Image description
১৫৯৯ মেশিনের হদিস নেই

একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আগে তড়িঘড়ি করে প্রায় ৪ হাজার কোটি টাকায় ইলেকট্রনিক ভোটিং মেশিন (ইভিএম) কিনতে প্রকল্প নেয় কে এম নূরুল হুদা কমিশন। তখন দেড় লাখ যন্ত্র কেনা হলেও ওই নির্বাচনে মাত্র ছয়টি আসনে ইভিএমের মাধ্যমে ভোটগ্রহণ করা হয়। প্রকল্পের উন্নয়ন প্রকল্প প্রস্তাবে (ডিপিপি) এক বছরের ওয়ারেন্টি এবং পাঁচ বছরের সাপোর্ট সার্ভিসের কথা উল্লেখ থাকলেও এত যন্ত্র কোথায় রাখা হবে, তার উল্লেখ ছিল না।

ইভিএম প্রকল্পের মেয়াদ ছিল পাঁচ বছর। পরে আরও এক বছর বাড়ানো হয়। সেই সময়ও শেষ হয়েছে ২০২৪ সালের জুনে। কমিশনকে বুঝিয়ে দিয়ে দায়িত্ব ছেড়ে বিদায় নিয়েছে প্রকল্পের সব জনবল। এই ইভিএম ব্যবহার না করতে নির্বাচন ব্যবস্থা সংস্কার কমিশনের সুপারিশ রয়েছে। পরে গণপ্রতিনিধিত্ব আদেশ (আরপিও) থেকেও ইভিএমের অংশ বাদ দিয়েছে নির্বাচন কমিশন (ইসি)। তারপরও অডিট আপত্তি, বাংলাদেশ মেশিন টুলস ফ্যাক্টরির (বিএমটিএফ) ওয়্যারহাউসের বকেয়া ভাড়াসহ নানান জটিলতায় এ যন্ত্র নিষ্পত্তি করা যাচ্ছে না। সাবেকদের কেনা এই ‘মরা’ যন্ত্র নিয়ে এখন বিপদে আছে এ এম এম নাসির উদ্দিন নেতৃত্বাধীন কমিশন। সংশ্লিষ্ট সূত্রে এসব তথ্য জানা গেছে।

সূত্র জানায়, এ এম এম নাসির উদ্দিন কমিশন দায়িত্ব নেওয়ার পর থেকে ইভিএমগুলো কী করা যায়, তা নিয়ে কাজ চলছে। এরই মধ্যে ইসি কর্মকর্তা, বাস্তবায়ন পরিবীক্ষণ ও মূল্যায়ন বিভাগসহ (আইএমইডি) সংশ্লিষ্টদের সমন্বয়ে ইভিএমের ভবিষ্যৎ করণীয় নির্ধারণ নিয়ে একটি কমিটিও গঠন করা হয়েছে। কাজ করতে গিয়ে কমিটিকে এ যন্ত্র নিষ্পত্তিতে নানা ধরনের চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করতে হচ্ছে।

এ বিষয়ে কথা হয় নির্বাচন কমিশনার মো. আনোয়ারুল ইসলাম সরকারের সঙ্গে। কালবেলাকে তিনি বলেন, ‘এখন পর্যন্ত এ সিদ্ধান্তই বহাল আছে যে, আমরা নির্বাচনে আর ইভিএম ব্যবহার করব না। এখন প্রশ্ন হচ্ছে এই কোটি কোটি টাকার ইভিএম দিয়ে আমরা কী করব। দুর্ভাগ্যবশত এগুলো স্টোরে পড়ে রয়েছে। তবে এ বিষয়ে আমরা পদক্ষেপ নিচ্ছি। সচল-অচল যন্ত্রের বিষয়ে একটি প্রতিবেদনের অপেক্ষায় আছি। প্রতিবেদনটি পাওয়ার পর কমিশন চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেবে।’

তিনি আরও বলেন, ‘নির্বাচন কমিশন রাজনৈতিক দল নিয়ে কাজ করে। কোনো রাজনৈতিক দল কি বলছে ইভিএমের মাধ্যমে ভোট চাই? আমার দেশের জনগণ কি ইভিএম সম্পর্কে ইতিবাচক ধারণা পোষণ করে? ইভিএম ব্যবহারের ক্ষেত্রে অতীতে যে রেকর্ড, তাতে কি আমরা আস্থা অর্জন করতে পেরেছি? সবকিছু মিলেই নির্বাচন কমিশনকে এ সিদ্ধান্তে উপনীত হতে হয়েছে যে, ইভিএম ব্যবহার করবে না।

আরেক নির্বাচন কমিশনার আব্দুর রহমানেল মাছউদও জানান, ব্যক্তিগতভাবে তিনি মনে করেন, ইভিএম আর কোনো নির্বাচনে ব্যবহার করা হবে না।

 

সূত্র জানায়, বর্তমানে বিএমটিফে ৮৬ হাজার ২৩৩টি, সিলেট অঞ্চলে ২ হাজার ৬০৭টি, রাজশাহী অঞ্চলে ১৩ হাজার ৫৩০টি, রংপুর অঞ্চলে ৪ হাজার ৪০৫টি, ময়মনসিংহ অঞ্চলে ৬ হাজার ৪২৮টি, চট্টগ্রাম অঞ্চলে ৪ হাজার ১৩৫টি, খুলনা অঞ্চলে ৭ হাজার ১২টি, কুমিল্লা অঞ্চলে ৬ হাজার ৮৭৫টি, ফরিদপুর অঞ্চলে ৩ হাজার ৮৮৫টি, বরিশাল অঞ্চলে ৫ হাজার ৮৭টি, ঢাকা অঞ্চলে ৭ হাজার ৪২৯টি ইভিএম রয়েছে। নির্বাচন ভবনের বেজমেন্ট ও দুটি উপজেলা নির্বাচন অফিসে আগুনে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে ১৫৭টি। সব মিলিয়ে ইসির হিসাবে ১ লাখ ৪৮ হাজার ৪০১টি ইভিএম রয়েছে। বাকি ১ হাজার ৫৯৯টির কোনো হদিস নেই। প্রতিটি ইভিএম কেনা হয়েছে প্রায় ২ লাখ ৩৫ হাজার টাকায়। সে হিসাবে ১ হাজার ৫৯৯টি ইভিএমের মূল্য প্রায় সাড়ে ৩৭ কোটি টাকা।

১ হাজার ৫৯৯টি ইভিএম খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না—বিষয়টি নজরে আনলে ইসি আনোয়ারুল ইসলাম সরকার বলেন, ‘এ তথ্যটি এখন পর্যন্ত অফিসিয়ালি আমার নজরে আসেনি। অফিসিয়ালি প্রতিটি জিনিসেরই হিসাব থাকবে, এটাই নিয়ম। এ ধরনের কিছু ঘটে থাকলে তার জন্য কে, কারা দায়ী বা কী সমস্যা আমরা ফাইন্ড আউট করব এবং নিয়ম অনুযায়ী যা যা করার তাই করব।’

সূত্র আরও জানায়, ইভিএমের ভাড়া বাবদ বিএমটিএফ ৭০ কোটি ৪০ লাখ টাকা দাবি করছে। এতে প্রতি বর্গফুটের ভাড়া ধরা হয়েছে ১৩৪ টাকা। বকেয়া টাকা দিতে ও ওয়্যারহাউস খালি করতে সর্বশেষ গত ১৫ ডিসেম্বর ইসিকে চিঠি দিয়েছে বিএমটিএফ। তবে প্রকল্পের ডিপিপিতে ইভিএম সংরক্ষণের বিষয়টি না থাকায় বকেয়া টাকার বিষয়ে জটিলতা তৈরি হয়েছে। যার কারণে এই টাকা পরিশোধ করতে পারছে না ইসি। অর্থ মন্ত্রণালয়ে চিঠি চালাচালি করেও বিষয়টির সুরাহা হয়নি। ফলে এ বকেয়া ভাড়ার পরিমাণ দিন দিন বাড়ছে। এ ছাড়া মাঠপর্যায়ে বিভিন্ন জায়গায় ইভিএম রাখতে যে গুদাম ভাড়া করা হয়েছে, তাতে প্রতি মাসে ৩০ লাখ টাকার ওপরে ভাড়ার নামে গচ্চা যাচ্ছে। কারণ ইভিএম সংরক্ষণের জন্য যেসব সুবিধা থাকা দরকার, তার কিছুই নেই এসব গোডাউনে।

এ বিষয়ে কথা হলে ইসি আনোয়ারুল ইসলাম সরকার বলেন, ‘বাস্তবতা হচ্ছে ডিসপোজ (নিষ্পত্তি) না হওয়া পর্যন্ত এটি চলতে থাকবে। কারিগরি দিক, প্রশাসনিক দিক; তারপর প্রচলিত আইনকানুনের ভেতর দিয়েই এগুলোকে নিষ্পত্তি করতে হবে।’

এ বিষয়ে নির্বাচন ব্যবস্থা সংস্কার কমিশনের প্রধান ও সুশাসনের জন্য নাগরিক-সুজন সম্পাদক ড. বদিউল আলম মজুমদার বলেন, ‘অপ্রয়োজনীয় প্রকল্পে রাষ্ট্রের অর্থ ব্যয় করা সমীচীন নয়। ইভিএমসহ ব্যর্থ প্রকল্পের জন্য দায়ীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে হবে। একই সঙ্গে ভবিষ্যতে এমন সিদ্ধান্ত ঠেকাতে কঠোর নজরদারি নিশ্চিত করা জরুরি।’

ইভিএমের ভবিষ্যৎ করণীয় নির্ধারণ নিয়ে কাজ করা কমিটির একজন কালবেলাকে জানান, ইভিএম প্রকল্পের মেয়াদ শেষ হলেও এটি নিষ্পত্তি করতে বেশকিছু চ্যালেঞ্জ রয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে, বেশকিছু অডিট আপত্তি; দুদকের তদন্ত; সরকারি সম্পত্তি সঠিকভাবে নিষ্পত্তি করা না হলে পরবর্তী সময়ে আবার অডিট আপত্তির শঙ্কা; এত টাকার জিনিসগুলোর সর্বোচ্চ ব্যবহারে কী করা যায় তার চিন্তা; প্রকল্পের মেয়াদ শেষ হওয়ায় এটি এখন শুধু কমিশনের বিষয় নেই, এটি জটিল এবং আন্তঃমন্ত্রণালয় বিষয় হয়ে গেছে; ইসি উদ্যোগ নেবে; কিন্তু নিষ্পত্তি করতে বিভিন্ন মন্ত্রণালয় জড়িয়ে যাচ্ছে; সংখ্যায় বেশি হওয়ায় কতটি ভালো আছে বা কতটি অচল হয়ে গেছে তার যাচাই করা যাচ্ছে না, কারণ যাচাই করতে আরেকটি ব্যয়ের খাত বের হয়; পুড়িয়ে ধ্বংস করতে গেলেও পরিবেশের ছাড়পত্র লাগবে এবং এর ব্যাটারির কারণে পরিবেশ দূষণের শঙ্কাও রয়েছে।

২০২৪ সালের ৭ জানুয়ারি অনুষ্ঠিত দ্বাদশ সংসদ নির্বাচনে ১৫০ আসনে ইভিএম ব্যবহার করতে চেয়েছিল হাবিবুল আউয়াল কমিশন। সে কারণে নতুন করে আরও ২ লাখ ইভিএম কিনতে ৮ হাজার ৭১১ কোটি টাকার প্রকল্প হাতে নেয় ওই কমিশন। কিন্তু সরকার তাতে সাড়া দেয়নি। সে সময় ইসি জানায়, ৪০ হাজার ইভিএম মেরামত অযোগ্য হয়ে পড়েছে। বাকি প্রায় ১ লাখ ১০ হাজার ইভিএম মেরামতের করতে ১ হাজার ২৬০ কোটি টাকা দাবি করেছিল বিএমটিএফ। ইসির মতে, বিএমটিএফ ইভিএমগুলোকে ব্যবহারযোগ্য করতে মেশিনগুলোর ব্যাটারি, তার, টাইমার এবং অন্যান্য কিছু অংশ পরিবর্তন করতে চেয়েছিল। তাতেও সরকার সাড়া দেয়নি।

ইসি কর্মকর্তারা জানান, বর্তমানে কোনো ইভিএম শতভাগ ভালো থাকার কথা নয়। কারণ, প্রকল্পের মেয়াদ শেষ হয়েছে ২০২৪ সালের জুন মাসে। ২১ দিন পরপর ইভিএমের ব্যাটারি চার্জ দিতে হয়। কিন্তু গত দেড় বছর ইভিএমগুলো ওভাবেই পড়ে আছে। তা ছাড়া মাঠপর্যায়ে যেখানে ইভিএম সংরক্ষণ করা হচ্ছে, সেগুলোর দরজা-জানালা সার্বক্ষণিক বন্ধ থাকা উচিত এবং স্যাঁতসেঁতে হওয়া যাবে না। পাশাপাশি ওই জায়গা বন্যা বা জলাবদ্ধতা থেকে মুক্ত থাকতে হবে। সেখানে বাতাস চলাচলের জন্য ফ্যান থাকতে হবে। কিন্তু মাঠপর্যায়ে যেখানে ইভিএম সংরক্ষণ করা হচ্ছে, সেসব জায়গায় এ ধরনের সুবিধা নেই।

২০১১ সালে চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশন নির্বাচনে একটি ওয়ার্ডে বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) তৈরি ইভিএম প্রথম ব্যবহার করা হয়। পরে ছোট ছোট আকারে ইভিএম ব্যবহার শুরু হয়। ২০১৩ সালে রাজশাহী সিটি করপোরেশন নির্বাচনে একটি ইভিএমের সমস্যার কারণে পরে আর ইভিএম ব্যবহার করা হয়নি। এরপর কে এম নূরুল হুদা নেতৃত্বাধীন কমিশন দায়িত্ব নেওয়ার পর নির্বাচনে ইভিএম ব্যবহারের উদ্যোগ নেয়। বিএমটিএফ কমিশনের জন্য ইভিএম তৈরি করে। সেই ইভিএম ২০১৭ সালে রংপুর সিটি করপোরেশন নির্বাচনে একটি ওয়ার্ডের ছয়টি কক্ষে পরীক্ষামূলকভাবে ব্যবহার করা হয়। এরপর দেড় লাখ ইভিএম কিনতে ২০১৮ সালে ৩ হাজার ৮২৫ কোটি টাকার প্রকল্প পাস হয়। তবে ইভিএম কোথায় রাখা হবে, তা প্রকল্পে উল্লেখ না করেই একসঙ্গে এত যন্ত্র কেনা হয়।

জানা যায়, ২০২৪ সালের ২৬ জুন একটি পৌরসভার সাধারণ ও চারটি পৌরসভার উপনির্বাচনে সর্বশেষ ইভিএম ব্যবহার করা হয়। ২০২৩ সালের ২৬ জুন পর্যন্ত ইসির দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, ইভিএমে ১ হাজার ১৪৩টি নির্বাচন করা হয়েছে। সেগুলো হলো একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ৬টি আসনে; ১৩টি শূন্য আসনে উপনির্বাচন; সাতটি সিটি করপোরেশন; সিটি করপোরেশনের বিভিন্ন ওয়ার্ডের ৭টিতে উপনির্বাচন; ৬১টি জেলা পরিষদে সাধারণ নির্বাচন; ১৮১টি পৌরসভার সাধারণ নির্বাচন; পৌরসভার বিভিন্ন ওয়ার্ডের ১৩টিতে উপনির্বাচন; ২২টি উপজেলায় সাধারণ নির্বাচন; ৬টিতে উপনির্বাচন; ৬৩১টি ইউনিয়ন পরিষদের (ইউপি) সাধারণ নির্বাচন এবং ১৯৩টি ইউপির বিভিন্ন ওয়ার্ডে উপনির্বাচন।