। এমপিওভুক্ত শিক্ষক-কর্মচারীদের পেনশনের জন্য রয়েছে বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান শিক্ষক ও কর্মচারী অবসর সুবিধা বোর্ড এবং বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান শিক্ষক ও কর্মচারী কল্যাণ ট্রাস্ট। শিক্ষকদের প্রতি মাসের মূল বেতন থেকে অবসর বোর্ডে নেয়া হয় ৬ এবং কল্যাণ ট্রাস্টের জন্য ৪ শতাংশ টাকা। কেটে নেয়া অর্থ থেকে প্রতি মাসে যুক্ত হয় ৭০ কোটি টাকা ও এফডিআর থেকে আসে তিন কোটি টাকা। তবে বেতন থেকে কেটে নেয়া অর্থের মাধ্যমে পুরো টাকা দেয়া হয় না। এফডিআর’র লভ্যাংশ যুুক্ত এই অর্থের সঙ্গে। প্রতি মাসে ৭৩ কোটি টাকা জমা হলেও প্রতি মাসে প্রয়োজন হয় ১১৫ কোটি টাকা। আর কল্যাণ ট্রাস্টে ৪ শতাংশ বেতন কাটার মাধ্যমে প্রতি মাসে জমা হয় প্রায় ৫০ কোটি টাকা। এফডিআর থেকে আসে আরও ২ কোটি টাকা। ৫২ কোটি টাকা আয় হলেও প্রতি মাসে প্রয়োজন হয় ৬৫ কোটি টাকা। নিয়ম মাফিক এই অর্থ ডিস্ট্রিবিউশনে ছোট ঘাটতি হলেও তৎকালীন সরকারের থোক বরাদ্দের টাকা লোপাট হওয়ায় বিপুলসংখ্যক শিক্ষক বিপাকে পড়েছেন।

বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান শিক্ষক ও কর্মচারী কল্যাণ ট্রাস্টের সচিব অধ্যাপক মো. হুমায়ুন কবির সেখ বলেন, অর্থের গরমিলের কারণে আমরা চাইলেও নিয়মিত অর্থ সুবিধা দিতে পারছি না। এখন অবসরের টাকা দিতে হলে সরকারের এককালীন অর্থ দিতে হবে। সেইসঙ্গে নিয়মিতভাবে এই অর্থ দিতে হবে। আমরা মন্ত্রণালয়কে বিষয়টি অবহিত করেছি।
শিক্ষকদের অবসরভাতায় প্রাপ্তিতে দুর্ভোগের বিষয়টি জানেন বর্তমান শিক্ষামন্ত্রী ড. আ ন ম এহছানুল হক মিলন। তিনি বলেন, শিক্ষকরা বৃদ্ধ বয়সে টাকার জন্য দ্বারে দ্বারে ঘুরেন- বিষয়টি আমাকে কষ্ট দেয়। এটি অমানবিক। বিষয়টি সুরাহা করতে ইতিমধ্যে আমরা আলোচনা করেছি। এর সুরাহা হয়তো একদিনে দেয়া সম্ভব নয়। আশা করি ধীরে ধীরে শিক্ষকরা এর সুফল পাবেন।