বিসিএস (পুলিশ) ক্যাডারের চারজন কর্মকর্তাকে গত বুধবার (২৫ মার্চ) চাকরি থেকে অপসারণ করেছে সরকার। এর মধ্যে রয়েছেন শেরপুরের একটি গ্রাম থেকে উঠে আসা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মার্কেটিং বিভাগের সাবেক ছাত্র মো. আব্দুল আজিজ (সারতাজ আজিজ)। অপসারণের ঘটনায় তার স্কুলজীবনের বন্ধু গাজী এমএ মান্নান মন্ডলের একটি পোস্ট ভাইরাল হয়েছে, যেখানে তিনি জানিয়েছেন, আজিজের অপসারণে তার গ্রামের মানুষের চোখে অশ্রু নেমেছে।
আজ শুক্রবার (২৭ মার্চ) দুপুর ১২টা ৩২ মিনিটে ব্যক্তিগত ফেসবুক আইডিতে এই পোস্ট দেন মান্নান মন্ডল। তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাস বিভাগের শিক্ষার্থী এবং তৎকালীন শেখ মুজিবুর রহমান হলের আবাসিক ছাত্র ছিলেন।
সারতাজ আজিজ একেবারে প্রান্তিক পরিবার থেকে উঠে এসেছিল উল্লেখ করে মান্নান মন্ডল লিখেছেন, আমরা দুজন একসাথে ইন্টারমিডিয়েট থেকে শুরু করে ভার্সিটি পর্যন্ত পড়েছি। ইন্টারমিডিয়েট ফেইল করে যখন পড়াশোনা একেবারে না করার সিদ্ধান্ত নিয়েছিলাম, তখন এই আজিজ আমাকে টেনে নিয়ে গিয়েছিল বাংলাদেশের সর্বোচ্চ বিদ্যাপীঠ পর্যন্ত।
আজিজের মেধার বর্ণনা দিয়ে তিনি লেখেন, অদম্য মেধাবী আমার বন্ধু এসএসসি ও ইন্টারমিডিয়েটে জিপিএ-৫ পেয়েছিল। ১৫-১৬ সেশনে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ভর্তি পরীক্ষায় ‘খ’ ইউনিটে ৩২তম, ‘ঘ’ ইউনিটে ১৪তম এবং জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ে ২য় হয়েছিল। আর্টসের ছাত্র হয়েও কৃতিত্বের সাথে মার্কেটিংয়ে বিবিএ ও এমবিএ শেষ করেন। আজিজ তার প্রথম বিসিএস (৪৩তম) থেকেই পুলিশ ক্যাডার পেয়ে যায়। যার কারণে বেশ কয়েকটি ৯ম/১০ম গ্রেডের চাকরির ভাইভাতে সে উপস্থিত হয়নি।’
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে বাধ্য হয়ে ছাত্রলীগ করতে হত উল্লেখ করে তিনি আরও লেখেন, তৎকালীন সরকারের সময়ে আমাদের মধ্যে যাদের হলের বাইরে থাকার সামর্থ্য ছিল না, প্রায় সবাই বাধ্য হয়ে ছাত্রলীগ করে হলে থাকতাম। আজিজরা ছিল তাদেরই একজন। প্রথম বর্ষে হলে থেকেছে আর ছাত্রলীগ করেনি— এমন কোনো ব্যক্তি নেই। পরবর্তীতে ছাত্রলীগের নিয়মিত গেস্টরুম প্রোগ্রাম না করার জন্য আজিজকে বিভিন্নভাবে তিরস্কার করা হয়। এছাড়া সূর্যসেন হলে যারা ১৫-১৬ সেশন এবং ইমিডিয়েট জুনিয়র ১৬-১৭ সেশন বা তার নিচে যারা ছিল, তাদের কেউ বলতে পারবে না আজিজ কখনো কারও সাথে খারাপ ব্যবহার করেছে।
বন্ধুর পরিবারের সংগ্রামী জীবনের তথ্য তুলে ধরে মান্নান মন্ডল লিখেছেন, আজিজ যে কতটা সংগ্রাম করে পড়াশোনা করেছে, তা আমার চেয়ে ভালো আর কেউ জানে না। ছোটবেলায় বাবা মারা যাওয়ার পর তার ভাই তাকে আজ পর্যন্ত আগলে রেখেছেন। তার ভাই অন্যের জমিতে কাজ করে, রাস্তায় কনস্ট্রাকশনের কাজ করে, এমনকি ঢাকা শহরে প্যাডেল রিকশা চালিয়ে আজিজকে পড়িয়েছেন। তার ভাই সারাদিন রিকশা চালিয়ে সন্ধ্যায় সূর্যসেন ক্যাফেটেরিয়ার সামনে রিকশা রেখে দুই ভাই একসাথে রাতের খাবার খেতেন।
তিনি আরও লিখেছেন, ৪৩তম বিসিএসে জয়েন করে এক বছর পুলিশ একাডেমিতে ট্রেনিং করার পর যেদিন সবাই জানতে পারল তাদের পরবর্তী পোস্টিং কোথায়, সেখানে আমার বন্ধু জানতে পারল তাকে অপসারণ করা হয়েছে। অপসারণ করার পর আজিজকে সারদা পুলিশ একাডেমির প্রিন্সিপাল জিজ্ঞেস করলেন, ‘আজিজ, আমি তো তোমাকে কিছুই দিতে পারলাম না, তবুও বলো তুমি আমার কাছে কী চাও?’ আজিজ উত্তর দিল, ‘স্যার, আমার ব্যাচমেটদের ডিটেনশন যেন মাফ করে সবাইকে একসাথে পাসিং দেওয়া হয়।’
আপনি কি কখনো দেখেছেন কারও চাকরি চলে যাওয়াতে গ্রামের সবাইকে কাঁদতে— এমন প্রশ্ন রেখে মান্নান মন্ডল লেখেন, গতকাল আমি দেখেছি আজিজের গ্রামের মানুষের চোখে পানি। আজিজদের আইজিপি বেনজীর বা ডিবি হারুন বানানোর পুরো দায় রাষ্ট্রযন্ত্রের। এটাই কি তাহলে নতুন বাংলাদেশে মেধাবীদের মূল্যায়ন? কোটা না মেধা? দলীয়করণ, নাকি কেবলই দলীয়করণ!