Image description
♦ উঠে এসেছে সামরিক-বেসামরিক দেড় ডজন কর্মকর্তার নাম ♦ মইন উ আহমেদের নির্দেশ বাস্তবায়ন করতেন আমিন ♦ অবৈধ সম্পদের খোঁজে দুদক

গোয়েন্দাদের জেরার মুখে গ্রেপ্তার দুই জেনারেল মুখ খুলতে শুরু করেছেন। এক-এগারোর অন্যতম এ দুই কুশীলব মাসুদ উদ্দিন চৌধুুরী এবং শেখ মামুন খালেদের বয়ানে উঠে আসছে অজানা কাহিনি, অনেকের নাম। এঁদের মধ্যে রয়েছেন সামরিক, বেসামরিক ও সুশীল সমাজের বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তি। অনেকে সরাসরি এক-এগারোর নানান প্রক্রিয়ায় জড়িত ছিলেন। কেউ কেউ নানান ধরনের পরামর্শ দিয়ে সহযোগিতা করেছেন। এঁদের কেউ দেশে, কেউ রয়েছেন বিদেশে। যাঁরা দেশে অবস্থান করছেন, তাঁদের দেশত্যাগে নিষেধাজ্ঞা দেওয়ার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এ ছাড়া গ্রেপ্তার দুজনসহ দেড় ডজন সামরিক-বেসামরিক কর্মকর্তার সম্পদের খোঁজে মাঠে নেমেছে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)।

সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছেন, অবসরপ্রাপ্ত এ দুই সেনা কর্মকর্তাকে জিজ্ঞাসাবাদে ঘুরেফিরে অন্তত দেড় ডজন ব্যক্তির নাম উঠে এসেছে। তালিকায় তিন বাহিনীর তৎকালীন প্রধান ছাড়াও সামরিক ও বেসামরিক ব্যক্তিদের নাম রয়েছে। এঁরা তৎকালীন ড. ইয়াজউদ্দিন আহমেদের তত্ত্বাবধায়ক সরকারকে হটিয়ে সেনাসমর্থিত এক-এগারোর সরকার গঠনে নেপথ্যে কাজ করেছিলেন। তবে এ তালিকা আরও দীর্ঘ হবে বলে গোয়েন্দারা জানিয়েছেন।

গোয়েন্দা সূত্র জানিয়েছেন, ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের হেফাজতে থাকা গ্রেপ্তার সাবেক দুই কর্মকর্তা নিজেদের অপরাধ কবুল না করে সবকিছু চাপিয়েছেন সাবেক সেনাপ্রধান মইন উ আহমেদ এবং সাবেক ডিজিএফআইপ্রধান মেজর জেনারেল এ টি এম আমিনের ওপর। মামুন খালেদ দাবি করেছেন, মইন উ আহমেদ নির্দেশ দিতেন এ টি এম আমিনকে। আমিন ওই সময় ডিজিএফআইতে কর্মরত কর্মকর্তাদের বাধ্য করেছিলেন তাঁর আদেশ বাস্তবায়ন করতে। ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের একজন পদস্থ কর্মকর্তা জানিয়েছেন, গ্রেপ্তার সবে শুরু হলো। বাকিদের গ্রেপ্তারে কাজ চলছে। একাধিক সূত্র বলছেন, এক-এগারোর সময় সামরিক গোয়েন্দা সংস্থার দুটি ব্যুরোসহ কয়েকটি সংস্থায় কর্মরত ১৮ ব্যক্তিকে শনাক্ত করতে পেরেছেন সংশ্লিষ্টরা। এ খসড়া তালিকা আরও বাড়তে পারে। তবে তাঁদের কয়েকজন অতি উৎসাহী হয়ে বর্তমান প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানকে অমানুষিক নির্যাতন করে পঙ্গুত্বের দিকে ঠেলে দিয়েছিলেন বলে নিশ্চিত হয়েছেন তাঁরা। যদিও সবকিছুর কলকাঠি নেড়েছেন মেজর জেনারেল (অব.) এ টি এম আমিন এবং লে. জেনারেল (অব.) মাসুদ উদ্দিন চৌধুরী। তবে বহুল আলোচিত চরিত্র জেনারেল (অব.) মইন উ আহমেদ অধিনায়কের ভূমিকায় থাকলেও তাঁকে সার্বিক সহায়তা করেছেন তৎকালীন বিমানবাহিনীর প্রধান এয়ার মার্শাল (অব.) শাহ মোহাম্মদ জিয়াউর রহমান এবং নৌবাহিনীর প্রধান ভাইস অ্যাডমিরাল (অব.) সরওয়ার জাহান নিজাম।

তদন্তসংশ্লিষ্ট সূত্র বলছেন, এক-এগারোর পরবর্তী সময়ে সেনাপ্রধান হয়েছিলেন জেনারেল আবদুল মুবীন। তিনি ২০০৯ সালের ১৫ জুন থেকে ২০১২ সালের ২৪ জুন পর্যন্ত সেনাপ্রধানের দায়িত্ব পালন করেন। সেনাপ্রধান হওয়ার আগে তিনি সশস্ত্র বাহিনী বিভাগের প্রিন্সিপাল স্টাফ অফিসার হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। তাঁর সময়েই ২০১০ সালের ১৩ নভেম্বর সাবেক প্রধানমন্ত্রী প্রয়াত বেগম খালেদা জিয়াকে শহীদ মইনুল রোডের বাড়ি থেকে উচ্ছেদ করা হয়। ওই সময় বাড়ি ভাঙার নেতৃত্ব দিয়েছিলেন পলাতক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সামরিক উপদেষ্টা তারিক আহমেদ সিদ্দিকের আস্থাভাজন তৎকালীন ক্যান্টনমেন্ট বোর্ডের এক্সিকিউটিভ অফিসার নাজমুছ সাদাত সেলিম। ওই সময় সবকিছু তদারকির দায়িত্বে ছিলেন শেখ মামুন খালেদ এবং তৎকালীন ‘এমইও’ বা মিলিটারি এস্টেট অফিসার। চিকিৎসার জন্য জেনারেল (অব.) মুবীন বর্তমানে সিঙ্গাপুরে অবস্থান করছেন বলে সূত্র নিশ্চিত করেছেন।

ঢাকা মহানগর পুলিশের অতিরিক্ত কমিশনার (ডিবি) শফিকুল ইসলাম বাংলাদেশ প্রতিদিনকে বলেন, ‘গ্রেপ্তার দুজন রাষ্ট্রের অনেক গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বে ছিলেন। তাঁরা অনেক কিছুই কৌশলে এড়িয়ে যাওয়ার চেষ্টা করছেন। মইন উ আহমেদের ওপর সবকিছু চাপিয়ে দিচ্ছেন। তবে আমরা তাঁদের বিরুদ্ধে অনেক অভিযোগ পেয়েছি।’

এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘মাসুদ উদ্দিনের বিরুদ্ধে মানব পাচারের সঙ্গে ভয়ংকর প্রতারণার অভিযোগ রয়েছে। আমরা এগুলো খতিয়ে দেখছি। প্রয়োজনে তাঁদের আবারও রিমান্ডে নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করা হবে।’

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, মাসুদ উদ্দিন চৌধুরী ও মামুন খালেদ গ্রেপ্তারের পর এক-এগারো এবং তৎপরবর্তী সময়ে নানান অপরাধে জড়িতদের মধ্যে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়েছে। তাঁদের মধ্যে যাঁরা বর্তমানে বিদেশে অবস্থান করছেন তাঁরা সেখানেই থেকে যাওয়ার চিন্তা করছেন। দেশে অবস্থানকারীরাও নানান কায়দায় দেশ ছাড়ার চেষ্টা করছেন। যদিও তাঁদের বিদেশযাত্রার ওপর রয়েছে নিষেধাজ্ঞা। ওই কুশীলবরা কেউ বিমানবন্দর অতিক্রম করতে গেলে বাধার মুখে পড়বেন বলে গোয়েন্দা সূত্রে তথ্য মিলেছে।

অপরাধ বিশ্লেষকরা বলছেন, এক-এগারো সরকারের সময় যাঁরা নির্যাতন ও দুর্নীতি করেছেন তাঁদের বিরুদ্ধে ওইসব অপরাধে এখনো কোনো মামলা হয়নি। তাঁদের বিরুদ্ধে অবিলম্বে সুনির্দিষ্ট অভিযোগের ভিত্তিতে মামলা করে বিচারের মুখোমুখি করতে হবে।

মূলহোতা যাঁরা : ২০০৭ সালের ১১ জানুয়ারি সেনাবাহিনীর হস্তক্ষেপে গঠিত হয় এক-এগারো সরকার। সেনাবাহিনীর একটি অংশের সমর্থনে ওই সময় গঠিত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রধান হয়েছিলেন ফখরুদ্দীন আহমদ। তবে ক্ষমতার মূল কেন্দ্রে ছিলেন তৎকালীন সেনাপ্রধান মইন উ আহমেদ। পরবর্তী সময়ে তদন্তসহ সব ঝামেলা এড়াতেই আওয়ামী লীগের সহায়তায় নির্বাসিত জীবন বেছে নিয়েছেন এক-এগারোর অনেক কুশীলব। ড. ফখরুদ্দীন আহমদ নাগরিকত্ব নিয়ে স্থায়ীভাবে বসবাস করছেন যুক্তরাষ্ট্রে। সাবেক সেনাপ্রধান মইন উ আহমেদও আছেন যুক্তরাষ্ট্রে। গ্রেপ্তার মাসুদ উদ্দিন চৌধুরী অবশ্য দেশে অবস্থান করছিলেন। তত্ত্বাবধায়ক সরকারের শেষ সময়ে তড়িঘড়ি করে সামরিক অ্যাটাশে হয়ে যুক্তরাষ্ট্রে পাড়ি জমিয়েছিলেন সামরিক গোয়েন্দা সংস্থার আরেক আলোচিত কর্মকর্তা ব্রি. জে. (অব.) চৌধুরী ফজলুল বারী। গণতান্ত্রিক সরকারের জমানায় এক-এগারোর ঘটনাবলির তদন্তের প্রয়োজনে তাঁকে ডাকা হলেও আর দেশে ফেরেননি। এর পর থেকেই স্থায়ীভাবে বসবাস করছেন যুক্তরাষ্ট্রের ডালাসে। এক-এগারোর সময় প্রতিরক্ষা গোয়েন্দা মহাপরিদপ্তরের (ডিজিএফআই) পরিচালকের দায়িত্বে ছিলেন তৎকালীন ব্রি. জেনারেল (অব.) এ টি এম আমিন। বর্তমানে তিনি দুবাইয়ে অবস্থান করছেন। সূত্র বলছেন, গোয়েন্দা চ্যানেলে তাঁকে দেশে ফেরানোর চেষ্টা চলছে। তৎকালীন ডিজিএফআইয়ের আরেক ক্ষমতাধর কর্মকর্তা মেজর জেনারেল (অব.) সাঈদ জোয়ার্দার দুবাই-কানাডা যাওয়া-আসার মধ্যে আছেন। লেফটেন্যান্ট জেনারেল (অব.) হাসান মশহুদ চৌধূরী এক-এগারো সরকারের সময় দুর্নীতি দমন কমিশনের চেয়ারম্যানের দায়িত্ব পালন করেন। ওই সময়ে রাজনীতিবিদদের বিরুদ্ধে ঢালাও অভিযোগ এবং একের পর এক মামলা করে আলোচনায় ছিল দুদক। তিনি এখন কোথায় আছেন তার কোনো সুনির্দিষ্ট তথ্য পাওয়া যায়নি। এ ছাড়া ওই সময়ের আলোচিত ও বিতর্কিত আরও কয়েকজন কর্মকর্তা ক্ষমতার কেন্দ্রে ছিলেন; যাঁদের মধ্যে অনেকেই এখন দেশে আছেন বলে গোয়েন্দা সংস্থাগুলো ধারণা করছে। সূত্রের দাবি, তাঁদের কেউ কেউ ইতোমধ্যে গোয়েন্দা নজরদারিতে আছেন। সরকারের শীর্ষ মহল থেকে সংকেত পাওয়া গেলে তাঁদের আইনের আওতায় আনা হবে।

১৯ বছর আগে বহুল আলোচিত ওয়ান-ইলেভেনের সময় প্রভাবশালী সেনা কর্মকর্তা হিসেবে আলোচিত লে. জেনারেল (অব.) মাসুদ উদ্দিন চৌধুরীকে সোমবার রাতে বারিধারার বাসা থেকে গ্রেপ্তার করা হয়। সিন্ডিকেট করে ২৪ হাজার কোটি টাকা আত্মসাৎ ও মানব পাচারের অভিযোগে রাজধানীর পল্টন মডেল থানার এক মামলায় তাঁকে গ্রেপ্তার দেখায় ডিবি। ২৬ মার্চ রাতে বারিধারা ডিওএইচএস থেকে শেখ মামুন খালেদকে গ্রেপ্তার করা হয়।