Image description
মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধ

মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধের কারণে বিশ্ববাজারে জ্বালানি তেলের সরবরাহ ব্যবস্থা টালমাটাল। এর প্রভাব প্রকট আকারে পড়েছে বাংলাদেশেও। বিশেষ করে জ্বালানি তেলের সংকট ক্রমশই বাড়ছে শিল্পখাতে। সরবরাহে সংকট তীব্র হওয়ায় দেশের গুরুত্বপূর্ণ শিল্পখাতে উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে। এর সরাসরি প্রভাব নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের বাজারে পড়ার পাশাপাশি পণ্য পরিবহন ও বিপণনেও ধাক্কা লেগেছে। পরিবহন ব্যয়ও বেড়ে গেছে। ফলে পণ্যমূল্যও বেড়ে যাচ্ছে।

এতে শিল্পপ্রতিষ্ঠানগুলোকে কম উৎপাদন ও বাড়তি ব্যয়ের মুখে পড়তে হচ্ছে বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা। আর জ্বালানি খাত বিশ্লেষকদের মতে, এভাবে যদি আরও কিছুদিন চলতে থাকে তাহলে মূল্যস্ফীতির চাপ প্রকট হবে, সাধারণ মানুষের জীবনধারণ কঠিন হয়ে পড়বে। বিশেষ করে বিদ্যুৎ উৎপাদন বা শিল্পখাতে গ্যাস সরবরাহ কমে গেলে উৎপাদন কার্যক্রম ব্যাহত হওয়ার ঝুঁকি তৈরি হবে।

সংশ্লিষ্টরা জানান, দেশের অর্থনীতি এমনিতেই গভীর সংকটে। মূল্যস্ফীতি ৯ শতাংশের ওপরে। কয়েক বছর ধরেই দেশে বিনিয়োগ, ব্যবসা-বাণিজ্যেও একরকম স্থবিরতা চলছে। রপ্তানি আয় কমছে। এ ছাড়া রাজস্ব আদায়ও কম। এই অবস্থার মধ্যে মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ অর্থনীতির এসব ক্ষত আরও গভীর করে তুলবে বলে মনে করছেন অর্থনীতিবিদ ও বিশ্লেষকরা।

শিল্প উদ্যোক্তারা বলছেন, উৎপাদন অব্যাহত রাখতে জ্বালানি সরবরাহ স্থিতিশীল থাকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এখন তারা পর্যাপ্ত জ্বালানি পাচ্ছেন না, আর পেট্রোল পাম্প থেকে জ্বালানি আনতেও অনেক সময় লাগছে। শিল্প খাতের জন্য অগ্রাধিকার ভিত্তিতে জ্বালানি সরবরাহ নিশ্চিত করতে সরকারের দ্রুত পদক্ষেপ নেয়া অত্যন্ত জরুরি। দেশে প্রায় এক মাস ধরে জ্বালানি তেলের সংকট চলছে। রাজধানীর বিভিন্ন জায়গায় দেখা গেছে, পেট্রোল পাম্পগুলোতে গাড়ির সারি এখনো লম্বা। দাঁড়িয়ে থাকতে হচ্ছে ঘণ্টার পর ঘণ্টা। কোথাও ঝুলছে ‘তেল নেই’ সাইনবোর্ড।

শিল্পখাতে কার্যক্রম ব্যাহত: বিএসআরএম গ্রুপের উপ-ব্যবস্থাপনা পরিচালক তপন সেনগুপ্ত বলেন, ইস্পাত কারখানার মতো ভারী শিল্পের জন্য জ্বালানি সরবরাহ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ, কারণ অধিকাংশ যন্ত্রপাতি ডিজেলে চলে। আমরা প্রয়োজনীয় পরিমাণের অর্ধেকও পাচ্ছি না, ফলে আমাদের কার্যক্রম ব্যাহত হচ্ছে। তিনি বলেন, দীর্ঘদিন ধরে সরবরাহ সংকট চলতে থাকলে উৎপাদন ব্যয় আরও বেড়ে যেতে পারে, যা মধ্যপ্রাচ্য সংঘাতের কারণে সৃষ্ট মূল্যচাপকে আরও বাড়িয়ে দেবে। এই পরিস্থিতির কারণে ইতিমধ্যে আমাদের পণ্যের দাম বাড়াতে হয়েছে। সংকট অব্যাহত থাকলে নির্মাণ খাতেও অতিরিক্ত চাপ সৃষ্টি হবে।

এ ছাড়া ভারী যন্ত্রপাতি- যেমন ক্রেন, ফর্কলিফট, জেনারেটর ও এস্কেভেটর চালাতে জ্বালানি তেলের ওপর নির্ভরশীল অন্যান্য শিল্প প্রতিষ্ঠানও একই ধরনের সংকটে পড়েছে।

চাপে তৈরি পোশাক খাত: দেশের সর্বোচ্চ রপ্তানি আয়ের খাত তৈরি পোশাক শিল্পও চাপের মুখে পড়েছে, বিশেষ করে তাপমাত্রা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে লোডশেডিং বৃদ্ধি পাওয়ায় পরিস্থিতি আরও জটিল হয়েছে। শিল্প সংশ্লিষ্টরা বলছেন, জ্বালানির সীমিত সরবরাহের কারণে এখন লোডশেডিংয়ের সময় অনেক কারখানাকেই কার্যক্রম বন্ধ রাখতে হচ্ছে।
বাংলাদেশ গার্মেন্টস ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যান্ড এক্সপোর্টার্স এসোসিয়েশনের (বিজিএমইএ) সভাপতি মাহমুদ হাসান খান বাবু বলেন, মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ সরাসরি তৈরি পোশাক শিল্পের কাঁচামাল আমদানিতে বড় ধরনের প্রভাব ফেলবে না। তবে জ্বালানি সংকট তৈরি হলে উৎপাদন ব্যাহত হওয়ার ঝুঁকি রয়েছে। তার মতে, সরকার যদি বাড়তি দামে জ্বালানি আমদানি করে এবং তার প্রভাব শিল্পখাতে পড়ে, তাহলে উৎপাদন ব্যয়ও বেড়ে যাবে। এ অবস্থায় জ্বালানি আমদানির ওপর বিদ্যমান শুল্ক, কর ও ভ্যাট সাময়িকভাবে কমানোর বিষয়টি বিবেচনা করা যেতে পারে।

বিকেএমইএ সভাপতি মোহাম্মদ হাতেম বলেন, চলমান তেল সংকট দেশের গার্মেন্টস শিল্পের কার্যক্রমে স্পষ্ট প্রভাব ফেলছে। অনেক কারখানা মালিক জানিয়েছেন, জেনারেটর পরিচালনা এবং পণ্য পরিবহনের জন্য যে পরিমাণ জ্বালানি প্রয়োজন, তা সময়মতো পাওয়া যাচ্ছে না। এর ফলে অনেক কারখানায় উৎপাদন প্রক্রিয়া ব্যাহত হচ্ছে। কোথাও উৎপাদন ধীরগতিতে চলছে, আবার কোথাও সাময়িকভাবে বন্ধ রাখতে হচ্ছে।

পণ্যমূল্য নিয়ে দুশ্চিন্তা: জ্বালানি তেলের দাম বাড়লে সবার আগে প্রভাব পড়ে সাধারণ মানুষে জীবনে। কারণ জ্বালানি তেলের দাম বৃদ্ধির ফলে পণ্যমূল্য বেড়ে যায়। আবার কৃষকের উৎপাদন ব্যয়ও অনেক বেড়ে যাবে। গত রোজার মাস এবং ঈদের কারণে এমনিতেই ভোগ্যপণ্যের বাজারে বেশ কিছু নিত্যপণ্যের দাম বেড়ে গেছে। এক মাসের ব্যবধানে সবধরনের মুরগির দাম কেজিতে ১০০ টাকারও বেশি বেড়েছে। গরুর মাংসের কেজি ৮০০ টাকা ছাড়িয়েছে। ভোজ্য তেলের দাম বাড়ানোরও পাঁয়তারা করছেন ব্যবসায়ীরা। ঈদের আগে যে পিয়াজের কেজি ছিল ৩০ টাকা, এখন সেটি বেড়ে ৪৫ থেকে ৫০ টাকা হয়ে গেছে। এভাবে আরও অনেক পণ্যের দাম বেড়ে গেছে ইতিমধ্যেই।

সংকট অস্বীকার কর্তৃপক্ষের: শিল্পখাতের অভিযোগের পরও রাষ্ট্রায়ত্ত জ্বালানি কোম্পানিগুলোর কর্মকর্তারা ও সরকারের মন্ত্রীরা বলছেন, সরবরাহে কোনো ঘাটতি নেই। পদ্মা অয়েল কোম্পানির ব্যবস্থাপনা পরিচালক মোফিজুর রহমান জানান, গ্রাহকদের পূর্ববর্তী চাহদা ও ব্যবহার অনুযায়ী জ্বালানি বিতরণ করা হচ্ছে। রাষ্ট্রায়ত্ত জ্বালানি আমদানিকারক ও বিতরণকারী প্রতিষ্ঠান বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশন (বিপিসি)-এর কর্মকর্তারাও একই কথা বলছেন।
পরিস্থিতি বড় উদ্বেগের: মধ্যপ্রাচ্যের চলমান যুদ্ধ তিন সপ্তাহ পার হয়ে গেছে। ইতিমধ্যেই যুদ্ধের ধাক্কা বেশ ভালো মতোই লাগতে শুরু করেছে দেশের অর্থনীতি ও ব্যবসা-বাণিজ্যে। সবার আগে প্রভাব পড়েছে জ্বালানি তেলের বাজারে। গত কয়েকদিন ধরে সারা দেশেই জ্বালানি তেল নিয়ে একরকম তুলকালাম চলছে। দেশে এখনো পর্যাপ্ত জ্বালানি তেল থাকার পরও কৃত্রিমভাবে সংকট তৈরি করে জনভোগান্তি শুরু হয়েছে। ইরানের হামলার কারণে কাতার এলএনজি উৎপাদন বন্ধ করায় এর প্রভাবও দৃশ্যমান হচ্ছে ক্রমেই। অর্থ ও পরিকল্পনামন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরীও বলেছেন, বর্তমান সরকার জ্বালানি নিরাপত্তার বিষয়ে খুবই সজাগ এবং জ্বালানি কেনা অব্যাহত আছে। জ্বালানির অভাবে যাতে মিল-কারখানা, বিদ্যুৎ খাত বাধাগ্রস্ত না হয়, সে জন্য ভালো ব্যবস্থাপনার ওপর জোর দেয়া হচ্ছে।

যা বলছেন বিশ্লেষকরা
বিশ্লেষকদের মতে, যদি হুরমুজ প্রণালি মার্চের শেষ পর্যন্ত বন্ধ থাকে, তা হলে প্রতি ব্যারেল জ্বালানি তেলের দাম ১৫০ ডলারেরও বেশি উঠতে পারে, যা রেকর্ড স্তরের কাছাকাছি। এই সংকট দীর্ঘায়িত হলে সত্তর দশকের মতো জ্বালানি শকের পুনরাবৃত্তি ঘটতে পারে, যা বিশ্ব অর্থনীতিতে মূল্যস্ফীতি, পরিবহন খরচ বৃদ্ধি এবং উৎপাদন হ্রাস ঘটাবে। বাংলাদেশের মতো তেল আমদানিনির্ভর দেশের জন্য এই পরিস্থিতি অত্যন্ত উদ্বেগজনক। দেশে বছরে ছয় থেকে সাত মিলিয়ন টন জ্বালানি তেল আমদানি হয়, যার বড় অংশ মধ্যপ্রাচ্য থেকে আসে। তেলের দাম ব্যারেলপ্রতি ১০ ডলার বাড়লে আমদানি ব্যয় অনেক বেড়ে যায়। আর তা যদি ১৫০ ডলারে উঠে যায়, তা হলে আমদানি ব্যয় কয়েক বিলিয়ন ডলার বাড়তে পারে, যা বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভে চাপ সৃষ্টি করবে।

উত্তরণে করণীয়: বেসরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠান সেন্টার ফর পলিসি ডায়লগের (সিপিডি) বিশেষ ফেলো অধ্যাপক ড. মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, শিল্প উৎপাদন থেমে গেলে অর্থনীতির ওপর বহুমাত্রিক চাপ তৈরি হয়। এতে কর্মসংস্থান কমে, রপ্তানি ক্ষতিগ্রস্ত হয় এবং বাজারে পণ্যের দাম বাড়ে। তাই শিল্প খাতে জ্বালানি সরবরাহ নিশ্চিত করা অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতার জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। দীর্ঘমেয়াদে জ্বালানি উৎস বৈচিত্র্য করা ছাড়া স্থায়ী সমাধান নেই। নবায়নযোগ্য জ্বালানির ব্যবহার বাড়ানো এবং জ্বালানি দক্ষ প্রযুক্তি শিল্প খাতে প্রসার ঘটানো জরুরি।
বেসরকারি গবেষণা সংস্থা পলিসি এক্সচেঞ্জ বাংলাদেশ-এর চেয়ারম্যান এম মাসরুর রিয়াজ বলেন, মধ্যপ্রাচ্যে ইরানের বিরুদ্ধে ইসরাইল ও যুক্তরাষ্ট্রের যুদ্ধকে ঘিরে চলমান অস্থিরতা বাংলাদেশের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভকে খাদে ফেলতে পারে এবং দেশকে কঠিন অর্থনৈতিক পরিস্থিতিতে ফেলতে পারে।

সিটি গ্রুপের পরিচালক বিশ্বজিৎ সাহা বলেন, এই পরিস্থিতিতে বাজারে স্থিতিশীলতা বজায় রাখতে সরকারের সক্রিয় ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বিশেষ করে নিত্যপ্রয়োজনীয় ভোগ্যপণ্য এবং উৎপাদনশীল শিল্প খাতে যাতে কার্যক্রম বাধাগ্রস্ত না হয়, সে জন্য জ্বালানি তেল ও গ্যাসের সরবরাহ নিশ্চিত করা জরুরি।

প্রাণ-আরএফএল গ্রুপের বিপণন পরিচালক কামরুজ্জামান কামাল বলেন, বর্তমানে তেল সংকট আমাদের সরবরাহ ব্যবস্থার ওপর সরাসরি প্রভাব ফেলছে। শিল্পপ্রতিষ্ঠানের পণ্য পরিবহন এবং বিভিন্ন গন্তব্যে বিতরণের জন্য নিয়মিত ও পর্যাপ্ত জ্বালানি অপরিহার্য। কিন্তু বর্তমানে তেলের স্বল্পতার কারণে পরিবহন কার্যক্রম স্বাভাবিকভাবে পরিচালনা করা যাচ্ছে না। ফলে নির্ধারিত সময়ে পণ্য সরবরাহ করা কঠিন হয়ে পড়ছে এবং ডেলিভারি প্রক্রিয়ায় বিলম্ব ঘটছে।