Image description

জুলাই গণ-অভ্যুত্থানে ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে পুলিশ বাহিনীতে নিয়োগ পাওয়া সাড়ে নয় হাজারের বেশি সদস্যের নিয়োগপ্রক্রিয়া খতিয়ে দেখার সিদ্ধান্ত নিয়েছে সরকার । তাঁদের নিয়োগ যাচাই - বাছাই করে তদন্তের জন্য পুলিশ সদর দপ্তরকে ইতিমধ্যে নির্দেশও দেওয়া হয়েছে । এই পুলিশ সদস্যদের মধ্যে দেড় হাজার উপপরিদর্শক (এসআই) পদে এবং কনস্টেবল পদে আট হাজারের বেশি নিয়োগ পেয়েছিলেন । তাঁরা গোপালগঞ্জসহ বৃহত্তর ফরিদপুর, কিশোরগঞ্জ, মাদারীপুর ও শরীয়তপুরের বাসিন্দা ।

অভিযোগ রয়েছে , তাঁদের অনেকে আওয়ামী লীগ ও এর সহযোগী সংগঠনের নেতা-কর্মী অথবা দলীয় রাজনীতির সঙ্গে সংশ্লিষ্ট পরিবারের সদস্য । স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সূত্র জানায় , ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে জেলা কোটা লঙ্ঘন এবং স্থায়ী ঠিকানার তথ্য গোপন করে রাজনৈতিক প্রভাবে অনিয়মের মাধ্যমে এসব উপপরিদর্শক ও কনস্টেবলকে নিয়োগ দেওয়া হয়ে থাকতে পারে । স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমে পুলিশ সদর দপ্তর এসব নিয়োগ যাচাই - বাছাই করবে । অসংগতি পেলে ব্যবস্থা নেওয়া হবে ।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ বলেন , বিগত সরকারের (আওয়ামী লীগ সরকার) আমলে পুলিশের নিয়োগে বিভিন্ন পর্যায়ে জালিয়াতির ঘটনা ঘটেছে । অনেকে স্থায়ী ঠিকানা পরিবর্তন করে ও অনিয়মের মাধ্যমে নিয়োগ পেয়েছেন । বিষয়গুলো তদন্তের জন্য পুলিশ সদর দপ্তরকে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে । পাশাপাশি তদন্তে যেন কারও প্রতি অন্যায় বা জুলুম করা না হয় , সে বিষয়েও সতর্ক থাকতে বলা হয়েছে । ভবিষ্যতে যাতে এ ধরনের অনিয়ম করার সাহস কেউ না পায় , সে লক্ষ্যেই এই উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে ।

স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সংশ্লিষ্ট শাখার একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা বলেন , স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী তাঁর দ্বিতীয় বৈঠকেই পুলিশের এসব নিয়োগপ্রক্রিয়া যাচাইয়ের নির্দেশ দিয়েছেন । এই তদন্ত করবে মূলত পুলিশ সদর দপ্তর এবং এ বিষয়ে যেকোনো সহায়তা দেবে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ।

সংশ্লিষ্ট সূত্র বলছে , ঠিকানা পরিবর্তন , কোটা জালিয়াতি এবং ‘ ছাত্রলীগ কোটা ” থেকে সরাসরি নিয়োগ পাওয়া এক হাজার ২১৭ জনসহ নানা অনিয়মের মাধ্যমে অন্তত দেড় হাজার উপপরিদর্শক ও আট হাজারের বেশি কনস্টেবলের নিয়োগপ্রক্রিয়া পুনরায় যাচাই-বাছাই করার সিদ্ধান্ত হয়েছে । পরে এ সংখ্যা আরও বাড়তে পারে ।

সূত্র বলেছে , ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী লীগ সরকারের ১৫ বছরে সারা দেশে পুলিশ বাহিনীতে প্রায় ৪৫ হাজার সদস্য নিয়োগ দেওয়া হয় । তাঁদের মধ্যে উপপরিদর্শক অন্তত ১০ হাজার ও কনস্টেবল পর্যায়ে ৩৫ হাজার । বিএনপি ও সমমনা রাজনৈতিক দলগুলোর দীর্ঘদিনের অভিযোগ ছিল , বিগত আওয়ামী লীগ সরকার দলীয় লোকজনকে পুলিশ বাহিনীতে নিয়োগ দিয়েছে । পুলিশকে দলীয়করণের মাধ্যমে রাজনৈতিক কাজে অর্থাৎ বিরোধী রাজনৈতিক দলের নেতা-কর্মীদের ধরপাকড়, গুম, হত্যা, নির্যাতন ও দমন-পীড়নে ব্যবহার করেছে ।

পুলিশের সংশ্লিষ্ট সূত্র বলছে, কনস্টেবল নিয়োগের ক্ষেত্রে জেলাভিত্তিক কোটা থাকলেও তা লঙ্ঘন করে গোপালগঞ্জসহ বৃহত্তর ফরিদপুর , কিশোরগঞ্জ ও মাদারীপুরের বিপুলসংখ্যক লোক নিয়োগ করা হয় । এসব অঞ্চলে কোটার ৩ গুণেরও বেশি লোক নিয়োগ দেওয়া হয় । বৃহত্তর ফরিদপুর অঞ্চল থেকে ১০ হাজার এবং কিশোরগঞ্জ থেকে ৭ হাজার পুলিশ সদস্য নিয়োগ দেওয়া হয় । শুধু গোপালগঞ্জ জেলা থেকেই নিয়োগ পান ৮ হাজারজন । মাদারীপুর ও শরীয়তপুর জেলা থেকেও বিপুলসংখ্যক পুলিশ সদস্য নিয়োগ দেওয়া হয় ।

এর বাইরে ঢাকা জেলার ধামরাই উপজেলার বিভিন্ন গ্রামের বাসিন্দা সাজিয়ে এক হাজার লোককে কনস্টেবল পদে নিয়োগ দেওয়া হয় । এই নিয়োগ হয় ২০১১ সাল থেকে ২০১৩ সালের মধ্যে । ভুয়া জমির দলিল ও জাল নাগরিক সনদের ভিত্তিতে অন্য জেলার লোকদের ধামরাই উপজেলার বাসিন্দা দেখিয়ে কনস্টেবল পদে নিয়োগের ব্যবস্থা করে পুলিশের ভেতরের আওয়ামী লীগপন্থী একটি চক্র । স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায় , কনস্টেবলদের মতো উপপরিদর্শক পদে আট ব্যাচের নিয়োগেও জেলা কোটা মানা হয়নি । গোপালগঞ্জ , ফরিদপুর ও মাদারীপুরের প্রার্থীদের বেশি নিয়োগ দেওয়া হয় । অন্য জেলার নিয়োগের ক্ষেত্রে প্রাধান্য দেওয়া হয়েছিল আওয়ামী লীগ ও এর সহযোগী সংগঠনের নেতা - কর্মী এবং দলীয় রাজনীতির সঙ্গে জড়িত পরিবারের সদস্যদের ।

উপপরিদর্শক নিয়োগ বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে , ২০১২ থেকে ২০২৩ সাল পর্যন্ত আটটি ( ৩৩ তম থেকে ৪০ তম ) ব্যাচে অন্তত ১০ হাজার উপপরিদর্শক নিয়োগ করা হয় । ২০১৮ সালে সরকারি চাকরিতে নিয়োগে কোটা বাতিলের পরিপত্র জারির আগপর্যন্ত মুক্তিযোদ্ধা , জেলা , নারী , ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী ও প্রতিবন্ধী— এই পাঁচ ক্যাটাগরিতে মোট ৫৬ শতাংশ কোটা ছিল । ৩৬ তম থেকে ৪০ তম ব্যাচের নিয়োগ পর্যালোচনায় দেখা যায় , জেলা কোটা অনুযায়ী গোপালগঞ্জের শূন্য দশমিক ৮১ শতাংশ প্রার্থী নিয়োগের সুযোগ থাকলেও নিয়োগ পায় ৩ দশমিক ৮৮ শতাংশ , যা সংখ্যায় ২৩২ জন । ফরিদপুরের ক্ষেত্রে ১ দশমিক ৩৩ শতাংশের সুযোগ থাকলেও নিয়োগ দেওয়া হয় ১৮৭ জনকে । শূন্য দশমিক ৮১ শতাংশ কোটার সুযোগ থাকা

মাদারীপুর থেকে নিয়োগ পান ১৩৩ জন । এভাবে কোটা লঙ্ঘন করে ৫৫২ জন উপপরিদর্শক নিয়োগ করা হয় । এই ব্যাচগুলোতে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়পড়ুয়া ৬৬৫ জন রয়েছেন । জনশ্রুতি রয়েছে , তাঁরা সরাসরি ছাত্রলীগ - সম্পৃক্ত কোটায় নিয়োগ পেয়েছেন । অভিযোগ রয়েছে , ২০১৪ সালের দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আগে এই উপপরিদর্শকদের নিয়োগ দিয়ে মাঠে নামাতে নানা অনিয়ম করা হয় । দুই বছরের প্রশিক্ষণ কমিয়ে এক বছর করা হয় । লিখিত পরীক্ষা শেষে মৌখিক পরীক্ষা ( ভাইভা ) নেওয়ার আগেই পুলিশ ভেরিফিকেশন সম্পন্ন করা হয় । সার্বিক বিষয়ে সদ্য বিদায়ী পুলিশের মহাপরিদর্শক ( আইজি ) বাহারুল আলম আজকের পত্রিকাকে বলেন , সচিবালয়ে এক বৈঠকে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বিগত সময়ে অনিয়ম ও জালিয়াতির মাধ্যমে নিয়োগ পাওয়া পুলিশ সদস্যদের নিয়োগপ্রক্রিয়া যাচাই - বাছাই করে দেখার নির্দেশ দিয়েছেন । কোনো ধরনের অসংগতি পাওয়া গেলে ব্যবস্থা নেওয়া হবে । ইতিমধ্যে মন্ত্রীর বার্তা পুলিশ সদর দপ্তরে পৌঁছে দেওয়া হয়েছে । তদন্ত কমিটি গঠন করে নিয়োগ যাচাই - বাছাই করবে পুলিশ সদর দপ্তর । পুলিশ সদর দপ্তরে খোঁজ নিয়ে জানা যায় , ১৫ মার্চ এক অফিস আদেশে জালিয়াতির মাধ্যমে নিয়োগ পাওয়া ট্রেইনি রিক্রুট কনস্টেবলদের ( টিআরসি ) শনাক্ত করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে । এ জন্য সংশ্লিষ্ট জেলার পুলিশ সুপারকে প্রধান করে চার সদস্যের একটি তদন্ত কমিটি গঠনের বিষয়টিও এতে জানানো হয়েছে । অতিরিক্ত ডিআইজি ( রিক্রুটমেন্ট অ্যান্ড ক্যারিয়ার প্ল্যানিং -১ ) মো . আবু হাসানের সই করা ওই অফিস আদেশ দেশের সব জেলার পুলিশ সুপারদের পাঠানো হয়েছে ।