মাসুদ উদ্দিন চৌধুরী ও শেখ মামুন খালেদ। দু’জনই সেনাবাহিনীর প্রভাবশালী কর্মকর্তা ছিলেন। এক/এগারো ও আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে ভয়ঙ্করভাবে উত্থান হয় দু’জনের। রাজনৈতিক নেতাকর্মীদের গ্রেপ্তার-জেল, ব্যবসায়ীদের তুলে এনে নির্যাতন, ভয়ভীতি প্রদর্শন করে টাকা আদায়, প্রকল্পের টাকা আত্মসাত, বিদেশে অর্থপাচার, গুম, খুন, মাইনাস টু ফর্মুলার পাঁয়তারা, রাজনৈতিক দলকে ক্ষমতায় আনার জন্য শর্তসাপেক্ষ গোপন চুক্তিপত্র, ভোট কারচুপিসহ এমন কোনো অপরাধ নেই যা এই দুই কর্মকর্তা করেননি। শুধু তাই নয়, তৎকালীন বিএনপি’র সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব ও বর্তমান প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানকে গ্রেপ্তার করে নির্যাতনের মূলহোতা ছিলেন তারা। নানা অপকর্ম করে সরকার পরিবর্তনের পরও তাদের কোনো শাস্তি তো হয়নি বরং তারা পদোন্নতি পেয়েছেন। এক-এগারো সরকারের আমলে কামিয়েছেন কোটি কোটি টাকা। তবে রেহাই মিলেনি। বিএনপি সরকার ক্ষমতায় আসার পর তাদের বিরুদ্ধে হিমঘরে থাকা অভিযোগের ফাইল আবার নড়েচড়ে উঠেছে। পুরাতন মামলায় তাদের গ্রেপ্তার করে রিমান্ডে এনে জিজ্ঞাসাবাদ করা হচ্ছে। ডিবি ছাড়াও তাদের অন্যান্য গোয়েন্দা সংস্থাও জিজ্ঞাসাবাদ করছে। তাদের বিরুদ্ধে থাকা নানা অপকর্ম ও অপরাধের বিষয়ে জানতে চাইলে তারা নিজেদের অপরাধ লুকানোর চেষ্টা করছেন। কিছু প্রশ্নের উত্তর দিলেও বেশির ভাগ প্রশ্নের উত্তর না দিয়ে এড়িয়ে যাচ্ছেন। কিছুক্ষেত্রে তারা চাকরির দোহাই দিচ্ছেন। চাকরি করার কারণে তারা কিছু কাজ করতে বাধ্য হয়েছেন বলেও জানান। তবে তাদের অগোছালো প্রশ্নের উত্তরের সমাধানের জন্য মাসুদ ও খালেদকে মুখোমুখি জিজ্ঞাসাবাদ করা হবে। তদন্তসংশ্লিষ্টরা বের করার চেষ্টা করছেন তারা আর কী কী অপরাধ করেছেন। তাদের এসব অপকর্মের পেছনে আর কে কে ছিলেন। পেছন থেকে কারা কলকাঠি নেড়েছেন।
তদন্তসংশ্লিষ্ট গোয়েন্দা সূত্রগুলো বলছে, এক-এগারোর সরকারের সময় যতো অপকর্ম সংঘটিত হয়েছিল সবকিছুর পেছনে মাসুদ উদ্দিন চৌধুরীর সম্পৃক্ততা ছিল। অভিযোগ আছে, ওই সময় রাজনৈতিক নেতাকর্মীদের গ্রেপ্তার করে চরম নির্যাতন করা হয়েছে। তাদের বিরুদ্ধে নানা অপকর্মের তকমা লাগিয়ে দেয়া হয়েছিল। তখন দেশের বড় দুই রাজনৈতিক দলের প্রধান দুই নেত্রীকেও গ্রেপ্তার করা হয়েছিল। তাদের দেশছাড়া করে মাইনাস টু ফর্মুলা বাস্তবায়নের পাঁয়তারা সঙ্গে যুক্ত ছিলেন মাসুদ। দেশের শিল্পপতি ও ব্যবসায়ীদের তুলে এনে নির্যাতন করে টাকা আদায় করা হয়েছিল।
২০০৭ সালের ১১ই জানুয়ারি দেশে সেনাশাসিত তত্ত্বাবধায়ক সরকার দায়িত্ব গ্রহণের পর বিএনপি চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়া ও আওয়ামী লীগ সভানেত্রী শেখ হাসিনাকে গ্রেপ্তার করা হয়। দুই নেত্রীকে রাখা হয় সংসদ ভবন এলাকায় স্থাপিত বিশেষ কারাগারে। ওই বিশেষ কারাগারে পরবর্তী নির্বাচন, কারামুক্তি, দেশের পরবর্তী শাসনভারসহ নানা ইস্যুতে তৎকালীন সরকারের প্রতিনিধিরা খালেদা জিয়া ও শেখ হাসিনার সঙ্গে দফায় দফায় বৈঠক করেন। যার নেতৃৃত্বে ছিলেন মাসুদ উদ্দিন চৌধুরী। ওই সময় মাসুদ ১৩টি শর্ত দিয়ে সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়াকে ক্ষমতায় আনার প্রলোভন দেখান। কিন্তু খালেদা জিয়া ক্ষমতার লোভে সেই শর্তগুলো মেনে নেননি। একই শর্ত দেয়া হয়েছিল শেখ হাসিনাকেও। কয়েক ঘণ্টার বৈঠকের পর হাসিনা সব শর্ত মেনে নিয়ে নির্বাচনে অংশ নেন। চুক্তি অনুযায়ী শেখ হাসিনার নেতৃত্বে আওয়ামী লীগ সরকার গঠন করে। সেই গোপন চুক্তিপত্রে কী ছিল সেটি মাসুদের কাছ থেকে বের করার চেষ্টা করছে ডিবি। চুক্তিপত্রটি এখনো মাসুদের কাছে রয়েছে। এদিকে আওয়ামী লীগকে ক্ষমতায় আনার পুরস্কার হিসাবে সেনাবাহিনীর চাকরি থেকে অবসরে গিয়ে এমপি হয়েছিলেন মাসুদ। অবসরে গিয়ে এমপি হয়ে আওয়ামী লীগের আমলেও তিনি দাপটের সঙ্গে চলতেন। এমনকি অন্তর্বর্তী সরকারের আমলেও তার বিরুদ্ধে একাধিক হত্যা ও হত্যাচেষ্টা মামলা থাকা সত্ত্বেও তিনি অধরা ছিলেন ঢাকার বাসাতে। অভিযোগ আছে তার বিরুদ্ধে মানবপাচারের যে মামলা হয়েছিল সেই মামলায় সিআইডির দেয়া ফাইনাল রিপোর্টে প্রভাব বিস্তার করেন। আদালতে তদন্ত সংশ্লিষ্টরা যে অভিযোগপত্র দিয়েছিল সেটি আদালত গ্রহণ না করে মামলাটি পুনরায় তদন্ত করার জন্য ডিবিকে দায়িত্ব দেন। ২০০৮ সালের ২৯শে ডিসেম্বরের নির্বাচনের মধ্যদিয়ে আওয়ামী লীগকে ক্ষমতায় বসানোর পুরো পরিকল্পনার বিষয়ে রিমান্ডে তথ্য দিচ্ছেন।
তদন্তসংশ্লিষ্টরা বলছেন, এক-এগারো সরকারের সময় গ্রেপ্তারের পর বিএনপি চেয়ারম্যান ও বর্তমান প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানকে পুলিশ রিমান্ডে জিজ্ঞাসাবাদের নামে নির্যাতন করা হয়েছিল মাসুদ উদ্দিন চৌধুরীর নির্দেশে। ডিজিএফআইয়ের একটি দল তারেক রহমানকে নির্যাতন করেছিল। টর্চার সেলে নির্যাতন করা হয়েছিল সেখানে মাসুদ উদ্দিন চৌধুরী সশরীরে উপস্থিত ছিলেন। ওই সময় তারেক রহমানের চোখবাঁধা ছিল। এমনকি নির্যাতনের পর তাকে চিকিৎসা পর্যন্ত করতে দেয়া হয়নি। নির্যাতনের সময় সেখানে আর কোন কোন কর্মকর্তা ছিলেন সেসব বিষয়ে রিমান্ডে তাকে জিজ্ঞাসাবাদ করা হচ্ছে। যদিও এসব বিষয়ে তিনি ভালো উত্তর দিচ্ছেন না। বিপুল অর্থের বিনিময়ে অস্ট্রেলিয়ার ক্যানবেরাতে কিনেছেন প্রাইভেট সি-বিচসহ বাড়ি। এসব টাকার উৎস নিয়েও তাকে জিজ্ঞাসাবাদ করা হচ্ছে। ২০০৮ সালের নির্বাচনে কীভাবে ৮৭ ভাগ ভোট কাস্ট হয়েছে, ওই নির্বাচনে বিএনপি যেখানে ১২০টি আসন পাবার কথা সেখানে কীভাবে ৩১টি আসন পেলো, প্রতিটি আসনে আগে থেকেই সিলমারা ব্যালটের পরিকল্পনার সঙ্গে কারা জড়িত এবং নির্বাচন কর্মকর্তার সঙ্গে সমঝোতা, বড় বড় শিল্প গ্রুপের কাছ থেকে টাকা আদায় করে বিদেশে পাচার, অধ্যাপক ড. ইয়াজউদ্দিনের তত্ত্বাবধায়ক সরকার ঘোষিত ২০০৭ সালের ২২শে জানুয়ারির নির্বাচন ভণ্ডুল, ‘মাইনাস টু ফর্মুলা’ বাস্তবায়ন করার অপচেষ্টার বিষয়েও জিজ্ঞাসাবাদ করা হচ্ছে। এ ছাড়া মাইনাস টু ফর্মুলার নামে জিয়া পরিবারকে শেষ করে দেয়ার গভীর ষড়যন্ত্র, ২০০৮ সালের ১৮ই জানুয়ারি দিনাজপুরে খালেদা জিয়ার মায়ের মৃত্যু হলে পরের দিন ১৯শে জানুয়ারি ৬ ঘণ্টার জন্য প্যারোলে মুক্তি দেয়া হলেও তারেক রহমান, আরাফাত রহমান কোকো ও খালেদা জিয়ার সাক্ষাৎ করতে না দেয়ার বিষয়েও জিজ্ঞাসাবাদ করা হচ্ছে মাসুদকে। তাকে নিয়ে বিভিন্ন স্থানে অভিযানও পরিচালনা করছে ডিবি।