Image description
যুদ্ধ পরিস্থিতির এক মাস

মধ্যপ্রাচ্য যুদ্ধ পরিস্থিতির এক মাসে এভিয়েশন খাতে বড় ধরনের ধাক্কা লেগেছে। বিশ্বরাজনীতি ও যুক্তরাষ্ট্র-ইসরাইল-ইরান সংঘাতের সরাসরি প্রভাব পড়েছে অভ্যন্তরীণ এভিয়েশন শিল্পেও। জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধি, আকাশপথ বন্ধ হয়ে যাওয়া এবং অতিরিক্ত পথপরিক্রমার কারণে খরচের বোঝা সামলাতে পারছে না অনেক এয়ারলাইন্স। ফ্লাইট ওঠানামা না করায় সিভিল এভিয়েশন অথরিটির আয় কমেছে।

একমাস ধরে মধ্যপ্রাচ্যের রুটগুলোতে উড়োজাহাজ চলাচল বন্ধ থাকায় বেবিচকের আয়ে প্রভাব পড়েছে। বড় ধরনের রাজস্ব হারাচ্ছে সরকার। স্বাভাবিক সময়ের মতো ফ্লাইট না থাকায় ট্রাভেল এজেন্সিগুলোও লোকসানে পড়েছে। টিকিট বিক্রি করতে না পারা, ভিসা প্রসেসিং করতে পারছে না এজেন্সিগুলো। একই সমস্যা রিক্রুটিং এজেন্সির। এমন পরিস্থিতি আরও কিছুদিন চলতে থাকলে অনেক ছোটখাটো ট্র্যাভেল এজেন্সিতে তালা ঝুলবে। জেট ফুয়েলের মূল্যবৃদ্ধি হওয়াতে অভ্যন্তরীণ ও আন্তর্জাতিক রুটের টিকিটের মূল্য বেড়েছে। যার প্রভাব পড়েছে যাত্রীদের ওপর। এছাড়া ফ্লাইটবিহীন বিভিন্ন বিমানবন্দরে উড়োজাহাজ পার্কিং ফি দিয়েও পকেট খালি হচ্ছে এয়ারলাইন্সগুলোর। সবমিলিয়ে এভিয়েশন খাতের এই মন্দা কাটাতে গিয়ে বেগ পেতে হবে। আর এই সংকট কবে শেষ হবে তারও কোনো ইঙ্গিত নেই।

বেবিচক কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, তাদের আয়ের বড় উৎস ওভারফ্লাইং চার্জ ও ল্যান্ডিং ফি। মধ্যপ্রাচ্য ও পশ্চিমা দেশগুলোর মধ্যকার রুটে বাংলাদেশের আকাশসীমা ব্যবহার কমে যাওয়ায় সংস্থাটির রাজস্বে বড় ধরনের নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে। অনেক বিদেশি এয়ারলাইন্স এখন দক্ষিণ এশীয় রুট এড়িয়ে বিকল্প পথে চলায় বেবিচকের মাসিক আয় ২০-২৫ শতাংশ কমেছে। শাহজালালে সাধারণত প্রতিদিন ২৫০ থেকে ৩০০টি ফ্লাইট ওঠানামা করে এবং ৪৫ হাজারের বেশি যাত্রী যাতায়াত করে। সংঘাত শুরুর পর প্রতিদিন গড়ে ৪২টি ফ্লাইট বাতিল হচ্ছে। ফলে অবতরণ ও পার্কিং ফি, নেভিগেশন চার্জ, যাত্রীসেবা ফি, নিরাপত্তা ফি এবং গ্রাউন্ড হ্যান্ডলিং চার্জ থেকে আয় কমে গেছে। বাংলাদেশে সব বিদেশি এয়ারলাইন্সকে গ্রাউন্ড হ্যান্ডলিং সেবা দেয় বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্স।

মধ্যপ্রাচ্যে জ্বালানি সংকটের মধ্যে গত মঙ্গলবার তেলের দাম বাড়াতে বৈঠক করে বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশন (বিইআরসি)। তাতে অভ্যন্তরীণ রুটে ফ্লাইটের জন্য প্রতি লিটার জেট ফুয়েলের দাম ১১২ টাকা ৪১ পয়সা থেকে এক লাফে ২০২ টাকা ২৯ পয়সা করার সিদ্ধান্ত নেয়া হয়। লিটারপ্রতি দাম বাড়ানো হয় ৮৯ টাকা ৮৮ পয়সা বা ৮০ শতাংশ। এ ছাড়া আন্তর্জাতিক ফ্লাইটের জন্য প্রতি লিটার ফুয়েলের দাম শূন্য দশমিক ৭৩৮৪ ডলার থেকে বাড়িয়ে ১ দশমিক ৩২১৬ ডলার নির্ধারণ করা হয়েছে। এক্ষেত্রে দর বৃদ্ধির হার প্রায় ৭৯ শতাংশ, যা পরের দিন থেকেই কার্যকর করা হয়। যদিও প্রতিবেশী দেশগুলোর তুলনায় বাংলাদেশে জেট ফুয়েলের মূল্যবৃদ্ধি অস্বাভাবিকভাবে বেশি। মধ্যপ্রাচ্য পরিস্থিতির মধ্যেও ভারত ও নেপাল জেট ফুয়েলের মূল্য অপরিবর্তিত রেখেছে। পাকিস্তানে ২৪ দশমিক ৪৯ শতাংশ এবং মালদ্বীপে ১৮ দশমিক ৫৪ শতাংশ বাড়ানো হয়েছে। কিন্তু বাংলাদেশে এই বৃদ্ধির হার প্রায় ৮০ শতাংশ। খাত সংশ্লিষ্টরা বলছেন, যুদ্ধ পরিস্থিতির প্রভাব এখন বৈশ্বিক। ফ্লাইট বাতিল ও জ্বালানি খরচ বৃদ্ধিতে দ্বিমুখী সংকটে আর্ন্তজাতিক পর্যায়েও এর প্রভাব পড়েছে। যুদ্ধ পরিস্থিতির কারণে মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোতে আসা-যাওয়া করতে পারছেন না যাত্রীরা। যারা মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলো হয়ে ইউরোপ, আমেরিকার দেশগুলোতে যাওয়ার টিকিট কেটেছিলেন, তারাও ভ্রমণ করতে পারছেন না। যাদের জরুরি ভ্রমণ দরকার হচ্ছে, তাদের কয়েকগুণ বেশি টাকা দিয়ে বিকল্প পথের এয়ারলাইন্স বেছে নিতে হচ্ছে।

জেট ফুয়েলের নতুন দাম কার্যকর হওয়ায় অভ্যন্তরীণ রুটে টিকিটের মূল্য বাড়িয়েছে বিভিন্ন এয়ারলাইন্স। অভ্যন্তরীণ রুটে চলাচলকারী বেসরকারি এয়ারলাইন্স ইউএস-বাংলা, নভোএয়ার ও এয়ার অ্যাস্ট্রা তাদের গন্তব্যের ভাড়া বাড়িয়েছে। এরমধ্যে ঢাকা থেকে চট্টগ্রাম, কক্সবাজার, সিলেট ও সৈয়দপুর রুটে একক যাত্রায় ভাড়া বেড়েছে অন্তত ১২শ টাকা করে। যশোর ও রাজশাহী রুটে একক যাত্রীয় ভাড়া বেড়েছে এক হাজার টাকা করে। আন্তর্জাতিক রুটে বিভিন্ন এয়ারলাইন্স অন্তত ২৫ শতাংশ ভাড়া বৃদ্ধি করেছে। ইউরোপ-আমেরিকার ফ্লাইটগুলো নিয়মিত রুটে যেতে পারছে না। ইসরাইল, ইরানসহ বেশ কয়েকটি দেশের আকাশ এড়িয়ে চলতে গিয়ে যাতায়াত পথও দীর্ঘ হয়েছে। এতে বেড়েছে জ্বালানি খরচ। সঙ্গে যুক্ত হয়েছে জ্বালানির অতিরিক্ত দাম। টিকিটের মূল্য বাড়ায় যাত্রীরা নিরুৎসাহিত হবার শঙ্কা রয়েছে। বিভিন্ন রুটে যাত্রী কমে যাবে। এমন পরিস্থিতিতে এয়ারলাইন্সগুলো তাদের লোকসান কমিয়ে আনতে অপেক্ষাকৃত কম লাভজনক রুটে ফ্লাইট কমাতে বা বন্ধ করতে পারে। এতে দেশের আঞ্চলিক সংযোগ এবং পর্যটন খাতও ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার ঝুঁকিতে রয়েছে।

এদিকে, নিরাপত্তাজনিত কারণে একের পর এক ফ্লাইট বাতিল করছে এয়ারলাইন্স। হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর থেকে পাওয়া তথ্যানুযায়ী, ২৮শে ফেব্রুয়ারি থেকে শনিবার পর্যন্ত হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর থেকেই মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন গন্তব্যে বিভিন্ন এয়ারলাইন্সের ৮ শতাধিকের উপরে ফ্লাইট বাতিল করতে হয়েছে। এর মধ্যে ২৮শে ফেব্রুয়ারি ২৩টি, ১লা মার্চ ৪০টি, ২রা মার্চ ৪৬টি, ৩রা মার্চ ৩৯টি, ৪ঠা মার্চ ৩২টি, ৫ই মার্চ ৩৬টি, ৬ই মার্চ ৩৪টি, ৭ই মার্চ ২৮টি, ৮ই মার্চ ২৮টি, ৯ই মার্চ ৩৩টি, ১০ই মার্চ ৩২টি, ১১ই মার্চ ২৭টি, ১২ই মার্চ ২৮টি, ১৩ই মার্চ ২৫টি, ১৪ই মার্চ ২৬টি, ১৫ই মার্চ ২৩টি, ১৬ই মার্চ ৩১টি, ১৭ই মার্চ ৩১টি, ১৮ই মার্চ ২৬টি, ১৯শে মার্চ ২৬টি, ২০শে মার্চ ২৮টি, ২১শে মার্চ ২৫টি, ২২শে মার্চ ২০টি, ২৩শে মার্চ ২০টি, ২৪শে মার্চ ২০টি, ২৫শে মার্চ ২০টি এবং ২৬শে মার্চ ২২টি ফ্লাইট বাতিল হয়। একই সময়ে বিভিন্ন এয়ালাইন্স ১ হাজার ৫৮টি ফ্লাইট পরিচালনা করেছে।

আটাবের সাবেক সভাপতি ও এয়ার স্পিড লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক আব্দুস সালাম আরেফ মানবজমিনকে বলেন, যুদ্ধ পরিস্থিতিতে ব্যাপক ক্ষতি হচ্ছে। এই পরিস্থিতি চলতে থাকলে ক্ষতির পরিমাণ আরও বাড়বে। অনেক ট্র্যাভেল এজেন্সি বন্ধ হয়ে যাবে। অভ্যন্তরীণ রুটে বিমান ভাড়া বেড়ে যাওয়াতে যাত্রীরা ভুক্তভোগী হচ্ছে। প্রায় ৭০ ভাগ এজেন্সি মধ্যপ্রাচ্যকেন্দ্রিক ব্যবসা করে। শ্রমিক যাত্রীদের আসা-যাওয়া, ইউরোপ-আমেরিকা যারা যাওয়া আসা করে তারাও মধ্যপ্রাচ্যর রুট ব্যবহার করেন। ভাড়াও মোটামুটি সহনীয় ছিল। কিন্তু এই রুটে অনেক এয়ারলাইন্স ফ্লাইট পরিচালনা বন্ধ করে দিয়েছে। সৌদি এয়ারলাইন্স চলাচল করলেও টিকিটের দাম বেড়েছে। এছাড়া এই এয়ারলাইন্সের ক্যাপাসিটি দিয়ে সব যাত্রী পরিবহন করা সম্ভব না। তাই যাত্রীরা এখন তার্কিশ এয়ারলাইন্সসহ আরও কিছু এয়ারলাইন্স দিয়ে যাতায়াত করছে। কিন্তু ভাড়া আকাশচুম্বী হয়ে গেছে। সবার পক্ষে ভাড়ার খরচ বহন করা সম্ভব হচ্ছে না। তেলের দাম বাড়ার কারণে যতটুকু ভাড়া বেড়েছে তার চেয়ে বেশি বেড়েছে ক্যাপাসিটি কম থাকায়। তিনি বলেন, ট্র্যাভেল এজেন্সিগুলো অলস সময় কাটাচ্ছে। তাদের কাজকর্ম নাই। এভাবে কতোদিন টিকে থাকবে এটাই এখন বড় প্রশ্ন।

ইউএস বাংলা এয়ারলাইন্সের মহাব্যবস্থাপক মো. কামরুল ইসলাম মানবজমিনকে বলেন, রমজানের সময় প্রবাসীরা দেশে এসে পরিবার পরিজন নিয়ে ঈদ করে আবার ফিরে যায়। কিন্তু আন্তর্জাতিক ফ্লাইটগুলো স্বাভাবিক না থাকায় অনেক যাত্রী আসতে যেতে পারেনি। এছাড়া আন্তর্জাতিক ফ্লাইটে ঢাকায় এসে তারা আবার অভ্যন্তরীণ ফ্লাইট ব্যবহার করেন। সেটিও হয়নি এ বছর। তিনি বলেন, জেট ফুয়েলের দাম বাড়ায় অভ্যন্তরীণ রুটে ১ হাজার ২০০ টাকা পর্যন্ত ভাড়া বাড়ানো হয়েছে। ভাড়া বাড়ালে হয়তো খরচ এডজাস্ট করা যাবে কিন্তু বাস্তবে যাত্রী কমে যায়। সেটার প্রভাবও পড়ছে। যাত্রীরা এখন আকাশপথ ব্যবহার না করে অন্য রুটে যাতায়াত করছে। এতে করে এভিয়েশনসহ সংশ্লিষ্ট সবখাতে গিয়ে প্রভাব পড়ছে।