Image description

একদিকে অর্থবছরের প্রথম ছয় মাসে রাজস্ব ঘাটতি ৪৬ হাজার কোটি টাকা ছাড়িয়ে গেছে। অন্যদিকে মূল্যস্ফীতির চাপ দুই অঙ্কের ঘর ছুঁই ছুঁই করছে। যুদ্ধের প্রভাবে হুহু করে বাড়ছে জ্বালানি তেলের আমদানি ব্যয়। খাদ্যপণ্যের বাজারও ঊর্ধ্বমুখী। স্থিতিশীলতা ফেরার আগেই আবার অস্থিতিশীল হয়ে উঠছে ডলারের বাজার। টানা ছয় মাস ধরে কমছে রপ্তানি আয়ও। ফলে চাপ সৃষ্টি হচ্ছে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভে। হুমকির মুখে পড়েছে মধ্যপ্রাচ্যসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশে থাকা প্রবাসী বাংলাদেশি কর্ম। এর ফলে খুব দ্রুত কমে আসতে পারে রেমিট্যান্স প্রবাহ। শুধু তাই নয় ইপিবির তথ্যমতে, টানা সাত মাস রপ্তানি কমায় চলতি ২০২৫-২৬ অর্থবছরের প্রথম আট মাসে (জুলাই-ফেব্রুয়ারি) দেশের সামগ্রিক পণ্য রপ্তানি কমেছে ৩ দশমিক ১৫ শতাংশ। অর্থবছরের বাকি সময়ে রপ্তানি খাতে ইতিবাচক হাওয়া ফেরার কোনো সম্ভাবনা দেখছেন না সংশ্লিষ্টরা। তবে শত প্রতিকূল পরিস্থিতি, নিত্যনতুন চ্যালেঞ্জ দক্ষতার সঙ্গে মোকাবিলা করার চেষ্টা করছে সরকার বলে জানিয়েছেন অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী।

এ বিষয়ে বিশ্বব্যাংকের ঢাকা অফিসের সাবেক প্রধান অর্থনীতিবিদ ড. জাহিদ হোসেন বলেন, মধ্যপ্রাচ্যের সংকট আমাদের অনেক     দিন ভোগাবে। এটা অবশ্য আমাদের একার কোনো সংকট নয়। এটা পুরো বিশ্বকেই ভোগাবে। এই সংকট বহু মানুষকে দারিদ্র্যসীমার নিচে নামিয়ে দেবে নতুন করে। এমনকি বহু দেশ চরম অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তায় নিমজ্জিত হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে বলে তিনি মনে করেন।

ইরান-ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে যুদ্ধ শুরুর পর সংকট এড়াতে চলতি মাসের ১০ তারিখ দ্বিগুণ দামে তিন কার্গো এলএনজি আমদানির অনুমোদন দিয়েছে সরকার। সময়মতো সার, ডিজেল আমদানি করে কৃষকের হাতে পৌঁছাতে না পারলে বাধাগ্রস্ত হবে কৃষি উৎপাদন। অর্থনীতির বহুমুখী চাপে অস্বস্তিতে ভুগছে সরকার। পরিস্থিতি সামলাতে আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) সঙ্গে দফায় দফায় বৈঠক করেছে সরকার। সংস্থাটির এশিয়া অঞ্চলের প্রধান কৃষ্ণা শ্রীনিবাসনের সঙ্গে প্রধানমন্ত্রী, অর্থমন্ত্রী, বিদ্যুৎ ও জ্বালানি মন্ত্রী ও বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর বৈঠক করেছেন চলতি সপ্তাহে। বৈঠকে আইএমএফের সঙ্গে চলমান ঋণ প্রকল্পের বকেয়া কিস্তির অর্থ দ্রুত ছাড়ের অনুরোধ করা হয়েছে। একই সঙ্গে নতুন আরও উৎকর্ষমূলক ঋণ কর্মসূচি নেওয়া যায় কি না সে বিষয়েও আলোচনা হয়েছে। সে সময় আইএমএফের ওই কর্মকর্তা বলেন, চলমান যুদ্ধ পরিস্থিতির কারণে পুরো বিশ্বই সংকটের মধ্যে পড়েছে। বাংলাদেশও এর প্রভাবমুক্ত নয়। এই যুদ্ধ দীর্র্ঘায়িত হলে অর্থনৈতিক সংকট আরও বাড়বে বলে আগেই সতর্ক করেছে আইএমএফ। অন্যদিকে জাতিসংঘের কৃষি ও খাদ্য সংস্থা বলেছে যুদ্ধের কারণে বিশ্বব্যাপী খাদ্যপণ্যের দাম বাড়তে শুরু করেছে। আগামী মৌসুমে সারা বিশ্বেই খাদ্য পণ্যের উৎপাদন খরচ বাড়বে। সরবরাহ চেইন স্বাভাবিক রাখা কঠিন হবে। ফলে কোন কোন অঞ্চলে খাদ্য সংকট তীব্র থেকে তীব্রতর হতে পারে।

এমন পরিস্থিতিতে দায়িত্ব নেওয়ার মাত্র এক মাসের মধ্যেই নতুন ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেট প্রণয়নের কাজ শুরু করেছে সরকার। এ ছাড়া চলতি অর্থবছরের বাজেট বাস্তবায়নও বাধার মুখে পড়েছে। অর্থনীতির এত সব সংকটকে সঙ্গে নিয়ে নতুন বাজেটের প্রস্তুতি নিতেও সরকারকে অনেক বেগ পেতে হচ্ছে। যুদ্ধের পরিস্থিতি সম্পর্কে প্রকৃত অবস্থা জানতে না পারার কারণে কী ধরনের নীতি নেওয়া হবে নতুন বাজেটে সে বিষয়েও সংশয় তৈরি হয়েছে বলে জানিয়েছেন অর্থবিভাগের একাধিক কর্মকর্তা। জানা গেছে, চলতি বাজেটে ভর্তুকি ও প্রণোদনা খাতে বরাদ্দ রাখা হয়েছে ৮৯ হাজার কোটি টাকা। বছর শেষে ভর্তুকির এই পরিমাণ অন্তত ২৫ শতাংশ বাড়ার আশঙ্কা করা হচ্ছে। এর অন্যতম কারণ হিসেবে বলা হচ্ছে ইরান-ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যকার চলমান যুদ্ধ। যার প্রভাবে জ্বালানি তেলের সংকট দেখা দিয়েছে সারা বিশ্বেই। বাংলাদেশেও চলছে জ্বালানি তেলের সংকট।

রাষ্ট্রীয় ভর্তুকি ব্যয়ের লাগামহীন বৃদ্ধির কারণে সরকারের আর্থিক ব্যবস্থাপনায় বহুমাত্রিক চাপ তৈরি হয়েছে। অর্থ মন্ত্রণালয় ও পরিকল্পনা কমিশনের সর্বশেষ হিসাব অনুযায়ী চলতি অর্থবছরে জ্বালানি, বিদ্যুৎ, সার ও খাদ্য খাতে ভর্তুকির জন্য মোট বরাদ্দ হতে পারে ১ লাখ ১০ হাজার কোটি টাকার বেশি, যা গত অর্থবছরের তুলনায় প্রায় ২২-২৫ শতাংশ বৃদ্ধি পেতে পারে। তবে মধ্যপ্রাচ্য সংকট আরও দীর্ঘায়িত হলে অর্থনীতির সংকট ভর্তুকির এই পরিমাণ আরও বাড়ার শঙ্কা রয়েছে।

বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) তথ্যমতে, আট মাস পর আবারও ৯ শতাংশের ঘরে পৌঁছাল মূল্যস্ফীতি। গত ফেব্রুয়ারি মাসে পয়েন্ট টু পয়েন্ট ভিত্তিতে মূল্যস্ফীতি হয়েছে ৯ দশমিক ১৩ শতাংশ। এর আগে গত বছরের মে মাসে ৯ শতাংশের ওপরে মূল্যস্ফীতি হয়। গত ১০ মাসের মধ্যে সর্বোচ্চ মূল্যস্ফীতি হয়েছে ফেব্রুয়ারি মাসে। এর চেয়ে বেশি মূল্যস্ফীতি হয়েছিল গত বছরের এপ্রিলে। মাসটিতে মূল্যস্ফীতি হয় ৯ দশমিক ১৭ শতাংশ। গত ফেব্রুয়ারিসহ টানা চার মাস বাড়ল মূল্যস্ফীতি।

হরমুজ প্রণালি নিয়ে অচলাবস্থার কারণে সবচেয়ে বড় সংকট তৈরি হয়েছে জ্বালানি তেল নিয়ে। এবারের যুদ্ধটাকে তেলের জন্য যুদ্ধ হিসেবে আখ্যা দিয়েছেন বিশ্লেষকরা। এই যুদ্ধের কারণে বিশ্ববাজারে জ্বালানি তেলের দাম ইতোমধ্যে প্রতি ব্যারেল প্রায় ১০০ ডলারে উঠেছে। বাংলাদেশকে দ্বিগুণ দাম দিয়ে জ্বালানি তেল ও এলএনজি আমদানি করতে হচ্ছে। তবু নিরবচ্ছিন্ন জ্বালানি সরবরাহে দেখা দিয়েছে চরম অনিশ্চয়তা। চাপ সামাল দিয়ে সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের জন্য বহুল প্রতীক্ষিত নতুন জাতীয় বেতন কমিশন বাস্তবায়ন নিয়ে তৈরি হয়েছে অনিশ্চয়তা। কমিশন বাস্তবায়নের জন্য বাজেটে সংরক্ষিত ৪০ হাজার কোটি টাকার প্রায় পুরোটাই অন্য খাতে সরিয়ে নিয়েছে সরকার। যার বড় একটি অংশ ব্যয় হয়েছে জ্বালানি খাতের ভর্তুকি এবং নির্বাচনি ইশতেহারের প্রতিশ্রুতি পূরণে। ফলে চলতি অর্থবছরে নতুন বেতন কাঠামো আলোর মুখ দেখার সম্ভাবনা নেই বললেই চলে।