Image description

একই ইউনিয়নের বাসিন্দা নার্গিস বেগম ও দোলা খাতুন। তারা কাজ করতেন একটি পোশাক কারখানায়। বসতেন পাশাপাশি। একজন আরেকজনকে ডাকতেন বান্ধবী বলে। সম্পর্ক দীর্ঘস্থায়ী করতে তাদের ছেলেমেয়ের মধ্যে বিয়েবন্ধনের বিষয়ে একমত হন। শুরু হয় নতুন সম্পর্কের আলোচনা। পাকাপাকি সিদ্ধান্ত নিয়ে দুজন বাড়ি ফেরেন ঈদের ছুটিতে। ঈদের পরদিন রোববার বিকেলে নার্গিস বেগমের ছেলে নাইম হাসানের সঙ্গে দোলা খাতুনের মেয়ে জুঁই আক্তারের বিয়ে হয়। ছোট্ট পরিসরে হলেও এলাকায় এই আয়োজনে বেশ আনন্দ-উল্লাস হয়েছে। বান্ধবী থেকে নার্গিস আর দোলা হয়ে যান বেয়াইন। তবে সেই আনন্দ দীর্ঘস্থায়ী হলো না। এক দুর্ঘটনায় প্রাণ গেছে এই দুজনসহ পাঁচজনের। তাদের পরিবারে এখন শুধুই কান্না আর আহাজারি।

শুক্রবার রাতে টাঙ্গাইলের কালিহাতীতে ট্রেনে কাটা পড়ে মারা গেছেন নার্গিস বেগম, তাঁর ১১ বছর বয়সী ছেলে নীরব হোসেন, নীরবের বড় ভাইয়ের শাশুড়ি দোলা খাতুন। এ ছাড়া মারা গেছেন রিপা বেগম ও সুলতান হোসেন। তাদের বাড়ি গাইবান্ধার সাদুল্লাপুর উপজেলার ধাপেরহাট ইউনিয়নের নীজপাড়া ও বড় ছত্রগাছা গ্রামে। নীরব হোসেন ছাড়া সবাই গাজীপুরে একটি পোশাক কারখানায় কাজ করতেন। 

একই সঙ্গে পাঁচজনের মৃত্যুতে শোকের ছায়া নেমে এসেছে এলাকাজুড়ে। শনিবার সকালে তাদের মরদেহ এলাকায় পৌঁছে। এ সময় নবদম্পত্তিসহ স্বজনের কান্নায় চারপাশের পরিবেশ ভারী হয়ে ওঠে। 

নার্গিসের প্রতিবেশী জাহেদা বেগম বলেন, ঈদ ও বিয়ে কেন্দ্র করে কয়েক দিন ধরে আনন্দে ছিলেন তারা। মুহূর্তেই বিষাদের ছায়া নেমে এসেছে। ধাপেরহাট ইউনিয়নের চেয়ারম্যান শহিদুল ইসলাম শিপন বলেন, এই ইউনিয়নে একসঙ্গে এত লাশ দেখেনি কেউ। জীবিকার তাগিদে এই এলাকার অনেকেই পোশাক কারখানায় কাজ করেন। 

নিহতরা সবাই দরিদ্র পরিবারের। এসব পরিবারের জীবিত সদস্যদের জন্য সরকারসহ ধনাঢ্য লোকজনের সাহায্যের হাত বাড়ানো উচিত। তারা যাতে সরকারি সহায়তা পান, তিনি সেই উদ্যোগ নেবেন। 

নার্গিস বেগম নীজপাড়া গ্রামের হামিদুল ইসলাম ওরফে হাম্বুর স্ত্রী। তাদের প্রতিবেশী আজিজার রহমানের ছেলে সুলতান হোসেন এবং আব্দুর রশিদ মিয়ার মেয়ে রিপা বেগমও ঈদের ছুটি শেষে কাজে ফিরছিলেন। দোলা বেগম বড় ছত্রগাছা গ্রামের জাকির হোসেনের স্ত্রী। হামিদুল ইসলাম এবং জাকির হোসেন রাজমিস্ত্রি। তারা দুজন এখন বাকরুদ্ধ। নীরব হোসেনের দাদা বৃদ্ধ হায়দার আলী বলেন, যাওয়ার আগে নীরবকে ৫০ টাকা দিয়েছি। সেই নাতি তাঁকে ছেড়ে গেল। শোকাহতদের সান্ত্বনা দিতে আসা কয়েকজন 

প্রতিবেশী বলেন, পর্যাপ্ত তেল সরবরাহ থাকলে বাসটি হয়তো সেখানে থামত না। দেশে তেল সংকটের কারণে দুর্ঘটনা ঘটে গেল। রেললাইনের বিভিন্ন স্থানে নিরাপত্তাবেষ্টনী দেওয়ার দাবিও জানান কেউ কেউ। 

স্থানীয় বাসিন্দা ব্যবসায়ী আমিনুল ইসলাম জানান, কর্মস্থলে যাওয়ার উদ্দেশে শুক্রবার বিকেলে সবাই রওনা হয়েছিলেন। তারা ঢাকাগামী একটি বাসে চড়েন। বাসটি যমুনা সেতু পার হওয়ার পর টাঙ্গাইলের কালিহাতী উপজেলার ধলাটেংগর এলাকায় তেল ফুরিয়ে যায়। রাত ৮টার দিকে মহাসড়কে গাড়ি থামিয়ে যাত্রীদের নামিয়ে চালক ও সহযোগী তেল সংগ্রহের জন্য পেট্রোল পাম্পে যান। এ সময় যাত্রীদের অনেকে সড়কের পাশে ঢাকা-উত্তরাঞ্চল রেললাইনে বসেন। ঢাকা থেকে সিরাজগঞ্জমুখী ট্রেনে কাটা পড়ে মারা গেছেন পাঁচজন।

সাদুল্লাপুর থানার ওসি আব্দুল আলিম বলেন, পাঁচজনের মরদেহ শনিবার দুপুরে নিজ নিজ পারিবারিক কবরস্থানে দাফন করা হয়েছে। উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মাহমুদুল হাসান জানান, সুযোগ থাকলে নিহতদের পরিবারের জন্য সরকারিভাবে অনুদানের ব্যবস্থা করা হবে।
 
বাস জব্দ, চালক ও সহকারী পলাতক 
টাঙ্গাইল প্রতিনিধি জানান, ট্রেনে কাটা পড়ে নিহত পাঁচজনের মরদেহ শুক্রবার রাতেই পরিবারের কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে। স্বজনের কোনো অভিযোগ না থাকায় ময়নাতদন্ত ছাড়াই লাশ হস্তান্তর করা হয়। শনিবার ভোর ৪টার দিকে মরদেহ নিয়ে যমুনা পূর্ব থানা থেকে গাইবান্ধার উদ্দেশে যাত্রা করেন স্বজন। টাঙ্গাইল রেলওয়ে পুলিশ ফাঁড়ির উপপরিদর্শক মিজানুর রহমান জানান, দুর্ঘটনার খরর পেয়ে যমুনা সেতু পূর্ব থানা পুলিশ ও টাঙ্গাইল রেলওয়ে পুলিশ উদ্ধার তৎপরতা চালায়। রাতে লাশ উদ্ধার করে যমুনা সেতু পূর্ব থানায় নিয়ে যাওয়া হয়। বাসটি জব্দ করা হয়েছে। বাসের চালক ও সহকারী পলাতক। এ ঘটনায় ঢাকার কমলাপুর রেলওয়ে থানায় অপমৃত্যুর মামলা হয়েছে।