‘খাল কেটে কুমির আনা’ বাংলা ব্যাকরণে বহুল ব্যবহৃত প্রবাদবাক্য। অর্থ হচ্ছে ‘নিজেই নিজের বিপদ ডেকে আনা’। বাংলাদেশ ব্যাংকের গচ্ছিত শেখ মুজিবুর রহমানের ছবিযুক্ত টাকার সিলগালা নোট বাজারে ছাড়ার খবরে সোশ্যাল মিডিয়ায় ক্ষমতাসীন বিএনপিকে উদ্দেশ করে এই প্রবাদবাক্যটি ছড়িয়ে দিয়েছেন। আসন্ন স্থানীয় নির্বাচনে অংশ নিতে দিল্লির কোলে বসে থাকা পলাতক শেখ হাসিনার নির্দেশে ‘শেখ হাসিনা ঐক্য পরিষদ’ ব্যানারে সাংগঠনিক কর্মকা- নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগ অনুসারীরা যখন সারাদেশে সংগঠিত হচ্ছে; দেশি-বিদেশি শক্তির ইন্ধনে আওয়ামী লীগের নেতারা একের পর এক মামলা থেকে জামিন পাচ্ছেন; তখন সিলগালা করে রাখা মুজিবের ছবিযুক্ত নোট বাজারে ছেড়ে দেয়ার সিদ্ধান্ত নিয়ে শুরু হয়েছে বিতর্ক। কেউ কেউ এমন সিদ্ধান্তকে বলছেন রহস্যজনক।
গণরোষের কারণে শেখ মুজিবুর রহমানের ছবিযুক্ত টাকার নোট সিলগালা করে রাখা হয়। অতঃপর অন্তর্বর্তী সরকার নতুন ডিজাইনের নোট ছাপিয়ে বাজারে ছাড়ে। কিন্তু ‘বিপুল অর্থ অপচয় হবে’ অজুহাত দেখিয়ে এখন সেই মুজিবের ছবির সিলগালা নোট বাজারে ছাড়া হচ্ছে। ‘সরকারের বিপুল অর্থ অপচয়’ অজুহাতে মুজিবের ছবিযুক্ত টাকা বাজারে ছড়িয়ে দেয়ার নেপথ্যে কি আওয়ামী লীগের প্রতি মানুষের সহানুভূতি সৃষ্টি করা। দেশের মানুষের কাছে শেখ মুজিব, শেখ হাসিনা ও আওয়ামী লীগকে ফের গ্রহণযোগ্য করে তোলার কৌশল? ফ্যাসিস্ট শেখ হাসিনা দেশকে ঋণগ্রস্ত করে পালিয়েছে। ড. মুহম্মদ ইউনূসের অন্তর্বর্তী সরকার জাতির ঘাড়ের সেই ঋণ বাড়িয়েছেন। এখনো বাংলাদেশে ঋণ ২৪ লাখ কোটি টাকার বেশি। মাথাপিছু ঋণ সোয়া লাখ টাকা। শুধু তাই নয়; দেউলিয়ার পথে যাওয়া ব্যক্তি-মালিকানাধীন ব্যাংকগুলো রক্ষায় কেন্দ্রীয় ব্যাংক অতিরিক্ত টাকা ছাপিয়ে ব্যাংকগুলোকে দিয়ে দেয়; সে দেশে নতুন টাকা ছাপানো ‘সরকারের আর্থিক অপচয়’ অজুহাত কি সত্যিই যুক্তিযুক্ত? সোশ্যাল মিডিয়ায় অনেকেই ‘সর্ষের ভিতরে ভূত’ শব্দটি ব্যবহার করে বিএনপির শীর্ষ নেতৃত্বকে সতর্ক করে দিয়েছেন। আওয়ামী লীগ যখন নানা ফর্মে জেড়ে ওঠার চেষ্টা করছে; স্থানীয় নির্বাচনে অংশ নিতে দেশের রাজনীতিতে প্রত্যাবর্তনে চেষ্টা করছে; তখন মুজিবের ছবিযুক্ত টাকা চালু করে শেখ মুজিব ও আওয়ামী লীগকে মানুষের নতুন করে গ্রহণযোগ্য করে তুলছেন?
জানা যায়, ‘সরকারকে কথিত আর্থিক অপচয়’ বন্ধের অজুহাত দেখিয়ে বাংলাদেশ ব্যাংকের মুজিবের ছবিযুক্ত টাকা বাজারে ছাড়ছে। আর এর নেপথ্যে রয়েছে রাজনীতি। সর্ষের ভিতরে ভূতের মতোই ক্ষমতাসীন বিএনপির ভিতর থেকেই বিএনপিকে নির্বাচনী মাঠে দুর্বল এবং বিব্রতকর অবস্থায় ফেলার অপচেষ্টায় এই কৌশল। কয়েক মাস পর সিটি করপোরেশন, পৌরসভা, জেলা পরিষদ, উপজেলা পরিষদ ও ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে। ওই সব নির্বাচনে আওয়ামী লীগ ভিন্ন নামে দলের নেতাকর্মীদের সংগঠিত করে নির্বাচনে অংশ নেয়ার পরিকল্পনা করছে। অপ্রিয় হলেও সত্য যে, ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানে শেখ হাসিনা ও তার অনুসারী মন্ত্রী-এমপি-নেতা মিলে কয়েক হাজার নেতা বিদেশ পালালেও বর্তমানে সারাদেশে দলটির অনুসারী রয়েছে কয়েক কোটি। বিগত ১৫ বছর আওয়ামী লীগের শাসনামলে পাতানো জাতীয় নির্বাচনগুলোতে এমপি, মেয়র, কমিশনার, জেলা পরিষদ চেয়ারম্যান, উপজেলা চেয়ারম্যান, ইউনিয়ন পরিষদ চেয়ারম্যান ও মেম্বর পদে নির্বাচিত হয়েছিলেন এবং ওই সব নির্বাচনে প্রার্থী হয়ে সুবিধা নিয়েছেন; বর্তমানে রাজনীতিতে নিষ্কৃত এমন নেতার সংখ্যা ২০ থেকে ৩০ হাজারের নিচে। এছাড়া বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ পদে থেকে গণধিকৃত হয়েছেন এবং তোপের মুখে পড়েন এমন নেতার সংখ্যা ৫০ হাজারের বেশি হবে না। কিন্তু কেন্দ্র থেকে শেকড় পর্যন্ত লাখ লাখ নেতা দেশেই রয়ে গেছেন দলটির। দেশের ১২ কোটি ৭৫ লাখ ভোটারের মধ্যে ৩ থেকে ৪ কোটি ভোটার রয়েছেন আওয়ামী লীগ অনুসারী ও কর্মী-সমর্থক। এর বাইরে বিভিন্ন পেশাজীবী ও ব্যবসায়ী রয়েছেন যারা এখন নীরবতা পালন করলেও আওয়ামী লীগের কট্টর সমর্থক। এমন অবস্থায় দেশি-বিদেশি শক্তি সাংগঠনিক কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগকে দেশের রাজনীতিতে পুনর্বাসন করতে চাচ্ছে। তারা ‘রিফাইন আওয়ামী লীগ’ গঠনের চেষ্টা করেছে। এখনো সফল না হলেও ভারতে থেকেই দলটির নেতারা নানা ক্রিয়াকলাপ করছে। দিল্লিতে ইফতার মাহফিলের আয়োজন করেছে। ঢাকায় কর্মরত ভারতসহ বিদেশি রাষ্ট্রদূত ও হাইকমিশনাদের অনেকেই বিএনপির নেতাদের সঙ্গে দেখা-সাক্ষাৎ করে আওয়ামী লীগকে দেশের রাজনীতিতে স্পেস দেয়ার প্রস্তাব দিচ্ছে।
দেশে গত ১২ ফেব্রুয়ারি নির্বাচনের পর আওয়ামী লীগ পুনর্গঠনে ‘শেখ হাসিনা ঐক্য পরিষদ’ গঠন করা হয়। শেখ হাসিনার গত দেড় মাসে সোশ্যাল মিডিয়ায় দেয়া বিভিন্ন বক্তব্যে দেশের সব এলাকায় আওয়ামী লীগের কার্যালয় খুলতে, পেশাজীবী সংগঠনের নামে এবং নানান প্রক্রিয়ায় নেতাকর্মী-সমর্থকদের সক্রিয় হয়ে ওঠার নির্দেশনা দেন। তিনি যে এলাকায় যে ব্যক্তি সক্রিয় হবে এবং কর্মদক্ষতা দেখাবেন তিনিই আগামীতে আওয়ামী লীগের গুরুত্বপূর্ণ পদ পাবেন এমন বার্তাও দেয়া হয়েছে। অতঃপর আওয়ামী লীগের নেতারা দেশের বিভিন্ন এলাকায় অফিস খুলতে শুরু করে এবং যেখানে-সেখানে বিক্ষোভ মিছিল করে। এমনকি ২১ ফেব্রুয়ারি আওয়ামী লীগ অনুসারীরা শহীদ মিনারে বিনা বাদায় শ্রদ্ধা জানান, ধানমন্ডির ৩২ নম্বরে শেখ মুজিবের প্রতিকৃতিতে ফুল দিতে গিয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কয়েকজন শিক্ষক গ্রেফতার হলে পরে তাদের ছেড়ে দেয়া হয়। বিভিন্ন এলাকায় এবার ৭ মার্চের ভাষণ বাজানো হয়েছে এবং ২৬ মার্চ জাতীয় স্মৃতিসৌধে শ্রদ্ধা জানায়। এখন পর্যন্ত সারাদেশে অর্ধশতাধিক এলাকায় জেলা-উপজেলা পর্যায়ের অফিস খোলা হয়েছে।
গণধিকৃত আওয়ামী লীগ যখন স্থানীয় নির্বাচন সামনে রেখে নানাফর্মে রাজনীতির মাঠে ঘুরে দাঁড়ানোর চেষ্টায় মরিয়া; তখন ‘জুলাই চেতনা’ উপেক্ষা করে শেখ মুজিবের ছবিযুক্ত টাকা বাজারে ছাড়া হচ্ছে। একাধিক ব্যাংকারের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নির্দেশনা মেনেই মুজিবের ছবিযুক্ত পুরোনো ডিজাইনের নোট বিনিময় করা হচ্ছে। কেন্দ্রীয় ব্যাংক বলছে, যেহেতু মুজিবের ছবিযুক্ত নোট নিষিদ্ধ করা হয়নি, তাই বিতরণে বাধা নেই। মুজিবের ছবিযুক্ত নোট বাজারে ছাড়ার মাধ্যমে যেন আওয়ামী লীগ-বিরোধী মানুষকে মনস্তাত্ত্বিকভাবে ‘শেখ মুজিব ও আওয়ামী লীগকে’ মেনে নেয়ার ক্ষেত্র তৈরি করা হচ্ছে। অথচ ২০২৪ সালের জুলাই অভ্যুথানের মুখে আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের সঙ্গে সঙ্গে দেশের বিভিন্ন স্থানে শেখ মুজিবের শত শত ভাস্কর্য ভেঙে ফেলা হয়। শেখ মুজিবুর রহমান ও শেখ হাসিনার বিরুদ্ধে মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস বিকৃত ও কুক্ষিগত করার অভিযোগ উঠে। পরে ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকার ক্ষমতায় এসে জনপ্রত্যাশা অনুযায়ী শেখ মুজিবের ছবিযুক্ত নোট বাজারে ছাড়া বন্ধ করার সিদ্ধান্ত নেয়। তারা মুজিবের ছবিযুক্ত নোটের পরিবর্তে নতুন ডিজাইনের নোটের প্রচলন ঘটায়। এখন নবনির্বাচিত বিএনপি সরকার এসে নতুন ডিজাইনের নোট ছাপালে অর্থের অপচয় হবে এমন অজুহাত তুলে বাংলাদেশ ব্যাংকে সিলগালা অবস্থায় থাকা শেখ মুজিবুর রহমানের ছবিযুক্ত পুরোনো নোট আবার বাজারে ছেড়ে দেয়ার সিদ্ধান্ত নেয়।
ব্যাংকিং খাতের একাধিক কর্মকর্তা জানান, শেখ মুজিবুর রহমানের ছবিযুক্ত টাকার নোট বন্ধের দাবির আন্দোলনের মুখে ২০২৫ সালের ঈদুল আজহার সময়ে শেখ মুজিবের ছবিযুক্ত পুরোনো ছাপানো নোটগুলা বিতরণ বন্ধ করে দেয়া হয়। সে টাকা বাংলাদেশ ব্যাংকে সিলগালা করে রাখা হয়। অতঃপর ড. ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকার নতুন করে টাকা ছেপে বাজারে ছেড়ে দেয়। চাহিদার অনুপাতে নতুন ছাপানো টাকার নোটের যোগান দেওয়া সম্ভব না হওয়ায় নতুন করে টাকা ছাপানোর বদলে মুজিবের ছবিযুক্ত আগের ডিজাইনের প্রিন্ট করা আগের ছাপা নোট পর্যায়ক্রমে ছেড়ে দেয়া হচ্ছে। এটা সরকারের কুচ্ছতাসাধন নাকি আওয়ামী লীগকে রাজনীতির মাঠে স্পেস করে দেয়ার কৌশল এ নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।
জানতে চাইলে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের সাবেক চেয়ারম্যান রাষ্ট্রবিজ্ঞানী প্রফেসর ড. নুরুল আমিন ব্যাপারী বলেন, ১২ ফেব্রুয়ারির আগ পর্যন্ত বিএনপির ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন হবে কি-না, তা নিয়ে সংশয়ে ছিল। বিএনপি চেয়েছিল যেভাবেই হোক নির্বাচনটা হোক। সে কারণে হয়তো নির্বাচনের পর আওয়ামী লীগকে রাজনীতির সুযোগ দেয়া হবে এমন প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল। এখন শেখ মুজিবের ছবিযুক্ত টাকা বাজারে ছেড়ে দিল্লিকে দেখাতে চাচ্ছেÑ আমরা কথা রাখছি এবং আওয়ামী লীগের ব্যাপারে নমনীয়। অন্যদিকে দিল্লির নীল নকশায় ওয়ান ইলেভেন ঘটানোর পর শেখ হাসিনা বলেছিলেন, ‘ওয়ান ইলেভেন আওয়ামী লীগের আন্দোলনের ফসল’ ওই ওয়ান ইলেভেনের কুশীলব মাসুদ উদ্দিন চৌধুরী, মামুদ খালেদকে গ্রেফতার করে মানুষকে বার্তা দিচ্ছে বিএনপি ভারতপন্থি নয়। তবে দেশের রাজনীতিতে যেকোনো প্রক্রিয়ায় আওয়ামী লীগের প্রত্যাবর্তন ঘটলে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হবে বিএনপি। তবে এটা ঠিক ২০১৪ সালের নির্বাচনের সময় আওয়ামী লীগ যেমন বলেছিল, ‘এটা সাংবিধানের ধারাবাহিকতার নির্বাচন; ছয় মাস পর ফের নির্বাচন দেয়া হবে’ ঠিক তেমনি ত্রয়োদশ নির্বাচন অনুষ্ঠান নিশ্চিত করতে বিএনপি দিল্লিতে যে প্রতিশ্রুতিই দিক না কেন- সামনে বিএনপির ওইসবের কিছু মনে রাখতে হবে।